অনুষ্ঠানের শুরুতে ক্যানসারের উপসর্গ নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ নিয়ে মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ক্যানসারের একদম সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে অরুচি, ওজন কমে যাওয়া, কারণ ছাড়া জ্বর ইত্যাদি। তবে অঙ্গভেদে ক্যানসারের উপসর্গ একেক রকম হয়ে থাকে। যেমন সাধারণত ফুসফুসের ক্যানসার হলে কাশি ও সেই সঙ্গে রক্ত বের হয়। শ্বাসনালির একেবারে ভেতরে ক্যানসার হলে আবার কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না। ক্যানসারের উপসর্গগুলো প্রথম পর্যায়ে দেখা দেওয়া মঙ্গলজনক। কারণ, তখন এ পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব। কিন্তু যাদের ক্যানসারের উপসর্গগুলো দেরিতে দেখা দেয়, তত দিনে তাদের ক্যানসার অ্যাডভান্স পর্যায়ে চলে যায়। যেমন ব্রেস্ট ক্যানসারের ক্ষেত্রে রোগী সহজে বুঝতে পারে না যে তার ব্রেস্টে লাম্প হয়েছে, যতক্ষণ না সেটি বড় হয়ে আলসার হয়।’

প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যানসার শনাক্ত করার জন্য যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়, তাকে ‘ক্যানসার স্ক্রিনিং’ বলে। এটি করা অত্যন্ত জরুরি। অঙ্গভেদে ক্যানসারের স্ক্রিনিংয়ে ভিন্নতা দেখা দেয়। যেমন ব্রেস্ট ক্যানসার হলে সেলফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন বা এসবিই করতে হয়। যে বয়সী (৪০ ঊর্ধ্ব) রোগীদের ব্রেস্ট ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে, তাঁদের এটি করতে বলা হয়। এ ছাড়া একটি ঝুঁকিপূর্ণ বা রিস্ক গ্রুপ আছে, যেমন যাঁদের পরিবারে ব্রেস্ট ক্যানসারের ইতিহাস আছে , যাঁরা বাচ্চাকে বুকের দুধ কম খাইয়েছেন, যাঁদের বাচ্চা নেই, কন্ট্রাসেপটিভ পিল সেবন করেন, তাঁদের এসবিই করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সারভাইকাল বা জরায়ুর ক্যানসারের সময় ভায়া (ভিজ্যুয়াল ইনস্পেকশন উইথ অ্যাসিটিক অ্যাসিড), পেপ্সমেয়ার, কোলপোস্কপি টেস্ট করতে হয়।
মো. আজিজুল ইসলাম বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আজ থেকে ১০ বছর আগেও বাংলাদেশে ক্যানসার ডায়াগনোসিস টুলস, ওষুধ ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞের অপ্রতুলতা ছিল। ক্যানসার চিকিৎসা কয়েক ধাপে করা হয়। রোগনির্ণয়ের পর তার ধরন দেখে চিকিৎসা শুরু হয়।

একেক রকমের ক্যানসারের জন্য একেক রকমের চিকিৎসক রয়েছেন। মেডিকেল অনকোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট, গাইনি অনকোলজিস্ট, হেমাটোলজিস্ট অনকোলজিস্ট, পেডিয়াট্রিক অনকোলজিস্ট ইত্যাদি। আগের তুলনায় বাংলাদেশে এখন এসব ক্যানসার চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের ঢাকা সিএমএইচের উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, ১০ বছর আগে এখানে মেডিকেল ও রেডিওলোজিস্ট অনকোলজিস্ট ছিলেন একজন। রেডিওথেরাপি ও পেট–সিটি স্ক্যান মেশিন ছিল না। ক্যানসার নির্ণয়ে কিছু উচ্চমানের হিস্টোপ্যাথলজি টেস্ট করা লাগে—এসবের কোনো ব্যবস্থা এখানে ছিল না। কিন্তু গত ১০ বছরে এসব কিছুর উন্নতি হয়েছে। ঢাকা সিএমএইচে এখন একাধিক মেডিকেল ও সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট যেমন, ব্রেস্ট সার্জন, থোরাসিস সার্জন, প্রোক্টোলজিস্ট (কোলোন সার্জন) আছেন। কেমোথেরাপি, উচ্চমানের রেডিওথেরাপিরও ব্যবস্থা আছে।

‘আমাদের দেশের মহাখালী ক্যানসার হাসপাতালের মতো বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র বেশি নেই। আবার এখানে সব ক্যানসারের চিকিৎসাও নেই। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে সবখানে কিছু না কিছু ক্যানসারের চিকিৎসা হয়, যেটা আগে হতো না। কিছু স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ উন্নত মানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই সম্ভব। এ ছাড়া আমাদের দেশে এখন বিশ্বমানের অ্যান্টিক্যানসার ড্রাগ উৎপাদিত হচ্ছে।’
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসা করে এ রোগ পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব। মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ক্যানসার ধরা পড়লে রোগী বা তার আত্মীয়স্বজনের কোনোভাবে হতাশ হওয়া যাবে না। ক্যানসার রোগী কত দিন বেঁচে থাকবে বা সুস্থ থাকবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এটি নিরাময়ে আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে হবে। চিকিৎসকদেরও রোগীর প্রতি আন্তরিক ও অনেক বেশি যত্নবান হতে হবে। কারও শরীরে টিউমার বা লাম্প দেখা দিলে অবশ্যই দেরি না করে টিউমার বা ক্যানসার বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে।

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন