বিটারসুইটের অন্দর
বিটারসুইটের অন্দরছবি: বিটারসুইট

উদ্যোক্তারা সব দেশেই, কোনো একটি ব্যবসার পাশাপাশি নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে কাজ করে থাকেন। ফ্যাশনের সঙ্গে সম্পৃক্তরাও এর বাইরে নয়। বিশ্বমাতানো ফ্যাশন ব্র্যান্ড কিংবা ফ্যাশন কনগ্লোমারেটরাও এ তালিকায় রয়েছে। গুচি, প্রাদা, আরমানি, দিওর, র‌্যালফ লরেন, টিফানি, বারবেরি, লুই ভুইতোর মতো ব্র্যান্ডরা পোশাক, অনুষঙ্গ, সৌরভ আর প্রসাধনীর বৃত্ত ছাড়িয়ে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ আর হোটেল ব্যবসায় মনোযোগী হয়েছে।

বাংলাদেশেও এই ধারাটি বেশ সক্রিয়। কে কবে কখন শুরু করেছে, সেটাও আলোচনার বিষয় বৈকি। তবে পরিসংখ্যান নয়, বরং বলা যেতে পারে এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ আড়ং। এ ধারায় যোগ হয়েছে একসট্যাসি, ইয়েলো, ঢাকা রিপাবলিক, যাত্রা, এপিলিয়ন, লা রিভ, আনোখিরা।

default-image

এ কাফেলায় সবশেষ সংযোজন ক্যাটস আই। বাংলাদেশে ওয়েস্টার্ন ফ্যাশনকে জনপ্রিয় করা, তরুণদের ফ্যাশনেবল করে তোলায় বিশেষ ভূমিকা রয়েছে ক্যাটস আইয়ের। ৪০ বছর পেরিয়ে আসা এই ব্র্যান্ড রসনাবিলাসের উপলক্ষ করে দিতে সম্প্রতি খুলেছে রেস্তোরাঁ। গুলশান-২ গোলচত্বর-সংলগ্ন তাদের রেস্তোরাঁটির নাম বিটারসুইট।

বিজ্ঞাপন

গুলশান-২ গোলচত্বর থেকে পাকিস্তান হাইকমিশনের দিকে এগোলে প্রথম বাঁ দিকে ঢুকল ১০ নম্বর রোড। আর ঢুকেই ডান দিকে বিটারসুইট। লোহার সিঁড়ি দিয়ে সোজা ওপরে উঠে যেতে হবে। এই বিল্ডিংয়েই রয়েছে উইভারস। তাই খুঁজে পাওয়া দুরূহ নয়।

default-image

দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলে এর খোলামেলা অন্দর, আন্তরিক আবহ আপনাকে আতিথ্যের উষ্ণতা দেবে। অন্দরসজ্জার এই কাজ সুনিপুণভাবে করেছে চিন্তন আর্কিটেক্ট। সেটা জানাতে কুণ্ঠা করেননি সাদিক কুদ্দুস। তিনি ও তাঁর স্ত্রী রুমাইলা সিদ্দিকী উভয়েই ক্যাটস আইয়ের পরিচালক—বর্তমানে এই দম্পতিই সামলাচ্ছেন বিটারসুইট পরিচালনার দায়িত্ব।

পোশাক থেকে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় সম্পৃক্ততার গল্পটাও চমৎকার। সম্প্রতি হেমন্তের এক বিকেলে বিটারসুইটে বসে সেসবই বলছিলেন সাদিক কুদ্দুস, যিনি একজন অ্যামেচার গলফারও।

বিটারসুইট ঢাকার রসনা অঙ্গনে নতুন কোনো ব্র্যান্ড নয়, বরং পুরোনোই। কারণ, এটা অন্তত এক যুগের পুরোনো। কিন্তু এর পরিচালকেরা পরিযায়ী জীবন বেছে নিয়ে এই রেস্তোরাঁ হাতবদলের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের ইচ্ছা ছিল পরিচিত কারও হাতে স্বপ্ন-উদ্যোগকে নিশ্চিন্তে রেখে যেতে। ফলে তেমন কাউকেই খুঁজছিলেন তাঁরা। এরই মধ্যে পেয়ে যান রুমাইলাকে। তিনিও আগ্রহ প্রকাশ করেন। ফলে শুরু হয় ক্যাটস আইয়ের দুই পরিচালক সাদিক ও রুমাইলার নতুন অভিযাত্রা।

default-image

কথাগুলো বলে একটু থামেন তিনি। তারপর আবার শুরু করেন, এখানে এসে ভেতরটা দেখে আমার বেশ কনজেস্টেড মনে হয়েছিল। আমি আসলে ছোট পরিসরকে আরও খোলামেলা করতে চেয়েছি। তাই দেয়াল ভেঙে গ্লাস লাগানো হয়েছে। অবশ্য ইন্টেরিয়র যাঁরা করেছেন, তাঁরা আমাদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

ওপর থেকে ঝোলানো হয়েছে বিজলিবাতির বিচ্ছুরণে কোমল আলো পরিবেশকে করেছে উপভোগ্য। কাঠের প্যানেলের উপস্থিতিতে অভ্যন্তর মাত্রা পেয়েছে। টেবিল, চেয়ার, বারটুল থেকে সোফা—সব জায়গায় পারিপাট্য দৃশ্যমান। সজ্জা কোথাও উচ্চকিত নয় বলেই কাটিয়ে দেওয়া যায় অনেকখানি সময়।

বিজ্ঞাপন

ভালোবাসা মানে ঠান্ডা কফির পেয়ালা সামনে/ অবিরল কথা বলা;/ ভালোবাসা মানে শেষ হয়ে-যাওয়া কথার পরেও/ মুখোমুখি বসে থাকা।— রফিক আজাদের কবিতার এই লাইনগুলো অনুরণিত হতে পারে মুখোমুখি বসে। কথায় কথায় গড়িয়ে যেতে পারে সময়।

default-image

এভাবেই বলা যায় নবরূপে রূপান্তর বিটারসুইটের। কেবল ইন্টেরিয়রই নয়, কিচেন আর মেনুও যে বদলে ফেলা হয়েছে তা জানিয়ে। সাদিক যোগ করেন, অবশ্য বিটারসুইটের পুরোনো কিছু জনপ্রিয় মেনু ছিল। সেগুলোকে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
৯ অক্টোবর শুরু হয়েছে বিটারসুইট, নতুনভাবে, নতুন আঙ্গিকে। তাই গুছিয়ে উঠতে সময় লাগাটাই স্বাভাবিক।

হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে গত ফেব্রুয়ারিতেই আমাদের শুরু করার কথা ছিল। সব পরিকল্পনামতো করা হয়েছিল। নিয়োগ দেওয়া হয়ে গিয়েছিল শেফ ও অন্যদের কিন্তু করোনা এসে সবকিছু মাটি করে দেয়।

তবে আমাদের সব কর্মী এ ক্ষেত্রে ভীষণ আন্তরিকতার পরিচয় দিয়ে পুরোটা সময় পার করেছেন। ফলে অক্টোবরে এসে বিটারসুইটের দরজা খুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

default-image

এই ট্রেন্ডে তাঁরা নতুন এবং অনভিজ্ঞ বলে স্বীকার করলেন সাদিক। বললেন, তাই সবকিছু গুছিয়ে উঠতে হচ্ছে নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে।

এর মধ্যে অবশ্য বিটারসুইটের আগের শেফ এবং পেস্ট্রি শেফকে তাঁরা ফিরিয়ে এনেছেন। এর সঙ্গে আরও রয়েছে রুমাইলার সক্রিয় অংশগ্রহণ। তিনিও কিচেনে সহায়তা করে থাকেন।

সাদিক আরও বলছিলেন, করোনা চলাকালে বাসায় বিভিন্ন রেসিপি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন রুমাইলা। সেই অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লেগে যাচ্ছে।

default-image

তবে গত মাস দেড়েকে তাঁরা প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষত পুরোনো ক্রেতারা ফিরে আসছেন। তাঁরা আগের কিছু পদের কারণেই আসছেন। সেগুলো প্রাথমিকভাবে রাখা না হলেও তাদের কথা চিন্তা করেই মেনুতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

চকলেট সুফলে, স্যুপ অব দ্য ডে কিংবা লাসাঙ্গাকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে নতুন নতুন পদ যোগ হচ্ছে প্রতি সপ্তাহেই।

বিজ্ঞাপন

প্রস্তুত প্রণালি থেকে পরিবেশন—সবকিছুতেই রয়েছে আন্তরিকতার ছাপ। অনেকটা বুটিক ক্যাফের মিল পাওয়া যাবে বিটারসুইটের ‘নব আনন্দে জাগো’ আবহ আর আয়োজনে; যেটা উদ্যোক্তা দম্পতি সাদিক-রুমাইলা যেমন উপভোগ করছেন তেমনি রসনাপ্রিয় নগরবাসীও।

default-image

মেনুতে যা যা আছে, তা চেখে দেখার সুযোগ তো আছেই। তবে মাশরুম বা টমেটো টপিংয়ের ব্রুশকেটায় কামড় দিয়ে আপনার স্বাদকোরক অবশ্যই যে উদ্বেল হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কফি আছে, বেছে নিতে পারা যাবে আপন আপন পছন্দে। কিন্তু আমেরিকানো-প্রিয়রা অবশ্যই আমোদিত হবেন ফ্রেশলি ব্রুড কফির ঘ্রাণে ও চুমুকে পাবেন সতেজতার অনুভব।

মন্তব্য করুন