ছবি: লেখক
ছবি: লেখক

পণ্ডিতেরা বলেন, মানুষের জন্ম হয়েছিল উত্তর আফ্রিকার একটি পাহাড়ি জঙ্গলের দেশে। হোমো স্যাপিয়েন্সের প্রথম দেখা পাওয়া গিয়েছিল হর্ন অব আফ্রিকার ইথিওপিয়ায়। এককালে যার নাম ছিল আবিসিনিয়া। ‘হাবসি’দের দেশ। এই দেশ, তার ইতিহাস এখনো আমাদের কাছে এক ধূসর জগৎ। দেশটি মানুষের সভ্যতাকে উপহার দিয়েছিল একটি প্রিয়তম পানীয়; যার নাম ‘কফি’।

default-image

পাশের দেশ মরক্কোতে কিংবা সমুদ্রের অন্য পারে ইয়েমেনে ছিলেন এক সুফি সাধক। নামটা বেশ লম্বা। গোতুল আকবর নুরুদ্দিন আবু অল-হাসান আল শাদিলি। তাঁর ছিল কিছু অলৌকিক ক্ষমতা। তাঁরা প্রার্থনা করে আতুর মানুষের রোগমুক্তি ঘটাতে পারতেন। একবার ইথিওপিয়ায় ঘুরতে ঘুরতে তিনি দেখেন, মাঠেঘাটে একটা ফল খাওয়ার পর পশুপাখিদের মধ্যে খুব স্ফূর্তি দেখা যাচ্ছে। তিনি নিজেও সেই ফল খাওয়ার পর দেখলেন, স্ফূর্তি বোধ করছেন। সেই ফল তিনি নিয়ে আসেন ইয়েমেনে।

অন্য গল্পে আছে, তাঁর শিষ্য ওমরকে একবার কোনো কারণে মক্কা থেকে নির্বাসন দেওয়া হয়। তিনিই নাকি ফলটি খুঁজে পান। ঘটনা যা–ই হোক, ইয়েমেন দেশের সুফি সাধকেরাই প্রথম এই ফলের নির্যাস পান করতে শুরু করেছিলেন। আরবি ইসলামি সংস্কৃতিতে এই নির্যাসের বহু তাৎপর্য রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

একটি তেজোবর্ধক পানীয়ের প্রয়োজন ছিল আরবের মানুষের। পানীয়টির নামটি নেওয়া হয় আরবি ভাষার ‘কাহওয়া’ শব্দটি থেকে। অর্থ, একধরনের মৃদু সুরা, যা ক্ষুধা হরণ করে। অটোমান তুর্কিদের ভাষায় কাহওয়া হয়ে যায় ‘কহওয়ে’। কহওয়ে ওলন্দাজদের ভাষায় হয় কোফি। ষোলো শতকে ইংরেজরা ‘কোফি’ শব্দ থেকে পানীয়টির নাম রাখে ‘কফি’। এখন সারা পৃথিবীতে এই নামই চলে।

default-image

সারা রাত নানা ধর্মানুষ্ঠানে সুফি সাধকেরা এই নির্যাস গ্রহণ করতেন। বিশেষত রোজার সময়। এই নির্যাসের বিশেষ নিদ্রাহর ও ক্ষুধাহর ক্ষমতা ছিল। অথচ তা শরীরে ও মনে শক্তির সঞ্চার করত। সেমেটিকভাষী সভ্যতা, যেমন খ্রিষ্টীয় বা ইসলামি—দুই সংস্কৃতিতেই এই নির্যাস নিয়ে ক্ষমতাশালীরা নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন। কখনো তাকে নিষিদ্ধ করা হতো, কখনোবা পবিত্র মনে করা হতো। তবে ক্রমে তার লোকপ্রিয়তা নির্বাধ বেড়ে ওঠে। সুফি সন্তদের সুবাদে আরব দুনিয়ার মক্কা, মদিনা, কাহিরা, দামাস্কাস, বাগদাদ বা কনস্ট্যান্টিনোপল (এখনকার ইস্তাম্বুল) সব জায়গায় তা ছড়িয়ে পড়ে। মামলুক, সফাভি, অটোমান—সব ইসলামি রাজসংস্কৃতিতেই এর প্রচলন ছিল।

default-image

লোককথা অনুযায়ী দক্ষিণ ভারতের সুফি সাধক বাবা বুদান প্রথম ইয়েমেন থেকে ভারতবর্ষে কফিবীজ নিয়ে এসেছিলেন। বর্তমান দক্ষিণ কর্ণাটকের পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় ঘুমিয়ে থাকা একটি গ্রাম চিকমগলুর বাবা বুদানের সূত্রে হয়ে ওঠে এ দেশে কফি চর্চার উৎস।

‘চিকমগলুর’ শব্দটির উৎস আছে কন্নড় ভাষায় ‘চিক্কমগলা উরু’ নামের মধ্যে। এর অর্থ ‘কনিষ্ঠ কন্যার জনপদ’। সক্করায়পত্তনের প্রবাদিত প্রধান রুকমঙ্গদা তাঁর কনিষ্ঠ কন্যাকে যৌতুক দিয়েছিলেন এই গ্রাম। প্রথমে সুফি সাধক, পরে ইংরেজদের প্রযত্নে এই জায়গা ক্রমে কফি সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়।

নামটা আমরা প্রথম শুনি ইন্দিরা গান্ধীর দৌলতে। তিনি একবার রায়বেরেলির মায়া কাটিয়ে চিকমগলুর থেকে ভোটে লড়েছিলেন। হতাশ হননি। একবার বেলুরু, হালেবিদু দেখে ফিরছিলুম বেঙ্গালুরু। যাওয়ার ছিল হাসান। হঠাৎ একটা বাস এল। যাবে অন্যদিকে চিকমগলুর। এত কাছে এসে ছাড়া যায় না। চড়ে গেলুম। আধঘণ্টার মধ্যেই চিকমগলুর, সবুজের স্বর্গ।

default-image

ভারতীয় উপদ্বীপের পূর্বঘাট আর পশ্চিমঘাট পর্বতমালাকে এককথায় স্বর্গরাজ্যই বলতে হবে। পূর্বে বঙ্গোপসাগর আর পশ্চিমে আরব সাগরের টানা প্রান্তজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে সবুজে সবুজ পার্বত্য প্রদেশ। এই সব পাহাড় হিমালয় নয়। তাদের হিম-মুকুট পরে থাকার বৈভব নেই। কিন্তু সৌন্দর্য মাপতে গেলে তারা পিছিয়ে থাকে না। পশ্চিমঘাটের পর্বতমালার নাম ‘সহ্যাদ্রি’। তার ব্যাপ্তি ষোলো শ কিমিজুড়ে। সেই গুজরাট থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণে মহারাষ্ট্র, গোয়া, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক হয়ে কেরালা পর্যন্ত তার রাজপাট। উচ্চতা মাপতে গেলেও কেরালার আনামুড়ি শৃঙ্গ প্রায় সাতাশ শ মিটার উঁচু।

default-image

এ দেশের কফি সংস্কৃতির কেন্দ্র পশ্চিমঘাট পর্বতমালা। সুফি সাধক বাবা বুদান নাকি হজ করে ফেরার পথে ইয়েমেন থেকে লুকিয়ে সাতটি কফিবীজ সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি থাকতেন পশ্চিমঘাটের চন্দ্রগিরিতে। সেখানেই রোপণ করেছিলেন এই বীজগুলো। তারা ছিল কফি অ্যারাবিকা গোত্রের বীজ। তবে এই পানীয় তখন মূলত সুফি সাধকদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। চন্দ্রগিরি এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তার প্রভাব। চন্দ্রগিরি পর্বতমালা বাবা বুদানের স্মরণে আজ নাম নিয়েছে বাবা বুদান গিরিপ্রণালি। তার সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গটির নাম মুল্লায়নগিরি। জেলা চিকমগলুর। এ দেশে এখানেই প্রথম শুরু হয় কফির কৃষি। ইংরেজরা এই শস্যের বাণিজ্যিক মূল্যটি অনুধাবন করেছিল। উনিশ শতক থেকেই তাঁরা বড় মাত্রায় কফি চাষ শুরু করেন পশ্চিমঘাট পর্বতমালার নানা জায়গায়। মজার কথা, আজ লোকে জানে, নীলগিরি অঞ্চলটিতে শুধু চায়ের চাষ হয়। কিন্তু আগে এখানে কফির চাষই শুরু হয়েছিল। পরে এ দেশের লোক চায়ের নেশায় মজে যায়। কফির বোলবালা রয়ে যায় শুধু দাক্ষিণাত্যেই। তাঁরা বলেন ‘কাপি’।

বিজ্ঞাপন

কথা হচ্ছিল চিকমগলুর নামে ছোট্ট শহরটি নিয়ে। একে ঠিক শৈলশহর বলা যাবে না। কিন্তু নয়নজুড়ানো ভূপ্রকৃতি এখানে। এর অর্থনীতির ভিত্তি কফি চাষ। শহর-গ্রামে প্রায় পনেরো হাজার মানুষ জড়িয়ে আছেন কফিশিল্পে। উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তাঘাট। আকাশছোঁয়া সরলরৈখিক বৃক্ষরাজির ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে কফিগুল্মের কৃষি হয় এখানে। ভারতীয় কফির বৈশিষ্ট্য হলো, এর চাষ হয় ছায়াঞ্চলে। এর স্বাদগন্ধ মৃদু, কোমল। যেদিকে চোখ যায়, শহরটি ঘেরা আছে পাহাড়ের ঢালে কফিবাগানের সারবাঁধা মিছিলে। মাঝেমধ্যে ঢালু লাল ছাদের বাংলোবাড়ি। নির্মল অক্সিজেনে ভাসাভাসি শীতল হাওয়া। তার মধ্যে ভেসে আসে সেঁকা কফিবীজের সুগন্ধ। শহুরে মানুষের ক্লান্ত শরীর জেগে ওঠে প্রকৃতির আলিঙ্গনে। ভেবে গিয়েছিলুম, কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে চিকমগলুরের মায়া কাটাব। কিন্তু থেকে গেলুম দুদিন।

default-image

চিকমগলুরের পরেই আসবে মাদিকেরির কফির গল্প। জেলা কোদাগু বা কুর্গ। অবশ্য পরেই–বা আসবে কেন? আগেই আসা উচিত। এ দেশের কফিবিনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র মাদিকেরি। এ দেশের শতকরা পঁচিশ ভাগ কফি আসে কোদাগু থেকে। কেরালায় হয় উনিশ ভাগ। অ্যারাবিকা, রোবাস্টা আর কাবেরী গোত্রের কফি চাষ হয় এখানে। বিরাজপেট, বিলিগেরি, কুর্গ ইত্যাদি ব্র্যান্ডের কফির সাধারণ নাম ‘মাইসোর কাপি’। মাদিকেরি একটা মাদকতাময় ঠিকানা। চারদিকে কফিবাগান ঘেরা পাহাড়ি জনপদ। চারদিকে বৃক্ষে বিস্তৃত হরিদ্বার। পাহাড়ের গায়ে সযত্ন কর্ষিত কফিবাগান। এ দেশে কফি মানেই তো কোদাগুর কফি। কফি এস্টেটেরই সঙ্গে অতিথিশালা। সে তো গ্রাম। মানে গ্রামই। বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। জেনারেটর ভরসা। বৃষ্টির দিনে বিলিগেরি যাওয়া যায় না তিন-চার মাস। পাহাড়ের আড়ালে সূর্য মুখ লুকালেই নিস্তব্ধ পুরী

নীরবতার শব্দ শুনতে চাইলে স্বাগত। শুধু বন ফায়ারের কাঠ পুড়ে যাওয়ার মৃদু শব্দ। ঘোর কালো আকাশে মিলিয়ে যাওয়া সাদা ধোঁয়ার সিঁড়ি। আঁকাবাঁকা লালমাটির পথ উঠে নামে। এদিক–ওদিক জল ঝরনার দল ভিজিয়ে দিয়ে যায়। কমলাবাগান আর এলাচিবীথির ফাঁকে ফাঁকে বোনা আছে সার সার কফিগুল্মের ঝোপঝাড়। নাম না জানা পাখিদের ডাকাডাকি, পাতার আড়াল থেকে গড়িয়ে আসা রোদ, যখন–তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি, কত রকমের উদ্ভিদ গন্ধের অলস বিলাসিতা।

মাদিকেরি থেকে গাড়িতে সাড়ে তিন ঘণ্টা দক্ষিণে গড়িয়ে গেলেই কেরালার ওয়াইনাড়। উত্তর কেরালার নয়নাভিরাম পরম প্রকৃতির কেন্দ্রে ছোট্ট জনপদ। এখানকার পাহাড়-পর্বত, বনাঞ্চল, হ্রদ-বাঁধ, ঝরনা-নদী, পশুপাখি—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, কেন কেরালাকে ঈশ্বরের বাসভূমি বলা হয়। ওয়াইনাড়ই কেরালার কফি চাষের কেন্দ্র। শতকরা নব্বই ভাগ কফি চাষ এখানেই হয়।

default-image

উনিশ শতকের শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা মননথওয়াড়িতে স্থানীয় রাজা আর উপজাতিক সর্দারদের বিদ্রোহ দমন করতে এসেছিলেন। লড়াই–টড়াই শেষ হয়ে যেতে কোম্পানি সেপাইদের চাষ করতে লাগিয়ে দেয়। মননথওয়াড়ি ছাড়াও তাঁরা অম্বুকুথি পাহাড় আর উপত্যকায় কফি চাষ করতে শুরু করে দেন। বিভিন্ন সাহেবরা তখন জমি ইজারা নিয়ে কফি এস্টেট খুলে বসেন। উনিশ শতকের সাতের দশকে সারা দাক্ষিণাত্যে প্রায় এক শ কুড়ি হাজার একর জমিতে কফি চাষ হতো। তার মধ্যে ষাট হাজার একরই ছিল শুধু ওয়াইনাড়ে।

এ দেশে কফি চাষ ব্যাপারটা ছোট ছোট উদ্যমে করা হয়। শতকরা আটানব্বই ভাগ কৃষিই দশ হেক্টর জমির নিচে বাঁধা থাকে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেমন সমতলভূমিতে কফি চাষ করা হয়, ভারতে তা হয় না। এখানে পাহাড়ের ঢালে, বৃষ্টিনির্ভর চাষ-আবাদ করতে হয়। কায়িক শ্রমদানের অনুপাতও অনেক বেশি। বীজ তোলা, বাছা, রোদে শুকানো—সব কাজই শ্রমিকনির্ভর।

default-image

পশ্চিমঘাটের দেখাদেখি পূর্বঘাটেও কফি চাষ শুরু হয়েছিল। উত্তর অন্ধ্রের আরাকু উপত্যকায় ভালো মাত্রায় কফির কৃষি দেখা যাবে। ছবির মতো আরাকু উপত্যকায় সবুজ পাহাড়ের ঢালে দেখা যাবে কফি খেত। নিলীম নির্জনে একটা ভারী সুন্দর কফি হাউস আছে ওখানে। ওড়িশার ‘দার্জিলিং’ দারিংবাড়িতেও কফি চাষ শুরু হয়েছে

default-image

দক্ষিণ ভারতে ‘কাপি’ শ্রেণিমুক্ত পানীয় হয়ে গেলেও উত্তর ভারতে অনেকের কাছে তা যেন একটা ‘শ্রেণিসত্তা’র সূচক। চা যেভাবে জনতার পানীয়, কফি তা নয়। কফির একটা ‘আপমার্কেট’ আবেদন আছে। কালো কফি পান করার ইচ্ছা যেন ‘চিন্তাশীল’ মানুষের চিহ্ন। কফির সঙ্গে একটা ‘এক্সক্লুসিভ’ রেলা দাগিয়ে দেওয়া এ দেশে মধ্যবিত্তের নির্ভুল লক্ষণ। কফি হাউসে আড্ডা না দিলে বাঙালি বৈতরণি পেরোতে পারে না। কফি তা জানে না ঠিকই। না জানিলে, আমার সকল গান তবুও তোমারে...।

মন্তব্য পড়ুন 0