পরদিন মধ্যরাতে লিজিয়াং শহরের হেরিটেজ ভিলেজে যাই। জমজমাট খাবারের দোকানগুলোর একটিতে উঁচু চুলায় সেঁকা হচ্ছিল কাবাব, সেই সুঘ্রাণ হাড়কাঁপানো শীতের রাতে জমে না গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল চারপাশে। চুলায় হাত সেঁকতে সেঁকতে শিকে ঝোলানো মাংসগুলো কিসের জানতে চাইলে এক ছোকরা মুখ দিয়ে ছাগলের ‘ম্যা’ ডাক শুনিয়ে আশ্বস্ত করে, তারপর বলে, ‘ইউ মুসলিম?’ আমরা ‘হ্যাঁ’ বললে সে নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বিশাল হাসিতে বলে, ‘আই মুসলিম।’ অর্ডার দিলে আমাদের ভেতরে গিয়ে বসতে বলে ও, কিন্তু রাস্তায় চুলার পাশে দাঁড়িয়ে গরম কাবাব আর রুটির স্বাদটা বেশি উপভোগ্য মনে হচ্ছিল। খাওয়ার পর বিল এনে ছোকরা বলে, ‘ইউ মুসলিম, আই ডিসকাউন্ট।’

default-image

ঝুলন্ত পশু প্রদর্শনী

আরেকবার ভিয়েতনামের হালং বে ভ্রমণে লঞ্চে দেওয়া দুপুরের খাবার হিসেবে বিবর্ণ প্লেটে করে আসে চিকেন শাশলিক, তারপর বিখ্যাত মোমো বা ডাম্পলিং, পনির দিয়ে তৈরি এক অজানা খাবার ও ফ্রায়েড রাইস। সেটা খাওয়ার জন্য চামচ চাইলে একজন প্যানট্রির দিক থেকে স্যুপ খাওয়ার কয়েকটা মেলামাইনের চামচ এনে দেয়। অগত্যা ওগুলো দিয়েই ফ্রায়েড রাইস খাওয়ার চেষ্টা করি। টেবিলের এক বিদেশিনী পেপার ন্যাপকিন চাইলে লঞ্চের এক কর্মী টয়লেট টিস্যুর একটা রোল রেখে যায় টেবিলে।

সেবারের ভিয়েতনামযাত্রায় সুগন্ধি প্যাগোডা দেখতে গিয়ে নৌকা থেকে যেখানে নামি, সেখানে খোলামেলা কয়েকটা রেস্তোরাঁর উনুনে রান্না হচ্ছিল রকমারি খাবার। সব কটির সামনে ঝোলানো রয়েছে কয়েক রকম পশুর মৃতদেহ। কাছ থেকে ওগুলোকে চেনার চেষ্টা করি, হরিণ, কুকুর, কিংবা পাটকিলে রঙের ছাগল হতে পারে, এমনকি বনবিড়ালের মতো দেখতে ঈষৎ ডোরাকাটাও ছিল একটা। কোনো কোনোটার কিছু অংশ কেটে নেওয়া হয়েছে খদ্দেরের চাহিদামাফিক রান্না করার জন্য। এগুলোর একটিতে খেতে হবে ভেবে ঘাবড়ে যাই। পরে যেটিতে আমাদের নেওয়া হয়, সেখানে এ রকম ঝুলন্ত পশু প্রদর্শনী ছিল না। আমাদের দেওয়া হয় ভাত, স্যুপ, শাক, মাছের তরকারি ও চিকেন কারি–জাতীয় কিছু। আমি মাছসহ সব পদের স্বাদ নিলেও চিকেন নামের বস্তুটি এড়িয়ে যাই।

পানিছাড়া লাঞ্চ

মঙ্গোলিয়ার অভিজ্ঞতা ছিল অন্য রকম। স্তেপের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মধ্যে গের (তাঁবুর মতো গোল বিশাল ট্র্যাডিশনাল ঘর)। একমাত্র দরজা দিয়ে আসা অপর্যাপ্ত আলোয় একটি মেয়ে খাবার সার্ভ করে, সঙ্গে চপস্টিক। কাঠের বাটিতে সাদা তরল; সেটি ঘোড়ার দুধ নাকি স্যুপ, জানার চেষ্টা করিনি। সঙ্গে আসে টমেটো, সেদ্ধ শসা আর লেটুসপাতার সালাদ। প্রধান ডিশ জবজবে তেলে ভাজা পুরি, ভেতরে মাংসের টুকরা। স্বাদহীন সাদা বর্ণের অপরিচিত সেই তরল আর ভেজা কাঁথার মতো মাংসপুরিকেই সে সময় অমৃতজ্ঞানে খেয়ে নিয়েছিলাম। স্তেপভূমির রোদে ঘুরে বহু আগে পাওয়া জলতৃষ্ণা এই আজব লাঞ্চের পর নতুনভাবে জেগে ওঠে। পানি চাইলে পাশের টেবিল থেকে স্থানীয় একজন স্পষ্ট ইংরেজিতে বলে ওঠে, ‘এখানে তো পানি পাওয়া যাবে না, এরা পানি সার্ভ করে না। আপনারা বরং আরেক বাটি স্যুপ চেয়ে নিতে পারেন।’ তারপর নিজে থেকেই সার্ভ করা মেয়েটিকে স্থানীয় ভাষায় কী যেন বলে দেয়। অগত্যা পানির বদলে দ্বিতীয়বারের মতো সেই অপরিচিত সাদা বিজাতীয় তরল খেয়ে জলতৃষ্ণা নিবারণের চেষ্টা করতে হয়।

সেবারের মঙ্গোলিয়াযাত্রায় খাওয়ার সুযোগ ঘটেছিল সালামির মতো ঈষৎ লোনা কাঠকাঠ শক্ত ঘোড়ার মাংসও। সেই মাংসের শুঁটকি আমাদের গরু-খাসি খাওয়া জিবে তেমন সুস্বাদু মনে হয়নি।

চা-পাতার সালাদ

default-image

বার্মার মান্দালয় থেকে বেগান শহরে যাওয়ার পথে অভিনব লাঞ্চের ব্যবস্থা হয়েছিল খোলা জায়গায় বিশাল এক বৃক্ষের ছায়ায়। ট্যুর কোম্পানির পাঠানো ছোট গাড়ি থেকে বেতের ঝুড়ি আর বড় বড় টিফিন ক্যারিয়ার নামিয়ে খাবার সাজায় দুই ছোকরা। পেতে রাখা ফরাশের ওপর বসে প্রথম পরিচয় ঘটে চা-পাতার সালাদ ‘লাপেতো’র সঙ্গে। এটা বানাতে কাঁচা চা-পাতা থেকে সালাদের কচি পাতা বেছে নিতে হয়। তার সঙ্গে মেশাতে হয় চিনা কিংবা কাজুবাদাম, রসুন, শিমের বিচি, টমেটো, জলপাই তেল ইত্যাদি। লাপেতোর স্বাদে মনে হয় না কাঁচা চা-পাতা খাচ্ছি। বাকি সব খাবার ছিল পরিচিত—মাংস, সবজি, সাদা ভাত ও নুডলস।

গুলাশ না, গুইয়াশ

default-image

আমস্টারডামের ‘মুদার্স’ নামের মশহুর রেস্তোরাঁয় প্রথমবার খাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বিখ্যাত হাঙ্গেরীয় খাবার গরুর মাংসের গুইয়াশ, সবার কাছে যেটি ‘গুলাশ’ নামে পরিচিত। ডাচ ভাষায় ‘মুদার্স’ অর্থ মা। রেস্তোরাঁর নামের সঙ্গে মিল রেখে সব কটি দেয়ালজুড়ে লাগানো আছে ছোট ছোট ফ্রেমে বাঁধানো মায়েদের হাজারখানেক ছবি।

রেস্তোরাঁর খাবারের চেয়ে অভিনব হচ্ছে সেটার পাঁচমিশালি থালাবাটি। ৩০ বছর আগে যেদিন রেস্তোরাঁটা চালু হয়, খদ্দেরদের অনুরোধ করা হয়েছিল, খেতে আসার সময় সবাই যাতে নিজ নিজ থালাবাটি সঙ্গে করে নিয়ে আসে। সেই সময় থেকে এটির টেবিলে এখনো খাবার পরিবেশন করা হয় হরেক ডিজাইনের থালাবাটিতে, একই টেবিলে নানান ডিজাইনের থালাবাটি। অবশ্য এখন আর খদ্দেরদের প্লেট–বাটি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হয় না, তবে আগে থেকে টেবিল বুক না করলে অপেক্ষা করতে হয় কয়েক ঘণ্টা।

রসনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন