‘ও রান্না করতে গেলে ফায়ার অ্যালার্ম বাজবেই’

উচ্চশিক্ষার জন্য আমার বিদেশজীবনের যাত্রা শুরু হয় ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। অনেকখানি উচ্ছ্বাস, উত্তেজনার সঙ্গে সোনার খাদের মতো খানিক দুশ্চিন্তা নিয়ে শুরু হলো আমার যাত্রা। দেশ ছেড়ে যাচ্ছি, পরিবার ছেড়ে যাচ্ছি—এসব কিছুই তখন মাথায় ছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল, এই মহামারির মধ্যে শেষ পর্যন্ত যেতে পারব তো?

যুক্তরাজ্যে বন্ধুদের সঙ্গে তরী (সামনে মাঝখানে)
ছবি: লেখকের কাছ থেকে সংগৃহীত

বিমানে বসে আমার একবারও মনে হয়নি যে আমি লন্ডন যাচ্ছি। মনে হচ্ছিল আমি ট্রেনে করে সিলেটে যাচ্ছি। কেননা, বিমান ভর্তি সিলেটের মানুষ। লন্ডনকে তখন সিলেট সিলেট বলে মনে হচ্ছিল। লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্টে যখন ৫টা বড় বড় ব্যাগ নিয়ে নামলাম, তখনো জানতাম না জীবন আমাকে কী চমৎকার অভিজ্ঞতা আর স্মৃতির মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে জীবন বেশ গোছানো ছিল। খুব সুন্দর একটা ঘর ছিল আমার। বিভিন্ন দেশের বন্ধু পেয়ে কত কিছু যে শিখেছি! সেই প্রথম আমার একা একা শহর চেনা, প্রথম একা বাজার করে রান্না করা, ভয়ংকর শীতের কবলে পড়ে স্নোফল দেখা, সেই সব আমার জন্য একেকটা বড় ঘটনা।

যুক্তরাজ্যে একটা বাসায় আমরা চারজন ছিলাম। তার মধ্যে আমি ছাড়া দুজন আফ্রিকার আর একজন ইউরোপের। সেদিক থেকে আমাদের রান্নাঘর ছিল ডাইভার্সিটির আখড়া। এর মধ্যে আমার রান্না সবচেয়ে মসলাযুক্ত। আমার হাউসমেটরা ঠাট্টা করে বলত, ‘তুমি কিচেনে ঢুকলেই আমরা বুঝে যাই যে এটা তুমি। কেননা, যতক্ষণ তুমি কিচেনে থাকো আমরা রুমে বসে হাঁচি দিতে দিতে শেষ।’

এর মধ্যে আমার এক আফ্রিকান হাউসমেট আবার জীবনে রান্না করেনি। আমাদের সঙ্গে থেকেই তার রান্নার হাতেখড়ি। সে প্রতিদিন খাবার পুড়িয়ে ফেলবে আর সেই ধোঁয়ায় ফায়ার অ্যালার্ম বাজা শুরু হবে, এটা একটা নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। প্রথম দিকে ফায়ার অ্যালার্মের শব্দে আমরা ছোটাছুটি করতাম। পরের দিকে অভ্যাস হয়ে গেল। ধরেই নিলাম ও রান্না করতে গেলে অ্যালার্ম বাজবেই।

যুক্তরাজ্যে বন্ধুদের সঙ্গে তরী (ওপরে মাঝখানে)
ছবি: লেখকের কাছ থেকে সংগৃহীত

আমার এই হাউসমেট আবার স্বীকার করবে না যে সে রান্না পারে না। তার মতে, ‘মাঝেমধ্যে পুড়ে গেলেও’ রান্না সে ভালোই পারে। তার মতে, রান্না খুবই সহজ একটা কাজ। এই বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে একদিন সে খাসির মাংস কিনে আনল। আমি সতর্ক করে বললাম, খাসির মাংস রান্না করা কিন্তু কঠিন। সে আমার দিকে ভেংচি কেটে বলল, ‘শোনো পৃথিবীর কোনো রান্নাই কঠিন না। সব রেসিপি এক। পাতিলে দিয়ে পাতিল চুলায় বসায়া দিবা।’

এত আত্মবিশ্বাসের ফল সন্ধ্যাবেলা পাওয়া গেল। যখন ডিনারে সে তার বিখ্যাত খাসির মাংস মুখে দিতে পারল না। কেননা মাংস সেদ্ধ হয়নি। তখন সে নতুন আইডিয়া বের করল। যে মাংস আগুনে পুড়িয়ে খাবে। তবে অস্বীকার করা যাবে না যে এক–আধ দিন সে সত্যিই ভালো রাঁধত। যেদিন ভালো হতো, সেই খাবার সে সবাইকে খাওয়াত। প্রমাণ করার জন্য যে প্রতিদিনই সে এমন রাঁধে।

আমাদের ইউরোপের হাউসমেট ছিল আমাদের সব সমস্যার সমাধানের নাম। আমাদের যাবতীয় সমস্যা সে অনায়াসে ঠিক করে ফেলত। অবাক হয়ে বলত যে এটা কীভাবে আমাদের জন্য একটা সমস্যা। এর মধ্যে তার বড় কৃতিত্ব ছিল সেন্ট্রাল হিটারের কানেকশনের ব্যাপারে। কেননা আমরা বাকি তিনজন গরমের দেশের মানুষ।

তাহেরা তরী
ছবি: লেখকের কাছ থেকে সংগৃহীত

তাই হিটারের কলকবজা আমাদের জানা নেই। আফ্রিকান হাউসমেট ছিল আমাদের সবার বড়। সে থাকত ঠিক আমার ওপরতলায়। আর তার ছিল মারাত্মক দেশপ্রেম। কাঠের বাড়ি হওয়ায় প্রতিদিন আমার ঘুম ভাঙত তার দেশের গান শুনে। তার কাজ ছিল নিচে কিচেনে যাওয়ার আর ফেরার পথে সবার রুমে নক করে খোঁজখবর করা। সুযোগ পেলেই তার কাজ ছিল মোবাইল থেকে তার দেশের ছবি বের করে আমাদের দেখানো।

এভাবেই একেক বিষয়ে কৃতিত্ব দেখিয়ে আমরা চার মাস একসঙ্গে ছিলাম। একজন আরেকজনকে চেনার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেশ আর সংস্কৃতিও চিনলাম। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ডেনমার্ক। সেখানে আমরা চারজন পড়লাম চারদিকে। শুরু হলো নতুন জীবন।