পরকীয়ার বলি কেন আপনজন

পত্রিকার পাতায় গতানুগতিক অপরাধের পাশাপাশি সম্পর্কজনিত জটিলতা থেকে খুব কাছের মানুষের হাতে খুন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আজকাল প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পরকীয়ার জেরে বাবা বা মায়ের হাতে সন্তান নিহত হওয়ার কয়েকটি ঘটনা পাঠকের মনকে বিষণ্ন করেছে।

পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে কোনো লুকোচুরি রাখা চলবে না। মডেল: সায়েম, সুমি ও তন্বী
প্রতীকী ছবিটি তুলেছেন সুমন ইউসুফ

নিজের লুকানো সম্পর্ক জেনে ফেলায় কখনো কন্যাকে হত্যা করেছেন বাবা, কখনো নিজের সম্পর্কের পথটি মসৃণ করতে আপন শিশুসন্তানকে হত্যা করছেন মা। আবার স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকেও হত্যা করছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই হত্যাকাণ্ড আবেগবশত হঠাৎ করে ঘটিয়ে ফেলা হত্যা নয়; রীতিমতো পরিকল্পনা করে আটঘাট বেঁধেই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানো হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, মানি বা না মানি, পরকীয়া একধরনের সম্পর্ক। আইনি, সামাজিক বা ধর্মীয় কারণগুলো এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আবেগ আর শারীরিক আকর্ষণের কাছে বাধাগুলো পরাজিত হয় বলেই মানুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। আইনি, সামাজিক বা ধর্মীয় বাধাগুলো নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়ে অতিক্রম করে বেশির ভাগ মানুষ। পরকীয়ায় জড়ানোর পেছনে তাঁদের প্রত্যেকেরই কিছু একান্ত নিজস্ব যুক্তি থাকে। তাই যাঁরা পরকীয়া করেন, তাঁদের আত্মগ্লানি তেমন একটা হয় না। নিজের মনপছন্দ যুক্তি দিয়ে নিজের অহংকে রক্ষা করেন। কিন্তু এই আইনি, সামাজিক বা ধর্মীয় বাধার চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার চারপাশের কাছের মানুষজন। তাই নিজের সেই বিশেষ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সেই কাছের মানুষকে সরিয়ে দিতেও যখন কেউ দ্বিধা করেন না, তখনই তাঁরা সংবাদের শিরোনাম হয়ে যান।

পরকীয়া যেভাবে হিংস্র হয়ে ওঠে

মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, নৃশংস আচরণের পেছনে রয়েছে মানুষের অবদমিত কামনা-বাসনা। একে তিনি অবচেতন মনের খিড়কি খুলে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। অবচেতনে মানুষ যা কামনা করে; শিক্ষা, সভ্যতা, সামাজিকতা আর নৈতিকতা দিয়ে সেগুলোকে ঢেকে রাখে তার চেতন মন। সেই অবদমিত কামনা সরাসরি পূরণ হয় না বলে হিংস্রতা আর নৃশংসতার মধ্য দিয়ে ঘুরপথে পূরণ করার চেষ্টা চলে। ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মনের গঠনে তিনটি উপাদান রয়েছে। ইড, ইগো আর সুপার ইগো। আমাদের সব কামনা-বাসনার চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে ইড। সে কেবলই আমাদের তৃপ্ত করতে চায়, যেভাবেই হোক না কেন। আমাদের নৈতিকতার মধ্যে বেঁধে রাখতে চায় সুপার ইগো। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে ইগো।

মনের গঠনে থাকা ইড মানুষের কামনার চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে। ছবিটি প্রতীকী
ছবি: সুমন ইউসুফ

এই ভারসাম্য রক্ষা করাটাই ইগো ডিফেন্স মেকানিজম। মানুষ যখন ইড দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন তার মধ্যে পাশবিক প্রবৃত্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নিষ্ঠুরতা আর হিংস্রতার পেছনে থাকে ইডের প্রভাব।

ফলে একজন মা যখন নিজের সন্তানকে হত্যা করে তখন তার সুপার ইগো পরাজিত হয়, এলোমেলো হয় ইগো ডিফেন্স, সে হারিয়ে ফেলে তার মানবিক গুণাবলি। এখন কে কীভাবে ইগোকে প্রতিহত (ডিফেন্স) করবে, কীভাবে ইডের প্রভাববলয় থেকে নিজেকে রক্ষা করবে, নির্ভর করে তার শৈশবরে বিকাশ, পারিবারিক পরিবেশ, জেনেটিক গঠন, সামাজিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং তার সমাজ ও সংস্কৃতির ভৌতকাঠামোর ওপর। আবার হয়তো পরকীয়ায় জড়িয়েছেন এমন একজন মানুষ যে তাঁর এই সম্পর্কটিকে কোনো রূপ দিতে পারছেন না। সব সময় লুকিয়ে রাখছেন। ফলে তাঁর মধ্যে তৈরি হচ্ছে হতাশা। তিনি এই হতাশা ঢেকে রাখতে সর্বদা আস্ফালন করেন। নিজের হতাশাকে কাটাতে নিজের অপ্রাপ্তিবোধের তাড়না থেকে এমন কাউকে বেছে নেন যিনি প্রতিবাদী নন। সেই দুর্বলের ওপর হিংস্রতা দেখিয়ে একধরনের মানসিক পরিপূর্ণতা পেতে চান। এই তত্ত্বকে বলা হয় ‘ফ্রাস্ট্রেশন-অ্যাগ্রেসন হাইপোথিসিস’। এ কারণেই আমরা দেখি দুর্বলের ওপর একজন হতাশ আর ব্যর্থ মানুষের আস্ফালন ও হিংস্রতা; যার পেছনে রয়েছে তার অপ্রাপ্তি, এই অপ্রাপ্তি তার পরকীয়ার সম্পর্কটিকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দিতে না পারার কারণেই তৈরি হয়। তাই দুর্বলের ওপর যিনি আস্ফালন করলেন আদতে তিনি মোটেই সবল নন, তিনি সেই আপাত দুর্বলজনের চেয়ে শতগুণ দুর্বল, ব্যর্থ আর হতাশ।

কী আছে সমাধান

সাধারণত দেখা গেছে, পেশাগত জীবনে যিনি নৈতিকতার চর্চা করেন, তিনি পারিবারিক জীবনেও বিশ্বস্ত থাকেন। আর পেশাগত দিকে অসৎ মানুষই বেশির ভাগ সময় পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছেন। তাই পেশাগত জীবনেও সৎ থাকা জরুরি। প্রচারমাধ্যমকে হতে হবে দায়িত্বশীল। পরকীয়ার কারণে খুনের সংবাদগুলো এমনভাবে পরিবেশন করতে হবে, যাতে এই সংবাদ থেকে কেউ পরকীয়ার পথকে সুগম করতে খুনকে একটা উপায় হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহিত না হয়। এই নৃশংস আচরণ রোধ করতে হলে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে কোনো লুকোচুরি রাখা চলবে না। সম্পর্ক বজায় রাখা যেমন সামাজিক আচরণ, তেমনি সামাজিক নিয়ম মেনে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাও সমাজসিদ্ধ আচরণ। এর বাইরে গিয়ে নৃশংস আচরণ করার কোনো সুযোগ নেই। পারিবারিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে গুণগত সময় দেবেন। পরিবারে সহনশীলতা আর মিলেমিশে থাকার চর্চা বাড়াতে হবে। ভিন্নমতের প্রতি সম্মান দেখানোও জরুরি।