প্রৌঢ়া গল্পকথকের মতো বলে চললেন, ‘অনেক অনেক দিন আগে, এই জিরোকাস্ত্রা শহরে বুস্তাচিও নামে এক যুবতী ছিল। ওই পাহাড়ের ওপর যে দুর্গটা দেখছ, সেই দুর্গের কাছের জনপদের বেশ কয়েকটা সম্ভ্রান্ত পরিবারের বসত ছিল। বলতে পারো সেটা ছিল সেই যুগের অভিজাত এলাকা। এ রকমই এক অভিজাত পরিবারের একমাত্র ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক বছর পর তাদের পরির মতো একটা মেয়েও হয়। মেয়ের নাম রাখা হয় নেইটেন, ইলিরিয়ান ভাষায় এর মানে রাত্রি। মেয়ের বয়স যখন আড়াই বছর, কোনো এক অজানা অসুখে বুস্তাচিওর বর মারা যায়। এর কিছুদিন পর তাদের সম্পত্তি হস্তগত করতে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগে বুস্তাচিওকে তার শিশুকন্যাসহ বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

default-image

শীতের সেই রাতে বুস্তাচিও তার মেয়েকে নিয়ে এই প্রাচীন শহরের পাথুরে পথে পথে হেঁটে বেড়ায় আর প্রতিটি বাসার জানালায় টোকা দিয়ে আশ্রয় চেয়ে ফেরে। তার প্রতি সবার সহানুভূতি থাকলেও বিতাড়িত বুস্তাচিওকে কেউই আশ্রয় দিতে সাহস করেনি সেই রাতে। ভোরের ঠিক আগে আগে অপমান, লাঞ্ছনা আর শিশুকন্যার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সে তার মেয়েকে কোলে নিয়ে এই পাহাড়ের খাদে লাফিয়ে পড়ে। সেই থেকে আজও তার আত্মা এই পাথুরে শহরের পথে পথে ঘুরে জানালায় টোকা দিয়ে আশ্রয় চেয়ে ফেরে।’

চ্যাঙের দিকে চেয়ে বললাম, ‘আগে জানলে তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাতাম! রুমমেট হিসেবে সে তোমার চেয়ে ইন্টারেস্টিং হতো, আমি নিশ্চিত।’ যাকগে, সুন্দর এই সকালটা আমি আষাঢ়ে গল্প শুনে পার করে দিতে চাই না। ছুটি কাটাতে এসেছি; খাবদাব আর ঘুমাব—এই আমার পরিকল্পনা। হাতের বইটা নিয়ে আমার ঘরের দিকে রওনা হলাম। শুনতে পেলাম চ্যাঙ আন্তরিক কৌতূহল নিয়ে বুস্তাচিও সম্পর্কে প্রশ্ন করে চলেছে।

default-image

জিরোকাস্ত্রায় এসেছি গতকাল। আজ জিরোকাস্ত্রার ইউনেসকো কর্তৃক ‘জাদুঘর শহর’ ঘোষণার ১৫ বছর পূর্তি। রাজধানীতে বসে যখন সরকারি আমন্ত্রণপত্রটি হাতে পেলাম, তখন মনে হলো, বেশ তো, ঘুরেই আসি। নিমন্ত্রণ রক্ষাও হলো, উইকএন্ডটা একটু বেড়িয়ে আসাও হলো। জিরোকাস্ত্রার মেয়র আমার বন্ধু। সে আমাকে দুর্গের ভেতর গোপন সুড়ঙ্গগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।

জিরোকাস্ত্রার একটা পাথুরে শহর। বাড়িঘর, পথঘাট সব পাথরে তৈরি। গ্রীষ্মের উত্তাপে পাথরগুলোও হয়ে ওঠে আরও উত্তপ্ত। তাই দিনের বেলাটা ঘরেই শুয়ে-বসে বইটই পড়ে কাটিয়ে দিই। বিকেলের দিকে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করলে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে, ক্যামেরার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বের হই। এই গেস্টহাউসটা পাহাড়ের বেশ ওপরে। এই গেস্টহাউসের কাছেই অটোমান প্রশাসক আলী পাশার নেতৃত্বে নির্মিত একটি ব্রিজ এখনো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে! হাঁটতে হাঁটতে গেলাম ব্রিজটার কাছে।

default-image

জিরোকাস্ত্রা শহরের পাহাড়টা পেরিয়ে আলী পাশা ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছালে দেখি দূরে একটা মানুষের লাশ পড়ে আছে। বুকটা ধক করে উঠল! ভয়ে ভয়ে কাছে গিয়ে দেখি জ্যান্ত মানুষ। মুখে টুপিঢাকা দিয়ে ঘুমোচ্ছে! পাশে ছোট্ট একটা ব্যাগের ওপরে গুটিসুটি হয়ে আছে একটা কুকুরছানা! আমার পায়ে লেগে গড়িয়ে যাওয়া নুড়ির শব্দে মক্কেলের ঘুম ভাঙল। আলাপ হলে জানলাম, বেলজিয়ামে বড় হওয়া এই তরুণ, নাম এমিল, ‘স্বাধীনতা আর সুখের মানে কী’—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাস ছয়েক আগে ক্যারাভান নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পশ্চিম ইউরোপ থেকে বেড়াতে বেড়াতে একসময় এসে পৌঁছায় পূর্ব ইউরোপের দেশ আলবেনিয়ায়। এখানে এসে কুড়িয়ে পায় এক মাস বয়সী কিসবাকে। এর পর থেকে দুজন একসঙ্গে। এমিল ওর দেখাশোনা করে, যত্ন নেয়, কিছুক্ষণ পরপর জল খাওয়ায়। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে এলে কিসবা কুঁই কুঁই করে একটা শব্দ করে। এমিল তখন ওকে কোলে তুলে নেয়।

এমিল দূরে থাকলে সে এই ব্যাগ ঘেঁষে থাকে, যাতে এমিল চলে যাওয়ার সময় ওকে ভুলে ফেলে রেখে না যায়! অতটুকু প্রাণের কত বুদ্ধি! আলাপ হওয়ামাত্র এমিল কুণ্ডলী পাকানো একটা কাঠের চিলতে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘স্বাধীনতা মানে তোমার কাছে কী, তা এটাতে তোমার মাতৃভাষায় লিখে দাও।’ জানতে চাইলাম, ‘তুমি পড়ে আমার ভাষা বুঝবে কী করে?’ বলল, ‘সে আমি ব্যবস্থা করে নেব।’ কাঠের চিলতেটাতে লিখে ওর হাতে দিলে দেখলাম মোম গলিয়ে সেটা সিলগালা করে রেখে দিল। তরুণ বয়সে কত বিচিত্র কৌতূহল যে থাকে মানুষের। আমি ছবি তুলতে পছন্দ করি দেখে যোগাসনের একটা পোজ দিয়ে বলল, ‘আমি চাই তুমি আমাকে এভাবে মনে রাখো।’

default-image

ওদের সঙ্গেই এবার দুর্গের দিকের পথ ধরলাম। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তাটা যেখানে দুভাগ হয়ে গেছে, সেখানে একটু দাঁড়ালাম। এই বাঁকটার একদিকে প্রাচীন এক অতিকায় অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে আছে সেই দুর্গ। আর একদিকে সেই প্রাচীন অভিজাত সুরম্য অট্টালিকার সারি। স্থানীয় প্রযুক্তি আর সরঞ্জামে নির্মিত জিরোকাস্ত্রার এই অট্টালিকাগুলো আধুনিক স্থাপত্যকলার গবেষকদের জন্য অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়। বৃষ্টির জল ধরে রেখে তা বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের যে কৌশল ও চর্চা এরা রপ্ত করছিল, তা কৌতূহলোদ্দীপকই বটে। যে দুর্গটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, সেটিরও প্রথম গোড়াপত্তন হয় সেই লৌহযুগে। সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া সামগ্রী থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় ৮০০ বছর আগে, মানে আজ থেকে ২ হাজার ৮০০ বছর আগেই এখানে জনপদের অস্তিত্ব ছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ শতকে এই জনপদটি প্রথম দুর্গ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর এই দুর্গ বিভিন্ন শাসকের অধীনে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করেছে। এখন এখানে যেসব স্থাপনা দেখা যায়, তার বেশির ভাগই অটোমান সাম্রাজ্যের প্রশাসক আলী পাশার নেতৃত্বে নির্মিত, এমনকি এই বিখ্যাত ক্লক টাওয়ারটিও। গত শতাব্দীর শুরুর দিকে রাজা জগের শত্রুদের বন্দী করে রাখতে এই দুর্গে একটি বন্দিশালা নির্মাণ করা হয়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা তাদের প্রায় ৫০০ যুদ্ধবন্দীকে এখানকার ৫০টি কুঠরিতে বন্দী করে রাখে। পরে এখানকার কমিউনিস্ট সরকারের আমলেও এই দুর্গে সরকারবিরোধী বিপ্লবীদের বন্দী করে রাখা হয়। ১৯৬৮ সালে যখন এই দুর্গে লোকসংগীত উৎসবের আয়োজন করা হয়, তখন থেকে এখানে আর বন্দীদের রাখা হয় না।

default-image

দুর্গের উঠানের এক কোণে রাখা আছে একটা যুদ্ধবিমান। স্নায়ুযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে। আলবেনিয়ার কমিউনিস্ট সরকারের ভাষ্যমতে, এই বিমানে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর এ দেশে ঢুকেছিল। আর আমেরিকা বলে যে বিমানটি আলবেনিয়ার আকাশসীমা পার হয়ে অন্য কোথাও যাচ্ছিল, আলবেনিয়ার সামরিক শক্তি এটিকে অন্যায়ভাবে ধরাশায়ী করে।

default-image

এসব রাজনৈতিক খুনসুটি চলতেই থাকে। কমিউনিস্ট সরকারের পতনের পর থেকে অবশ্য এই নতুন আলবেনিয়ার সঙ্গে পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ দহরম–মহরম। ৪০ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক এনভের হোজ্জার বাসভবনের ঠিক উল্টো পাশের রাস্তাতেই সেই বাড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হেসে চলেছে কেএফসির সেই বুড়ো দাদাঠাকুর।

জিরোকাস্ত্রা বহুদিন আগে থেকেই গ্রিসের জন্য বলকান অঞ্চলের প্রবেশদ্বার ছিল বলা যায়। বিভিন্ন বাণিজ্য এবং শিল্পস্থাপনার মধ্য দিয়ে জিরোকাস্ত্রাতেও একটি অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব হয় এবং তারাই ধীরে গড়ে তোলে এই শহর। সেই অভিজাত বাড়িগুলোর পেছনের পাহাড়ের আড়ালে সূর্যটা ডুবল ধীরে ধীরে। চারদিকে কী সুন্দর নরম একটা আলো। আকাশের জড়ো হওয়া শ্রাবণের কালো মেঘ, তার ফাটল বেয়ে গড়িয়ে আসা কমলা রঙের নরম আলো আর তার নিচে ধূসর পাথরের স্লেটে ছাওয়া পুরোনো বাড়ির এই শহর! অপার্থিব একটা দৃশ্য! দূরের ওই সুরম্য অট্টালিকাগুলোর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। হঠাৎ একজন তরুণী কণ্ঠের প্রশ্নে ভাবনায় ছেদ পড়ল।
‘তুমি লালনের দেশের মানুষ?’

default-image

এত অবাক আমি হইনি অনেক দিন! ইউরোপের বলকান অঞ্চলের এই পুরোনো শহরে লালনকে কেউ কীভাবে চিনবে? আমার অবাক ভাব তার চোখ এড়ায়নি। একটু হেসে বলল, ‘তোমার শালের পেছনে ওটা লালনের ছবি না?’
বললাম, ‘হ্যাঁ, কিন্তু তুমি লালনকে কীভাবে জানো?’

সে এবার বলল, ‘আমার বাবা বেখতাসি সম্প্রদায়ের সাধক ছিলেন। বাড়িতে সুফি মতবাদের চর্চা থাকায় লালনসহ আরও অনেকের লেখা আমার বাবার সংগ্রহে ছিল। আমি শুনেছি, লালনের কবিতাগুলো নাকি সুর দিয়ে গাওয়া হতো! সুরগুলো নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর! আমি তো শুধু অনূদিত লেখাগুলো পড়েছি; তাতেই যে গভীরতার আভাস পাই, মূল গানগুলো না জানি কত সুন্দর হবে! তোমার নিশ্চয়ই ওঁর অনেক গান জানা।’

আমি বললাম, ‘বাউলদের গান বাংলাদেশের মানুষের কাছে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। এই গানগুলোই পুরো জাতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নয়তো সেই কবেই খুনোখুনি করে বিলুপ্ত হয়ে যেত। এ নিয়ে কেউ কথা বলতে চাইলে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে যেতে পারি। তোমার অত সময় হবে?’

সে সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার অফুরন্ত সময়!’

‘অফুরন্ত সময়’ একটা কথার কথা হলেও ওর চোখে কেমন যেন একটা বিষণ্নতা ছিল। সত্যের মতো শোনাল। এখানে অনেক তরুণীই একা একা বেড়াতে আসেন। ইউরোপের অন্য অনেক দেশের চেয়ে আলবেনিয়া অনেক নিরাপদ। কিন্তু ওকে দেখে পর্যটক বলে মনে হলো না। আমি কথোপকথন হালকা করতে বললাম, ‘আমি ওই দূরের বাড়িগুলোর দিকে হাঁটতে যাব ভাবছি। তোমার সঙ্গে গল্প করতে করতে গেলে হয়তো ততটা দূর মনে হবে না, বরং মনে হবে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়…।’

default-image

অনেক দিনের অনভ্যাস; কণ্ঠে ফ্লার্টের সুরটা হয়তো ভালো লুকাতে পারিনি। উত্তরে সে হেসে বলল, ‘খুউউব, তাই না! অবশ্য আমি তোমাকে ওই বাড়িগুলোর ইতিহাস বলতে পারি; তার বদলে তুমি লালনের গান শোনালে! এই শর্তে রাজি থাকলে চলো এগোনো যাক।’
‘নিশ্চই! কিন্তু তোমার নামটাই তো জানা হলো না!’
‘আমার ভালো নাম অনেক খটমটে, তুমি উচ্চারণই করতে পারবে না। আমার বন্ধুরা আমাকে “বুচি” বলে ডাকে।’
‘আমার নাম সৌভিক। এটাও বেশ খটমটে একটা নাম। আমার বাবার ঠাকুমা সংস্কৃত বই ঘেঁটে রেখেছিলেন এই নাম। তুমি আমায় সহজ করে জাদুকর বলে ডাকতে পারো।’
‘খুউউব, তাই না!’ (চলবে)

লেখক: মানবতাবাদীকর্মী
ছবি: সৌভিক দাস

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন