সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পাহাড় কিনতে চেয়েছিলেন। যে পাহাড়ের পায়ের কাছে থাকবে গহন অরণ্য। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সাতটি পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গড়ে ওঠা ইংল্যান্ডের শেফিল্ড শহররের পায়ের কাছে কোনো অরণ্য নেই। আছে অজগরের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া কালো পিচঢালা রাস্তা। আছে রাত্রির অন্ধকারে পাহাড়ের গায়ে গায়ে লেপ্টে থাকা থোকা থোকা আলো। অনেকটাই দার্জিলিং শহরের মতো। গ্রীষ্মে আরামদায়ক উষ্ণতা থাকলেও শীতকালে আলিঙ্গন করে তুষারপাত আর প্রচণ্ড ঠান্ডা। আমরা আছি সেই সাত পাহাড়বেষ্টিত শেফিল্ড শহরের অন্যতম পাহাড়ি রাস্তা গ্রে স্টোন রোডে মৌনির দিদি জামাইবাবুদের বাড়িতে। যে বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সান্ধ্য ছায়ায় দেখা যায় পাহাড়ি শেফিল্ডের খাঁজে খাঁজে সারি সারি আলোর বহর।

শেফিল্ড শহর

আগের দিন দিনভর পিকডিস্ট্রিক্ট ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত–শ্রান্ত শরীর এলিয়ে দিলাম বিছানায়। কারণ, ঘুম থেকে উঠেই যেতে হবে রদারভ্যালি নামের অসম্ভব সুন্দর এক হ্রদের পারে। সেখানেই উদ্‌যাপিত হবে মৌনির জন্মদিন; তারপর নৌবিহার আর খানাপিনা। ব্যস, সকালে উঠেই বনভোজনের জোগাড়যন্ত্র করে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। গন্তব্য রদারভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক। শেফিল্ড থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূর হলেও লন্ডন থেকে রদারভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের দূরত্ব প্রায় ১৭০ কিলোমিটার।

রদারভ্যালির যাত্রাপথে একটু শেফিল্ড শহরের গোড়াপত্তন নিয়ে একটুখানি বলে নিই। শেফ এবং ডন নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা শেফিল্ড শহর মানুষের আবাসস্থল হয়ে ওঠে সেই লৌহ যুগ থেকে। তবে জানা যায়, মধ্যযুগের শুরুতে ব্রিটেনে নরম্যান্ডি শাসন আমলে শেফিল্ড ক্যাসল তৈরি হয়েছিল ক্রমাগত ক্ষীণ হয়ে আসা পূর্ববর্তী শাসক অ্যাংলো-স্যাক্সন শাসকদের দৌরাত্ম্য পর্যবেক্ষণ করতে। সেই ক্যাসলের সূত্র ধরে ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করে শেফিল্ড শহর।

বয়ে চলেছে ডন নদী

চৌদ্দ শ শতকে ছুরি তৈরিতে সিদ্ধহস্ত শেফিল্ড শহরের নামডাক ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইংল্যান্ডে, যা মধ্যযুগীয় ব্রিটিশ লেখক জেফ্রি চসারের বিখ্যাত কেন্টারবারি টেলেও উঠে এসেছে। ধীরে ধীরে আজকের শেফিল্ড গোটা বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়ে আছে স্টেইনলেস স্টিলের কাটলারি প্রস্তুতকারক হিসেবে। ষোলো শতকে শেফিল্ডের হালমশায়ার কাটলারি কোম্পানি হয়ে ওঠে গোটা ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামচ, কাঁটা চামচ ও ছুরি তৈরির শহর হিসেবে। ধীরে ধীরে শেফিল্ড ব্যাপ্তি লাভ করতে শুরু করে শিল্পনগরী হিসেবে। ১৭৪০ সালে শেফিল্ডে স্টিল প্রসেসিং শুরু হয় এবং এখানকার অধিবাসী বেঞ্জামিন হান্টসম্যানের হাত ধরে উদ্ভাবন হয় কাস্ট আয়রনের পণ্যসামগ্রীর।

রদারভ্যালিতে পৌঁছেই গাড়ি থেকে বাক্সপ্যাটরা নামিয়ে প্রথমেই আয়োজন হলো জন্মদিন উদ্‌যাপন। এরপর খাবারের দায়িত্বে নিয়োজিতরা শুরু করলেন বনভোজনের আয়োজন। আর আমাদের মতো তরুণেরা হইহই করে নেমে পড়লেন নৌবিহারে। বাংলাদেশের মানুষ আমি। পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতেও ডুব–সাঁতারে এপার-ওপার করেছি দেওরভাগা নদীতে। অবাধ সন্তরণে স্নান করেছি সুরমা, কুশিয়ারা আর কুঁড়া নদীতে। সুতরাং নৌকার হাল ধরার দায়িত্ব পড়ল আমার হাতে। বহুদিন পরে নৌকার গলুইয়ে বসে মনে পড়ল বহিরানা ঘরানার সংগীতসাধক হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান...
‘হবিগঞ্জের জালালী কইতর, সুনামগঞ্জের কুঁড়া,
সুরমা নদীর গাংচিল আমি, শূইন্যে শূইন্যে দিলাম উড়া,
শূইন্যে দিলাম উড়া রে ভাই, যাইতে চান্দের চর,
ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি, কইলকাত্তার উপর,
তোমরা আমায় চিননি...’

রদারভ্যালি হ্রদে নৌবিহার

একটু ভালো করে বাঁচার অথবা পেশাগত জীবনের উৎকর্ষের জন্য আমরা যাঁরা দেশ ছেড়েছি, তাঁরাও জল, নৌকা কিংবা দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে নিজের অজান্তেই পদ্মা–মেঘনার গাংচিল হয়ে উঠি। টান পড়ে শিকড়ের সুতায়। হাজারো চাকচিক্যের মাঝে থেকেও বুকে আফাল ওঠে টিনের চালে শ্রাবণের বৃষ্টিময় অলস সন্ধ্যার জন্য। রদারভ্যালির টলটলে জলে অশ্রান্ত নৌকা বেয়ে সেদিনের মতো ভ্রমণ সমাপ্ত করে ফিরলাম বাড়িতে।

রাতে খাবারের আয়োজনে ছিল ব্রিটিশ ভেড়ার মাংসের ঝাল ঝাল ঝোল। তুলতুলে নরম ভেড়ার মাংসের টুকরা জিহ্বা আর তালুর হালকা চাপে মিশে গেল তুলার মতো। সেই সাথে পদ্মার ইলিশ। এই একটা বিষয়ে বাংলাদেশের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণাম জানাতেই হয়। না হলে কার্বনিফেরাস যুগের পিকডিস্ট্রিক্টে বসে পদ্মার ইলিশের স্বাদ পাওয়া দুষ্কর ছিল। সেই সাথে ডাল আর বেগুন ভাজা দিয়ে কবজি ডুবিয়ে খাওয়া শেষে বসল আড্ডা।

চলে গেছে পথ

আড্ডার মধ্যমণি মৌনির দাদাবাবু রঞ্জিত চক্রবর্তী। যাকে ইতিহাসের তথ্যভান্ডার বললেও মনে হয় ভুল বলা হবে। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ছাত্রজীবনে ছিলেন বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত। স্বাধীনতার পর প্রথম ডাকসু নির্বাচনে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।হালের বহু জাতীয় নেতাদের সাথে ছিল সখ্য, হলের রুম শেয়ার কিংবা মিছিলে স্লোগানে গলা মেলানো। যাঁদের অনেকেই তাদের তৎকালীন আদর্শ ত্যাগ করে নানা ধারার রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। দায়িত্ব মনে করেই যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো দিনও কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেননি, এমনকি নেননি মুক্তিযুদ্ধের সনদও। ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কলারশিপে চলে এসেছিলেন লন্ডনে। ইতিমধ্যে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং স্বাধীনতার মূল চারটি স্তম্ভের ধ্বংসস্তূপে আর ফিরে যেতে সায় দেয়নি মন। এরপর থেকেই বসতি শেফিল্ডে। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা এবং লম্বা ঘুম শেষে পরের দিন সকালে আমরা প্রস্তুতি নিলাম পিক ডিস্ট্রিক্টে আমাদের শেষ অভিযানের। গন্তব্য হেদার সেইজ, যেখানে পাহাড়ের চূড়ায় ফুল, পাথর আর সবুজের সমারোহ।

এবার আর গাড়ি নয়। পুরো পথটাই যেতে হবে হেঁটে। বাড়ি থেকে বেরিয়েই খাড়া পাহাড়। সেই পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতেই শুরু হলো ঢালু রাস্তা। এভাবে উঁচু–নিচু রাস্তা হাঁটতে হাঁটতে কখন যে আমরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে উঠে এসেছি টেরই পাইনি। আসলে এমন শান্ত প্রকৃতি, অপূর্ব ঝরনা, দুধারে সবুজ ঘাসের মাঠে ভেড়া আর গরুর পালের আনাগোনায় ক্লান্তি টের পাওয়া যায় না।

হোয়াইটলি উডের পাহাড়ি ঝিরির পাশ দিয়ে পাথুরে রাস্তা ৫৪১
হাজার বছরের পুরনো পাথরের উপরে বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন লেখক

এমন সরু পাহাড়ি পথে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে সারিবদ্ধভাবে আমরা পাঁচজন মোহগ্রস্ত হয়ে হাঁটছিলাম, তখন পাখির কূজন, পাহাড়ি ঝিরিতে স্বচ্ছ জলের শব্দ আর বাতাসের আনাগোনা ছাড়া অন্য কিছুই মনে ছিল না। কিন্তু উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে দৃশ্যপটে এল পাখির চোখে শেফিল্ড শহরের ইট-কংক্রিটের জঙ্গল, তখনই সংবিত ফিরে পেলাম। চারপাশের এত জৌলুশ পাহাড়, প্রকৃতি আর হাতের কাছে নরম মেঘের আনাগোনার মাঝে মনুষ্য সৃষ্ট শেফিল্ড শহরকে নিতান্তই নগণ্য মনে হলো।

পাহাড়ের চূড়ার ছোট একটি কফিশপের বেঞ্চে গা এলিয়ে চা-কফি আর ক্যারট কেক গলাধঃকরণ আর খানিক বিশ্রাম শেষে শুরু হলো আবারও পথচলা। এবার পাহাড়ের একেবারেই উঁচু সরু পথে চলেছি আমরা। চারপাশটা জনশূন্য, কোনো হইচই নেই। দুধারে সারি সারি দেবদারু গাছ আর মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে ছোট ছোট কটেজ। ভ্রমণবিলাসীদের এমন কটেজে সন্ধ্যা নামলে কাচের জানালা গলে জোনাকির মতো জ্বলে ওঠা আলো ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৩০০ ফুট উঁচুতে হেদার সেইজ
হাজার হাজার বছরের পুরাতন পাথর, যার নাম অক্সস্টোন। এটি পাথরের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় যার স্তর
প্রাচীন চুনাপাথরের বেড়া

অবশেষে আমরা পৌঁছালাম আমাদের গন্তব্য হেদার সেইজে। সিজন এখনো আসেনি, তাই হেদার ফুলের রঙিন ফুলপাহাড়ের দর্শন না পেলেও এমন প্রকৃতি সহজেই হার মানায় স্বর্গের অপ্সরী কিংবা মর্ত্যের প্রিন্সেস অব আলেকজান্দ্রিয়া ক্লিওপেট্রা কিংবা হেলেন অব ট্রয়কেও।

আমরা হাঁটছি মিলিয়ন বছরের পুরোনো পাথুরে পাহাড়ের গায়ে সারি সারি দেবদারুগাছ আর হেদার ফুলের ইন্দ্রপুরীতে। মনে হচ্ছিল নীল আকাশে সাদা মেঘগুলো চলে এসেছে একেবারেই হাতের নাগালে। হেদারের ঝাড়গুলো আর সুনীলের কবিতার উল্টো অনুবাদ করে পাহাড়ের পায়ের কাছে নয় বরং উঠে এসেছে একেবারেই চূড়ায়।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৩০০ ফুট উঁচুতে সারিবদ্ধ দেবদারু গাছ
পাথরের উপরে বসে লেখক ও তার সঙ্গীরা

এমন অপার প্রকৃতির সান্নিধ্যে কৃত্রিম নাগরিক যাপিত জীবনের ভাবনা বড্ড বেমানান। সেই ভাবনা থেকেই হয়তো মনের মধ্যে চলছিল প্রেম, প্রকৃতি আর অপার্থিব জীবনের সন্ধান। আর হেডফোনে প্রিয় শিল্পী মানসী অনন্যার খালি কণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান:
বঁধু তোমায় করবো রাজা তরু তলে,
বনফুলের বিনোদমালা দেব গলে।।
সিংহাসনে বসাইতে হৃদয়খানি দেব পেতে,
অভিষেক করব তোমায় আঁখি জলে।।

লেখক: পিএইচডি গবেষক ও প্রভাষক, ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, এংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটি, কেমব্রিজ
ছবি: অসীম চক্রবর্তী
বি.দ্র: শেফিল্ড নিয়ে প্রথম পর্বটি প্রকাশিত হয়েছিল ২৭ জুন।

আরও পড়ুন

নিসর্গের মৌতাতে প্রাক্‌-ইতিহাসের অনুভব