default-image

সাইকেলে প্রথম দিন

আমাদের (সালমা আপা, শামিমা আপা, আমি আর চঞ্চল) সঙ্গী দুটো ট্যান্ডেম। বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই দুই সাইকেলে। আজ গন্তব্য মানদ্রাকা পার্ক। ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে পড়েছিলাম। সিকি কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তা এবার বাঁয়ে মোড় নিয়ে খাড়া ঢালে উঠে গেছে। রেকি করতে এসে গতকালই বুঝেছিলাম এটা কঠিন পরীক্ষা হবে। তুলনামূলকভাবে কোনো শহরের মধ্যে এমন খাড়া রাস্তা আগে দেখিনি। যানবাহনের মধ্যে ছোট পুরোনো গাড়ি, মোটরসাইকেল, সাইকেল আছে। স্কুলের বাস দেখা গেল বেশ কয়েকটা। রাস্তা আশঙ্কাজনক সরু। অপরদিক থেকে আসা গাড়ির সঙ্গে টক্কর লাগার আশঙ্কা পদে পদে।

আট কিলোমিটার আসতেই দেড় ঘণ্টা। আরও ঘণ্টাখানেক চালিয়ে আম্বানিতসেনা নামের এক জায়গায় বিরতি নেওয়া হলো। এটা খাবার হোটেল। খুব ছিমছাম।

আসার পথে রাস্তার দুধারে বসতি তেমন চোখে পড়েনি। মাঝেমধ্যে ঝুপড়িতে দোকানজাতীয় কিছু একটা। রাস্তা থেকে নেমে গিয়ে খানিক বাদে আবাদি জমি। বেশির ভাগই জমিতেই সবজিজাতীয় ফসল।

default-image

টানা সাইকেল চালালাম। একসঙ্গে শুরু করেও দুই দলের তাল রাখা দায় হয়ে গেল। আমরা এগিয়ে যেতে যেতে একসময় আবার তাদের দৃষ্টিসীমা হারিয়ে ফেললাম। পথ হারানোর ভয় নেই। তাই নিজেরা এগিয়ে গেলাম। সামনে কোনো বসার জায়গা বা দোকান পেলে থামা যাবে।

হঠাৎ লোকালয়। এক সারিতে কয়েকটা পুরোনো বাড়ি। পলেস্তারা খসে খসে গেছে। মলিন হয়েছে টালিগুলো। বিকেলের রোদের উষ্ণতা হারিয়ে গেছে আগেই। ঠান্ডাও লাগছে। এমন ছোট লোকালয় ঠিক আমাদের দেশের মতোই। দিনের বিশেষ কোনো সময় জমজমাট হয়। দু–একটা মানুষের আনাগোনা। আমাদের সাইকেলের প্রতি ঝোঁক সবার। তবে বাংলাদেশের মতো হাত দিয়ে টেপাটিপি করার প্রবণতা দেখা গেল না!

সারা দিন চালানো হলো। সময়টাকে রাত না সন্ধ্যা বলব? আটটা বাজে। আলো আছে। তবে মিহি দানার মতো আবছা হয়ে আসছে ক্রমে। দূরে পাহাড়ের গায়ে ঢলে পড়া সোনালি কিরণে কয়েকটি বাড়ির ছাতে টিভির অ্যানটেনা দেখা যাচ্ছে। আমরা একটা ত্রিবেণী সংগমে বসে আছি। হোটেল আরও দূরে। প্রায় ৯টার সময় রাস্তার সঙ্গে লাগানো গাছগাছালিতে ভরা মানদ্রাকা পার্ক হোটেলটা পাওয়া গেল।

default-image

মানদ্রাকা পার্ক থেকে বেজানোজানো

প্রাতরাশ হলো ফরাসি কায়দায়। ন্যাপকিন জড়িয়ে ব্রেড বাটার অমলেট। সঙ্গে ফলের পানীয়। মনোরম পরিবেশ। রাতে একটা কাঠের সেতু টপকে এসেছিলাম। এখন দেখা গেল তার নিচে বহমান খাল। পরিখার মতো।

প্যাডেল দেওয়ার শুরু সকাল সোয়া সাতটায়। সিঁথির মতো সরু নদীটা আমাদের সঙ্গী হলো। বাঁ দিকে বয়ে যাচ্ছে অবিরাম। কলকল শব্দ পাওয়া যায় খানিক পরপর। রাস্তা এখানে দারুণ। ওঠানামা আছে, তবে গাছগাছালিতে ভরা। মন খুলে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা একই সঙ্গে। নিকট দূরত্বে একটা স্থাপনা। মানদ্রাকার মতোই। সঙ্গে নদীও আছে। মরামাঙ্গা নামের শহরে থাকব আমরা আজ। বেলা শেষে পৌঁছে গেলাম রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া হোটেলে।

উত্তরমুখী যাত্রার শেষ দিন

রুটিনমাফিক ভোর ছয়টায় পথে নামলাম। আজ সবচেয়ে কম চালানো হবে। ৩০ কিলোমিটারের নিচে। রাস্তায় চড়াই আছে কয়েকটা। খাড়া। তবে দীর্ঘ নয়। এতে কষ্ট কম হয়। দৈর্ঘ্য লম্বা হলে কষ্ট বাড়তে থাকে। আজ এত কম দূরত্ব হওয়ার কারণ হলো, এর পরের থাকার জায়গা অনেক দূরে। ১০০ কিলোমিটারের আগে কিছু পাওয়া যাবে না। এই রাস্তায় আমরা ১০০ কিলোমিটার চালাতে পারব না। আজকে যেখানে থাকার পরিকল্পনা, সেখান থেকে আগামীকাল প্রায় ৯০ কিলোমিটার পর একটা মোটেল পাওয়া যাবে। তাই আজ নির্ভার দিন। ধীরে–সুস্থে চালিয়ে শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া।

আজ রাস্তা ভারী চমৎকার। দুই সাইকেল একসঙ্গে। কথা বলে বলে যাওয়া যাচ্ছে। হালকা চড়াই। উতরানো যাচ্ছে তালে তালে। মসৃণ পাকা রাস্তা। মাঝেমধ্যে ১৮ চাকার ট্রাক আসছে। এই গাড়ি নিয়ে ভয় কম। গাড়িগুলো এত উঁচু যে চালক দূর থেকে রাস্তার সবকিছুর খেয়াল রাখতে পারেন।

default-image

প্রায় এক ঘণ্টার পর বড় একটা নামা ঢালের দেখা মিলল। ১০ শতাংশ গ্রেডিয়েন্টের (ঢালের মাত্রা) চিহ্ন দেওয়া। এর মানে খুব খাড়া ঢাল। এ ধরনের রোড সাইন পাহাড়ি দেশে খুব পরিচিত। চঞ্চলেরা এগিয়ে চোখের পলকে হারিয়ে গেল। সকালে মিষ্টি রোদ হালকা হয়ে যাচ্ছে। দূরের ধূসর মেঘমালা পেঁজা তুলার মতো জড়ো হয়ে কালো রং ধারণ করছে। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেড়ে গেলে ঘাম হয় বেশি। কুলকুল করে ঘামের নহর নেমে যাচ্ছে শিরদাঁড়া বেয়ে। আমরা সমতল থেকে উঁচুতে আছি। বৃষ্টির ভাব প্রবল। থামলাম ছবি তোলার জন্য। আজ একটু আয়েশ কিংবা বিলাসিতা যাই বলা হোক, হতেই পারে।

মধ্যবেলার আগেই আজকের যাত্রার ইতি টানা হলো। এখান থেকে ১০০ কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে মাদাগাস্কারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর তমাসিনায় চলে গেলাম পরদিন। আরও এক দিন পর পৌঁছালাম মাহাভেলনা। এটি পর্যটন এলাকা। মাহাভেলনা মালাগাছি নাম। ফউলপয়েন্ট নামেও পরিচিত। ইতিহাস বলছে, এই ফউলপয়েন্ট এসেছে ‘ফুল’ নামের এক ব্রিটিশ জাহাজের নামানুসারে। আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত সময়কালে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমের এই শহর দাস কেনাবেচার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সে সময় এখানে এক ফোর্ট তৈরি করা হয়েছিল শত্রুপক্ষের হাত থেকে বাঁচার জন্য। এ ছাড়া মাহাভেলনার উপকূল বিরল প্রজাতির কোরাল রিফ দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত ছিল। এই দুইয়ের কারণে বর্তমানে এই শহরে পর্যটন ভীষণ জনপ্রিয়।

default-image

হোটেলের ভাড়া খুবই কম। দুই থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে যে হোটেল পাওয়া যাবে, তা নিজে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হতো। মান্দা বিচ হোটেল একেবারে সৈকতঘেরা। ভারী মনোরম স্থাপনা। কটেজগুলো বাঁশ-কাঠ-ছনের চালা দিয়ে তৈরি। এগুলোও কোমর পর্যন্ত উঁচু মাচার ওপরে। জোয়ারের জন্যই সবকিছু মাচার ওপর হবে হয়তো।

কটেজের সিঁড়িতে বসে খালি পায়ে বালুতে আঁকিবুঁকি করা আর ভারত মহাসাগরের সামনে বসে পিৎজা খাওয়া। এ–ও লেখা ছিল আমাদের কপালে!

উত্তরমুখী যাত্রার আজকে শেষ দিন। এরপর আবার একই পথে তমাসিনা পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে। আজ থামব মোহাম্বো নামের খুদে শহরে। শহর বলা না গেলেও এখানে থাকার জন্য হোটেল, রিসোর্ট আছে। দামে যদিও সবাই এক। নামে আলাদা। দিন শেষে রাস্তার অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। এমন খানাখন্দে আরাম করে চালানোও যাচ্ছে না। বৃষ্টির পানি জমে গেছে কোথাও কোথাও। সময় বলছে আমরা পৌঁছে গেছি। কিন্তু হোটেলটা দেখা যাচ্ছে না। আরও ছয় কি সাত কিলোমিটার হবে ‘হোটেল হিবিসকাস’ লেখা সাইনবোর্ড দেখলাম। আনতানানারিভোর যে হোটেলে উঠেছিলাম, তার মালিক এই হিবিসকাসের কথা বলেছিলেন।

default-image

এখানেও কটেজ। ভাড়া ২ হাজার ৫০০ টাকা। সাগর গুনে গুনে ৫০ কদম। বাঁশ-কাঠের ঝুপড়ির কটেজ। সাগরের গর্জন ছাড়া আর কিছু নেই। গাড়ি নেই। বাড়ি নেই। দোকান নেই। জনমানবহীন নিরালা। আমরা চার প্রাণী আর হোটেলকর্মী এক তরুণী। আরও মানুষ আছে কোথাও, তবে দেখতে পেলাম না। জুতা ছুড়ে ফেলে খালি পায়ে আরাম লাগছে বেশি। কটেজগুলো ঘাসের জমির ওপর। সৈকত এসে মিশে গেছে ঘাসের সঙ্গে। ঘাসে জমিন এগিয়ে সৈকত যেখানে শুরু, সেখানে শামিয়ানা টাঙানো। নিচে দুটো টেবিলে ছয়টি চেয়ার। বাতাসে পতপত পতাকার মতো উড়ছে শামিয়ানা।

সৈকতে এসে দেখা গেল আরও হোটেল আছে। তবে দূরে। এই হিবিসকাসের মতোই। জেলেদের নৌকা ডাঙায় ভেড়ানো। জাল টেনে তুলছে ওই দূরে কয়েকজন। একজন নারী এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। মাথায় নীল একটা গামলা।

শেষের দিন হিসেবে জায়গাটা আমরা সবাই খুব উপভোগ করলাম। নামমাত্র মূল্যে দারুণ খাবার সেই আনন্দকে বাড়িয়ে দিয়েছিল আরও বেশি। মনে রাখার মতো হলো এই সফর। যদিও এখানেই শেষ নয়, তবে একই পথে ফিরে যেতে কষ্ট আর সময় দুই কম লাগবে।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন