মাতৃমৃত্যুদর্শন

যদি কোনো স্বর্গীয় দূত এক হাতে স্বর্গ ও অন্য হাতে শৈশব নিয়ে এসে আমাকে বলে কোনটা নেবে? আমি বিমুগ্ধচিত্তে শৈশব নিয়ে নেব। অবশ্য শৈশবের প্রতি এই অনুভূতির মূলে আছেন মা। এটা সম্ভবত সবার ক্ষেত্রেই এক। অনেকেই বুঝতে পারে, আবার কেউ কেউ পারে না। আজ থেকে প্রায় ১২ বছর আগে প্রকাশিত এক লেখায় আমার সাড়ে তিন বছর বয়সী শৈশবের স্মৃতিচারণা করেছিলাম আর তা ছিল মাকে ঘিরেই।

ছোটবেলায় বন্ধু মাসুদের সঙ্গে আমার একবার মারামারি হলো। মা মাসুদকে আদর করে কোলে নিয়ে আমাকে হালকা ঝাড়ি দিলেন। ঘরে এসে আমাকে বোঝালেন, ‘তুমি ওর সঙ্গে আর কখনো এমন করবে না, কারণ ওর মা নেই।’ আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওর মা কোথায় মা?’ মা একটু চুপ থেকে বলেছিলেন, ‘মারা গেছে।’ আমি ফের প্রশ্ন তুললাম, ‘মারা গেলে এখন কোথায়?’ মা শান্তসুরেই বললেন, ‘আল্লাহর কাছে।’

এরপর থেকে মাসুদ আমার খুব ভালো বন্ধু। আমার জীবনের প্রথম বন্ধু সেই মাসুদই। বয়স যখন চার, তখন প্রতিদিন মাসুদের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতাম, এটা কীভাবে সম্ভব? ও থাকে কী করে? আমার তো মা একটু চোখের আড়াল হলেই দম আটকে যায়, মনে হয় পৃথিবীটা শূন্য। মাঝেমধ্যেই মাকে জিজ্ঞাস করতাম, ‘মাসুদ ওর মাকে ছাড়া কীভাবে থাকে মা?’ মা বলতেন, ‘আল্লাহই ব্যবস্থা করেন, ওর মনকে ভুলিয়ে রাখেন; তা ছাড়া ওর তো কোনো কিছু মনে নেই।’ তখন কত কথা হতো মায়ের সঙ্গে, হাজার হাজার প্রশ্ন। মা রান্নাবান্না আর গেরস্থালির কাজকর্ম করার মধ্যেই জবাব দিতেন। মাঝেমধ্যে তো বিরক্ত হতেনই।

আমাদের রান্নাঘরের ওপরে একটা বড় কড়ইগাছ ছিল। তাতে কাকসহ বিভিন্ন পাখি এসে বসত। কাক এসে ডাকাডাকি করলেই মা বলতেন, ‘ওই কাউয়া আল্লাহরে ডাক।’ কাক কা–কা করতেই থাকত। ওই সময় বয়স দুয়েরও নিচে। একবার আমার জ্বর হলো। রাতে জ্বর বেড়ে গেলে মা আমাকে চেপে ধরে বললেন, ‘মনে মনে আল্লাহরে ডাকো বাবা।’ আমি বুঝতে পারছিলাম না আল্লাহরে কীভাবে ডাকে। আমি লজ্জায় প্রশ্নও করতে পারি না। মনে মনে কা–কা করতে থাকলাম। কারণ, মা যখন কাককে বলেছিলেন, কাক তো তখন কা কা করছিল। মা বিরক্ত হবেন ভেবে শৈশবে এমন অনেক সহজ প্রশ্নের উত্তরের জন্য মাকে জিজ্ঞাস করতাম না, নিজে নিজেই মিলিয়ে নিতাম।

মা তাঁর শেষ সময়টা কাটিয়েছেন আমার সঙ্গে। এ সময় মা আমাকে ওই রকম প্রশ্ন করতেন। আমি পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী থাকলে মাঝেমধ্যে চুপ থাকতাম, কখনোবা বিরক্ত হতাম। বেশি বিরক্ত হলে মা রাগ করতেন। একদিন তো বলেই ফেললেন, ‘আমি তোর বাসায় থাকুম না।’ আমি হাসি দিয়ে বললাম, ‘আমার আবার বাসা এল কোত্থেকে মা! পোলাপাইনের বাসা হয়? বাসার মালিক তো হন মা-বাবা। এটা আপনার বাসা বলেই তো আপনি এত স্বাধীন এখানে।’ মা তখন মুচকি হাসি দিয়ে টিভির সাউন্ড বাড়িয়ে দিলেন। মায়ের সঙ্গে আরেকটা বিষয় নিয়ে বাধত আর তা হলো হাত ধোয়া। মাঝেমধ্যে এমন হতো যে মা এই মাত্র হাত ধুয়ে এসেছেন, কিন্তু আমি দেখিনি। তাই আমাকে দেখানোর জন্য আবার হাত ধুতে হতো। আমি বলতাম, ‘আঙুলের মাথা দিয়ে সবকিছু ধরা হয়, তাই আঙুলের মাথা বেশি করে ধুইবেন।’ আর তাই ধুয়ে এসে বলতেন, ‘নে তোর আঙুলের মাথা, ধুইছি মাথা, হইছে এইবার মাথা ঠিক, পাগল?’ ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে মা মাঝেমধ্যে রাগ হয়ে বলতেন, ‘তোর ওই সব ইউসিএল, অক্সফোর্ডের বেইল নাই।’ আমি তখন হেসে বলতাম, ‘তা তো জানি মা, আমরা গরিব মানুষ, আপনি হলেন জমিদারের নাতনি। ব্রিটিশ আমলে আরিফ উল্লাহ মাস্টার আপনারে ডাবল প্রমোশন দিছিল। আমরা কি আর আপনার মতো অত বুদ্ধি রাখি মা?’ তখন এই অগ্নিশর্মা চোখেও মিটমিট করে হেসে দিতেন মা। মা বলেছিলেন, যদি ছোটবেলায় বিয়ে না হয়ে যেত, তবে চারুকলায় পড়তেন। মায়ের পছন্দের সব গান মনে আছে। ‘ওরে পাষাণী আমার চোখেরও পানি’, ‘মধু মালতি ডাকে আয়’, ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’ কিংবা বিভিন্ন যাত্রাপালার গান, যেমন ‘গুনাই বিবি ও রহিম’ ‘বাদশাহ-রূপবানকন্যা’।

গত ১০ জুলাই ছিল বাবার ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই ‘বাবার অচিন দেশ ভ্রমণ’ নামে আমার একটা লেখা প্রথম আলো প্রকাশ করেছিল। আজ ২৫ জুলাই। গত বছর এই দিনেই পৃথিবী থেকে মায়ের শারীরিক প্রস্থান ঘটে। এটা শুধু শারীরিক প্রস্থানই, কারণ মায়েদের মৃত্যু হয় না। আমাদের নিশ্বাসে–প্রশ্বাসে, কথার সুর–টান–লয়ে, নিত্যকার কাজেকর্মে মা আছেন, বাবাও আছেন, তবে কম। আমরা যারা এটা উপলব্ধি করতে পারি না, তারা দুর্ভাগা। কারণ, সন্তানের অস্তিত্বের সঙ্গে মায়ের ভালোবাসা যেভাবে মিশে থাকে, তা প্রাকৃতিক। যারা এই প্রাকৃতিক নিয়মকে এড়িয়ে যায়, তারা স্বাভাবিক জীবনে নেই। তাদের জীবন অস্বাভাবিক, বিকৃত। এই করোনাকালে টাঙ্গাইলের সখীপুরে যে সন্তানেরা মাকে বনে রেখে এসেছে, তারা বিকৃত জীবনের চর্চাকারী। আপনি ভোরে ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে যে পাখিটা বা বিড়ালটা দেখতে পান, ওরাও তাদের মায়ের সঙ্গে এমন করে না।

একটি মা বিড়ালের গল্প শুনুন। দুষ্টু ছেলেরা ওই বিড়ালের তিনটি বাচ্চা চুরি করে কয়েক মাইল দূরে ফেলে দিয়ে আসে। বিড়ালটি অন্তত ১৫ দিন কেঁদে কেঁদে দিন-রাত পার করেছে। খাবার দিলে খেতে এসেছে, কিন্তু যখনই দেখেছে বাচ্চারা খেতে আসেনি সে দৌড়ে আবার চলে যেত ঘরের পেছনে, দূরের রাস্তায়, সর্বত্র কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চাদের খুঁজত। ভুলে যেত খাবারের কথা। তিন-চার মাস পরও বিড়ালটি ওই বাচ্চাদের ভুলতে পারেনি। চার মাস পর দেখা গেল, একে একে তিনটি বাচ্চাই ফিরে এসেছে, ওরা বড় হয়ে গেলেও সবাই সবাইকে চিনতে পারল। কি যে আনন্দ! সেই আনন্দ ভাইরাসের মতো ছড়াল আমার মধ্যে। এই হলো মা ও সন্তানের স্বাভাবিক ভালোবাসার গল্প। এটা সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই এক, সর্বজনীন। আমরা বাস্তবতার দোহাই দিয়ে বৃদ্ধাশ্রমের আবরণে এই স্বাভাবিক ভালোবাসার উপলব্ধিকে এড়াতে গিয়ে পক্ষান্তরে স্বাভাবিক জীবনকেই এড়িয়ে চলি।

২০০৭ সালের ১০ জুলাই বাবা যখন মারা যান, আমি তখন লন্ডনে। আমার পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে আমাকে মৃত্যুসংবাদ দেওয়া হয় পাঁচ দিন পর। বাবার মৃত্যু না দেখে আমার অবশ্য একটা লাভ হয়েছে, আমি একটুও কাঁদিনি, আসলে কাঁদতে হয়নি। কারণ, আমি ভেবে নিয়েছি বাবা মারা যাননি। এখনো ভাবি, আছেন বাড়িতেই; হয়তো বাজারে, মসজিদে বা অন্য কোথাও। বাবার মৃত্যুর পর আমার দুই ভাই পরপর মারা গেছেন। আমি দুবারই দেশে এসেছি। শেষের জন পিঠাপিঠি ভাই কামরুল। ওর অসুস্থতার কথা শোনামাত্রই চলে এসেছি। মৃত্যু অবধি পাশেই ছিলাম। দিল্লি থেকে অ্যাম্বুল্যান্সযোগে আসার পথে কানপুরে হলো মৃত্যু, তখনো পাশে ছিলেন মা। কানপুরের সবুজ বনানী আমার মায়ের দুঃখ দেখে কেঁদেছে। হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি মৃত্যু কী জিনিস! সর্বশেষে চতুর্থ যাত্রী হয়ে চলে গেলেন মা। মা চলে যাওয়ার প্রথম তিন-চার মাস শুধু স্মৃতি আর স্মৃতি। স্মৃতি মানেই তো ওই সময়কে পেতে চাওয়া। কিন্তু যখন ভাবনায় আসত নেই, তখনই বুক আড়ষ্ট হয়ে আসত কান্না। তবে ছয় মাস পর আমার একটা অনুভূতি এসেছে, হতে পারে তা আধ্যাত্মিক বা কী বলা যায় জানি না। আমার মানসিক শক্তি বেড়ে গেছে। আমার মনে হতে থাকে ওপরে আমার কোনো শক্তি আছে, যা আমার ওপর নিয়ত ছায়া হয়ে আছে। সনাতন ধর্মানুসারীরা কি এ জন্যই মা সরস্বতী, মা লক্ষ্মীসহ সব দেবীকে মা বলে ডাকেন? মনে হয়।
বয়স যখন চার-পাঁচ, তখন পূর্ণিমা এলে আমি আর ঘরে থাকতাম না। উঠানে হেঁটে চাঁদের দিকে চেয়ে চেয়ে ছড়া মুখস্থ করতাম। দেখতাম চাঁদটা কীভাবে আমার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটে। একদিন আমি ঘরে গিয়ে ব্যস্ত মাকে টেনে নিয়ে উঠানের ওপর দিয়ে দৌড়ে বড় রাস্তা পর্যন্ত চলে গেলাম। মা প্রথমে না বুঝে রাগ হলেন। পরে দুই পুকুরের মধ্যে গাছগাছালি ঘেরা আল দিয়ে দৌড়ানোর সময় গাছের ফাঁকে ফাঁকে চাঁদটা দেখিয়ে বললাম ‘মা, মা, ওই যে ওই যে চাঁদটা কীভাবে আমার সঙ্গে দৌড়াচ্ছে!’ মা হাসলেন। বড় রাস্তায় গিয়ে মা আমাকে খপ করে কোলে তুলে বললেন, ‘কই আমার সঙ্গে তো দৌড়ায় না বাবা, তুমি তো চাঁদ, তাই চাঁদটাও চাঁদের সঙ্গে দৌড়ায়।’ আমি মিটমিটিয়ে হাসলাম।
ওই সব স্মৃতি হাতড়াতে গেলে এখন আর কান্না আসে না। কারণ, আমি সহাস্যে উপস্থিত হতে পারি সেই শৈশবে। এখন মা আছেন এক অবাক করা সৌন্দর্যের দেশে, অশেষ সমৃদ্ধি ও স্বাচ্ছন্দ্যে। শুভ্র সকালের এক ঘণ্টা বয়সী সূর্য যখন পৃথিবীজুড়ে স্বাপ্নিক আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায়, কালো মেঘ ঝরে গেলে ছড়িয়ে থাকা সাদা মেঘেরা যখন দুপুরের প্রশান্ত ধোয়া আকাশকে সৈকতের সাজে সাজায় এবং ত্রয়োদশী, চতুর্দশী কিংবা পঞ্চদশী চাঁদ যখন রাতের আকাশকে স্বর্গোদ্যান বানায়, তখন আমি দেখতে পাই চলন্ত আনন্দ–জাহাজ, ‘শিপ অব পিস’। ওই আনন্দ–জাহাজে বসে হাত নেড়ে নেড়ে মা আমাকে ডাকেন, কথা বলেন, আমার খোঁজখবর নেন।

*লেখক: প্রধান নির্বাহী, ফুল-পাখি-চাঁদ-নদী রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম। [email protected]