নাঈম-বীরত্বে শেষটাও সুন্দর

এক ম্যাচে এত প্রাপ্তি কোথায় রাখবে বাংলাদেশ দল!আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ দলের চাওয়া-পাওয়া আটকে ছিল দুটি মাত্র শব্দে—অপ্রাপ্তি মোচন। সিরিজ জয়ের কাজ যেহেতু শেষ, পুরো সিরিজের অপূর্ণতা ঘুচিয়ে নেওয়ার মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামের শেষ ম্যাচ। সবকিছুর যোগফল এক ওভার বাকি থাকতে রুদ্ধশ্বাস ১ উইকেটের জয়ের সঙ্গে কাল সন্ধ্যায় সে মঞ্চ গমগম করতে লাগল নতুন নতুন প্রাপ্তির ভিড়ে।ব্যাট হাতে জুনায়েদ সিদ্দিক আরও একবার ব্যর্থ হলেও আগের ম্যাচগুলোর ফিল্ডিং ব্যর্থতা পুষিয়ে দিলেন স্লিপে তিন তিনটি দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে। মাহমুদউল্লাহর ওপর থেকে গত ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের আলোটা সরে যাচ্ছিল এই সিরিজে। সেই মাহমুদউল্লাহ বল হাতে নিলেন ৩ উইকেট, ব্যাট হাতে ৩৩ রান করে নাঈম ইসলামকে দিলেন সময়ের দাবি অনুযায়ী সাহসী সঙ্গ। আর নাঈম নিজে যেটা করলেন—এক কথায় অভূতপূর্ব। রান-বলের অনেক সমীকরণের পর যখন ব্যাপারটা গিয়ে ঠেকল ১ উইকেটে ১৮ বলে ২৪ রানের কঠিন এক চ্যালেঞ্জে, নাঈম হয়ে উঠলেন ‘ছক্কা নাঈম’। চামু চিবাবার করা ৪৮তম ওভারের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বলে আছড়ে পড়ল তিনটি বিশাল ছক্কা। প্রথমটা গেল লং অনের বাইরে, পরেরটা বোলারের মাথার ওপর দিয়ে, আর শেষ ছক্কার ঠিকানা ওয়াইড লং অন পেরিয়ে গ্যালারির কাছাকাছি। ১২ বলে ৬ রানের বাকি দূরত্ব যেন হাঁটা পথের এবং সেটা ৪৯তম ওভারেই পার। শেষ ওভার বাকি থাকতেই বাংলাদেশের সিরিজ জয়ের ব্যবধান ৪-১।জিম্বাবুয়ের ২২১ রানের জবাবে জয়ের স্বপ্ন দেখাটা শুরু থেকেই কঠিন ছিল। ওপেনার তামিম ইকবাল ইনিংসের প্রথম ওভারে পোফুর বলে আঘাত পেলেন বাঁ হাতের পিঠে। মাঠ ছেড়ে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হলো। এমআরআই স্ক্যানের পর সিদ্ধান্ত হয়, খুব প্রয়োজন না হলে আর ব্যাট করতে নামবেন না চট্টগ্রামের এই তরুণ। স্ক্যান রিপোর্ট জানিয়েছে, মারাত্মক কিছু হয়নি তাঁর, দুই সপ্তাহ বিশ্রাম নিলেই সুস্থ হয়ে উঠবেন পুরোপুরি। তামিমকে প্রয়োজন হলো শেষ পর্যন্ত, দলের ১৭৯ রানে অষ্টম উইকেট পড়ার পর আবার নামলেন ব্যাট হাতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক এক রান আউট নিজের মাঠের সবুজ ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড়টা দিতে দিল না তাঁকে।বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যের শুরু অবশ্য আরও আগে থেকেই। টপ অর্ডারের ব্যর্থতা আরও একবার রুগ্ণ চেহারা দিল দলের স্কোর বোর্ডটাকে—৭৫ রানে ৩ উইকেট হারানো বাংলাদেশ দলের দৃষ্টিটা তখন শূন্য। আগের ম্যাচেই অমন একটা পরাজয়ের পর জিম্বাবুয়ে কি তাহলে পুরোনো স্মৃতিই ফিরিয়ে আনবে আবার? ২০০১ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৮ রানে এবং ২০০৬ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে ৬৯ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জাকে তারা গর্বের পতাকা বানিয়েছিল পরের দুই ম্যাচে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছিল ৪ উইকেটে, কেনিয়াকে ১০৯ রানে।কিন্তু ক্রিকেটে বাংলাদেশ নামটাই যে এখন অন্য কিছু! রকিবুল হাসান, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম বা মাহমুদউল্লাহদের কেউ বড় ইনিংস খেলতে না পারলেও কক্ষপথ বিচ্যুত হতে দেননি দলকে। তাদের মাঝারি রান ছোট ছোট জুটি এনে দিচ্ছিল, যার ওপর দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নাঈমের ব্যাট হয়ে উঠল নির্মম এক বুনো কাষ্ঠখণ্ড। ১০৫ রানে সাকিবকেও হারানোর পর মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে ৬৯ রানের জুটি। মাহমুদউল্লাহ রান আউট হলেন দলকে ১৭৪ রানে রেখে। এরপর ১৭৯ রানের মাথায় মাত্র ৪ বলের ব্যবধানে রাজ্জাক আর এনামুলও ড্রেসিংরুমে ফিরে গেলে অনেকটাই ফিকে হয়ে যায় বাংলাদেশের শেষ লড়াইয়ের স্বপ্ন। ব্যান্ডেজ হাতে তামিম রান আউটে কাটা পড়ার পর শেষ উইকেট জুটিতে নাঈমের সঙ্গী বোলার নাজমুল! ৩১ বলে জয় পেতে তখনো প্রয়োজন ৩৫ রান। নাজমুলের সঙ্গে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে পারবেন নাঈম—ক্রিকেটীয় অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কোনো কিছুই সাহস দিচ্ছিল না সেই স্বপ্ন দেখতে। বাকিটা নাঈম ইসলামের নায়ক হয়ে ওঠার রোমাঞ্চকর এক গল্প। চার ছক্কার কথা তো জেনেছেনই, এর সঙ্গে মারলেন চারটা চারও। ৯০ বলে ৭৩ রানে অপরাজিত নাঈম ম্যাচ জেতানোর পর মাঠের মাঝখানে যে উল্লাসটা করলেন, সেটা যেন পুরো বাংলাদেশ দলের আনন্দেরই প্রতিচ্ছবি। জয়ের নায়ক বললেন, ‘একবারও মনে হয়নি ম্যাচটা আমরা হারতে পারি।’এর আগে মুখে হাসি নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিমান ধরার সব আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেছিল হ্যামিল্টন মাসাকাদজার দল। উপলক্ষটা আসলে তৈরি করে দিয়েছিলেন ব্রেন্ডন টেলর। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিটাকে নিয়ে গেছেন অপরাজিত ১১৮ রানে। বাংলাদেশ স্পিনাররা সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পরও তাই জিম্বাবুয়ের স্কোরবোর্ডে ২২১ রান। মাসাকাদজার দৃষ্টিতে যেটা ছিল, ‘জেতার মতো স্কোর’।ধারণাটা হয়তো ভুল ছিল না মাসাকাদজার। কিন্তু নাঈম ইসলামের ‘ছক্কা নাঈম’ হয়ে ওঠার দিনে যে অন্য সব ধারণাই ভুল প্রমাণিত হবে, ক্রিকেটীয় রোমাঞ্চের আড়ালে নিয়তি যে ঠিক করে রেখেছিল সেটাই!