মার্কিন দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনা লস্করের!

ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে আক্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন—সন্দেহভাজন এমন দুই বিদেশি জঙ্গিকে গোয়েন্দারা খুঁজছে। টি নাসির ওরফে মো. আলী ও আসাফ ওরফে আব্দুল কাইয়ুম নামের এই দুই জঙ্গি পাকিস্তানের লস্কর-ই-তাইয়েবার সদস্য। তাঁরা গত সপ্তাহে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এলাকা রেকি (আক্রমণের আগে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ) করেছেন বলে একটি সংস্থা নিশ্চিত হয়েছে। ওই দুই জঙ্গির তিন সহযোগী শহিদুল ইসলাম ওরফে সুজন (২৬), আল আমিন ওরফে সাইফুল (২৭) ও মুফতি হারুন ইজহারকে (৩৩) বুধবার চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার মাদ্রাসা থেকে আটক করা হয়েছে। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আটক শহিদুল ইসলাম ও আল আমিন পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবার সদস্য। মুফতি হারুন ইজহার বাংলাদেশের হরকাতুল জিহাদের (হুজি) সঙ্গে যুক্ত। তিনি বিদেশি জঙ্গিদের আশ্রয় দিয়েছেন। তাঁকে ধরার পর অন্যদের সন্ধান মিলেছে। মুফতি হারুন ইসলামী ঐক্যজোট একাংশের আমির মুফতি ইজহারুল ইসলামের ছেলে। ইজহারুল চট্টগ্রামের পাহাড়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত লালখান বাজার মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। ইজহারুল ইসলাম গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, আটকের পর ৪৮ ঘণ্টা পার হয়েছে, এখনো তাঁর ছেলেকে আদালতে হাজির করা হয়নি। ছেলেকে মাদ্রাসার পাশের বাসা থেকে আটক করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, হারুনের সঙ্গে আটক অন্যদের সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এ দেশে হুজির তত্পরতা শুরুর পর চট্টগ্রামের লালখান বাজারের এই মাদ্রাসাটি ছিল সদস্য সংগ্রহের অন্যতম কেন্দ্র। এখানে জঙ্গিদের শারীরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ ছিল। এ ব্যাপারে প্রথম আলোতে ২০০৪ সালের আগস্টে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ডেনমার্কের একটি পত্রিকার কার্যালয়ে হামলার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ডেভিড কোলম্যান হেডলি (৪৯) ও তাহাবুর হোসাইন রানা (৪৮) নামের দুই জঙ্গি গ্রেপ্তার হন। তাঁদের সঙ্গে লস্কর-ই-তাইয়েবার নেতা পাকিস্তানের নাগরিক আবদুর রহমান ওরফে সাইদের যোগাযোগের প্রমাণ পায় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। আর পাকিস্তানের সাইদের সঙ্গে বাংলাদেশে টি নাসির, আসাফ ও মুফতি হারুনের টেলিফোনে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদেশি গোয়েন্দা সূত্র থেকে এই তথ্য পায় বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। এরপর পাকিস্তানি জঙ্গিদের সঙ্গে এ দেশ থেকে যোগাযোগ রক্ষাকারীদের ব্যাপারে অনুসন্ধানে নামে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ। প্রযুক্তির সহায়তায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তিন জঙ্গিকে শনাক্ত করা হয়। এরপর ঢাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল বুধবার চট্টগ্রামে লালখান বাজার মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়ে তিন জঙ্গিকে আটক করে। তাঁদের কাছ থেকে আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে।আটক হওয়াদের সম্পর্কে ডিবির উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, মুফতি হারুন অনেক দিন ধরেই হুজির সঙ্গে জড়িত। বাকি দুজনের একজন পাকিস্তানের ও অন্যজন ভারতীয় নাগরিক বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।তবে সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, গোয়েন্দারা এখন অপর দুই বিদেশি জঙ্গি টি নাসির ও আসাফের সন্ধানে নেমেছে। কারণ, এই দুজন গত সপ্তাহে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস এলাকা রেকি করেন। ওই সময়ে তাঁদের ব্যবহার করা মোবাইল ফোনের সূত্রে এ রেকির বিষয়ে নিশ্চিত হন গোয়েন্দারা। রেকি করার সময় তাঁদের ব্যবহূত ফোনটি মুফতি হারুনের কাছে পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামে আটকের পরপর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হারুন তা স্বীকারও করেছেন। টি নাসির ও আসাফ ভারতীয় নাগরিক এবং লস্কর-ই-তাইয়েবার দুর্ধর্ষ জঙ্গি। তাঁরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গেছেন— এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে এসব জঙ্গি ঢাকায় বসে বিদেশি দূতাবাসে আক্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন বলে গোয়েন্দারা সন্দেহ করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত সপ্তাহে প্রথম আলোকে বলেছেন, দেশে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মুখে বেকায়দায় পড়া জঙ্গিরা কূটনৈতিক এলাকায় নাশকতা চালাতে পারে বলে ইতিপূর্বে তাঁরা আশঙ্কা করছেন। তাই ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় দূতাবাসের নিরাপত্তা জোরদারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।মার্কিন জঙ্গিদের যোগাযোগ: যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গির নাম ডেভিড কোলম্যান হেডলি ও তাহাবুর হোসাইন রানা। হেডলির আসল নাম দাউদ গিলানি। ২০০৬ সালে তিনি নাম পরিবর্তন করেন। হেডলি যুক্তরাষ্ট্র ও রানা কানাডার নাগরিক। দুজনই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। এফবিআইয়ের জয়েন্ট টেররিজম টাস্কফোর্স জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁদের সঙ্গে পাকিস্তানের লস্কর-ই-তাইয়েবার দুই শীর্ষ নেতার যোগাযোগের তথ্য-প্রমাণ পায়। এর মধ্যে একজন আবদুর রহমান ওরফে সাইদ গত মঙ্গলবার পাকিস্তানে গ্রেপ্তার হন। মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের ওয়েবসাইটে হেডলি ও রানার ব্যাপারে বলা হয়, ডেভিড কোলম্যান হেডলিকে গত ৩ অক্টোবর শিকাগো বিমানবন্দরে ফিলাডেলফিয়াগামী ফ্লাইট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফিলাডেলফিয়া থেকে তাঁর পাকিস্তানে যাওয়ার কথা ছিল। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে ১৮ অক্টোবর রানাকে তাঁর শিকাগোর বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রানা সে দেশের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের কিংসম্যান শহরের একটি কসাইখানার মালিক। তাঁর ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস নামে অভিবাসন সেবা ব্যবসা আছে। শিকাগো, নিউইয়র্ক ও কানাডার টরন্টো শহরে এর কার্যালয় আছে।আদালতে এই দুজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়, তাঁরা হজরত মোহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কার্টুন প্রকাশকারী ডেনমার্কের একটি পত্রিকার ভবন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত হেডলি সন্ত্রাসী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দুবার ডেনমার্ক ভ্রমণ করেন। তিনি ওই নাশকতা পরিকল্পনার নাম দিয়েছিলেন মিকি মাউস প্রজেক্ট (এমএমপি)। এর মধ্যে হেডলি কয়েকবার পাকিস্তানও ভ্রমণ করেছেন।ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হেডলি জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি রানার ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসে পরামর্শক হিসেবে কাজ করতেন। পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও স্বীকার করেছেন তিনি।এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, হেডলি মূলত পাকিস্তানের লস্কর-ই-তাইয়েবার হয়েই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। তাঁদের প্রথম লক্ষ্যবস্তু ছিল ডেনমার্কের পত্রিকা কার্যালয়।ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, হেডলি আরও স্বীকার করেছেন, আজাদ কাশ্মীরে হুজির অপারেশনাল চিফ ইলিয়াস কাশ্মীরির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। ইলিয়াস এখন পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তানে আছেন বলে ধারণা করা হয়। ইলিয়াস কিছুদিন আগে এক বিবৃতিতে আল-কায়েদার সঙ্গে কাজ করছেন বলে ঘোষণা দেন। রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য দেশে সন্ত্রাসী হামলায় তিনি হেডলিসহ আরও তিনজন পাকিস্তানিকে বিদেশে যাতায়াতসহ নানা ধরনের উপাদান-উপকরণ দিয়ে সহায়তা করেছেন।পাকিস্তানের (হাসান আবদুর শহরে) একটি মিলিটারি স্কুল থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটকেন্দ্রিক একটি যোগাযোগ গ্রুপ আছে। এ গ্রুপের নাম আবদালিয়ানস। রানা ও হেডলি এ গ্রুপেরও সদস্য।