বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image


বইটি পাঠের পর মান্নান সৈয়দের এ মন্তব্যের সঙ্গে কোনোভাবেই দ্বিমত করতে পারিনি। দেড় দশকের বড় অমিতাভ পালের কবিতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল; এ মুগ্ধতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২০০৬ সালে প্রকাশিত আমার প্রথম কবিতার বই ‘সাতশো ট্রেন এক যাত্রী’র একটি দীর্ঘ কবিতায়। যেখানে অমিতাভদার নামসহ তাঁর একটি কবিতা কোলাজ করে ব্যবহার করেছিলাম। ওই প্রথম এবং শেষ নিজের কবিতার ভেতর অন্যের কবিতা সরাসরি ব্যবহার করা। অমিতাভদা ওই বই নিয়ে ‘সমকাল’ পত্রিকায় একটি গদ্য লিখেছিলেন, যা আমার জন্য ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক।

দুই.
অমিতাভ পালের কবিতা যতটা পরিপাটি আর শৃঙ্খলিত, ব্যক্তিজীবন ততটা পরিপাটি ছিল বলা যাবে না। তিনি অফিশিয়াল শৃঙ্খলার সঙ্গে অনেক সময়ই আপস করতে পারেননি, একজন কবির পক্ষে যা অত্যন্ত কঠিন। ফলে তাঁকে কখনো কখনো চাকরিহীন থাকতে হয়েছে। বিষয়টি তাঁর পছন্দের বন্ধুরা জানতেন, এ নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্নও থাকতেন। ২০১১ সালে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম; মাঝেমধ্যে অমিতাভদার লেখা নিতাম। হঠাৎ একদিন তাঁর ফোন, চাকরি প্রয়োজন। আমি তুচ্ছ মানুষ, আমার তো আর কাউকে চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নেই। সেখানকার সম্পাদকের সঙ্গে আলাপ করলাম, তাঁকে নেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে। দেখলাম সম্পাদক রাজি হয়ে গেলেন। ভাবছিলাম অমিতাভদাকে কলিগ হিসেবে পেলে বিষয়টা আমার জন্য আনন্দদায়কই হবে। নির্ধারিত দিনে তিনি যখন অফিসে এলেন, দেখলাম হাঁটু পর্যন্ত তোলা প্যান্ট আর পায়ে ব্যান্ডেজ। অ্যাকসিডেন্ট করেছেন, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। চাকরিটা তাঁর হলো না। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু চাকরিটা না হওয়াতে অমিতাভদা যে দুঃখ পেয়েছিলেন, তা মনে হলো না, বরং তিনি যে এসে আড্ডা দিতে পেরেছিলেন, তাতেই যেন খুশি ছিলেন। অমিতাভ পাল তাঁর কবিতার মতোই, আড্ডাতেও যেন ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁর সঙ্গে কথা বললে আমি দেখেছি আমার মধ্যে অনেক কবিতার লাইন ঝিলিক দিত, যা খুব কম কবির সঙ্গে আড্ডা দিলে হতো।

শাহবাগের মোড়ে একদিন যানজটে আটকে থাকা অসংখ্য গাড়ি দেখিয়ে অমিতাভদা বলেছিলেন, ‘ওই যে গাড়িগুলো দেখছেন, ওগুলো কিন্তু একধরনের জুতোর মতো কাজ করে। আমরা যেমন জুতো পায়ে চলি, ওই রকম গাড়িতে করে চলাফেরা করি। জুতোরই একটা ভিন্ন ভার্সন হচ্ছে গাড়ি।’ তাঁর কথা শুনে আমার কাছে সেদিন ভাবতেই ভালো লেগেছিল, শাহবাগের রাস্তায় গাড়ি নয়, সারি সারি জুতো যানজটে আটকে আছে! আর জুতোর মধ্যে বসে আছে মানুষ!

শাহবাগের মোড়ে একদিন যানজটে আটকে থাকা অসংখ্য গাড়ি দেখিয়ে অমিতাভদা বলেছিলেন, ‘ওই যে গাড়িগুলো দেখছেন, ওগুলো কিন্তু একধরনের জুতোর মতো কাজ করে। আমরা যেমন জুতো পায়ে চলি, ওই রকম গাড়িতে করে চলাফেরা করি।

জুতোরই একটা ভিন্ন ভার্সন হচ্ছে গাড়ি।’ তাঁর কথা শুনে আমার কাছে সেদিন ভাবতেই ভালো লেগেছিল, শাহবাগের রাস্তায় গাড়ি নয়, সারি সারি জুতো যানজটে আটকে আছে! আর জুতোর মধ্যে বসে আছে মানুষ!

সম্প্রতি যুক্ত হয়েছি সাহিত্যবিষয়ক অনলাইন ‘তর্ক বাংলা’র সঙ্গে। এখানে প্রথম থেকেই লেখা দিয়ে যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, মৃত্যুর ছোবলে এ যুক্ততায় ছেদ পড়ল।

তিন.
খুব বেশি লেখেননি অমিতাভ পাল, তবে যা লিখেছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আটটি। কাব্যগ্রন্থ: ‘নতুন বাল্বের আলো’, ‘আলোর আলোচনা’, ‘শ্রীমতি কবিতা’, ‘পুনর্নির্বাচিত আমি’, ‘গণবেদনার গাথা’, ‘অ্যাপসগুলি’। গল্পগ্রন্থ: ‘রাতপঞ্জি’, ‘অসচরাচর’। শেষদিকে অমিতাভদা কবিতাকে অনেক বেশি কমিউনিকেটিভ করতে চেয়েছিলেন। কবিতা নিয়ে আলাপকালে একদিন বলেছিলেন, প্রবচনের মতো করে ছোট ছোট কবিতা লিখতে চান। প্রবচন যেমন মুখে মুখে থাকে, তেমনি কবিতাও মুখে মুখে থাকবে।

default-image

তাঁর সর্বশেষ কবিতার বই ‘অ্যাপসগুলি’ কিনেছিলাম ২০১৯-এর একুশের বইমেলায়। কবিতার বইটির নাম এবং কবিতাগুলো পাঠ করলেই স্পষ্ট হওয়া যায়, কবিতাকে কীভাবে সমকালীন রাখতে হয়, সে কৌশল তাঁর কাছে ছিল স্পষ্ট। বইটির ফ্ল্যাপে তিনি লিখেছেন, ‘সবচেয়ে শেষ মুহূর্তটাকে নিয়ে কবিতা লেখাটাই নতুন কবিতা লেখা—কারণ সবচেয়ে শেষ মুহূর্তটাই নতুন। এই মুহূর্তটা গঠিত হয় বিগত সময়ের যা কিছু টিকে গেছে এবং আসন্ন যা কিছু জন্মসংগীতে মুখর—তারই দ্বৈত প্রেরণায়।’

সবচেয়ে শেষ মুহূর্তটাকে নিয়ে কি লেখা যায়? অমিতাভদা যেখানে চলে গেলেন, সেখানকার বার্তা কি পাঠাতে পারবেন? ২০১৯-এর বইমেলাতেই তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা, শেষ ছবি তোলা ও শেষ আড্ডা। দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছরের বেশি সময় তাঁর সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয়নি। আর দেখা হওয়ার সুযোগও রইল না। অমিতাভদার কবিতা এখন নতুনভাবে পঠিত ও আলোচিত হবে, এমনটাই প্রত্যাশা।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন