বিজ্ঞাপন

এমন মুক্তচিন্তক মনীষার পৌত্র আনিসুজ্জামান যে উত্তরকালে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সম্মুখসারির সংগ্রামী হবেন, তাই তো স্বাভাবিক।

আনিসুজ্জামানের বাবা এ টি এম মোয়াজ্জম কলকাতায় হোমিওপ্যাথ পড়াশোনা করে তখনকার মহকুমা শহর বসিরহাটে গিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেন। ১৯২৫ সালে বিয়ে করেন সৈয়দা খাতুনকে। পরিবারে অসুস্থতার প্রকোপ ও মৃত্যুর জন্য বসিরহাটির বাড়িকে সংস্কারবশত কেউ ‘অপয়া’ আখ্যা দিলে সৈয়দা খাতুন কলকাতা যাওয়া মনস্থির করেন। আনিসুজ্জামানের লেখাতেই ফিরে তাকাই প্রায় পঁচাশি বছর আগের সেই সময়খণ্ডটিতে:

‘তত দিনে মায়ের সংকল্পের কারণে আমরা কলকাতাবাসী। ১৯৩৬-এ আব্বা বসিরহাট ছাড়লেন। প্রথম বাড়ি বিক্রি করতে তাঁর মন সরেনি। যখন সিদ্ধান্ত করলেন বাড়ি বিক্রি করার, তখন ক্রেতা দেখা দেয় তো বাড়ি অপয়া শুনে পিছিয়ে যায়। আব্বা একরকম খালি হাতে পরিবার নিয়ে কলকাতায় এসে আমার মামার মায়ের মামাতো ভাইয়ের বাড়িতে ওঠেন। কিছুদিন পর এন্টালির কাছে ৩১ ক্যান্টোফার লেনে বাড়িভাড়া করেন। সেই বাসায় আমার জন্ম।’

কলকাতা এসে ডা. এ টি এম মোয়াজ্জম জগদ্বিখ্যাত জার্মান হোমিওপ্যাথের নামে ‘হেরিং হোমিও ক্লিনিক’ নামে চেম্বার খোলেন পার্ক সার্কাসের ২২ নাসিরুদ্দীন রোডে আর এর কিছুকাল পর ১৯৩৮ সালে এই পরিবার ক্যান্টোফার লেন ছেড়ে পার্ক সার্কাসের মেহের লস্কর লেনে দুমাস কাটিয়ে বসবাস শুরু করেন ১০ কংগ্রেস একজিবিশন রোডে।

‘পার্ক সার্কাসে তখনো গ্যাসের বাতি জ্বলত। সন্ধ্যাবেলায় সিঁড়ি কাঁধে নিয়ে একজন বাতির পর বাতি জ্বালিয়ে যেত—দেখতে ভারি ভালো লাগত। ভোরবেলায় পাইপ দিয়ে পানি ঢেলে রাস্তা পরিষ্কার করা হতো। তখনো আমাদের এলাকায় ফুটপাতে তেমন লোক ঘুমাত না—এক-আধজন ঘুমোলেও রাস্তা ধোয়ার আগেই উঠে পড়ত। ডিপো থেকে ট্রাম বেরোলে মনে হতো, দিনের কাজকর্ম শুরু হলো। তার আগেই কিন্তু ট্রামডিপোর সামনের রেস্টুরেন্ট দুটি খুলে যেত। কাজে বেরোবার আগে ট্রামের কর্মীরা অনেকে এখানে খেয়ে নিতেন।’

১৯৩৭-১৯৪৭; কলকাতাবাসের এই এক দশকে তাঁরা আর একবারই বাসা বদল করেছিলেন; ১৯৪৩-এর মধ্য জানুয়ারিতে ১০ নম্বর কংগ্রেস একজিবিশন রোড ছেড়ে পাশেই ৭-এ নম্বরের এক নতুন দোতলা বাড়ির একতলাতে।

কলকাতার বাসায় বড়বোনকে পড়ানোর ভার নিলেন গুপ্ত বিপ্লবী দলের সদস্য কবি বেনজীর আহমদ। তাঁর উদ্যোগ ও আগ্রহে স্নেহভাজন ছোট্ট আনিস মাত্র তিন বছর বয়সে মায়ের লেখা ‘হাতেম-তাই’ বইয়ের প্রকাশক হিসেবে আবির্ভূত হলেন। পৃথিবীর প্রকাশনা-ইতিহাসেই মনে হয় এ এক বিরল ঘটনা। আনিসুজ্জামানের তথ্য:

‘সৈয়দা খাতুনের “হাতেম-তাই” ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হলো, প্রকাশক এ টি এম আনিসুজ্জামান, ২২ নাসিরুদ্দীন রোড, পার্ক সার্কাস, কলিকাতা; পরিবেশক: মখদুমী লাইব্রেরি ও আহসানউল্লাহ বুক হাউস লিমিটেড, ১৫ কলেজ স্কয়ার, কলিকাতা।’

আনিস বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায় কিশোর-কিশোরীদের ব্যাডমিন্টন খেলা দেখতেন নিবিষ্ট মনে কিন্তু পৃথিবীতে তখন শুরু হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের নতুন খেলা—কলকাতায় দেখা দিল জাপানি বোমাতঙ্ক। ব্রিটিশ রাজত্বে বসে মানুষ ব্রিটিশ-হেয় করা ছড়া কাটতে শুরু করল:

‘সা রে গা মা পা ধা নি
বোম ফেলছে জাপানি
বোমের মধ্যে কেউটে সাপ
ব্রিটিশ বলে, বাপ রে বাপ।’

default-image

বোমাবাজির কলকাতা ছেড়ে কিছুদিন আনিসুজ্জামানরা সপরিবার থেকে এলেন আদিভূমি বসিরহাটে। সেখান থেকে এসেই ৭-এ কংগ্রেস একজিবিশন রোডের নতুন সুপরিসর বাসায় ওঠা হলো। খেলার সাথি বন্ধু হিসেবে পেলেন মাহমুদ আরিফ বনিকে আর কেমন ছিল তখনকার পার্ক সার্কাস? তাকিয়ে দেখি তাঁর ছবিস্বচ্ছ লেখায়:

‘পার্ক সার্কাসে তখনো গ্যাসের বাতি জ্বলত। সন্ধ্যাবেলায় সিঁড়ি কাঁধে নিয়ে একজন বাতির পর বাতি জ্বালিয়ে যেত—দেখতে ভারি ভালো লাগত। ভোরবেলায় পাইপ দিয়ে পানি ঢেলে রাস্তা পরিষ্কার করা হতো। তখনো আমাদের এলাকায় ফুটপাতে তেমন লোক ঘুমাত না—এক-আধজন ঘুমোলেও রাস্তা ধোয়ার আগেই উঠে পড়ত। ডিপো থেকে ট্রাম বেরোলে মনে হতো, দিনের কাজকর্ম শুরু হলো। তার আগেই কিন্তু ট্রামডিপোর সামনের রেস্টুরেন্ট দুটি খুলে যেতো। কাজে বেরোবার আগে ট্রামের কর্মীরা অনেকে এখানে খেয়ে নিতেন।’

কলকাতার বাড়ির প্রতিবেশী হিসেবে ছোটবেলায় কাছ থেকে দেখেছেন ‘সেন্ট হেলেনা’ নামে সেকালের নামকরা কবিতার লেখক ফজলুল হক সেলবর্সী, দৈনিক ‘আজাদ’-এর ‘মুকুলের মহফিল’-এর ‘বাগবান’ মোহাম্মদ মোদাব্বের, নাট্যকার আনিস চৌধুরী, ব্যাকরণবিদ জামিল চৌধুরী, সংস্কৃতিগুণী ভাইবোন—ফজলে লোহানী, হুসনা বানু খানম, ফতেহ লোহানী, লেখক এস ওয়াজেদ আলী, খান বাহাদুর আতাউর রহমান, কবি সুফিয়া কামাল-কামালউদ্দিন খান দম্পতি এমনকি খ্যাতনামা অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের মতো মানুষদের।

বিশ্বযুদ্ধের দামামায় ভয়ধরা ‘নিষ্প্রদীপ মহড়া’র কালবেলায় কালাতিপাতের বিবরণ ধরা আছে আনিসুজ্জামানের অমলিন অক্ষরের অবয়বে:

‘একবার আব্বা গিয়েছিলেন খিদিরপুরে, তখন সাইরেন পড়ল। অল-ক্লিয়ারের সংকেত পাওয়ার পরে শোনা গেল, জাপানিরা খিদিরপুরেই বোমা ফেলেছে ডক-এলাকায়। আমরা খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে থাকলাম। আমি সামনের ফুটপাতে গিয়ে ট্রামে ফিরে আসা যাত্রীদের মধ্যে আব্বার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম—তিনি ফিরে না আসা অবধি।’

একদিকে বোমার আওয়াজ অন্যদিকে সুভাষ বসু আর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠনের সংবাদ। জার্মানির হার, হিটলারের আত্মহত্যা, জাপানের আত্মসমর্পণে পাল্টে যাচ্ছে এতকালকার চেনা দুনিয়া। বারুদের ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে আসা চারপাশ আর ধেয়ে আসা দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। কলকাতার বাতাসে ১৯৪৩ জুড়ে একটাই ধ্বনি, ‘ফ্যান দাও’। ভাত চাওয়ার অবস্থাতে যেহেতু নেই বাস্তবতা!

এর মধ্যে তাঁদের বাড়িতে আনিসুজ্জামানের বাবার কাছে এলেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন:

‘জয়নুল আবেদিন আমাকে ডেকে নিলেন তাঁর পাশে। পকেট থেকে বের করলেন ট্রামের কয়েকটি টিকিট। তারপর দেখালেন, টিকিটের উল্টো পিঠে কালি-কলমে আঁকা ছবি—প্রায় সবই দুর্ভিক্ষের চিত্র। অত অল্প পরিসরে আঁকা ছবির মর্ম বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল না, তবু দুচোখ মেলে প্রত্যেকটা ছবি দেখেছিলাম।’

আনিসুজ্জামানের স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল অনেক টুকিটাকি বিষয়ও; যেমন, কলকাতাজীবনে তাঁরা কাপড়-চোপড় কিনতে যেতেন ধর্মতলা স্ট্রিটের বিখ্যাত ওয়াছেল মোল্লার দোকান কিংবা কমলালয়ে কখনো সুবিদ আলী অ্যান্ড ব্রাদার্স ও একিন মোল্লা অ্যান্ড সন্সে। কোনো উপলক্ষে গয়না কিনতে বাড়ির বড় কারও সঙ্গে গিয়েছেন এল মল্লিকের দোকানে।

এমন এন্তার ঘোরাঘুরি একসময় গন্তব্য পায় বাড়ির কাছের পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে—সময়টা মার্চ ১৯৪৩। এর আগেই অবশ্য যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসিখুশি’ দিয়ে বিদ্যারম্ভ তাঁর। কেমন ছিল উত্তরকালে বাংলাদেশের ‘জাতীয় অধ্যাপক’-এর বিদ্যালয়বেলা? শোনা যাক তাঁর বয়ানেই:

‘স্কুলে আমি ভালো ছাত্র ছিলাম না। পরীক্ষায় কখনো প্রথম হইনি। আমার ওপরে সব সময় চার-পাঁচজন থাকত। একবারই দ্বিতীয় স্থান দখল করি পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার সময়ে। তার পুরস্কারস্বরূপ সেবারে আমার জন্মদিনে এক পাউন্ডের কেক কাটা হয় এবং ফুলের মালা গলায় আমার ছবি তোলা হয় পাড়ার ল্যানসডাউন আর্ট স্টুডিওতে।’

প্রতিবছর বুকলিস্ট পাওয়ার পর নতুন বই সংগ্রহ করতে বাবার হাত ধরে যেতেন কলেজ স্ট্রিটে। মনে আছে, ইংরেজি পাঠ্যবই ‘ক্লারেনডন রিডার’ বা ‘হিমালয়ান রিডার’-এর চকচকে পাতা আর মোটেও ভোলেননি তখনকার দিনের ছাত্রপ্রিয় ‘বাহাদুর একসারসাইজ বুক’ নামের খাতার কথা।

default-image

ক্লাস ফাইভে ওঠার পর গৃহশিক্ষক হিসেবে পেলেন সাংবাদিক ও পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেনকে। স্কুলে বিশেষ হৃদ্যতা গড়ে উঠল খায়রুল বাশার কমল, আনিস ওয়ায়েজ আর এক ক্লাস নিচের ছাত্র হাসান শফির সঙ্গে। স্কুলের অসাম্প্রদায়িক আবহে সরস্বতীপূজার ফুল ও বার্ষিক মিলাদের বাতাসা-বকুলদানার মোহন-গন্ধ যেমন আচ্ছন্ন করে রেখেছে তাঁর সারা জীবন, তেমনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে গ্রীষ্মাবকাশের আগের দিন ক্লাসঘর সাজাতে গিয়ে অনুজ বন্ধু হাসান শফির দুর্ঘটনায় মৃত্যুর শোকও বয়ে বেড়িয়েছেন সব সময়। তাঁর স্মৃতিতে গড়ে তুলেছেন ‘হাসান শফি মেমোরিয়াল লাইব্রেরি’; সম্ভবত সংগঠক আনিসুজ্জামানের সূচনাবিন্দু সেটি। এরপর তোড়জোড় শুরু হলো হাতেলেখা পত্রিকা ‘নোতুন দিন’ প্রকাশের। শিল্পী বজলে মওলার প্রচ্ছদকৃত এ পত্রিকায় লেখা দিয়েছিলেন জসীমউদ্‌দীন, সুফিয়া কামাল, বেনজীর আহমদসহ আরও অনেকে। ছবি সংযুক্ত ছিল জয়নুল-কামরুল-সফিউদদীনের মতো শিল্পীত্রয়ের। উদ্যোগটা আনিস ও কমল—এই দুই বন্ধুর হলেও তারা তখনো বয়সে ছোট বলে সম্পাদনায় নাম থাকল রোকনুজ্জামান খান, ফজলে লোহানী ও সৈয়দ আনোয়ারুল হাফিজের। বলা যায়, বিশিষ্ট সম্পাদক আনিসুজ্জামানের প্রাভাতিক উদ্বোধন এই ‘নোতুন দিন’-এর মধ্য দিয়েই সূচিত।

উৎসবের আভায় রাঙা ছিল সেই সময়। ‘বালাগালউলা বে কামালিহি’র ধ্বনিমাধুর্যে মিলাদ শরিফ, ফুলঝুরি-আতশবাজি-তুবড়ি-মোমবাতি আর হালুয়া রুটির শবে বরাত, সাহ্‌রি-ইফতারময় রোজার মাস, আনন্দঘন দুটি ঈদ-উৎসব, ‘হায় হাসান, হায় হোসেন’ বলে বুক-চাপড়ানো তাজিয়া মিছিলের মহররমের সোনালি স্মৃতি কি কখনো ফিকে হওয়ার! ছেলেবেলার কলকাতায় ঈদ নিয়ে এক টুকরো স্মৃতির কণা:

‘ময়দানে নামাজ পড়তে ভালো লাগত বেশি। আরও ভালো লাগত, ট্রামে করে গিয়ে যদি গড়ের মাঠে নামাজ পড়ার সুযোগ হতো। কত লোক সেখানে—তার সঙ্গে অন্য কোথারও তুলনা হয় না।’
আর একটি বিশেষ পরব ছিল নববর্ষের হালখাতা:

‘আব্বার হাত ধরে প্রায়-নিয়মিত আরেকটি অনুষ্ঠানে যেতাম, তা হালখাতার। সেসব দোকান থেকে আব্বা ওষুধপত্র কিনতেন, সেগুলি ছিল সি রিঙ্গার অ্যান্ড কোম্পানি (ডালহাইসি স্কয়ারে), এম ভট্টাচার্য অ্যান্ড কোম্পানি (বউবাজারে) ও কিং অ্যান্ড কোম্পানি (এলিয়ট রোডে)। ওই একটি অনুষ্ঠানেই আব্বা অনামন্ত্রিত আমাকে নিয়ে যেতে দ্বিধা করতেন না, আমিও খেয়েদেয়ে বেশ আনন্দিত হতাম এবং প্রায়শই হাতে বাড়তি প্যাকেট নিয়ে ফিরতাম।’

সময় গড়িয়ে চলে, দেশভাগের আগমনী শোনা যায় যেনবা! ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও শাণিয়ে ওঠে ভারতবর্ষের দিগ্‌বিদিক। ১৯৪৬-এ ফেব্রুয়ারিতে দিল্লির লালকেল্লায় শুরু হয় সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রশীদ আলীর প্রহসনমূলক বিচার। রশীদ আলীর মুক্তির দাবিতে স্কুলে আহূত ধর্মঘটের সমর্থনে কলকাতার রাজপথে নামলেন আনিসুজ্জামান ও সতীর্থরা। ওয়েলিংটন স্কয়ারে সেই যে মিছিলে নামলেন জীবনের শেষ পর্যন্ত মানুষের মুক্তির প্রশ্নে সেই মিছিলে হাঁটা বন্ধ হয়নি আর।

কলকাতার আর কী কী মনে পড়ত আনিসুজ্জামানের?

মনে পড়ে মঞ্চে ‘আলীবাবা’, ‘ধাত্রীপান্না’, ‘দুই পুরুষ’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটক দেখার কথা; চাক্ষুষ করেছেন অহীন্দ্র চৌধুরী, ছবি বিশ্বাস, জহর গাঙ্গুলী চন্দ্রাবতী, প্রভা দেবী, সুনন্দা দেবীর অভিনয়। ইংরেজি ‘টারজান’, ‘কিং কং’ বা ‘বাফেলো বিল’-এর পাশাপাশি বাংলা ‘মুক্তি’, ‘শেষ উত্তর’, ‘উদয়ের পথে’ সিনেমা যেমন উপভোগ করেছেন, তেমনি বাদ যায়নি হিন্দি ‘কিসমত’, ‘ওয়াসিতনামা’-ও। সে বয়সে ছায়াছবির প্রিয় তারকা হয়ে উঠেছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া-কানন দেবী-যমুনা, অশোককুমার, অসিতবরণ-সুমিত্রা দেবী প্রমুখ।

পার্ক সার্কাস ময়দানে তাঁবু গাড়তে দেখেছেন সার্কাসের দলকে, জিপসিদের ঝলমলে পোশাক ও বাহারি চালচলনে পেতেন বোহিমিয়ান ঘ্রাণ। টিনের বাক্সের বায়োস্কোপে দিল্লির দুর্গ, আগ্রার তাজমহল, মুম্বাইয়ের বিমানবন্দর—ছবির মতো একটার পর একটা ফুটে উঠত সামনে। বাবার সঙ্গে যেতেন কলকাতার চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে। বয়সে ‘বড়’ হয়ে ছোটবেলার বড় মধুমাখা বিষয় ‘বিস্ময়’ হারানোর দুঃখ পাঠকের সঙ্গে ভাগ করেছেন এভাবে:

‘পশুপক্ষী হোক কিংবা গাছপালা হোক, এমনকি ওই টিনের বাক্সের বায়োস্কোপ হোক, যাই দেখতাম, তাতেই বিস্ময়ের অবধি থাকত না। বড় হবার একটা বড় শাস্তি এই বিস্ময়বোধ হারিয়ে ফেলা।’
১৯৪৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ভয়াবহতা আনিসুজ্জামানের কিশোরমনে ভীষণ দাগ কাটল আর তাঁর মননে চিরকালের মতো প্রোথিত হলো সাম্প্রদায়িকতার প্রতি গভীর ঘৃণা। এ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য:
‘যা দেখলাম এবং শুনলাম, তাতে মানুষের প্রতি জ্ঞানকৃত অপরাধের জন্যে যাদের প্রতি মনে ধিক্কার জন্মাল, তাদের জাত আলাদা হলেও কাজ অভিন্ন।’

কেবল ধর্মপরিচয়ের ভিন্নতার কারণে ধর্মের ধ্বজাধারী গুন্ডাদের হাতে পরিচিত গোয়ালার নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে দেখলেন। তবে উন্মত্ততার মধ্যে শুভবুদ্ধির প্রকাশও দেখেছেন এমন:
‘১৭ বা ১৮ তারিখে পুলিশের গাড়ি এসে ছবি বিশ্বাস ও তাঁর পরিবারের সকলকে নিয়ে গেল। আরও পরে দাস-ভবন থেকে হিন্দু-পরিবার সব উদ্ধার করল পুলিশ। তত দিন পর্যন্ত পড়শিরা তাঁদের লুকিয়ে রেখেছিলেন। পুলিশ তাদের নিয়ে যাওয়ার পরে গুন্ডাদের ক্ষোভ ফেটে পড়ল মোহাম্মদ মোদাব্বেরের ওপর। তারা অভিযোগ করল, টাকা খেয়ে তিনি হিন্দুদের রক্ষা করেছেন, এর প্রতিফল তাঁকে পেতে হবে। দাস-ভবনের অধিবাসীদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে গুন্ডারা স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হলো।’
কলকাতার মতো দাঙ্গা হয় বিহার ও নোয়াখালীতেও। বিহারে উৎপীড়িত মানুষের সাহায্যার্থে ‘মুকুলের মহফিল’-এর আহ্বানে ‘মুকুল’ আনিসুজ্জামান কলকাতার রাস্তায় নামেন, ত্রাণ-সংগ্রহে। রবিনসন বার্লির টিনের গায়ে সাহায্যের আবেদন-সংবলিত সাদা কাগজ এঁটে নিজ পাড়া থেকে পার্ক সার্কাস ট্রাম ডিপো, লোয়ার সার্কুলার রোড, দক্ষিণে বালিগঞ্জ পোস্ট অফিস পর্যন্ত গিয়েছেন, ট্রামে চড়ে সাহায্যের অর্থে টিন ভরেছেন। এ নিয়ে স্মৃতিচারণা:

‘আব্বা মনে করতেন, কলকাতার সব গাড়িঘোড়া আমাকে চাপা দেওয়ার জন্যেই ছুটোছুটি করছে। সুতরাং আমির আলী অ্যাভিনিউ পার হওয়ার অনুমতি আমার ছিল না। ...এই অবস্থায় বিহার রিলিফ ফান্ডের জন্যে সারাদিন ঘোরাফেরা করা—তাও অধিকাংশ সময়ে ট্রামে—সম্ভব হয়েছিল শুধু উপদ্রুতদের প্রতি আমাদের পরিবারের গভীর সহানুভূতিবশত।’

বিহার রিলিফ ফান্ডে সর্বাধিক টাকা পাঠিয়ে মুকুল ফৌজের সদস্যদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন নয় বছরের আনিসুজ্জামান। পুরস্কারস্বরূপ রুপার মেডেলই পাননি শুধু, আবক্ষ প্রতিকৃতিসহ তাঁর কৃতিত্বের খবর ছাপা হয়েছিল ‘মুকুলের মহফিল’-এর পাতায়।

এমন সেবামূলক কাজের সমান্তরালে মুকুল ফৌজের ব্রতচারী গানে গলাও মেলাতেন আনিস:

‘চল কোদাল চালাই
ভুল মনের বালাই
ঝেড়ে অলস মেজাজ
হবে শরীর ঝালাই।’
কিংবা
‘দিন যে চলল
রাত ওই নামল
ঘরে চলো হে!
সকলেই নিঝঝুম
তারাদের নাই ঘুম
ঘরে চলো হে!’

বাড়িতে বড় দুলাভাই একদিন নিয়ে এলেন একটা রেডিওগ্রাম। এই নিয়ে কৌতূহল জন্মাল বেশ:
‘রেকর্ডের ব্যাপারটা একরকম বুঝতে পারতাম, কিন্তু রেডিওটা তখনো রহস্যময় মনে হতো। রেডিওগ্রামের পেছনে কেউ না কেউ বসে কথাবার্তা বলছে বা গান গাইছে, এসব কথায়, আস্থা স্থাপন করে ঠকার সময় তখন পার হয়ে গেছে। আমরা আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্রের অনুষ্ঠানই শুনতাম—তার বাইরে যে অন্য বেতারকেন্দ্র আছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। পঙ্কজ মল্লিকের সংগীত-শিক্ষাদান ও নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের গল্পদাদুর আসর খুব পছন্দ হতো।’

শৌখিন মেজো দুলাভাই যেমন বাসায় বিলিতি বিস্কুট এবং পলসনের মাখন ও ক্র্যাফটের পনির নিয়ে আসতেন তেমনি কলকাতার নামকরা হোটেল ‘ফারপো’তে নিয়ে গিয়েও খাওয়াতেন। ঘরবন্দী আনিসের খুব ভালো লাগত উর্দিপরা খানসামা আর অন্যবিধ আভিজাত্যে মোড়া হোটেলে বসে খাওয়া। দুলাভাই নিয়ে যেতেন ইডেন গার্ডেনেও:

‘যত দূর মনে পড়ে, সেটা ছিল ১৯৪৬ সাল, টেস্ট খেলা হয়েছিল লালা অমরনাথের ভারতীয় দলের সঙ্গে ডন ব্র্যাডমানের অস্ট্রেলীয় দলের। ক্রিকেটের কিছু না জেনেও মাঠের ও গ্যালারির পরিবেশে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি।’

কলকাতার বাড়িতে তাঁর বাবার কাছে আসতে দেখেছেন, সান্নিধ্য পেয়েছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ‘সওগাত’ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, কবি শহীদ কাদরীর পিতা সাংবাদিক কে আই এ কাদরী, লেখক-সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবু জাফর শামসুদ্দিন, শিল্পী আব্বাসউদ্দীন, কবি শাহাদাৎ হোসেন, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ, কবি জসীমউদ্‌দীন, ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা, আবদুল কাদির, আহসান হাবীব, লেখক কাজী আবদুল ওদুদ, চলচ্চিত্রকার ওবায়েদ-উল-হক (হিমাদ্রী চৌধুরী), রাজনীতিবিদ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, জালালউদ্দীন হাশমীর মতো বর্ণাঢ্য-জীবনের মানুষদের।

এল ১৯৪৭। ছোট বোনের শ্বশুরবাড়ি যশোর বেড়াতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে মামাতো বোন হালিমার কাছে শুনলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য মারা গেছেন। আর তারপর তো মৃত্যু হলো অখণ্ড ভারতবর্ষ ও বাংলারও। দেশ বিভাগের সময় সমাগত, সঙ্গে সঙ্গে এল সেই রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কালও।

আরও বহু পরিবারের মতো ডা. এ টি এম মোয়াজ্জম পরিবারটিও ভারত ছেড়ে নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে বসতি গড়ার সিদ্ধান্ত নিল। তবে প্রথমে ঢাকায় নয়, খুলনার মুনশিপাড়ায় আনিসুজ্জামানদের খালুর বাড়িতে আসা সাব্যস্ত হলো। ১৯৪৭ সালের ১৫ অক্টোবর সকালে শিয়ালদা স্টেশনে এসে ট্রেনে চড়লেন তাঁরা। ট্রেন টু পাকিস্তান; পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববাংলা। পেছনে পড়ে রইল স্মৃতিময় ৭-এ কংগ্রেস একজিবিশন রোড; গঙ্গার ধারের হাওয়া, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের হৃদয়হারী বিশালতা কিংবা কলুটোলা স্ট্রিটে গিয়ে লাসসি, শরবত বা ফালুদা খাওয়ার অপার আনন্দধারা।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন