দিন কয়েক আছে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন চিত্রশিল্পী আব্দুস সালাম। তাঁর স্মরণে এই লেখা।
default-image

চিত্রকর আব্দুস সালামকে নিয়ে যে কোনো দিন কিছু লিখব, তা আমরা কেউই ভাবিনি! ৩০ আগস্ট ২০২০-তে সাভারে দ্রুতগামী মোটরযানের ধাক্কায় মৃত্যুবরণ করেছে সালাম। অনিরাপদ সড়কে ঝরে গেছে আরেকটি প্রাণ! এই জগতের সব প্রাণই তো মূল্যবান!
আমাদের তারুণ্যে চিত্রকর আমান উল্লাহ ভাই আমাদের নানাভাবে আশকারা দিয়েছেন, এখনো দেন। তিনি কেবল চিত্রকরই নন, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মীও। আমান ভাইয়ের সঙ্গে একটা বিশেষ ব্যক্তিগত কারণে আমি আত্মীয়তা অনুভব করি। কিশোরগঞ্জ শহরের খড়মপট্টিতে তাঁদের বাসা যেখানে—শহরতলিতে, আমার নানার কুল কুলিয়ার চর থেকে গিয়ে আবাস গেড়েছিল একদা সেখানেই। অবশ্য এই ক্ষুদ্র বিষয়টা কখনোই আমান ভাইকে তাড়িত করেনি।

বিজ্ঞাপন
default-image

আশির দশকের মাঝামাঝিতেই আমান ভাইয়ের ছোট ভাই সালামের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, ১৯৮৬ সালে। আমান ভাই তখন রাজশাহী চারুকলার তরুণ শিক্ষক। আমান ভাইয়ের সূত্রেই রাজশাহী চারুকলার প্রথম ব্যাচের ছাত্র সালামের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার। সালাম তখন আমান ভাইয়ের সঙ্গে রাজশাহী শহরে ভাড়া বাসায় থাকত। যত দূর মনে পড়ে, আমান ভাই ঢাকায় চলে আসার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের কাছাকাছি কোনো একটা মেসে উঠেছিল সালাম।
আব্দুস সালাম আশির দশকের সন্তান। যেই দশকে কেবল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনই হয়নি, স্বৈরাচারবিবোধী আন্দোলনও হয়েছে তুমুলভাবে। মধ্য আশি থেকে আশির শেষ দিক অবধি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনেক আড্ডা দিয়েছি আমরা—আলীর ক্যানটিনে, মন্টুর দোকানে, সাহেববাজারে। সেই বৃহৎ আড্ডার অংশ কবি অসীম কুমার দাস, বিষ্ণু বিশ্বাস, মোহাম্মদ কামাল এবং চিত্রকর মইনুল ইসলাম পল ও আব্দুস সালাম। পলের সঙ্গে সালামের সবচেয়ে বেশি খাতির ছিল। সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা ছাড়াও সমাজসচেতনতায় ৠদ্ধ ছিল আমাদের সালাম। পরে সালামকে আমরা শাহবাগের আড্ডাতেও, নব্বইয়ের পয়লাতেই, নিয়মিতভাবে পেয়েছি। তত দিনে চারুকলায় তার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়ে গেছে।

লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরিভাবে জড়িত ছিল সালাম। উদাহরণত, ফরিদ আহমেদের গণিতবিষয়ক পত্রিকা চলক-এর তৃতীয় সংখ্যার প্রচ্ছদ করেছিল সে। শাহবাগের লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও সংগঠক সবার সঙ্গেই হার্দিক সম্পর্ক ছিল সালামের। সালামের নিকটবন্ধুদের নামের তালিকাটা দীর্ঘই হবে, যাদের ভেতরে কাজল শাহনেওয়াজ, কফিল আহমেদ, শামসুল কবির, ফরিদ আহমেদ, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, সৈয়দ তারিক, বিষ্ণু বিশ্বাস, সুমন রহমান প্রমুখের নাম উল্লেখ না করে পারা যাবে না।
আমান ভাই একদা কলাবাগানের ডলফিন গলিতে থাকতেন। সেটা নব্বইয়ের শুরুর দিকের কথা। সেই বাসাতেও সালামের সঙ্গে দেখা হতো আমার। আমান ভাইয়ের ডলফিন গলির বাসাতে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, সৈয়দ তারিক, বিষ্ণু বিশ্বাস, ফরিদ আহমেদ আর আমি মাঝেমধ্যেই গেছি। আমাদের শাহবাগকেন্দ্রিক আড্ডা তখন ঢুকে পড়ত আমান ভাইয়ের বাসা কাম স্টুডিওতে। সেই সব আড্ডাতেও সরব ছিল আব্দুস সালাম। শাহবাগের সেই সব আড্ডাতে কতই না কেজো কথা হয়েছে, অকেজো কথা হয়েছে তার চাইতেও বেশি! সালাম আমার, আমাদের সেই সব উৎকেন্দ্রিক, উত্তেজনাকর দিনের সহচর। সালামের মৃত্যু আমার কাছে তাই আশির দশকের উন্মাতাল স্তবকের একটা সুন্দর ফুলেরই মৃত্যু বলে মনে হয়!

বিজ্ঞাপন
default-image

সালামকে আমি বলতাম, তুমি তো মিয়া কবি! কবিতা লেখো না কেন? হাসত সালাম। তবে সালামের কবিতা আমি পড়েছিলাম কি না, তা আর আমার মনে পড়ে না। যেটা মনে পড়ে, নব্বইয়ের শুরুতে আলিয়ঁস ফ্রঁসেসে একক চিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল তার। সম্ভবত আলিয়ঁস ফ্রঁসেসের জন্য সে একটা ভাস্কর্য তৈরি করেছিল। এবাদে তার আরেকটা একক চিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল বলে মনে পড়ছে। যৌথ চিত্র প্রদর্শনীতেও অংশ নিয়ে থাকবে। আমি বলব (আমি চিত্রকর্মবোদ্ধ নই), তার কাজে রিয়ালিস্ট ধারার পেইন্টিংয়েরই ছাপ ছিল।
যৌবনে সাধারণত সাদা প্যান্ট আর সাদা ফুল শার্ট পরত সালাম। পরিপাটি করে সে প্যান্টের ভেতরে গুঁজে রাখত তার শার্ট, পায়ে পরত কেতাদুরস্ত জুতো। ফ্যাশান অনুযায়ী পোশাক-আশাক পরিধানের দিকে ঝোঁক ছিল তার। অবশ্য সালাম এতই সুদর্শন ছিল যে এলেবেলে পোশাক গায়ে চাপালেও তার সৌন্দর্যের কোনো কমতি হতো বলে আমার মনে হয়নি। সুদর্শন সালাম যে চিত্রকর আমান উল্লাহ ভাইয়ের সহোদর, তা তার চেহারা, তার দীর্ঘকায়, তার স্মিত হাসি এবং তার গমগমে গলার আওয়াজেই বোঝা যেত। আমান ভাই আর সালাম—এই দুই সহোদরকে রূপবান রাজপুত্র ছাড়া আর কিছু ভাবার অবকাশ ছিল না আমাদের। ঈর্ষান্বিত হতাম আমি! নারীকুলের নৈকট্যলাভের প্রতিযোগিতায় সালাম যদি আমাদের সঙ্গে নামত, তবে নিঃসন্দেহে হেরে যেতাম আমরা অনেকেই!

মধ্যনব্বইতে আমার শাহবাগের দিনগুলো ফুরিয়ে গেল। এর অন্যতম কারণ হলো এই যে তত দিনে কবি বিষ্ণু বিশ্বাস অসুস্থ হয়ে ঢাকার বাইরে চলে গেছে, অস্ট্রেলিয়াতে পাড়ি জমিয়েছে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। এবাদে জীবিকার তাড়নায় আমরা অনেকেই তখন নিয়মিতভাবে শাহবাগে আড্ডা দিতে যাচ্ছিলাম না। সে সময় সৈয়দ তারিক, ফরিদ আহমেদ, শামসুল কবির, সুমন রহমান—এদের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ হচ্ছিল না আমার। একসময় পেশাগত কাজে আমার এতই উল্লম্ফন শুরু হয়ে গেল যে বন্ধুদের ভেতরে একমাত্র ফরিদ আহমেদের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়ে গেল। এভাবে আমি ছিটকে পড়ে গেলাম শাহবাগের বৃত্ত থেকে। সে কারণে দীর্ঘদিন আর সালামের সঙ্গে নিয়মিতভাবে আমার দেখা হয়নি। মাঝেমধ্যে বইমেলাতে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে মাত্র।
২০০৭ সালে আবার সালামের সঙ্গে আমার দেখা হলো ডলফিন গলিতে, যে ডলফিন গলি নিয়ে অনন্যসাধারণ সব গল্প লিখেছেন শ্রদ্ধেয় ওয়াসি আহমেদ। আমি ফিরছিলাম অফিস থেকে। তখন দেখি, পথের ধারে চা খাচ্ছে সালাম। আমাকে দেখে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।

default-image

আমরা আগের মতোই টংয়ে বসে চা-বিড়ি খেলাম। জানা গেল, সালাম বিয়েশাদি করেছে, থাকে ডলফিন গলিতেই। দুজন সন্তান তার। সালামদের সেই বাসাটা আমি আগে থেকেই চিনতাম—যে বাসাতে একদা চিত্রাভিনেত্রী শাবানারা থাকতেন, সেই বাসাটার পুবের বাসাটাই সালামদের। আমি তখন কলাবাগান লেক সার্কাসে থাকি। আসতে-যেতে পথে প্রায়ই দেখা হয় সালামের সঙ্গে। ডলফিন গলিতে সালামের প্রিয় চায়ের দোকানে বসে বসে আমরা চা খাই (মরহুম খালেদ মোশাররফদের বাসার পুবে অস্থায়ী একটা চায়ের দোকানে ছিল তখন); গল্প করি; খামাখা রিকশায় ঘুরি। কখনো কখনো আমার ডেরায় আসে সালাম। আমরা কবিতা বা চিত্রশিল্প নিয়ে গল্প করি, আমি মানুষজনদের অনেক গালিগালাজ করি, সালাম মৃদু হাসিতে আমার পাগলামি সহ্য করে। আমি আমান ভাইয়ের খবরও নিই তার কাছ থেকে (আমান ভাই তখন কিশোরগঞ্জ শহরে থাকেন বলে মনে পড়ছে)।

বিজ্ঞাপন

মাঝে চার বছর আর সালামের সঙ্গে দেখা হলো না। আমি অনেক দূরের দেশে দেশে ছিলাম তখন। ২০১৩-তে দেশে ফেরার পর আবার আমার আর সালামের আড্ডা শুরু হলো ডলফিন গলিতে। ডলফিন গলির মুখে আমি যথারীতি অফিসের শাটল থেকে নামতাম। সালাম তখন বেশির ভাগ দিনেই তার বাসার পাশের একটা চায়ের দোকানে বসে থাকত। সে শুকিয়ে গিয়েছিল অনেক। মরে যাচ্ছিল তার ‍সুন্দর চেহারার জেল্লা। আবারও আমাদের ফাউ ফাউ রিকশাভ্রমণ আর চা-বিড়ি শুরু হয়ে গেল।
২০১৮-এর শেষের দিক থেকে লেক সার্কাস ছাড়লাম আমি। আর দেখা হলো না সালামের সঙ্গে। আমার নতুন মুঠোফোনে তার ফোন নম্বর সেভ করা ছিল না। কথাও হলো না। বইমেলাতেও দেখা হলো না আমাদের। কিন্তু আমি জানতাম, ডলফিন গলিতে গেলেই আমি সালামকে পেয়ে যাব।
আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সালামের মৃত্যু আমাকে শূন্য করে দিয়ে গেল। আমরা আর ডলফিন গলিতে চা খেতে খেতে গল্প করব না; ফাউ ফাউ রিকশায় ঘুরব না; বইমেলাতে হাঁটব না; এই জগতের সব মানুষকে দেওয়া আমার অবিশ্রান্ত গালিগালাজ আর মিটিমিটি হাসিতে শুনবে না সালাম! অনিরাপদ সড়ক শিকার করে নিয়ে গেছে তারে!
আমাদের তারুণ্যের বন্ধু আব্দুস সালামের জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা।

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন