বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আবুল হাসনাতকে ছাড়া কালি ও কলম–এর অফিস কল্পনাই করা যায় না। তবু তো অফিস চলছে। পৃথিবীর কোনো কিছুই অনিবার্য বা ‘ইনেভিটেবল’ নয়। আবুল হাসনাত সুনিপুণ দক্ষতায় যথাসময়ে কালি ও কলম পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। এখনো পত্রিকাটি প্রকাশিত হচ্ছে। হাসনাত চলে যাওয়ার পর কিছুদিন অনিয়মিতভাবে হলেও এখন আবার প্রায় প্রতি মাসেই পত্রিকা বেরোচ্ছে। মানও যথাযথই আছে। মানসমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য পত্রিকার অভাব ছিল দেশে। হাসনাতের সম্পাদনায় বিগত ১৮ বছর ধরে কালি ও কলম সে অভাব ঘুচিয়েছে। বিদগ্ধ পণ্ডিত ড. আনিসুজ্জামান ছিলেন এ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি। তিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন গত বছরের মে মাসে। আর নভেম্বরের শুরুর দিন চলে গেলেন আবুল হাসনাত। পত্রিকার বড় দুর্দিন চলছে। তারপরও পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। সভাপতি আনিসুজ্জামান ও সম্পাদক আবুল হাসনাত পত্রিকার এমন একটা প্রক্রিয়া দাঁড় করিয়েছেন, যাতে তাঁরা ছাড়াও পত্রিকা চলতে পারে। লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। পত্রিকার ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া দাঁড়িয়ে গেছে। তাই পত্রিকাও ঠিকঠাকমতো বের হচ্ছে।

বাংলা সাহিত্যে, বিশেষত বাংলাদেশের সাহিত্যে আবুল হাসনাতের অনেক অবদান। তিনি কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের লেখা জোগাড় করার জন্য রাজশাহী চলে গেছেন। রাজশাহী গিয়ে দু–তিন দিন থেকে হাসান ভাইয়ের লেখা নিয়ে তবেই ফিরেছেন। প্রতি মাসে একবার–দুবার ভারত গেছেন লেখা জোগাড় করার জন্য। প্রাবন্ধিক চিন্ময় গুহর লেখা আর সবার মতো তাঁরও পছন্দ ছিল। চিন্ময় গুহর লেখা চেয়ে পাঠিয়েছেন কোনো সংখ্যার জন্য। এভাবে লেখকদের দিয়ে নানা বিষয়ে লিখিয়েছেন তিনি, বছরের পর বছর।

সৈয়দ শামসুল হককে দিয়ে সংবাদ সাময়িকীর জন্য ‘মার্জিনে মন্তব্য’ লিখিয়ে নিয়েছেন। একইভাবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে দিয়ে ওই একই পত্রিকায় লিখিয়েছেন ‘অলস দিনের হাওয়া’। আবার কবি অলকরঞ্জন দাশগুপ্তর কাছে লেখা চেয়ে টেলিফোন করেছেন সুদূর জার্মানিতে, ঢাকায় বসে। আবুল হাসনাত লেখা চাইলে সে লেখা না নিয়ে তিনি ছাড়বেন না—এ কথা আমাদের সবারই জানা ছিল। এই আমাকেও হাসনাত বহুবার লেখা দিতে বাধ্য করেছেন। সংবাদ সাময়িকীর জন্য এবং কালি ও কলম–এর জন্যও।

একা হাতে তিনি এ দেশে বহু লেখক তৈরি করেছেন। লেখককে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করা সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব। তিনি সেটি জানতেন। ফলে অনেক লেখকের আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় করার পেছনে তাঁর বড় একটা ভূমিকা ছিল। একজন লেখককে কীভাবে বিকশিত করতে হয়, সেটিও ছিল তাঁর জানা।

নিজেও লেখক হিসেবে ছিলেন উজ্জ্বল। মাহমুদ আল জামান নামে কবিতা লিখতেন। তাঁর সেই সব কবিতা ব্যক্তিগত অনুভূতির রসে সিক্ত, পড়লে বোঝা যায়, খুব নির্জনের গহন কথা উঠে আসছে। যেন ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে’ একা কথা কয় তাঁর কবিতা। তিনি গদ্যও লিখেছেন বিস্তর। হাসনাতের কবিতা এবং গদ্যে যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো পরিমিতিবোধ। এই পরিমিতির ব্যাপারটি তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যেই ছিল।

হাসপাতালে বসে জীবনের শেষ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার রোদ্দুর ঢেকে যাচ্ছে কালো মেঘে/ হায় ছায়াবৃতা দাও, আমাকে দাও সজীব/ সহজ উজ্জ্বলতা...’।

আবুল হাসনাত তাঁর কবিতার চরণের মতোই সজীব, সহজ ও উজ্জ্বল ছিলেন। তাঁকে হারিয়ে আমাদের রোদ্দুরও যেন ঢেকে যাচ্ছে কালো মেঘে। শিল্প–সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। লেখক–সম্পাদক আবুল হাসনাত আমাদের মনে চিরজাগরূক।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন