default-image

এপ্রিলের এক অস্বস্তিকর গরম বিকেলে স্ট্রেথেডেন জাহাজ ঢুকল মুম্বাই বন্দর সীমানায়। আধা ডজন ভারতীয়র সঙ্গে শ তিনেক অস্ট্রেলীয় এবং ইংরেজ জাহাজের ডাইনিং রুমে আগেভাগে খাবার সেরে ঘাটের তিন মাইলের মধ্যে ঢোকার আগে শেষবারের মতো মদ টেনে নিচ্ছিল। লাউড স্পিকারে মদ্যপান বন্ধ করার হুকুম জারি হওয়ার আগে আমাদের টেবিলে বেশ কটা বমনোদ্রেককারী অস্ট্রেলীয় মিঠে শ্যাম্পেন বোতল খালি হয়েছে। একজন ইংরেজ তার সিট থেকে উঠে গ্লাস উঁচিয়ে নিষিদ্ধ করা উদ্যাপনের কথা বলল। মার্জিত রসিকতার মধ্য দিয়ে অনেকে সাড়াও দিল। আমি টলতে টলতে সিট থেকে উঠে গ্লাসটা পানিতে ভরে ওপরে উঁচিয়ে বিব্রত শ্রোতাদের সামনে আবৃত্তি করতে শুরু করলাম: ‘মৃত আত্মা একজন মানুষ এখানে নিঃশ্বাস ফেলে/ যে কখনো নিজে বলেনি এই তো আমার স্বদেশভূমি,’ ইত্যাদি, ইত্যাদি।
আমার টোস্টের জবাবে ছয়জন ভারতীয় উন্মত্ত স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘জয় হিন্দ’। আধঘণ্টা পর জেটির কাছে পৌঁছালাম আমরা।
কয়েক মিনিটের মধ্যে জাহাজ দর্শনার্থীতে ভরে গেল। স্বজনদের শুভেচ্ছা জানাতে আসা মানুষের প্রতি অন্য কোনো বন্দরকে এতটা সদয় হতে দেখিনি। অবশ্য তখন তো আমরা উষ্ণ হৃদয়ের মানুষ।
ততক্ষণে ‘বি’–ডেক, ধুতি আর শাড়িতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। বেশ কিছুসংখ্যক হাতঘড়ির কবজি বদল ঘটল, জ্বলজ্বলে ছোট্ট প্যাকেট অদৃশ্য হয়ে গেল বান্ধব হাতব্যাগের ভেতর, ছোট ছোট আরও অনেক কিছু নিরাপদ আশ্রয় নিল কোটের পকেটে। আমরা পার্থিব বিষয়-আশয় থেকে ভার কমিয়ে উল্টো দিক থেকে হালকা হৃদয় নিয়ে নেমে এলাম। বেলা দেড়টায় আমরা কাস্টমস শেডে হাজির হলাম।
কাস্টমস শেডের ভেতরটায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে মানুষ। আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা কাউন্টারের পেছনে বসে আছে নৌসেনার পোশাক পরা কজন হ্যান্ডসাম মানুষ। তাদের মুখোমুখি যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন, এখানে ডিক্লারেশন ফর্মের নিরীক্ষা চলছে। কোন লাইনে আমি দাঁড়াই বুঝতে পারছি না। তাই অনুসন্ধান বোর্ড ঝোলানো লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কয়েক মিনিট পর দেঁতো হাসি দিয়ে আমার উল্টো দিকের নারীকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কোথায় যাব?
তিনি দক্ষতার সঙ্গে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কাস্টমস অফিসারদের মাথার ওপরে বোর্ডে নম্বর লেখা আছে, দেখুন।’
বোর্ড দেখতে দেখতে গোটা হল ঘুরে আসি আমি। ওখানে কোনো নম্বর নেই। কাজেই আমি আবার অনুসন্ধান লাইনে যোগ দিলাম। এবার দেঁতো হাসি না দিয়ে নারীকে জানালাম আমার আবিষ্কারের কথা। কথা শুনে তিনি মুষড়ে পড়লেন; বেশ কয়েক টুকরো চক সঙ্গে নিয়ে বোর্ডে নম্বর লেখার জন্য হলভর্তি মানুষের মধ্যে এগোলেন পথ কেটে। এরপর বেশ কটি লাইনে মানুষ এদিক-ওদিক করল। দেখলাম আমি আমার লাইনের একেবারের লেজের ডগায়। আধঘণ্টা পর কাউন্টারে পৌঁছালাম এবং বিপর্যস্ত অফিসারের কাছে ঘোষণা করলাম আমার উপস্থিতি। তিনি তাঁর কাগজপত্র ঘেঁটে বললেন, আমার ডিক্লারেশন ফর্ম তঁার কাছে পৌঁছায়নি। আমি প্রতিবাদ করার আগেই আমার পরের লোকটির সঙ্গে কাজ করতে শুরু করলেন তিনি। কাস্টমসের ঘড়ি তখন আড়াইটায় স্থির।
আবার অনুসন্ধান লাইনে যোগ দিলাম আমি। নারী এবার নিশ্চিত, অকারণে আমি তঁাকে বিরক্ত করছি। তবে তিনি এবার ত্বরিত কাস্টমস অফিসারের কাছে গেলেন, তাঁর ফাইলপত্রের দিকে তাকালেন এবং ফ্লোর থেকে একটি ফর্ম তুলে বিজয়ীর মতো আমাকে দেখিয়ে নাড়তে থাকলেন। আমি আবার আমার লাইনে ফিরে এলাম।
কিছু সময় পর আমি যখন কাস্টমস অফিসারের মুখোমুখি, আমার ডিক্লারেশন ফরম তাঁর সামনে টেবিলের ওপর। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘নিবাস বদলের কারণে আপনি কি কর মওকুফ দাবি করছেন?’
‘হ্যাঁ, আমি চার বছর বাইরে ছিলাম।’
‘এই ফরম পূরণ করে আবার আসুন।’
হলের এক কোনায় গিয়ে আমি ফরম পূরণ করি, আবার আমার লাইনের লেজে গিয়ে দাঁড়াই। রেয়াতি ফরম যথাযথভাবে পূরণ করে ৪০ মিনিট পর আবার মোকাবিলা করি কাস্টমস অফিসারকে।
তিনি ঘোষণা করলেন, ‘আপনি মওকুফ দাবি করতে পারেন না, এর মধ্যে আপনি দুই সপ্তাহের জন্য বাড়ি এসেছিলেন।’ আমি প্রতিবাদ করলাম, ‘কিন্তু সেটা তো বাড়িবদলের ব্যাপার নয়। আমাকে অফিসের কাজে পাঠানো হয়েছিল। আমার স্ত্রী ও সন্তানেরা তখন বাইরেই ছিল।’ তিনি বললেন, ‘দুঃখিত, আইন খুবই স্পষ্ট। তার পরও যদি পীড়াপীড়ি করতে চান, ইন্সপেক্টরের সঙ্গে দেখা করুন।’
আমি দেখলাম, অন্যান্য যাত্রী তাঁকে ঘিরে ধরেছে। আবার যখন আমার পালা এল, আমার অবস্থা তাঁকে ব্যাখ্যা করলাম। আমার পূরণ করা ফরম তিনি ছিঁড়ে ফেললেন এবং সবকিছুই যে বুঝতে পেরেছেন এমন একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘মাঝখানে যে এসেছেন এটা অস্বীকার করুন। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
আমি অন্য একটা ফরম নিয়ে ফিরে আসি এবং লাইনে দাঁড়াই। কুড়ি মিনিটের মধ্যেই আমি আবার কাউন্টারের সামনে বিরক্ত ও খিটখিটে মেজাজের অফিসারের মুখোমুখি হলাম।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাকে কে এই ফরম পূরণ করতে বলেছে?’
আমি হলের চারদিকে তাকিয়ে ইন্সপেক্টরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করি।
তিনি ইন্সপেক্টরের কাছে গেলেন এবং ঢের অঙ্গভঙ্গি করে তাঁর সঙ্গে তর্ক করলেন। দেখে মনে হলো, ইন্সপেক্টর জয়ী হয়েছেন। আমাকে শুল্ক রেয়াত দেওয়া হলো। তবে আমাকে আবার ডিক্লারেশন ফরম পূরণ করতে হবে। হলের কোনায় গিয়ে আবার ফরম পূরণ করলাম। লাইনে এসে দাঁড়ালাম। যখন কাস্টমস অফিসারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম, ঘড়িতে পাঁচটা বেজে গেছে।
এরপর আরও লাইন রয়েছে। এক লাইনে নতুন কেনা মালামালের জন্য কাস্টমস শুল্ক দিতে হবে, অন্যটিতে পোর্ট ট্রাস্টের চার্জ। আধঘণ্টার মধ্যে এসব শেষ করার পর শুরু হলো কাস্টমস পরিদর্শকের জ্বালা। মালামালে ফেটে পড়ছে এমন বাক্সপ্যাটরা, স্টিলের ট্রাঙ্ক এবং দৃশ্যমান ঝুড়ি পরীক্ষার মুখোমুখি করানোর ব্যাপারটা তিক্তকর। এমন সময় উদ্ধারকারী দেবদূত হিসেবে আবির্ভূত হলেন মধ্যবয়সী আলুথালু একজন—আমাকে সহাস্যে সন্তুষ্ট করতে এবং তেল দিতে চেষ্টা করছেন তিনি। বগলতলায় তাঁর ছাতা গোঁজা। ন্যাকা স্বরে বললেন, ‘আরে ভাই, এত চিন্তা করছেন কেন? আমাকে দশটা টাকা দিন। সব ঠিক হয়ে যাবে, আমার বাল-বাচ্চারাও আপনার জন্য দোয়া–খায়ের করবে।’
‘কিন্তু আমি তো রেয়াত পেয়েছি, কূটনৈতিক রেয়াত।’
‘আরে, সেটা তো আমি জানি। কিন্তু আমাকে আমার বাচ্চাদের তো খেয়েপরে বেঁচে থাকতে হবে। দশ টাকা এমন বড় কিছু নয়। দশ টাকায় আপনার তেমন কোনো সমস্যা হবে না। কী বলেন?’ বলেই আমার পাঁজরে একটা বান্ধব খোঁচা দিয়ে পান চিবুনো লাল দাঁতগুলো বের করলেন লোকটি। আমি দেখলাম, আমার পাশের একজন তাঁর নোংরা মোজা ও রুমাল তাঁর অনেক স্যুটকেসের একটির এক কোনায় গুঁজতে যাচ্ছেন। কিন্তু তার জন্য যথেষ্ট জায়গা নেই।
আমি নিজেকে দেবদূতের হাতে ছেড়ে দিলাম। কোনো ধরনের পরীক্ষা-পরিদর্শন ছাড়াই আমার মালপত্রের বাক্সপ্যাটরাতে দাগ দিয়ে দেওয়া হলো। আমার উদ্ধারকারী দূতের আশীর্বাদের স্তূপ সমৃদ্ধ করে তুলল আমাকে।
তারপর একদল কুলিকে মোকাবিলা করতে হলো, সবাই আমার বোঝা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আমার শুভকামনা জানাতে জানাতে বিদায় করলাম তাদের। অনেক সংগ্রামের পর বিজয়ী হয়ে মালামাল ট্রাকে তুললাম আমি। নিজেকে স্থাপন করলাম মালামালের ওপরে। আমার ওয়ালেটে অবশিষ্ট রইল কেবল কিছু খুচরো টাকা। ঘড়িতে যখন ছয়টা, আমরা বের হলাম জেটি থেকে।
ড্রাইভারকে অনুরোধ করে থামলাম পথের ধারের একটি রেস্তোরাঁয়। পানে সঙ্গদানের জন্য আমন্ত্রণ জানালাম ড্রাইভারকে।
আমরা দুজন ‘জয় হিন্দ’ বলে উঁচিয়ে ধরলাম গ্লাস। গ্লাসে বরফ মেশানো লেমোনেড, কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, এটি অস্ট্রেলীয় শ্যাম্পেনের চেয়েও সুস্বাদু।

default-image

খুশবন্ত সিং: জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধা
ভূমিকা ও অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী
অল্পের জন্য শতবর্ষী হতে পারেননি সম্ভবত সর্বাধিক পঠিত ভারতীয় কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক, দিল্লির ‘ডার্টি ওল্ড ম্যান’ খুশবন্ত সিং। তাঁর মৃত্যুর বর্ষপূর্তির আগেই এসে গেল জন্মশতবার্ষিকী।
জন্ম: ২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৫ সালে, পাকিস্তানের পাঞ্জাবের একটি গ্রামে। মূলত শিখ হওয়ার কারণে দেশত্যাগের যন্ত্রণা নিয়ে সপরিবারে ভারতে চলে যেতে হয়েছিল তাঁদের। খুশবন্ত সিংয়ের বাবা স্যার শোভা সিং ছিলেন আধুনিক দিল্লির একজন খ্যাতিমান নির্মাতা।
লন্ডনের ইনার টেম্পলে আইন নিয়ে পড়ালেখা করলেও আইনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেননি খুশবন্ত সিং। লেখালেখি ও সাংবাদিকতাই ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। স্বল্পকাল ছিলেন কূটনীতিবিদ, রাজ্যসভার সদস্যও।
দেশভাগের মর্মন্তুদ স্মৃতি নিয়ে লেখা তাঁর অসামান্য বই ট্রেন টু পাকিস্তান ছাড়াও আই শ্যাল নট হিয়ার দ্য নাইটিঙ্গেল, দিল্লি আ নভেলসহ অনেক বইয়ের রচয়িতা তিনি। ২০১৪-এর ২০ মার্চ মারা যান এই লেখক।
খুশবন্ত সিংয়ের লেখা নিয়ে আছে বিতর্কও। এসব বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আমি যা বিশ্বাস করি তাই লিখি। পরিণতি কী হবে তার পরোয়া করি না।’

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন