আষাঢ়ে আশা

আমি খুব একটা আশাবাদী মানুষ নই। যদিও ৬ বলে ৩০ রানের হিসাব মাথায় নিয়ে ক্রিজে যখন মুস্তাফিজ আর রুবেল, তখনো মনে হয়, যদি রুবেল ৫টা ৬ মেরে দেয়, তাহলেই তো আমরা জিতে যাই! যে ছেলে মাঝেমধ্যেই ৬ খায়, সে একদিন ৫টা ৬ মারতেও তো পারে!

যদিও ছোটবেলাতেই পাঠ্যবইয়ে পড়েছি—আশা? সে তো মরীচিকা। তারপরও খুচরা কিছু বিল্ট–ইন আশা তো থাকেই বাংলাদেশিদের। দেশের অমুক বিষয়টা নিয়ে আমি খুব আশাবাদী—এই টাইপ চেতনা না থাকলে এই যুগে বন্ধুবৃত্তে গুরুত্ব আশা করা যায় না। তাই সঙ্গদোষে কিছু আশা আমার মধ্যেও আছে হয়তো। বিষয়টা হতাশাজনক।
করোনা আসার পর এলাকায় এলাকায় বাড়ির গেটের সামনে বা গ্যারেজে বেসিন বসানো, প্রধান খাদ্যের মতো করে কিনে ঘরে ঘরে হ্যান্ডওয়াশ আর স্যানিটাইজারের দুর্গ গড়ে তোলা, উপর্যুপরি স্বাস্থ্য সচেতনতা আমাকে একধরনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ফেলে দিল—তাহলে কি আমি ভুল? আমার কি আশাবাদী হওয়া উচিত?

কক্সবাজারের ডলফিনের মতো আমার মধ্যেও আশা ফিরে এল। তা ছাড়া যেহেতু লকডাউনে প্রচুর অবসর, ফলে চামে হালকা আশাবাদী হয়ে উঠলাম আমি। মনে হলো, পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা—এই বিষয়গুলোতে হয়তো এবার মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। লকডাউন শেষে দেখা হলে কেউ হ্যান্ডশেকের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দেবে না (আমি প্রাচীনকাল থেকেই হ্যান্ডশেকের বিরোধী, কিন্তু বলার সাহস পেতাম না)। দেখা হলে আতকা জড়িয়ে ধরবে না (এই সংস্কৃতিও আমার জন্য নতুন। ঈদ ছাড়া আমি আগে কারও সঙ্গে কোলাকুলি করছি—এই ইতিহাস আমার মনে পড়ে না)।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু এসবের কিছুই হলো না। উল্টো দেখলাম বেশ কয়েকটা বাসার সামনের বেসিন সরিয়ে ফেলেছে। আমাদের বিল্ডিংয়ে ঢোকার মুখে যে বেসিন, সেটার ওপর দেখি বহিরাগত এক উদাস বিড়াল বসে বোঝার চেষ্টা করছে, জিনিসটা কী!
পুরি-মোগলাইয়ের দোকানে ব্যাপক ভিড়। বরাবরের মতোই খালি হাতে পুরি-মোগলাই ভরা হচ্ছে প্যাকেটে। চায়ের দোকান, চটপটির দোকানে এত লোক যে বসার জায়গা নেই, লোকজন দাঁড়িয়েই যা খাওয়ার খাচ্ছে। সবাই নাকি ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে, তাহলে এত লোক কেন? একজনকে দেখলাম বন্ধুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে চায়ের দোকানের প্যাকেটে রাখা কেক ধরল। প্যাকেটের নিচের দিক থেকে পছন্দমতো কেক বাছাই করে শুরু করল খাওয়া।

পুরি-মোগলাইয়ের দোকানে ব্যাপক ভিড়। বরাবরের মতোই খালি হাতে পুরি-মোগলাই ভরা হচ্ছে প্যাকেটে। চায়ের দোকান, চটপটির দোকানে এত লোক যে বসার জায়গা নেই, লোকজন দাঁড়িয়েই যা খাওয়ার খাচ্ছে। সবাই নাকি ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে, তাহলে এত লোক কেন? একজনকে দেখলাম বন্ধুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে চায়ের দোকানের প্যাকেটে রাখা কেক ধরল। প্যাকেটের নিচের দিক থেকে পছন্দমতো কেক বাছাই করে শুরু করল খাওয়া।
রাস্তায় দেখলাম অনেক মাস্ক পড়ে আছে। বোঝাই যায়, ত্যক্ত হয়ে মাস্ক ফেলেই বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দেয় সবাই। এটাকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখি। আমাদের মুখে বিল্ট–ইন মুখোশ থাকে, আলাদা মুখোশের কী দরকার?

রাস্তায় দেখলাম অনেক মাস্ক পড়ে আছে। বোঝাই যায়, ত্যক্ত হয়ে মাস্ক ফেলেই বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দেয় সবাই। এটাকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখি। আমাদের মুখে বিল্ট–ইন মুখোশ থাকে, আলাদা মুখোশের কী দরকার?
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশাটা আমি করেছিলাম ‘হোম অফিস’ নিয়ে। আমার আশা ছিল, বাসা থেকেও যে ভালোভাবে কাজ করা সম্ভব, এটা সর্বস্তরের মানুষ এবার বুঝবে। ঢাকার মানুষের আয়ুক্ষয় করা জ্যাম এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিদিন অফিস যাওয়ার চেয়ে বাসা থেকে কাজ করা যে যৌক্তিক, এটার একটা ট্রায়াল তো এই কয়েক মাসে হলো। বোঝা গেল, অনেক কাজই বাসা থেকে করা সম্ভব এবং উচিতও বটে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু না, আমার সেই আশার ফ্রাইড রাইসে করলা! সবাইকেই একদিন অফিস যেতে হয়, কাল থেকে যেতে হবে আমাকেও। সর্বশেষ গিয়েছিলাম ৯ এপ্রিল। আগামীকাল ৯ সেপ্টেম্বর। অফিস প্রত্যাবর্তন দিবস। ভবিষ্যতে শোকাবহ হিসেবে দিনটি পালন করব ভাবছি। ২০১৬ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের কাছে ২ রানে হারার পর মনে হয়েছিল, এত বড় শোকের ঘটনা আমার জীবনে ঘটেনি। ওয়ারফেজ কি সাধে গেয়েছে—
‘হতাশা হতাশা
কালো ছায়া হয়ে জড়িয়ে আছে...’

এই পুরো ব্যাপারটায় নিজেকে ম্যানসিটির সমর্থক মনে হচ্ছে। জানতাম মেসি আসবে না, তা–ও ওই যে আশা! জানতাম, অফিসে যেতে হবে, কিন্তু ওই যে সূক্ষ্ম আশা, যদি...হোয়াট ইফ...

কিন্তু বৈরুতের বিস্ফোরণের মতো আচমকা মেইলে এল আদেশ, ‘আহো ভাতিজা, আহো’। মনে পড়ে গেল কবিতার লাইন, ‘হায় চিল...’!
বিশ্বের আপামর অফিসগামীর কথা মাথায় রেখে আইয়ুব বাচ্চু গেয়েছিলেন—
‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি
তাই তোমার কাছে ছুটে আসি।’

এই ‘তুমি’ এলে অফিসে! যদিও আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি না, তা–ও বাপ-মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অফিস যেতেই হবে। কারণ, ‘অফিসে যাব না’ শুনলে তারা মুখে এমন একটা বিরক্তির ভাব সৃষ্টি করে, যা দেখার চেয়ে অফিসে যাওয়া ভালো। এই মূকাভিনয় তারা আজ থেকে অনেক বছর আগে করত ‘আজকে স্কুলে না যাই?’ শুনলে। অথচ পাঁচ বছর আগেও আমি অফিসে যেতাম না। পাঁচ বছরে কী এমন হলো যে এখন আমাকে অফিস যেতে হয়? জার্মানির সরকারও তো চেঞ্জ হয়নি! তখনো প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল, এখনো তিনিই আছেন! কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বিজ্ঞাপন

পরিবর্তন আসবে না বিরক্তিকর অফিসযাত্রাতেও। বাসের হতাশ শূন্যদৃষ্টির লোকগুলোর সঙ্গে আমিও যুক্ত হব কাল (চিন্তা করেন, এত কিছুর পরও আমি আশা করছি, বাস পাব!)।

কাল সকালের কথা ভেবেই মনে জেগে উঠছে বিষাদের ছায়া! ঘর থেকে বের হলেই গায়ে লাগবে ছাল ওঠা বিরক্তিকর গরম। এরপর বাসের আবহমানকাল থেকে চলে আসা নোংরা সিটে বসা, যেই সিটের কভার বানানোর পর আর কোনো দিন পরিষ্কার করা হয়নি। বাসের জানলা দিয়ে তাকালে প্রতিদিন দেখব কমপক্ষে দুজন অন্য বাসের যাত্রী গলা বের করে বমি করছেন। ওদিকে আমাকে হেলান দেওয়ার স্ট্যান্ড ভেবে পুরো শরীরটা এলিয়ে দিয়েছেন আমার পাশের যাত্রী। এভাবেই জ্যামে আটকে থাকতে হবে ঘণ্টাখানেক। প্রতিদিন বাসে ‘ওই ব্যাটা, আমি কি আজকে নতুন যাই’–বিষয়ক একটা হাতাহাতি হবে। মানে একটা ফুরফুরে মেজাজকে খারাপ করার যাবতীয় উপাদান ছড়িয়ে আছে বাসযাত্রায়।

ফেরার সময় আরেক দফা বাসযাত্রা। তার জন্য আবার দাঁড়িয়ে থাকতে হবে এক–দেড় ঘণ্টা। কারণ, বাসের গেট লক। একটা একটা করে বাস আসবে, দৌড়ে যাব, গিয়ে দেখব সিট নেই। বোলারের মতো আবার ফিরে যাব নিজের স্ট্যান্ডিং মার্কে। ‘পরের বাস...এবারে কিন্তু চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ধরতে পারলেন না। আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন গেটরক্ষক, সজোরে গেট লাগিয়ে প্রতিহত করলেন ছুটে আসা যাত্রীকে। এবং যাত্রীর আবেদন...কিন্তু নাকচ করে দিলেন...যাত্রীসংখ্যা যা ছিল তা–ই, এবারও কোনো বাস হলো নাআআআ...। যা বলছিলাম খোদাবক্স...’

বাস তো আমার কাছে একটা চলমান নরক। আসল নরকে এমন গেটলক সার্ভিস থাকলেই হয়!
তো যা বলছিলাম খোদাবক্স, এই ৮ ঘণ্টার অফিসের জন্য ৩–৪ ঘণ্টা কাটবে রাস্তায়। খুবই দুঃখের ব্যাপার। এই দুঃখের দিন আবার শুরু হতে যাচ্ছে আগামীকাল!
এ রকম একটা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই বারী সিদ্দিকী গেয়েছিলেন—
‘মনের দুঃখ মনে রইল রে
বুঝলি না রে সোনাচান
চন্দ্র–সূর্য যত বড় আমার দুঃখ তার সমান!’

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0