default-image

আসাদ চৌধুরী বিংশ শতাব্দীর যে ষাটের দশকের কবি, তার সমাজ-রাজনৈতিক যুগপৎ দৈশিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাভূমি নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক। এমন এক সময়ের সন্তান ষাটের কবিবংশ, যার প্রেমও গ্রহণলাগা, ব্যক্তিবিরহও সামষ্টিক ব্যর্থতার রঙে রঞ্জিত। এর মাঝে স্মৃতি হয়তো বিশেষ করে আলোচ্য কোনো বিষয় হতে পারে না তবু সরল এক প্রস্তাবনারূপে যদি তাঁকে ইতিউতি পাঠের স্মৃতি থেকেই তাঁর স্মৃতিসূত্র শনাক্তের প্রয়াস পাই, তবে হয়তো সামগ্রিকভাবে আমাদের কবিতার এক গতিমুখেরও সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
প্রথমেই আসে আসাদ চৌধুরী প্রথম কবিতাবই ‘তবক দেওয়া পান’-এর প্রসঙ্গ। লোকজ পরিসরে এই শিরোনাম এসেছে অনেক আলোচনা-প্রত্যালোচনায়। আমরা বলি, এ-ও তাঁর স্মৃতিচর্যারই প্রকাশ। সময়ের সঙ্গে অঙ্গীভূত যে লোকাচার-লোকাভ্যাস লুপ্তপ্রায়, তাকে স্মৃতিতে জায়মান রাখেন কবি তবক দেওয়া পানের রূপকে। একদিন হয়তো পানের বরজ সব উঠে যাবে এ দেশ থেকে, একদিন এই তুমুল ফরমালিন-বাস্তবে প্রাণের ‘পান’ হয়তো নেবে বিষের আকার, তখন আসাদ চৌধুরীর কবিতাসূত্রে পান থাকবে আমাদের স্মৃতির গহনে। আর তাঁর কবিতা মনে করিয়ে দেবে অলস দুপুরের বাংলা, একটু আয়েশি ভঙ্গি আর গুরুভার মজলিশে হালকা রসের ফোয়ারা।
আসাদ চৌধুরী কবিজীবনের প্রারম্ভ পর্বে, গত শতকে পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে স্মরণ করেন প্যাট্রিস লুমুম্বাকে, যা বাঙালি তরুণ কবির গভীর আন্তর্জাতিকতাবোধের স্মারক। দূরদেশের বিপ্লবীর পাশাপাশি এই বাংলাদেশের কুমিল্লার বরুড়া অঞ্চলের কৃষকনেতা কমরেড মুহাম্মদ ইয়াকুবও তাঁর পরবর্তী কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে অনায়াসে। একই সঙ্গে ‘স্মরণের মীঢ়ে ধীরেন’ কবিতাটি স্মরণের সরণিতে নিয়ে আসে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রথম প্রস্তাবক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে। লক্ষযোগ্য,Ñগীতসুধার অনুষঙ্গ ‘মীঢ়’ ও স্মৃতি একাকার হয়ে গেছে ধীরেন দত্ত প্রসঙ্গে। সংগীত যেভাবে স্মরণযোগ্যতার বিন্দুবিভা ছড়িয়ে যায় শ্রোতার মনের মহলে, ঠিক তেমনি যেন ধীরেন দত্তের স্মৃতিসুর অনশ্বর হয়ে বাজে বাঙালির হৃদয়জুড়ে:
‘দিন যায়,
দিন যেতে থাকে।
তাঁর জন্যে যত শ্রদ্ধা নিজেদের প্রতি ততখানি ঘৃণা,
কারাগার তাঁকে চেনে,
ঘাতক বুলেট তাঁকে চেনে
শুধু অকৃতজ্ঞ আমরা চিনি না।’

বিজ্ঞাপন

মাতৃভাষা বাংলার জন্য যাঁর বিশাল অবদান, তিনি যখন একাত্তরে পাকিস্তানি হায়েনাদের হাতে নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেন আর ক্রমেই আমরা যখন তাঁর রক্তরঞ্জিত বাংলাদেশে বাস করে তাঁকেই ভুলে যেতে থাকি, তখন কবি আমাদের বিস্মৃতি নামক পাপ সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়ে যান এভাবেই।
আসাদ চৌধুরী ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক কবিতা লেখেননি কখনো, কিন্তু যখন ফেব্রুয়ারির অমর একুশের গ্রন্থমেলায় তাঁর কবিতার পঙ্‌ক্তি প্ল্যাকার্ডে প্ল্যাকার্ডে জ্বলজ্বল করে জানায় যে কোনো নিপুণ জল্লাদের ক্ষমতা নেই যে ভাষাশহীদের গা থেকে একটিও লোম তুলে নেওয়ার দুঃসাহস দেখায়,Ñতখন বুঝতে হয় কবিতার প্রয়োজন নেই স্লোগানে, বরং প্রকৃত কবিতাকেই সময় তার প্রয়োজনে স্লোগান করে নেয়; এই যেমন বর্তমান লেখক তার শৈশব-কৈশোরে বাংলাদেশের এক মফস্বল জেলা শহরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনের সমর্থনে এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মরণে দেয়ালে দেয়ালে উৎকীর্ণ দেখেছে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে আসাদ চৌধুরীর এই অনশ্বর কবিতা:
‘তোমাদের যা বলার ছিল
বলছে কি তা বাংলাদেশ?’
(শহীদদের প্রতি)
মিলান কুন্ডেরা যেমন বলেন, উপন্যাস বা শিল্প হলো বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম; আসাদ চৌধুরী ঠিক তেমনি কবিতার মধ্যে দিয়ে জারি রাখেন সে সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের অনন্যসাধারণ কবিতা ‘বারবারা বিডলার-কে’ তো আজ স্মৃতিসত্তার অনুপম যুগলবন্দীরূপে প্রতিভাত কবি, আবৃত্তিশিল্পী ও কবিতাপ্রেমী মানুষের কাছে:Ñ
‘টু উইমেন ছবিটা দেখেছে বারবারা?
গির্জায় ধর্ষিতা সোফিয়া লরেনকে দেখে নিশ্চয়ই কেঁদেছিলে
আমি কাঁদিনি, বুকটা, শুধু খাঁ খাঁ করেছিল—
সোফিয়া লরেনকে পাঠিয়ে দিয়ো বাঙলাদেশ,
ত্রিশ হাজার রমণীর নির্মম অভিজ্ঞতা শুনে
তিনি শিউরে উঠবেন।

আসাদ চৌধুরীর কবিতা ষাটের ক্ষুৎকাতর-ক্রুদ্ধ প্রজন্মের সতীর্থদের স্মৃতি থেকে সাম্প্রতিক জঙ্গি সন্ত্রাসের শিকার শহীদ বাঙালিদের স্মৃতিসমুজ্জ্বল। কবিতায় স্মৃতিচর্যা ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে পাঠকের মধ্যে জন্ম দেয় নির্জীব দুষ্কালের বিরুদ্ধে কাম্য সশস্ত্রতা, আবার কখনো জনতায় নির্জন করে দেওয়ার মতো মেদুর বিষণ্নতার।

অভিধান থেকে নয়
আশি লক্ষ শরণার্থীর কাছে জেনে নাও, নির্বাসনের অর্থ কী?
জর্জ ওয়াশিংটনের ছবিঅলা ডাকটিকেটে খোঁজ থাকবে না
স্বাধীনতার...’
আসাদ চৌধুরীর সঙ্গে বছর কয়েক আগে ভ্রমণে গিয়েছিলাম ঠাকুরগাঁওয়ে। শীতার্ত উত্তরবঙ্গের ছোট্ট শহরটিতে আয়োজিত সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পড়া হচ্ছিল আসাদ চৌধুরীরই কবিতা ‘মফস্বল, হায় দুয়োরানী’:
‘মফস্বল, হায় দুয়োরানী,
চেয়ে আছ সামনের দিকে, হাতে এখনো
পানের বাটা
আর নস্যির কৌটো।
একটি চোখে অতীতের সোনালি আভা,
একটি চোখে, ক্লান্ত চোখে,
ভবিষ্যতের একঘেয়ে স্বপ্ন,
বর্তমানকে ভোলার কী চমৎকার দাওয়াই
কী বিপুল মেধা নিয়ে, সুযোগের অপেক্ষায় আছ,
মফস্বল, আমার দুঃখিনী মা।
মেলোডির মতো শান্ত, স্নিগ্ধ
মফস্বল তোমার কী হলো?’
আমাদের অনুধাবনের এল যে মফস্বলের বাসিন্দা, কবি ও আবৃত্তিকারেরা ভীষণ একাত্ম অনুভব করেছে এই কবিতার সঙ্গে। কারণ, সুয়োরানী রাজধানী ও কেন্দ্রের দাপটে ম্রিয়মাণ মফস্বলের কথা এমন করে কবিতায় খুব কমই হয়েছে বলা। আবার আসে সেই স্মৃতিসূত্র। আমাদের যৌথ জীবনের স্মৃতিতে যে মফস্বলের বাস, তাকে আজকের রাজধানীবাসের বিকট বাস্তবে স্মরণে রাখেন একমাত্র কবিই।
স্মৃতির এমন নানা গভীর ব্যঞ্জনায় ভাস্বর আসাদ চৌধুরীর প্রায় প্রতিটি কবিতায় যে এই নিয়ে পৃথক আলোচনায় কেবল খণ্ডীকরণেরই জন্ম দেবে। তবু কথার পিঠে কথায় ফিরে আসে তাঁর খ্যাততম কবিতা ‘সত্য ফেরারী’। কেউ এ কবিতায় খুঁজে পান আবৃত্তিযোগ্যতা, কেউবা ক্যাটালগিং, কিন্তু নিবিড় অবলোকনে আমরা দেখি কবিতার দেহবল্লরিজুড়ে স্মৃতিসত্তার জাগর উপস্থিতি। সত্য যখন পুরাকালের বিষয় হয়ে যায়, তখন তা সমকালের স্মৃতি-অন্তর্গত; হয়তো ভর্ৎসনার আড়ালে কবি এ-ও বলে যান যে আমাদের স্মৃতির আকাশেই সত্য আবার উড়াল দিয়ে ফিরবে ভস্মভেদী ফিনিক্স পাখির প্রতিমায়।
ফিরে ফিরে নষ্ট এই কালে প্রায়শই আমাদের ভেতরে রণিত হতে থাকে আসাদ চৌধুরীর কবিতারূপী এমন অনুশোচনাবাক্য:
‘তখন সত্যি মানুষ ছিলাম
এখন আছি অল্প।’
কবি তাঁর দূর ও নিকটাতীতের সমস্ত ব্যক্তিক ও সামষ্টিক সুকৃতির বন্দনা গেয়ে, স্মৃতিচর্যা সেরে এই নিষ্করুণ বাস্তবের বাজপড়া মাঠে এসে দাঁড় করান আমদের, যেখানে মানুষ হিসেবে আমাদের খর্বতার উপলব্ধি টের পাই আমরা। কবিতা তখন পাঠকের ভেতর পর্যালোচনার বোধ তৈরি করে, পূর্ণাঙ্গ মানুষ থাকার কালকে স্মৃতিতে আনে আর মানুষ হিসেবে তার সাম্প্রতিক ঊনতাকে বিবেচনায় বসায়। কবিতা এভাবে অক্ষরের কালো সীমা অতিক্রম করে হয়ে ওঠে কালোত্তীর্ণ কনফেশন-বাক্য।

বিজ্ঞাপন

আসাদ চৌধুরী তাঁর কবিতায় বিশ্বযুদ্ধ, রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ, কোরআন, পুরাণ, বাইবেল, প্রাচীন লোকসাহিত্য, জ্ঞান দাস, সৈয়দ মুর্তজা, মির্জা গালিব, লালন শাহ, পাবলো নেরুদা, ড. শহীদুল্লাহ, জসীমউদ্‌দীন, কাননবালা, মোকসেদ আলী সাঁই, আবদুল আলীম, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কাজী হাসান হাবীব থেকে ইতিহাসের, স্মৃতির কত যে পট তুলে এনে বসান তাঁর কবিতাকৃতিতে,ভাবতে বিস্ময় মানি। স্মৃতির এসব বিচিত্র বর্ণিল প্রসঙ্গ ও চরিত্র তাঁরই ভাষায় ‘সত্তা স্মৃতির সেলাই ফোঁড়াই’ সাধন করে যায়। ‘ইলা মিত্র এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের প্রতি’ কবিতায় যেমন তিনি বলেন:
‘স্বপ্ন ছিল
এখন স্মৃতির ভার,
ব্যর্থতার ভার
কোনখানে পেতে রাখি
রাত্রির প্রণাম!’
এভাবেই আসাদ চৌধুরীর কবিতা ষাটের ক্ষুৎকাতর-ক্রুদ্ধ প্রজন্মের সতীর্থদের স্মৃতি থেকে সাম্প্রতিক জঙ্গি সন্ত্রাসের শিকার শহীদ বাঙালিদের স্মৃতিসমুজ্জ্বল। কবিতায় স্মৃতিচর্যা ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে পাঠকের মধ্যে জন্ম দেয় নির্জীব দুষ্কালের বিরুদ্ধে কাম্য সশস্ত্রতা, আবার কখনো জনতায় নির্জন করে দেওয়ার মতো মেদুর বিষণ্নতার।
‘একা ও একসঙ্গে’র বোধ প্রতিষ্ঠাক্ষম কবি আসাদ চৌধুরী অমোঘ শস্ত্র ‘স্মৃতির’ প্রতি তাঁর জন্মদিনে আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন