বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেই ২০০১ সালের মার্চ মাসে ফ্লাইট ৭৭৬৭-এ চড়ে বুয়েনস এইরেস থেকে ১৩ বছরের ছোট্ট লিও বাবার হাত ধরে বার্সেলোনায় এসেছিলেন। ক্লাবের পক্ষ থেকে চার্লি রেক্সেচ একটা রেস্টুরেন্ট ন্যাপকিনে প্রাথমিক চুক্তির স্বাক্ষর করিয়েছিলেন। তখন কি তিনি জানতেন হরমোনের সমস্যায় ভোগা এই রোগা ছেলেটি আগামী ২০ বছর ক্লাবের জন্য কী কী করতে পারেন?

মেসি গত দেড় দশকে বার্সার সিনিয়র টিমের পক্ষে ক্লাবের প্রতি যে কৃতজ্ঞতা ও দায় শোধ করেছেন, তা এক বাক্যে প্রকাশ করা সম্ভব না।

১০টি লা লিগা শিরোপা

৪টি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা

৬টি কোপা দেল রে ট্রফি

৭টি সুপারকাপ

৩টি উয়েফা সুপারকাপ

৩টি ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ডকাপ

৭ বার পিচিচি ট্রফি (লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা)।

তা ছাড়া ৬ বার ব্যালন ডি’অর খেতাব প্রকারান্তরে বার্সেলোনার ব্র্যান্ড ভ্যালু অনেক সমৃদ্ধ করেছে।

১৯৮৭ সালের ২৪ জুন সকাল ছয়টায় আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্মেছিলেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

ছোটবেলায় মেসির হিরো ছিলেন ডিয়াগো ম্যারাডোনা।

মেসির রুমের দেয়ালে ম্যারাডোনার পোস্টার লাগানো থাকত।

পাঁচ বছর বয়সে প্রথম স্বপ্নে দেখেছিলেন তাঁর হিরোকে।

সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই নানি সিলিয়াকে মেসি জানালেন, তিনি স্বপ্নে ম্যারাডোনাকে গোলরক্ষক হিসেবে খেলতে দেখেছেন। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিল না ম্যারাডোনার বিপক্ষে গোল দেওয়া ঠিক হবে কি না। কিন্তু ম্যারাডোনা চিৎকার দিয়ে তাঁকে বলেছিলেন,

‘লিও, আমাকে গোল দাও তো দেখি!’

ড্রিবল করে স্বপ্নের নায়ককে কাটিয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে যখন গোল দিলেন, তখন নাকি ম্যারাডোনা মুচকি হেসে মেসির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিয়েছিলেন।

নানি সিলিয়া ছোট্ট মেসির কথা বিশ্বাস করেছিলেন। তিনিও স্বপ্ন দেখতেন, মেসি একদিন বড় ফুটবলার হবেন। তাই চতুর্থ জন্মবার্ষিকীতে কিনে দিয়েছিলেন নাতিকে প্রথম নীল-সাদা রঙের ফুটবল।

এরপর প্রতিবছর জন্মদিনে সিলিয়া উপহার দিতেন একটা করে নতুন ফুটবল। সারা দিনের সঙ্গী ছিল সেই ফুটবল। বন্ধুরা তাঁকে ডাকত ‘ফ্লি’ বা ‘ছোট মাছি’ নামে। সারা দিন বল পায়ে ছুটে বেড়ানো। এমনকি রাতেও সেই ময়লা বল নিয়ে ঘুমাতেন মেসি। কেউ যেন না দেখে ফেলে, সে জন্য চাদর দিয়ে বলটাকে মুড়িয়ে জড়িয়ে রাখতেন।

বড়বেলায় মেসি ফুটবল খেলেছেন অবাধ স্বাধীন আনন্দে। কিংবদন্তি ক্যারাবিয়ান শিল্পী বব মার্লি যেমনটি বলেছিলেন, ‘ফুটবল নিজেই একটা শিল্প। পুরো জগৎ সেটা। পুরো মহাবিশ্ব এর ভেতর। ফুটবল মানে মুক্তি।’

ফুটবল বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আগামীকাল যদি বার্সেলোনায় মেসির ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়, তবে তাঁর কোনো ক্ষতি নেই। মেসির অর্জন ক্লাব পর্যায়ে যেকোনো ফুটবলারের জন্য স্বপ্ন। মেসির পক্ষে আর কী করা সম্ভব, তা জানার জন্য তাঁর শেষ অবসরের ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

মেসির সামনে এখন একটাই চ্যালেঞ্জ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। বার্সেলোনায় থাকুন বা নতুন গন্তব্যে পাড়ি জমান, পাখির চোখে ঠিকই তাকিয়ে থাকবেন আগামী বিশ্বকাপের দিকে। জাতীয় পর্যায়ে শেষ সুযোগ তাঁর।

২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর শরীরের তলপেটে নতুন উলকি এঁকেছিলেন। মেডিকেল অ্যানাটমির ভাষায় ইনগুনিয়াল রিজিওনে ম্যাকবার্নিস পয়েন্টের পাশে টকটকে লাল ঠোঁটের চুমুর ট্যাটু। এটি যেন পরিণত মেসির নতুন কোনো বার্তা।

প্রিয়তমা স্ত্রী অ্যান্তোনেল্লার ঠোঁটের আদলে সেই উলকি এঁকে মেসি বোঝাতে চেয়েছেন তিনি কতটা সৌন্দর্যপূজারি। প্রেমিকার ঠোঁটের গোপনীয় স্পর্শের মতোই তাঁর ফুটবল-সৌকর্য একান্ত নিজস্ব। এই স্বকীয়তা বজায় রাখতে তিনি সবকিছু বিসর্জন দিতে রাজি। যেভাবে অনেকবার বলেছিলেন তাঁর যাবতীয় ব্যালন ডি’অর খেতাবের বিনিময়ে বিশ্বকাপ অর্জন অনেক বেশি মূল্যবান। এটা ছোঁয়ার জন্য জীবনের সব অর্জন ত্যাগ করতে রাজি তিনি। আরেক লাতিন কণ্ঠস্বর গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ লিখেছিলেন, ‘ভালোবাসার জন্য মৃত্যু, এর চেয়ে বড় কোনো গৌরবের ব্যাপার নেই।’

মেসির অবস্থান এখন এমন। ফুটবলের অপার শৈল্পিক সৌন্দর্য বাঁচিয়ে রাখতে মেসির কোনো বিকল্প নেই। যে দলের হয়ে তিনি খেলুন না কেন, ফুটবল ইতিহাসে মেসির স্থান আজ বার্সেলোনা ক্লাব থেকেও বড়।

মেসি যেদিন ফুটবল–বিশ্বকে চিরবিদায় জানাবেন, সেদিন আমরা সর্বপ্রথম তাঁর প্রবল অনুপস্থিতি উপলব্ধি করব; তার আগে নয়। ইতিমধ্যে পুরো কাতালোনিয়া ও বার্সেলোনাবাসী সেই শূন্যতায় আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদের ত্রাতা ‘মেসি’র ক্লাব পরিত্যাগের আশঙ্কায়।

অন্য আলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন