বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেই দিনগুলো এত তাড়াতাড়ি বিগত হবে, কখনো ভাবতে পারিনি। বাদল রায়ও কি ভেবেছিলেন?
১৯৮৬-তে রহমতগঞ্জের বিপক্ষে ম্যাচের কথা মনে পড়ে। ঢাকার মাঠে বাদল রায় ছোট বাদল নামে শুরুতে পরিচিত হলেও বাদল রায় নামেই খেলোয়াড়ি জীবনে তখন দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। ১০ নম্বর বললেই মানসপটে তাই বাদল রায়ের ছবিই ভেসে আসত।

যা বলছিলাম, মোহামেডানের সেই মৌসুমটা কঠিন ছিল সর্বার্থেই। আবাহনীকে টপকে চ্যাম্পিয়ন হতে হলে প্রতি ম্যাচ জেতার বিকল্প নেই। সেদিন খানিক বৃষ্টি হয়েছিল বোধ হয়। আমি, জাফর ভাই গ্যালারিতে। বৃষ্টিস্নাত মাঠে মোহামেডান ভালো খেলে, এ রকম একটা প্রবাদ ছিল। কিন্তু কিছুতেই স্ট্রাইকাররা সেদিন রহমতগঞ্জের রক্ষণব্যূহে চিড় ধরাতে পারছেন না। খেলার প্রায় অন্তিম লগ্ন। মোহামেডান কর্নার পেল। আমরা মোহামেডান গ্যালারির নিচের প্রান্তে বসে আছি। ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন বাদল রায়।

গ্যালারিতে তখন তুমুল উত্তেজনা। বাদল রায় কর্নার করতেন বাঁকানো শটে। বল ইন সুইং করে ডি বক্সে আসত। নয়নাভিরাম ছিল সেই দৃশ্য।

বাদল রায়ের কর্নার এবং গো ও ও ল...প্রেসবক্সে উত্তেজনা গোপন করতে না পারা খোদাবক্স মৃধার চিৎকার। গ্যালারিতেও তখন কান পাতা দায়।

ঘরোয়া ফুটবলে বাদল রায় খেলতেন ফরোয়ার্ড পজিশনে। বুদ্ধিদীপ্ত ফরোয়ার্ড ছিলেন, সঙ্গে ছিল যথার্থ স্কিল। আমি ‘ক্রীড়াজগৎ’ রাখতাম। তখন তো ফুটবলাররা বিশাল তারকা। পত্রিকা, ম্যাগাজিনে সমস্ত খবর পাওয়া যেত। ক্রীড়া সাংবাদিকেরাই এই বিশেষণ দিয়েছিলেন বাদল রায়কে—‘বুদ্ধিদীপ্ত ফরোয়ার্ড বাদল রায়’। খুব তেড়েকেটে না কিন্তু, বাদল রায়ের স্বভাবজাত খেলা ছিল যেন ধীরলয়ের গান।

ঘরোয়া ফুটবলে বাদল রায় খেলতেন ফরোয়ার্ড পজিশনে। বুদ্ধিদীপ্ত ফরোয়ার্ড ছিলেন, সঙ্গে ছিল যথার্থ স্কিল। আমি ‘ক্রীড়াজগৎ’ রাখতাম। তখন তো ফুটবলাররা বিশাল তারকা। পত্রিকা, ম্যাগাজিনে সমস্ত খবর পাওয়া যেত। ক্রীড়া সাংবাদিকেরাই এই বিশেষণ দিয়েছিলেন বাদল রায়কে—‘বুদ্ধিদীপ্ত ফরোয়ার্ড বাদল রায়’। খুব তেড়েকেটে নয় কিন্তু, বাদল রায়ের স্বভাবজাত খেলা ছিল যেন ধীরলয়ের গান। একটা সুনিপুণ ছন্দময় তরঙ্গের বিস্তার মাঠজুড়ে। নিজে গোল করতেন, কিন্তু জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন দুর্দান্ত থ্রু ঠেলে গোল করানোয়। এ প্রসঙ্গে অবধারিতভাবে উঠে আসবে ’৮২-এর ফুটবল লিগ।

সেবার মোহামেডানের সালাম মুর্শেদী ২৭ গোল করে নতুন ইতিহাস গড়লেন। এক লিগে সর্বোচ্চ গোলসংখ্যার রেকর্ড। বহুদিন তা অক্ষুণ্ন ছিল। সালামের এই অর্জনের সিংহভাগ অবদান ছিল বাদল রায়ের। যেন ম্যান বিহাইন্ড দ্য হিস্টোরি! গোল করবার অনেক সহজ সুযোগ পায়ে ফেলে বাদল সেবার সালামকে গোলের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। নিজেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন ১৪ গোল করে।
সত্তরের দশকে কুমিল্লা জেলায় আলো ছড়ানো কিশোর বাদল রায়কে মোহামেডানে নিয়ে এসেছিলেন মোহামেডানের সেই সময়ের তারকা ফুটবলার ভানু ও নীহার। ১৯৭৬-এ খুব খারাপ ফলাফল করা মোহামেডানকে ঢেলে সাজানোর জন্য সেবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চৌকস খেলোয়াড়দের সংগ্রহ করেছিল ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তার ফলে বাদল মোহামেডানের একজন হলেন। সেই শুরু, ধীরে ধীরে মোহামেডানের সুখ-দুঃখের একজন বিশ্বস্ত সারথি হলেন বাদল রায়। ’৭৭ থেকে খেলা শুরু করে ’৮৯-এ জার্সি খুলে রেখে অবসর নেওয়া বাদল রায় খেলে গেছেন মোহামেডান ক্লাবেই। ভালো অফার পায়ে ঠেলে ক্লাব-অন্তঃপ্রাণ স্বজন হয়েছেন। খেলা ছাড়ার পরও ফুটবলের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিলেন আমৃত্যু।

তিন বছর মোহামেডানের ম্যানেজার ছিলেন, ছিলেন ২০০১-এ জাতীয় দলের বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইং রাউন্ডে বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচও। ফুটবল ফেডারেশনের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। কিন্তু এই সব ছাপিয়ে মোহামেডানের ১০ নম্বর জার্সিধারী একজন শান্ত-সুদর্শন, সেই বাঁকানো শটে কর্নার আর থ্রু ঠেলে স্ট্রাইকারদের দিয়ে গোল করানো বাদল রায় হয়েই আমার হৃদয়পটে থেকে গেছেন, যাবেন।

সেই সাদাকালো ১০ নম্বর জার্সিতে আপনি লাখো ফুটবলপ্রেমী হৃদয়ের অন্তর্গহিনে থেকে যাবেন, প্রিয় বাদল রায়।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন