বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বেশ কয়েকটা কেসে আমার সঙ্গে কাজ করেছিল শাব্বির। আমার মনে আছে, একবার, সেই কেসে আমার সঙ্গে ছিল ফাইয়াদ নামের একজন আর এই শাব্বির, ইউরেনিয়াম বহনকারী একটা ট্রাক হাইওয়ে থেকে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনা ঘটিয়েছিল দুজন নন–হিউম্যান এক্সপার্ট সিস্টেম। পরিবহনের দায়িত্বে যে ছিল, সে–ও ছিল নন–হিউম্যান আর তার সিস্টেমের ওপর ওই ক্রিমিনাল দুজন একটা নিষিদ্ধ অ্যালগরিদম, ‘সিন্যাপটিক প্রুনিং’ প্রয়োগ করেছিল এবং এর ফলে তার সমস্ত স্মৃতি চিরতরে মুছে যায়। সেই সিন্যাপটিক প্রুনিংয়ের ক্লু উদ্ধার করেছিল শাব্বির এবং ওই ভদ্রলোকের সিস্টেমের রোলব্যাকও করেছিল সে।

আরেকবার, সেই কেসে শুধু শাব্বিরই ছিল আমার সঙ্গে, এক বাসার মেইনটেন্যান্স সিস্টেমের কগনিটিভ অংশে সমস্যার কারণে এক নারী একটা রুমে তালাবন্ধ অবস্থায় আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল। কেস সলভ করে দেখা যায় যে ওই নারীর স্বামী এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তারপর সবকিছু এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে মনে হয় তাদের বাসার মেইনটেন্যান্স সিস্টেম ইচ্ছা করেই এই কাজ করেছে।

রাস্তায় দেখা হওয়ার পর আমি শাব্বিরকে সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে আসলাম।
শাব্বির বলছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী রিচার্ড পিয়ারসনকে গ্রেফতার করে তাকে মিসরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন সে মিশরে।

আমি অবাক হলাম, আশ্চর্য! আমি জানিই না। কারা গ্রেফতার করল, মিসরে নিয়ে গেল কেন?
শাব্বির হাসল, আপনি তো নিউজটিউজ ফলো করেন না তেমন। দুনিয়া কোনদিকে যাচ্ছে, সেটা ফলো করেন না।
আমি সম্মতিতে মাথা নাড়লাম।

সে বলতে থাকল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের একটা বাণিজ্য চুক্তি হয়েছিল ১৫০ বছর আগে, ২০২০ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে চীন ১০০ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য নেবে আর বিনিময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের সিলিকন চিপ দেবে।
আমি অবাক হলাম, সিলিকন চিপ!
শাব্বির বলল, হ্যাঁ, ব্রাদার, সেটা নিয়েই তো কাহিনি, সিলিকন চিপের তো এখন আর অস্তিত্ব নেই। মুরস ল বলেছিল যে কম্পিউটার চিপ যত বেশি দ্রুতগতির হবে ও যত বেশি শক্তি-সাশ্রয়ী হবে, এর উৎপাদন খরচ তত কম হবে। একসময় ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সর্ব্বোচ্চ উন্নতি ঘটেছে এই মুরস ল অনুযায়ী। কিন্তু সেই মুরস লর কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে তা–ও ষাট-সত্তর বছর আগে। মানে সিলিকন চিপের ক্ষমতাও তখন শেষ হয়ে গেছে, অতিরিক্ত ট্রানজিস্টরগুলোকে সিলিকন চিপ আর অ্যাকোমোডেট করতে পারত না। এখন তো সবকিছু চলছে গ্রাফিন দিয়ে, গ্রাফিনের ষড়ভুজাকৃতির ল্যাটিস স্ট্রাকচার বিদ্যুৎ ও তাপ পরিবহন করার জন্য খুবই শক্তিশালী জিনিস। আর এর পুরো বাণিজ্যিক উৎপাদন চীনের হাতে।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তো চীন বলছে কী এখন, এই বাণিজ্য তারা আর করবে না, গ্রাফিন দেবে না?
শাব্বির কাত হয়ে ছিল। এবার সোজা হয়ে বসল। বলল, দেবে না তা নয়, তারা তো বাণিজ্যিকভাবে গ্রাফিন উৎপাদন করছেই। কৃষিপণ্য এখন আগের মতো অতটা ক্রিটিক্যাল রিসোর্স নয়, কৃষিপণ্যের মনোপলিও এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই, কিন্তু গ্রাফিনের মনোপলি তো চীনের হাতে। তারা ১০০ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্যের বিনিময়ে ১০০ বিলিয়ন ডলারের সিলিকন চিপের হিসাব অনুযায়ী ১০০ বিলিয়ন ডলারের গ্রাফিন দেবে না, তারা সম্ভবত আরও বেশি কিছু চায়। আর এই চুক্তি নতুন করে করার জন্যই চীনের প্রতিনিধিদল গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে।

শাব্বির বলল, চীনে যারা গিয়েছিল, এগারোজনের একটা দল, সবাই নন–হিউম্যান, সবাই এক্সপার্ট সিস্টেম। আর আমেরিকার বাণিজ্যের ব্যুরোক্রেসিতে সিঙ্গেল একজনও আর্টিফিশিয়াল কগনিটিভ সিস্টেমের নেই। হানড্রেড পারসেন্ট হিউম্যান ডিপেনডেন্ট। এখন তারা আগের চুক্তিতেই থাকতে চায়, কিন্তু চীন মানবে না। দুই পক্ষের বৈঠক অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়েছে, আমেরিকা সুবিধা করতে পারেনি। মিটিং শেষে আমেরিকা করেছে কী, চীনের সেই এগারোজন এক্সপার্ট সিস্টেম নন-হিউম্যানকে ডিসফাংশন করে, ভেজিটেবল বানিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে।

জিজ্ঞাসা করলাম, তখন যুক্তরাষ্ট্র ঝামেলা করেছে?
শাব্বির বলল, চীনে যারা গিয়েছিল, এগারোজনের একটা দল, সবাই নন-হিউম্যান, সবাই এক্সপার্ট সিস্টেম। আর আমেরিকার বাণিজ্যের ব্যুরোক্রেসিতে সিঙ্গেল একজনও আর্টিফিশিয়াল কগনিটিভ সিস্টেমের নেই। হানড্রেড পারসেন্ট হিউম্যান ডিপেনডেন্ট।

এখন তারা আগের চুক্তিতে থাকতে চায়, কিন্তু চীন মানবে না। দুই পক্ষের বৈঠক অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়েছে, আমেরিকা সুবিধা করতে পারেনি। মিটিং শেষে আমেরিকা করেছে কী, চীনের সেই এগারোজন এক্সপার্ট সিস্টেম নন–হিউম্যানকে ডিসফাংশন করে, ভেজিটেবল বানিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে।

আমি বিস্ময় চাপা দিতে পারলাম না, মাই গড!
শাব্বির বলল, হ্যাঁ, এটা নাকি হয়েছে বাণিজ্যমন্ত্রী রিচার্ড পিটারসনের নির্দেশে। আর চীন এতে মারাত্মক অফেনডেড হয়েছে। তারা বলেছে, তারা এখনই হুট করে কিছু করবে না, তারা এর জবাব রাজনৈতিকভাবে দেবে।

জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে রিচার্ড পিটারসনকে কে গ্রেপ্তার করল?
শাব্বির উত্তর দিল, ডব্লিউওইএস। ওয়ার্ল্ড অরগানাইজেশন ফর এক্সপার্ট সিস্টেম।

যেহেতু অন্যায়ভাবে এগারোজন এক্সপার্ট সিস্টেমকে আক্রমণ করা হয়েছে, স্পষ্টত এটা ক্রাইম। এখন চীন সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে না এলেও ডব্লিউওইএসকেই ব্যাপারটা ডিল করতে হবে। তারা আমেরিকাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, রিচার্ড পিটারসনকে তাদের কাছে হস্তান্তর না করলে আমেরিকা থেকে সব নন-হিউম্যান সিস্টেমকে তারা প্রত্যাহার করে নেবে।

আমি বললাম, হ্যাঁ, বুঝতে পারছি, আর উপায় না দেখে আমেরিকা পিটারসনকে হস্তান্তর করেছে ডব্লিউওইএসের কাছে।

শাব্বির যেহেতু নিজেও একজন নন-হিউম্যান, এক্সপার্ট সিস্টেম, আমার ইচ্ছা হচ্ছিল আমি শাব্বিরকে একটু খোঁচাই। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিলাম না, সে ব্যাপারটাকে কীভাবে নেবে। ডব্লিউওইএস খুবই সক্রিয় সংগঠন, নন-হিউম্যান এক্সপার্ট সিস্টেমদের জন্য কাজ করে। যে ক্যাটাগরিরই হোক, প্রতিটা নন-হিউম্যান এক্সপার্টের অধিকারের ব্যাপারে তারা একবিন্দু ছাড় দেয় না কখনো। সংগঠনটাতে কোনো মানুষ নেই, সবাই নন-হিউম্যান। কোনো মানুষ এই সংগঠনের কার্যক্রম জানে না, বুঝতেও পারে না। সংগঠনের ভেতর কী হচ্ছে, কখন কে সংগঠনের প্রধান থাকছে, নন-হিউম্যানদের জন্য কী করছে—এসব তথ্য কখনো আমরা মানুষেরা জানতে পারি না। অবশ্য এই সংগঠন তৈরি হওয়ার পর পৃথিবীতে অনেক শান্তি ফিরে এসেছে, মোটামুটি একটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা তৈরি হয়েছে। মাঝেমধ্যে শোনা যায়, ডব্লিউওইএস নাকি আরও উন্নত কয়েক ধরনের নন-হিউম্যান এক্সপার্ট সিস্টেম তৈরি করেছে, সেগুলো এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। শোনা যায়, পৃথিবীর প্রতিটা দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নাকি ডব্লিউওইএসের ঠিক করে দেওয়া। আরও অনেক কন্সপিরেসি থিওরি আছে ডব্লিউওইএসের নামে, যেমন, এ পর্যন্ত নাকি গোপনে অনেকগুলো গণহত্যা চালিয়েছে তারা।

আমি তাকে বললাম, তাহলে তো তোমার খুশি হওয়ার কথা!
সে কিছুটা অবাক হলো মনে হয়। আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, কেন?
সরাসরি কোনো উত্তর দিলাম না। শুধু ভ্রু কুঁচকে মাথা নাড়লাম তার দিকে তাকিয়ে, যেন বোঝাতে চাইলাম, এই পরিস্থিতিতে, একজন নন-হিউম্যান হিসেবে বুদ্ধিমত্তার সামর্থ্যের দিক থেকে তৃতীয় বা দ্বিতীয়ও হতে পারে, ক্যাটাগরির এক্সপার্ট সিস্টেম হিসেবে আনন্দিত হওয়া ছাড়া আর কী-ই বা হওয়ার কথা তোমার?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, হ্যাঁ, কিছুটা খুশি এ কারণে যে একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে। এটা স্বাভাবিক।

বললাম, আর ওয়ার্ল্ড অর্ডারের ওপর এক্সপার্ট সিস্টেমদের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা? শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটাই তো আসলে যেখানে যায়—যেকোনো মানুষের চেয়ে যেকোনো এক্সপার্ট সিস্টেমের সামাজিক গুরুত্ব বেশি, মানে ক্ষমতা বেশি।
তাকে হতাশ মনে হলো, আলাপের মধ্যে এই বিষয় এসে পড়াতে।

সে বলল, ব্যাপারটা সে রকম নয়। আপনার দিক থেকে ক্ষমতাহীন হয়ে ওঠা মানে আমার ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা নয়। মানুষ রাজনৈতিক, আমরা নই। সামাজিক গুরুত্ব বা ক্ষমতা মানুষের জন্য যেভাবে কাজ করে, আমাদের জন্য সেভাবে কাজ করার কথা নয়, করেও না। আমরা ক্ষমতা দ্বারা চালিত নই, সমাধান দ্বারা চালিত। কোথাও কোনো অ্যানোমালি দেখা দিল, সেটা সমাধান করাই আমাদের প্রধান কাজ। উই আর নট পলিটিক্যাল, উই আর কম্পিউটেশনাল।

আমি হাসলাম, বললাম, গুড ডিফেন্স।
তাকে আরও হতাশ মনে হলো, যদিও কিছুই বলল না সে।

রাতের জন্য ভাত বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন, শাব্বির জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। জানালার অন্য পাশে বড় একটা চালতাগাছ, জানালায় সেই চালতার পাতার ছায়া এসে পড়েছে। আমি ভাতের চাল ধোয়া শুরু করলাম।

জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে রিচার্ড পিটারসনকে নিয়ে কী করবে তোমরা?
সে উত্তর দিল, আমরা কেন! ডব্লিউওইএসের ব্যাপার, তারা করবে।
বললাম, হ্যাঁ, তারা-ই করবে, বিচার। বিচারে কী শাস্তি হতে পারে, সর্বোচ্চ?
সে উত্তর দিল, মৃত্যুদণ্ড।

আমার হাত থেকে চালসহ পাতিল সিংকের ওপর পড়ে গেল। মৃত্যুদণ্ড! এক্সপার্ট সিস্টেমদের বিশ্ব সংগঠন একজন মানুষের, তাও আবার একটা ক্ষমতাবান দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে! দিতে পারবে!
শাব্বির বলতে থাকল, ডব্লিউওইএস তাদের বিচার ব্যবস্থা নতুন করে সাজিয়েছে। মৃত্যুদণ্ডকে তারা শাস্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এখন এগারোজন এক্সপার্ট সিস্টেমকে ডিসফাংশন করা অনেক বড় অপরাধ অবশ্যই, তার শাস্তিও বড় হবে। আর যদি সর্বোচ্চ শাস্তি হয়, তার একটা ভালো দিক আছে, চীন এতে খুশি হবে, পরবর্তীকালে রাজনৈতিক কোনো পদক্ষেপ হয়তো নেবে না, আমেরিকার সাধারণ মানুষ ক্ষতি থেকে বেঁচে যাবে।

আমি বললাম, নাহ, মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে না। এক্সপার্ট সিস্টেমরা কোনো মানুষের মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে না, ফিলোসফিক্যালি এটা ভয়ানক ব্যাপার। এক্সপার্ট সিস্টেম মানুষের তৈরি করা একটা জিনিস, নাথিং মোর দ্যান দ্যাট। তাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। ডব্লিউওইএসের উচিত নয় মানুষের বিচার করা, কোনো মানুষের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা তো আরও দূরের কথা।

সে প্রশ্ন করল, এগারোজন এক্সপার্ট সিস্টেমকে ডিসফাংশন করলেও?
আমি জোর দিয়ে বললাম, হ্যাঁ, সেটা করলেও!
সে বলল, কোনো সিরিয়াস স্ট্রাগল চলাকালীন, অসময়ে দয়ালু ও মহানুভব হয়ে ওঠার মতো জঘন্য নৃশংসতা আর নেই।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কার কথা এটা?
শাব্বির উত্তর দিল, ট্রটস্কি। লিওন ট্রটস্কি।

আমার অদ্ভুত লাগল, সামান্য হাসিও পেল। হাসিটা লুকাতে চাইলাম আমি।
বললাম, অথচ একটু আগেই বললে, এক্সপার্ট সিস্টেমরা রাজনৈতিক নয়, স্ট্রাগল ইজ ভেরি মাচ আ পলিটিক্যাল থিং।

শাব্বিরের মধ্যে একটু সংশয়ের ছায়া দেখা গেল। সে বলল, আমাদের লড়াই হলো সমাধান খুঁজে বের করা। অ্যানোমালি যতটা সম্ভব মিনিমাইজ করা, কমিয়ে আনা। মানুষ অসংগতি উপেক্ষা করে থাকতে পারে, আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না।
মফস্বল ও গ্রামের মাঝামাঝি একটা জায়গা, হোসেনপুর। আর সেখানে কংক্রিটের একটা ছোট গলির ভেতর বাড়িটা, নাম বসন্তবীথি। অনেক পুরাতন ধাঁচের নাম অবশ্যই। গলি দিয়ে ঢুকলে বাম পাশে বাড়িটা, আর বাড়িটার উল্টা দিকে সামান্য ফাঁকা জায়গা পার হয়ে একটা ছোট নার্সারি, নার্সারির ভেতর ছোট একটা কাচের গ্রিনহাউস।

সামনের দিকে ছোট ছোট চারা গাছ রাখা, আর নার্সারির ভেতর ডান কোনার দিকে গোলাপের ঝাড়। আমি বাড়িটার দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম, খয়েরি রঙের গেট। কোথাও গেলে এবং বিশেষ করে এ রকম পরিস্থিতিতে, আমি সেখানকার গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করি। পাওয়া যায় কোথাও কফির গন্ধ, কোথাও দেয়ালের কাঁচা রঙের গন্ধ, কোথাও চার-পাঁচ রকমের মসলার মিশ্রণের গন্ধ বা কোথাও আর্দ্র মাটির গন্ধ। একবার আমি এক জায়গায় খুব অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ পেয়েছিলাম, মনে আছে। আমি এখনো সেই ঘ্রাণ মনে করতে পারি চাইলে, কিন্তু তখনো ধরতে পারিনি, সেটা কিসের গন্ধ ছিল, এখনো পারি না। অনেকটা কর্পূর-লেবুর পাতা-মৌরীর মিশ্রণের গন্ধের মতো, আবার ঠিক তা–ও না, অথচ এগুলোর কোনোটার মতোই হালকা ছিল না সেটা। তীব্র, খুব তীব্র আর ঠান্ডার দিনের স্টেইনলেস স্টিলের মতো ঠান্ডা সেই ঘ্রাণ। এখানেও তা–ই করলাম। কোনো ঘ্রাণ নেই। এমনকি পেছনের ওই গোলাপের ঝাড় থেকে আসা গোলাপেরও না, যদিও এত দূর পর্যন্ত আসার কথাও নয়।

আমি খয়েরি রঙের গেট পার হয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লাম। বাড়িটা মফস্বলের বাড়ির মতোই, গেট দিয়ে ঢুকেই ডান পাশে বারান্দা, সেই বারান্দায় দুইটা ছোট ছোট গোলাকার চেয়ার, আর সেই বারান্দায় গ্রিলের রং পুরাতন হতে হতে তার আদি রং কী ছিল, তা আর বোঝা যায় না। যদিও আমার মনে হলো, হলুদ বা কাঠালি রং ছিল হয়তো, আর সেই বারান্দা পার হয়েই, মানে বারান্দার পেছনেই সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরের দিকে। আমার পেছনে থাকা হামজার দিকে তাকালাম আমি আর হামজা চোখ দিয়ে নীরবে ইশারা করল সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে কিছুটা পিছিয়ে গেলাম, যাতে হামজা সামনে যেতে পারে। তাকে অনুসরণ করে একটা অন্ধকার ঘর পার হয়ে আরেকটা ঘরের দরজার সামনে এসে থামলাম, যেখানে দরজার বাইরে সম্ভবত চতুর্থ ক্যাটাগরির একটা এক্সপার্ট সিস্টেম দাঁড়িয়ে আছে আর পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে। এবার হামজা পিছিয়ে গিয়ে আমাকে আগে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ার ইশারা করল, আর সেটাই করলাম আমি।

ঘরের ভেতর, দরজার বিপরীত দিকে, মাঝারি আকারের একটা পড়ার টেবিল, টেবিলে নীলচে রঙের একটা অর্ধস্বচ্ছ প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে রাখা আছে দুটো বাচ্চার কাটা মাথা, প্লাস্টিকের ওপর দিয়েও বোঝা যাচ্ছে, গলার নিচে রক্ত জমে কালচে হয়ে আছে। আর পাশেই, টেবিলের পাশেই, বিছানার ওপর তাদের শরীর, একই রকমের অর্ধস্বচ্ছ নীলচে রঙের প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা।

হামজার দিকে তাকালাম আমি, সবার আগে সে-ই এসেছিল এখানে।
কিছু জিজ্ঞাসা না করতেই হামজা বলল, ছেলেটার বয়স আট আর মেয়েটার সাড়ে চার।
কিছু বীভৎস দৃশ্য আমি দেখেছি জীবনে এবং এটাও ছিল তার একটা। কিন্তু দুটি বাচ্চা, নিষ্পাপ বাচ্চা, তাই আমার নিরাবেগ, আমার এপ্যাথি, কসমিক অন্তঃসারশূন্যতা, আমার চিরন্তন বোধকে আর সামাল দিতে পারলাম না, দ্রুত ওই ঘর থেকে বের হয়ে এলাম।
হামজা বলল, আরেকজন আছে, ছাদে চিলেকোঠার ঘরে।

আবারও হামজাকে অনুসরণ করে সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম। চিলেকোঠার দরজার সামনে দাঁড়ালে দেখা যায়, দক্ষিণ কোনার দিকে একটা নারকেলগাছ ছাদ পার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার সামনে দরজা খোলা। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, সিলিংয়ের কোনো কিছু থেকে যেটা আবার দেখা যাচ্ছে না, ঝুলছে দুইটা পা, ভালো করে তাকালে ঝুলন্ত শরীরের অর্ধেকটা দেখা যায়। অস্বস্তিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম দরজার বাইরে, এরপর ঘুরে দাঁড়ালাম। আমার কোনোভাবেই আর তার ঝুলন্ত দেহের ওই মৃত মুখ দেখতে ইচ্ছা করল না।

হামজার দিকে ফিরে বললাম, আমি আর ঢুকব না ওই ঘরে।

সিঁড়ি দিয়ে যখন নেমে এসেছি, আমি আগে আর হামজা আমার পেছনে, গেট দিয়ে বের হয়ে আসছি, তখন হামজা বলল, ওই ছেলেটাই, ছাদের ঘরের ওই ছেলেটাই।
জিজ্ঞাসা করলাম, সবার বড়? বয়স কত?
সে উত্তর দিল, হ্যাঁ। ১৩।

পরে আমরা ফিরছিলাম গাড়িতে, সন্ধ্যার আগে আগে। আমি বসেছিলাম বাম পাশের জানালার ধারে, আর জানালার অন্য পাশে বেশ বড় জলাভূমি বা বিল। ঘটনার সব বিবরণ আর তথ্য সাজিয়ে নিচ্ছিলাম মাথার ভেতর। একটা পরিবার, তিনজন ছেলেমেয়ে সেখানে, বাবা বিদেশে থাকে, মা থাকে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওই বাড়িতে, বড় ছেলেটা, যার বয়স ১৩ বছর, সে দুপুরের পর গতকাল কোনো একসময়, যখন বাড়ি ফাঁকা ছিল, মেরে ফেলল তার ওই আট বছর আর সাড় চার বছর বয়সী ভাইবোনকে।

আমি বললাম, নাহ, মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে না। এক্সপার্ট সিস্টেমরা কোনো মানুষের মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে না, ফিলোসফিক্যালি এটা ভয়ানক ব্যাপার। এক্সপার্ট সিস্টেম মানুষের ডেভেলপ করা একটা জিনিস, নাথিং মোর দ্যান দ্যাট। তাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। ডব্লিউওইএসের উচিত নয় মানুষের বিচার করা, কোনো মানুষের ডেথ সেনটেন্স তো আরও দূরের কথা।

একটা বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে দুজনের ঘাড় আর মাথা আলাদা করে ফেলে শরীর থেকে, আর তারপর, তারপর নিজেই একা একা চলে যায় ছাদে ওই চিলেকোঠার ঘরে এবং তারপর কোনো এক কী চিন্তা থেকে বা অনন্তের আহ্বানে নিজেই ফাঁসিতে ঝুলে পড়ে।

ঘটনা আপাতভাবে এই-ই, যদি না কেউ, শেষ পর্যন্ত দেখা যায় যে তাদের হত্যা করেছে। তাদের মা হাসপাতালে, তাকে সিডাটিভ দিয়ে অচেতন করে রাখা হয়েছে। আর একটা এক্সপার্ট সিস্টেম ছিল বাড়িতে, বাচ্চাদের সঙ্গে মেশার জন্য, তাদের সঙ্গ দেওয়ার জন্য। পঞ্চম ক্যাটাগরির। তাকে আলাদা করা হয়েছে, আপাতত তাকে লোকাল কাস্টডিতে রাখা হয়েছে।

একজন মানুষ, যার আবার বয়স মাত্র ১৩ বছর, সে নিজের অথবা অন্য কারও নিয়ন্ত্রণে আরও দুজনকে, যারা তার নিজের জীবনেরই অংশ, কেন মেরে ফেলল, তাও আবার নিজেকে মেরে ফেলার আগে। জীবন ও এই মহাবিশ্বের নিরবচ্ছিন্ন চলতে থাকা পারমিউটেশন কম্বিনেশন ঠিক কীভাবে তাকে ওই ঘটনায়, ওই মুহূর্তে নিয়ে এল!
আমি দেখলাম, সন্ধ্যা হয়ে আসছে, পৌষের মাঝামাঝি, বিলের ওপর পাতলা ফিনফিনে সাদা কুয়াশা। আর এই সন্ধ্যার ঠিক আগে আগেও বিলের অল্প পানিতে কিছু বক, সাদা বক, ভাবলেশহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ কেউ এক পা, দুই পা হেঁটে বেড়াচ্ছে।
আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার পাশ থেকে হামজা বলল, আমাকে জানানোর উদ্দেশ্যে, এই বিলের নাম বালাহার।

আমরা রংপুর শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত হয়ে গেল। আমি অফিসে দেরি করলাম না।

অফিস থেকে ফিরছিলাম, বাসার কাছাকাছি এসে শাব্বিরের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। যখন বড় রাস্তা থেকে ডান পাশে সেনপাড়ার গলিতে ঢুকব, গলির মুখটার একটু আগেই, ফুটপাতের ওপর একটা বন্ধ দোকানের নামানো কালো রঙের শাটারের গায়ে হেলান দিয়ে সে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু একটা চিন্তা করছিল মনে হয়, হাত দুটো জ্যাকেটের পকেটে ঢোকানো। আমি তাকে দেখে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
রাস্তায় দেখা হওয়ার পর আমি শাব্বিরকে সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে এলাম।
আমি তাকে বললাম, অথচ একটু আগেই বললে, এক্সপার্ট সিস্টেমরা রাজনৈতিক নয়, স্ট্রাগল ইজ ভেরি মাচ আ পলিটিক্যাল থিং।

শাব্বিরের মধ্যে একটু সংশয়ের ছায়া দেখা গেল। সে বলল, আমাদের লড়াই হলো সমাধান খুঁজে বের করা। অ্যানোমালি যতটা সম্ভব মিনিমাইজ করা, কমিয়ে আনা। মানুষ অসংগতি উপেক্ষা করে থাকতে পারে, আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না।

সামান্য উত্তেজিত হয়ে উঠলাম আমি। আর এ কারণেই আর্টিফিশিয়াল কগনিটিভের নন–হিউম্যান এক্সপার্ট সিস্টেমরা মানুষের চেয়ে সুপিরিয়র? তারা পারফেক্ট?
শাব্বির বলল, এখানে পারফেকশনের কোনো ব্যাপার নেই, কেউ পারফেকশন দাবিও করছে না। পারফেকশন খুবই অপ্রাসঙ্গিক ব্যাপার মানুষ আর এক্সপার্ট সিস্টেমদের তুলনায়।

আমি পাল্টা বললাম, তাহলে সুপিরিয়রিটির ব্যাপারটা প্রাসঙ্গিক। বলতে চাইছ যে এক্সপার্ট সিস্টেমরা মানুষের চেয়ে সুপিরিয়র!
মনে হলো শাব্বির এই তর্ক, আমার উত্তেজিত হয়ে ওঠা, পাল্টা জবাব দেওয়া উপভোগ করছে। মনে হলো, সে যেখানে যেতে চাইছে, এই তর্ক সেখানেই যাচ্ছে।

সে ধীরে ধীরে বলল, একটা শব্দের পর থেমে থেমে আরেকটা শব্দ উচ্চারণ করে করে—সুপিরিয়রিটি এবং ইনফিরিয়রিটি আপনাদের জিনিস, আমাদের নয়। তবে হ্যাঁ, অবশ্যই, সব দিক দিয়েই এক্সপার্ট সিস্টেমস ওয়ার্ক বেটার দ্যান হিউম্যান বিইং।
আমি উত্তেজনা এবং বিস্ময়ে আমার দুই হাত শূন্যের ওপর ছেড়ে দিলাম, কীভাবে!
সে উত্তর দিল, মানুষ যেভাবে অন্য প্রাণীর চেয়ে বেটার। পৃথিবীতে আরও অনেক অনেক প্রজাতির প্রাণী থাকা সত্ত্বেও মানুষ যেভাবে এই পৃথিবী, এই গ্রহ শাসন করে আসছে এত দিন ধরে, সেভাবেই।

উত্তেজনার কারণে যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমি। শাব্বির বলতেই থাকল। সহযোগিতা, সিনক্রোনাইজেশন। হোমো স্যাপিয়েন্স এই গ্রহকে শাসন করতে পারছে কারণ, বৃহৎ পরিসরে তারা সংখ্যায় অনেক। মানুষ খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে আরও অনেক মানুষকে সাহায্য করতে পারে এবং এই সহযোগিতা থেকেই প্রতিটা সিস্টেম তৈরি হয়।

প্রাণিজগতের আরও অনেক প্রাণীই নিজ প্রজাতির অন্য সদস্যদের সাহায্য করতে পারে। কিন্তু মানুষের মতো একই সঙ্গে এ রকম বৃহৎ পরিসরে, বিরাট সংখ্যায় আর এত গোছানোভাবে সেটা পারে না। ধরেন, পিঁপড়া। তারা একে অন্যকে সাহায্য করে, একটা সিস্টেম তৈরি করে, কিন্তু সেটা ফ্লেক্সিবল নয়, খুব রিজিড। কোনো বাধা তৈরি করবেন সেই সিস্টেমে, দেখবেন সেই সিস্টেম ভেঙে পড়েছে, পিঁপড়ারা আর একে অপরকে সাহায্য করতে পারছে না। আবার বড় প্রাণীদের ক্ষেত্রে, কোনো সিস্টেম তৈরি করতে পারে না। একটা বাঘের সঙ্গে একা একটা মানুষ কখনোই পারে না। এমনকি দশটা বাঘের সঙ্গেও হয়তো দশজন মানুষ লড়াই করে জিততে পারবে না। কিন্তু এক হাজার বাঘের বিরুদ্ধে এক হাজার মানুষ জিতে যাবে। কারণ, তারা সবাই মিলে এমন একটা কৌশল বাস্তবায়ন করে ফেলবে জেতার জন্য। এটাই, বৃহৎ পরিসরে এই সহযোগিতা, সিনক্রোনাইজেশন ও কাস্টোমাইজেশনের ক্ষমতার কারণেই মানুষ পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করছে।

আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ, আর এই ক্ষমতার কারণেই, মানুষের এই সম্মিলিত সহযোগিতা ও সিনক্রোনাইজেশন দিয়েই তারা এক্সপার্ট সিস্টেমদের তৈরি করেছে।

শাব্বির মুচকি হাসল আমার কথায়। বলল, ঠিক তা–ই! কিন্তু মানুষের তৈরি এসব এক্সপার্ট সিস্টেমের বৃহৎ পরিসরে সহযোগিতা করার ক্ষমতা তাদের তুলনায় অনেক বেশি। এক্সপার্ট সিস্টেমদের একে অপরের সঙ্গে সিনক্রোনাইজ করার ক্ষমতা মানুষের তুলনায় অনেক অনেক বেশি।

আমি দেখলাম, ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি নেমেছে। কিন্তু কোনো আওয়াজ নেই, ঘরের ভেতর থেকে বোঝা যাওয়ার কথা নয়। শুধু যেটুকু আলো জানালা পার হয়ে বাইরে গিয়ে পড়েছে, ওই চালতাগাছটার গায়ে, সেই আলোতে দেখা যাচ্ছে, ঘুণ ঘুণ বৃষ্টি আর আলো পড়েছে গাছটার যেটুকুতে, সেই অংশ আস্তে আস্তে ভিজে উঠছে।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর, আমার উত্তেজনা থামানোর জন্য বা আমাদের তর্ক সহজ করার জন্যই হয়তো, শাব্বির বলল, কিন্তু এগুলো সাধারণ কথাবার্তা। তার মানে এই নয় যে এক্সপার্ট সিস্টেম মানুষের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী ও ডায়নামিক হয়ে উঠবে এবং মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে। একটা কথা কী, সভ্যতা কখনোই প্রেডিকটেবল পদ্ধতিতে কাজ করে না, কখনোই না।
এরপর সে বলল, লেটস টক সামথিং পারসোনাল।

আমি অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিলাম, হুম। আপনি ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো কেন ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেটা আমার কাছে কখনোই স্পষ্ট নয়। নতুন কোনো কাজে জড়ানোর পরিকল্পনা আছে আপনার, নিজের কোনো কিছু বা কারও সঙ্গে কোলাবোরেশনে?
সে ঘাড় ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে দেখল, আর সে সময়ই উত্তর দিল, আমি নিশ্চিত নই।

আমি তাকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম, তুমি কি আসলেই ডব্লিউওইএসের লোকাল এজেন্ট? আন্ডারকভার?
আমার মনে হয়, প্রশ্নটা ভালোভাবে বোঝার জন্য শাব্বির তিন-চার সেকেন্ড সময় নিল।

এরপর অনেক শব্দ করে হেসে উঠল। সে তার হাসি থামানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারছিল না। সেই অবস্থায়ই বলল, আমার মনে হয়, একটা কারণেই মানুষ জিতে যাবে, তার আনপ্রেডিকটেবিলিটির জন্য, আনপ্রেডিকটেবলভাবে অদ্ভুত ও নন–কনভেনশনাল চিন্তা করার জন্য।

ধীরে ধীরে সামলে নিয়ে শাব্বির এবার আমাকে প্রশ্ন করল, কিন্তু আপনাকে যে অবস্থায় দেখেছিলাম, যখন আমি কাজ করতাম আপনার সঙ্গে, আপনি এখনো কেন সেই অবস্থায়ই আছেন, যদিও অন্যমনস্কতা সামান্য বেড়েছে। কিন্তু এখনো কেন একা আছেন, জড়াননি কারও সঙ্গে, বিয়ে করেননি কেন?
আমি উত্তর দিলাম, খুবই ব্যক্তিগত প্রশ্ন।

সে পাল্টা উত্তর দিল, হ্যাঁ ব্যক্তিগত। কিন্তু আমি উত্তর জানতে চাচ্ছি।
হাসলাম আমি। বললাম, আমার কারও প্রতি সে রকম আগ্রহ তৈরি হয় না।

শাব্বির হাসল। চোখ ছোট ছোট করে ফেলল। আমি কিন্তু দেখেছি, অন্য জিনিস, সেই যে আমরা যখন ভ্রমনে গিয়েছিলাম, আপনি সাফিয়ার সঙ্গে আঠার মতো লেগে ছিলেন, ওর স্বামী সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও আর ওর স্বামীকে দেখছিলেন ঈর্ষার চোখে। সেই ভদ্রলোককে বারবার আউটস্মার্ট করার চেষ্টা করছিলেন। আমার মনে আছে, খাওয়ার সময় আপনি প্লেট হাতে উঠে গিয়ে ওদের পাশেই বসে পড়লেন।
আমি বললাম, ওটা রিফ্লেক্স, হয়তো বায়োলজিক্যাল, হয়তো কিছুটা সারকামস্ট্যানশিয়াল, বলে হাসলাম।

আমি কিছুটা দ্বিধার মধ্যে থেকে বললাম, আমি একজনের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলাম। কথা দিয়েছিলাম। ভালোবাসতাম। নাহ, আমি এখনো তাকেই ভালবাসি এবং শি ওয়াজ অল ইন মাই লাইফ। বেশ কয়েক বছর আগে। সে আমাকে ছেড়ে যায় এবং এখনো, শি ইজ অল ইন মাই লাইফ। আমার পরিকল্পনা ছিল, আমরা বিয়ে করব। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল মোটামুটি। কিন্তু, শি ড্রিফটেড অ্যাওয়ে, টু সি দ্য সান শাইনিং, অন সামওয়ান এলসেস ডে। গত ৯ বছরে আমি তাকে চোখে দেখিনি, তার কণ্ঠ শুনিনি। কিন্তু তার প্রতি আমার ডেসপারেশন, সেই ডেসপারেশনই আমাকে চালায়, আমার অস্তিত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। আমি ডেসপারেশন দ্বারা চালিত।

তাকে দুঃখিত মনে হলো বা সে সংবেদনশীল হওয়ার ভান করল হয়তো। আস্তে বলল, স্যাড!

আমি বললাম, স্যাড, হয়তো অতটা স্যাড নয়। জীবন এ রকমই শাব্বির, একটা সময় এক হাতে যা দেয়, পরে কোনো একসময় এসে আরেক হাতে তা কেড়ে নেয়।
শুনে শাব্বির মুচকি হাসল, আরেকটা কারণেও হয়তো মানুষ জিতে যাবে। জীবনের থেকে বিভিন্ন দার্শনিক বয়ান তুলে আনার জন্য।

সেই হাসির মধ্যে বিদ্রুপ ছিল কি না, সেটা বের করার জন্য আমি আর মনোযোগ দিলাম না।
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, রামায়ণ পড়া আছে তোমার?
সে সামান্য অবাক হলো বলে মনে হলো আমার। বলল, নাহ। তবে কাহিনিটা জানি, মূল কাহিনিটা।
তাকে বললাম, ত্রেতাযুগে রামচন্দ্র ১৪ বছরের জন্য বনবাসে গেল, তখন রাবণ এসে যখন সীতাকে হরণ করছে, একটা পাখি রাবণকে বাধা দিয়েছিল। পাখিটার নাম ছিল জটায়ু। রাবণ তখন ওই পাখির ডানা দুটি কেটে দেয়। পরে জটায়ু, সেই পাখি রামচন্দ্রকে কেঁদে কেঁদে বলেছিল, ‘প্রভু আমি আমার মাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম।

কিন্তু আমি তো পারলাম না। আমি এখন কী করব প্রভু? আমি তো মরে যাব।’ রামচন্দ্র বলেছিল, ‘জটায়ু আমি জানি তুই মরবি, মৃত্যুর আগে বল, তুই কী চাস।’ সেই পাখি তখন কেঁদে কেঁদে বলেছিল, ‘প্রভু যদি জানতে চাও আমি কী চাই, তাহলে আমি চাইব যে জন্ম–জন্মান্তর ধরে আমি যেন তোমার সঙ্গছাড়া না হই, আমাকে সঙ্গে রেখো।’ তখন রামচন্দ্র উত্তর দিয়েছিল, ‘জটায়ু, এ যুগে নয়, আগামী দ্বাপর যুগে আমি কৃষ্ণ হব আর তুই হবি ময়ূর পাখি। আমি তখন তোর ওই ময়ূরপুচ্ছ সব সময় মাথায় রাখব।’ পরে কৃষ্ণের মাথায় সব সময় ময়ূর-পুচ্ছ থাকত, তার সাজসজ্জার অংশ হিসেবে, তার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য। শাব্বির, মানুষ ও নন-হিউম্যান এক্সপার্ট সিস্টেমদের সম্পর্ক অনেকটা ওই শ্রীকৃষ্ণ ও ময়ূরের মতো, বা রামচন্দ্র ও জটায়ুর মতো। মানুষের সঙ্গে এক্সপার্ট সিস্টেমদের জেতা-হারার সম্পর্ক নয়, প্রতিযোগিতার সম্পর্ক নয়। মানুষের কগনিটিভ বা বুদ্ধিবৃত্তিক সৌন্দর্যের একটামাত্র দিক হচ্ছে এক্সপার্ট সিস্টেম, আর্টিফিশিয়াল কগনিটিভ সিস্টেম, শুধু একটামাত্র দিক, সৌন্দর্যের একটামাত্র প্রকাশ।

দেখলাম, সে আমার কথা শুনে কিছুটা বিমর্ষ হয়ে উঠল। আমার মনে হলো, সে কিছু একটা বলবে। আমি অপেক্ষা করলাম আর সে কিছু বলল না শেষ পর্যন্ত। তাকে নতুন কেসটার কথা বললাম, ১৩ বছর বয়সী ছেলেটার ভাইবোনকে মেরে ফেলা ও আত্মহত্যার কথা।

আমি বললাম, তোমার কোনো কাজ না থাকলে আমাকে সাহয্য করো বা পরামর্শ দাও।
সে রাজি হলো। জিজ্ঞাসা করল, সেই বাড়ির সদস্যদের মধ্যে শুধু এখন একমাত্র জীবিত আছে, ওই বাচ্চাদের মা?
উত্তরে বললাম, হ্যাঁ, আর একটা এক্সপার্ট সিস্টেম, পঞ্চম গ্রেডের।
সে বলল, আমি দুজনের সঙ্গেই কথা বলতে চাই।

আমি বললাম, সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে, আমি নিজেও তো কথা বলব। কিন্তু তুমি একটু সিরিয়াসলি ইনভলভড হও, তাহলে, মনে হয় তাড়াতাড়ি সুরাহা হয়ে যাবে। মনে হয় না তেমন জটিল কিছু, বয়োসন্ধিকালের মানসিক জটিলতা ছাড়া সম্ভবত আর কিছু পাওয়ার নেই এখানে।

সে জিজ্ঞাসা করল, মা তখন বাইরে ছিল, না?
আমি বললাম, হ্যাঁ। কেস কোনোভাবেই ওই দিকে যাবে না মনে হয়, ভদ্রমহিলাকে সিডাটিভ দিয়ে রাখা হয়েছে।

তার পরের দিন আমি আর ফিল্ড ওয়ার্কের সময় বের করতে পারলাম না। অফিসের ভেতরই ব্যস্ততায় দিন কেটে গেল আর শাব্বিরের সঙ্গে যোগাযোগ বা দেখা কিছুই হলো না। তবে শাব্বিরকে সঙ্গে নিয়ে খুন হওয়া ছেলেমেয়েদের মা ও সেই বাড়িতে থাকা পঞ্চম গ্রেডের এক্সপার্ট সিস্টেমের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে ফেললাম। তাই শাব্বিরের সঙ্গে আমার দেখা হলো পরের দিন আর দিনের শুরুতেই আমরা আশাহত হলাম, কারণ হাসপাতালে গিয়ে আমরা জানলাম, ভদ্রমহিলার জ্ঞান ফিরেছিল, তবে তিনি এতটাই মানসিক আঘাত পেয়েছেন যে ডাক্তার তাকে আবার ঘুম পাড়িয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছে এবং তার সঙ্গে কারও দেখা করার অনুমতি আপাতত নেই। আমি আশাহত হলাম, কারণ, তার সঙ্গে কথা বললে হয়তো তার বড় ছেলে, যে নিজের ভাইবোনকে মেরে ফেলে আত্মহত্যা করল, তার অপ্রকৃতস্থতার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানতে পারতাম, যা থেকে দিক নির্দেশনা পাওয়া যেত এবং এই ঘটনায় কোনো এক্সপার্ট সিস্টেম জড়িত নেই, সেটা স্পষ্ট হয়ে যেত আর এই বিদঘুটে কেসে আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে যেত আর এটা চলে যেত হিউম্যান ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিটে।

আমালেক নামের সেই পঞ্চম ক্যাটাগরির এক্সপার্ট সিস্টেমের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমরা গেলাম। তাকে রাখা হয়েছে ডাকবাংলোতে। দুই-এক দিনের মধ্যেই ডব্লিউওইএস থেকে এসে তাকে নিয়ে যাবে। যে ট্রমার মুখোমুখি হয়েছে সে, তা কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা নাকি করবে তারা। আমি তার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ পাচ্ছিলাম না তেমন একটা। কিশোরদের সমপর্যায়ের বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন একটা এক্সপার্ট সিস্টেম কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারবে বা তথ্য লুকাতে পারবে—এমন কোনো বিশ্বাস আমার ভেতর থেকেই আসছিল না। আমার সঙ্গে ছিল শাব্বির। সে–ই বেশির ভাগ প্রশ্ন করল, কথা বলল সেই পঞ্চম ক্যাটাগরির আমালেকের সঙ্গে, আর আমি চুপচাপ ছিলাম।

ডাকবাংলো থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলাম আর যখন ইঞ্জিন স্টার্ট দেব তখন শাব্বির, তখনই বলে উঠল, আমি সেদিনই ধারণা করেছিলাম, আর আজ নিশ্চিত হলাম।
আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, যখন জিজ্ঞাসা করা হলো ওই ঘরের ভেতর, এই এক্সপার্ট সিস্টেম আমালেক বলল, সে ছিল নিচতলায়, তাকে চেয়ার রং করার কাজ দেওয়া হয়েছিল, সে পুরোটা সময় ছিল নিচতলায়, সন্ধ্যার আগে আগে সে ওপরে ওঠে দোতলায় আর ভেতরের ঘরে আবিষ্কার করে সেই ভয়াবহ বীভৎস দৃশ্য, বিছানার ওপর রক্তাক্ত দুইটা শিশুর লাশ।
আমি বললাম, হ্যাঁ।

শাব্বির বলতে থাকল, কিন্তু আপনি ওর বর্ণনা খেয়াল করেছেন কিনা জানি না, ওর ভাষা, ওর শব্দের ব্যবহার, ও যখন ভিতরের রুমে ঢুকে ওই দৃশ্য দেখার বর্ণনা দিল, তখন ও বলেছে, “বিছানা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল”, ও কিন্তু বলেনি যে বিছানা রক্তে ভেসে গেছে, রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। এমন ভাষায় বর্ণনা দিচ্ছিল, যেন সে ওখানে ছিল ওই মুহূর্তে, সবকিছু তার চোখের সামনে ঘটেছে।

শাব্বিরের ব্যাখ্যা শুনে আমি কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলাম।
আমাকে হতভম্ব অবস্থায় রেখেই সে বলল, তার মানে সে এই ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিল। সে নিজ হাতে এই ঘটনা ঘটায়নি, কিন্তু সে-ই এই ঘটনার মাস্টারমাইন্ড।

আমি সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম। আজ শুধু নিশ্চিত হলাম, কারণ, আমি জানতাম ডব্লিউওইএস একটা পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করেছে, গোপন, খুবই গোপন। পঞ্চম ও ষষ্ঠ ক্যাটাগরির এক্সপার্ট সিস্টেমদের ওপর তারা একটা অ্যালগরিদম প্রয়োগ করেছে, যাতে তারা মানুষকে, বিশেষ করে মানুষের সন্তানকে হিপনোটাইজ করতে পারে। এই ক্যাটাগরির সিস্টেমরা সাধারণত পরিবারের শিশু ও কিশোরদের সংস্পর্শে বেশি থাকে।

যদি এখন থেকেই তাদের মাধ্যমে মানবসন্তানদের নিজেদের মতো করে গড়ে নেওয়া যায়, মাথার ভেতর এমন কিছু ঢুকিয়ে দেওয়া যায় যা পরবর্তীকালে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করবে, ডব্লিউওইএসের কাজে লাগবে—এমনটাই ডব্লিউওইএসের উদ্দেশ্য। এখন পরীক্ষামূলকভাবে এই অ্যালগরিদম কিছুদিনের জন্য কোনো কোনো পঞ্চম ও ষষ্ঠ ক্যাটাগরির সিস্টেমদের ভেতর প্রয়োগ করা হচ্ছে। পরীক্ষা সফল হলে হয়তো তখন এই অ্যালগরিদম চূড়ান্তভাবে কাজে লাগানো হবে। আমার বিশ্বাস, এই আমালেকের ক্ষেত্রে তা–ই করা হয়েছিল, টেস্ট হিসেবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও কোনো গণ্ডগোল হয়েছে। সে ওই ছেলেটাকে সম্ভবত হিপনোটাইজ করে ফেলেছিল, ওর চিন্তার দখল নিয়ে নেয় এবং ওকে দিয়ে এই ভয়ানক ও বীভৎস ঘটনা ঘটায় এবং সম্ভবত নিজে সাহায্যও করে।

আমি টের পেলাম, আমার গা, হাত–পা ঠান্ডা হয়ে আসছে, হিমশীতল হয়ে আসছে, আমার গা, হাত–পা অবশ হয়ে আসছে।

শাব্বির আবার বলল, আমি ডব্লিউওইএসেরর এই প্রজেক্টের কথা শুনেছিলাম।

আমার হতভম্ব ও সন্ত্রস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে সে বলল, স্টার্ট দিন। আপনি প্রমাণ করতে পারবেন না কারণ আপনার কাছে কোনো প্রমাণ নেই এবং থাকবেও না। আপনি এই অভিযোগই তুলতে পারবেন না আর আপনার হাত থেকে এই কেস চলে যাবে। কারণ, এই ঘটনায় কোনো এক্সপার্ট সিস্টেম জড়িত নেই।

আমি অনেক কষ্টে একটা বাক্য বলতে পারলাম। প্রশ্ন করলাম, এই ব্যাখ্যা, এই ঘটনা তুমি কেন বললে আমাকে?
এক মুহূর্ত পরে সে উত্তর দিল, তা আমি জানি না।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন