বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভাবার কোনো কারণ নেই, আমরা ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাওলানা ভাসানীর প্রতি অনুরক্ত সাঈদ হোসেন দুলালের কোনো আধ্যাত্মিক কেরামতির কথা বলছি। সামান্য মানুষ ছিলেন তিনি, বৃক্ষ বা দহের সঙ্গে তুলনীয়। পেশায় সরকারি খাদ্যগুদামের কনিষ্ঠ কর্মচারী ছিলেন, এলোমেলো চুল-দাড়ি-গোঁফ, স্বেচ্ছাচারী পোশাক-পরিচ্ছদ মিলে এই কালের সমাজের চোখে তেমন আহামরি রূপে ধরা দেবেন, সে আশা করার উপায় নেই। তবে সুতীব্র চোখ দুটো আর ভারী কণ্ঠস্বর হঠাৎ গভীর আত্মপ্রত্যয়ের জানান দিত। সেই প্রত্যয়ের কারণটি নিয়ে ভাবার আছে।

ভাবার কোনো কারণ নেই, আমরা ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাওলানা ভাসানীর প্রতি অনুরক্ত সাঈদ হোসেন দুলালের কোনো আধ্যাত্মিক কেরামতির কথা বলছি। সামান্য মানুষ ছিলেন তিনি, বৃক্ষ বা দহের সঙ্গে তুলনীয়। পেশায় সরকারি খাদ্যগুদামের কনিষ্ঠ কর্মচারী ছিলেন, এলোমেলো চুল-দাড়ি-গোঁফ, স্বেচ্ছাচারী পোশাক-পরিচ্ছদ মিলে এই কালের সমাজের চোখে তেমন আহামরি রূপে ধরা দেবেন, সে আশা করার উপায় নেই। তবে সুতীব্র চোখ দুটো আর ভারী কণ্ঠস্বর হঠাৎ গভীর আত্মপ্রত্যয়ের জানান দিত। সেই প্রত্যয়ের কারণটি নিয়ে ভাবার আছে।

কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল ঢাকা থিয়েটারের অঙ্গ সংগঠন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের কেন্দ্রীয় একজন নেতা ছিলেন। এটা অবশ্য রীতিমতো একটা ভাবনার বিষয়। কেননা পুঠিয়া থেকে কেন্দ্র তো বহুদূর। কেন্দ্রের বিশটি পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য এই পদ কীভাবে তাঁর জন্য নির্ধারিত হলো, তা তিনি এবং নীতিনির্ধারকেরাই ভালো বলতে পারবেন। এটিকে প্রাপ্তি বিবেচনা করলে এর পেছনে যে তাঁর দীর্ঘকালের মগ্ন ও একনিষ্ঠ শ্রম জড়িত, সে বিষয়ে দুর্মুখও একমত হবেন। তবে এই পদপ্রাপ্তি বা সংশ্লিষ্টতাই যে তাঁর আত্মপ্রত্যয়ের মূল কারণ সেটি বললে নির্ঘাত ভুল বলা হবে। ভুল এ কারণে যে সেলফোন-ইন্টারনেটের যুগে একালে এসে কেন্দ্রকে বেশ নিকটবর্তী মনে হলেও কিছুকাল আগেও কেন্দ্র থেকে পুঠিয়ার দূরত্ব ছিল অর্ধদিবসের। তবু সময় তাঁকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। ছোট্ট ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে তিনি হেঁটেছেন কেন্দ্রনগরের পথে। পুঠিয়া খুব বেশি বদলায় না, খুব বেশি বদলায় না তাঁর প্রতিষ্ঠিত পুঠিয়া থিয়েটার, এমনকি তাঁর আয়োজিত বার্ষিক লোকনাট্য উৎসব। কিন্তু কেন্দ্রনগর মেট্রোপলিটন থেকে কসমোপলিটন হয়ে যায়, সঙ্গে সেখানকার মানুষেরাও বদলান। এটাই স্বাভাবিক। তবে গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন ও বাঙালির নিজস্ব নাট্যরীতি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অব্যহত থাকে।

কাজী সাঈদ হোসেন দুলালও সেই স্বপ্নে বিভোর থাকেন। এই বিভোরতার ভেতরে কোনো ফাঁকি নেই, অথচ তিনি প্রান্তপল্লি পুঠিয়ানিবাসী, মেট্রোপলিটন বা কসমোপলিটন নাগরিক হওয়ার মতো অবকাশ আর তাঁর জীবনে নেই। কাজী সাঈদ হোসেন দুলালকে প্রথমত এই বৈপরীত্যের মাঝে খুঁজে পেলেই তাঁর আত্মপ্রত্যয়ের স্বরূপ উন্মোচন করা যাবে আশা করি।

বস্তুত বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং উদ্যোগ আজও প্রশংসার দাবি রাখে। নাটকের ক্ষেত্রে এ তাত্ত্বিক কাঠামোয় যেমন সমকালের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের স্বাভাবিক যোগসূত্র পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ ছিল, তেমনি ফিউশনের ক্ষেত্রেও ছিল অপার স্বাধীনতা। এমনকি প্রশিক্ষণ, বিষয় চয়ন, মেলা, মঞ্চায়ন, আলোক, বাদ্য ইত্যাদির ব্যপারেও ছিল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। আরও ছিল গণসচেতনতা, লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পাঠাগার স্থাপন এমন তাৎপর্যপূর্ণ সব উদ্যোগ। কিন্তু সে প্রায় আড়াই যুগ আগের ঘটনা। আজ আড়াই যুগ পর গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন যে সফল হয়েছে, সে কথা বলার সুযোগ নেই। বরং তা একটি প্রজন্মের স্বপ্ন ও বেদনাহত স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সম্পূর্ণ সফল না হওয়ার নিশ্চয় অনেক কারণ রয়েছে। কারণগুলোর সঙ্গে যেমন সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিষয় জড়িত, তেমনি জড়িত সমকালীন মানুষের দেখার চোখ, আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক হালহকিকত ইত্যাদি। সেসব আসলে দীর্ঘ গবেষণার দাবি রাখে।

default-image

বলার কথা এই যে এত দিন ধরে বাঙালির নাট্য ইতিহাসের যে পর্বটি নির্মিত হলো, সেখানে গ্রাম থিয়েটার একটি আলোচিত পর্ব, তার সঙ্গে কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল জড়িয়ে আছেন, দহের চিহ্নের মতো জ্বলজ্বল করছেন এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলা নাট্যের নাগরিক ইতিহাসে এই তাঁর সম্পৃক্ততা। এটিকে কত বড় বা ছোট করে দেখা যায়, সে যাঁদের দেখা খুব প্রয়োজন তাঁরা দেখবেন। আমরা দেখতে চাই এভাবে যে গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন একজন আত্মনিবেদিত ব্যক্তির কাছে যে প্রেরণা, কর্মতৎপরতা ও একনিষ্ঠতা দাবি করেছিল, কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল তার অপ্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টান্ত ছিলেন। অদ্যাবধি গ্রাম থিয়েটারের অস্তিত্ব সেই দায়িত্ববোধের জানান দেয়।

কাজী সাঈদ হোসেন দুলালের জীবনে আরেকটি বড় সৌভাগ্যের অংশ পুঠিয়া। রাজশাহীর পুঠিয়া-দুর্গাপুর অঞ্চলকে দেখা যেতে পারে আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির উর্বরতম ভূমিরূপে। নদী মুখ্য বাংলার আবহমান বিকাশের প্রেক্ষিতে একটি জনপদের যে ধরনের চারিত্র্যধর্ম কাঙ্ক্ষিত তার সবটুকুই যেন পুঠিয়ায় বিরাজমান। এখানে ঘটেছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সহাবস্থান, অব্যাহত আছে বাঙালির মৌলিক সংস্কৃতিধারা। আবার পুরাকীর্তিতে সমৃদ্ধ ক্ষুদ্র শহরে চর্চিত হচ্ছে আধুনিক থিয়েটার। কাজী সাঈদ হোসেন দুলালের জন্ম ও বিকাশ মূলত সেখানেই। ফলে এতদঞ্চলের উদারনৈতিক জীবনধারা তাঁর মানসের নির্মাণ ঘটায় এবং তিনিও সেই মানস সংক্রান্ত দায়িত্ববোধের ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য করেছেন বলে জানা যায় না। তিনি পুঠিয়ার সমসাময়িক জীবনধারার সঙ্গে আদ্যন্ত জড়িত ছিলেন।

একসময় সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফের প্রভাবে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পুঠিয়ায় বিদ্যমান ঐতিহ্যবাহী নাট্যসমূহ অবলোকন করতে থাকেন, তাঁর লিখিত ভাষ্য খুব বিরল হলেও মৌখিক ভাষ্যে এ বিষয়ে তাঁর ঈর্ষণীয় ব্যুৎপত্তির কথা সংশ্লিষ্ট সবাই অবগত। সেই সূত্রে তাঁর একটি জাতীয় পরিচিতিও গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া এ দেশের বহু প্রখ্যাত নাট্যগবেষকের গবেষণাকর্ম কুসুমাস্তীর্ণ করার পেছনে তাঁর বেহিসাবি অবদান রয়েছে। এ অবদান রীতিমতো তাঁর কৃত্যে পরিণত হয়েছিল। শিক্ষানবিশ থেকে প্রবীণতম নাট্যগবেষক অবধি তাঁর উষ্ণ সাহচর্যের বিষয়ে অবগত। কেন এই কৃত্য? বাংলা নাটকের জন্য? অবশ্যই। স্বাধীনতা–উত্তরকালে বাংলা নাটকের অনেক কৃতীই পুঠিয়ার পথে হেঁটেছেন।

কিন্তু কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল কি কৃতী? তারও আগের কথা, তিনি কি কৃতী হতে চেয়েছেন? এবার তাঁর আত্মপ্রত্যয়ের কারণ আন্দাজ করে ইতি টানি। কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল তো কৃতী হওয়ার দলে নন, তিনিই তো বাংলা নাট্য-শিল্পাঙ্গনে নিম্নবর্গের শেষতম নেতা। জয়-পরাজয়ে নয়, লড়াইয়েই তাঁর আনন্দ। হ্যাঁ, কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল হওয়া যায় না। কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল বানানোও যায় না। কোনো চেষ্টাতেই না। কিন্তু আত্মগ্লানির বোঝা আমরাই–বা আর কত ভারী করব? নিদারুণ অনিচ্ছায় সেই আত্মগ্লানি উসকে দিতে দুলাল আর কারও সামনে এসে দাঁড়াবেন না কোনো দিন। সেই আত্মগ্লানির বোঝা হালকা করা ছাড়া আর কি দিতে পারি আমরা সদ্য মৃত দুলালকে? যা তাঁকে তৃপ্ত করবে? তেমন কিছু নেই আসলে।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন