যদিও তলস্তয় অনেক বিখ্যাত লেখকদের প্রতিভা এবং তাঁদের সৃষ্টি নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তবু অনেক লেখকের গুণে মুগ্ধ ছিলেন তিনি। পুশকিনের কবিতা এবং নাটকের সমালোচনা করলেও পুশকিনের প্রেম ও রোমাঞ্চের প্রভাবকে অস্বীকার করেননি তিনি। তেমনি চেখভের নাটককে তাচ্ছিল্য করলেও, তাঁর রচিত ছোটগল্পের প্রশংসা করতেও ভোলেননি তিনি।

১৮৯১ সালে পাল মাল ‘বাজেট’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত জন লেবকের ১০০ শ্রেষ্ঠ বইয়ের একটি তালিকা দেখে লিও তলস্তয় তাঁর বিভিন্ন বয়সে পড়া বইয়ের একটি তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেন। মাত্র ৪৫টি বইয়ের তালিকা করার পর তলস্তয় বুঝলেন, এ কাজ করা অসম্ভব। তবু সেই তালিকায় উঠে এসেছিল তাঁর প্রিয় কিছু বই এবং লেখকের একটি প্রাথমিক তালিকাও। এ ছাড়া তলস্তয় তাঁর বন্ধু এবং প্রকাশকদের সঙ্গে নিয়মিত পত্র আদান-প্রদান করতেন। নিয়মিত আলোচনা করতেন বিভিন্ন লেখকের রচনা নিয়ে।

তলস্তয় ছোটবেলা থেকেই জ্যঁ জ্যাক রুশোর তীব্র ভক্ত ছিলেন। এতটাই যে কিছু সময়ের জন্য তলস্তয় গলায় রুশোর ছবিসংবলিত একটি লকেট পরতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও তলস্তয় রুশোর প্রশংসা করেছেন। ১৯০৫ সালের এক লেখায় তলস্তয় বলেছিলেন, ‘রুশো এবং গসপেল আমার জীবনের দুটি শক্তিশালী এবং ইতিবাচক প্রভাব।’ তলস্তয় রুশোর সমগ্র রচনাই পড়েছিলেন এবং তাঁর কিছু কিছু লেখা এতটাই পছন্দ হতো যে তিনি সেসব লেখাকে নিজের লেখা বলে ভাবতে চাইতেন। রুশোর উপন্যাস ‘জুলি’ থেকে তলস্তয় প্রেম, সম্পর্ক এবং পারস্পরিক জীবনের বিষয়বস্তু শিখে নিয়েছিলেন।

তলস্তয় অনেক বিখ্যাত লেখকদের প্রতিভা এবং তাঁদের সৃষ্টি নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তবু অনেক লেখকের গুণে মুগ্ধ ছিলেন তিনি। পুশকিনের কবিতা এবং নাটকের সমালোচনা করলেও পুশকিনের প্রেম ও রোমাঞ্চের প্রভাবকে অস্বীকার করেননি তিনি। তেমনি চেখভের নাটককে তাচ্ছিল্য করলেও, তাঁর রচিত ছোটগল্পের প্রশংসা করতেও ভোলেননি তিনি।

কৈশোরেই তলস্তয় নিকোলাই গোগলের লেখার সংস্পর্শে এসেছিলেন। গোগলের ‘দ্য ওভার কোট’ দিয়েই তলস্তয়ের গোগল পাঠ শুরু হয়েছিল। তলস্তয় গোগলের লোকসাহিত্যপ্রীতিকে খুব পছন্দ করতেন। তলস্তয়ের ইয়াসনায়া পালিয়ানা এস্টেটের স্কুলে কৃষকদের বাচ্চাদের গোগলের গ্রামীণ জীবন নিয়ে লেখা ‘ইভিনিং অন আ ফার্ম নেয়ার ডিকানকা’ উচ্চ স্বরে পড়ে শোনাতেন। চার্লস ডিকেন্সের ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ তলস্ততয়ের কৈশোর রাঙানো আরেকটি সৃষ্টিকর্ম। তলস্তয় তাঁর দীর্ঘ জীবনে পরিচিত প্রায় সব লেখকের রচনার মূল্যায়ন কিংবা পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। কিশোর বয়সে পড়া ‘ডেভিড কপারফিল্ড’-এর ওপর তাঁর মুগ্ধতা পরিণত বয়সে এসেও একটুও কমেনি। তলস্তয়ের ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠার প্রথম অনুপ্রেরণা ছিল চার্লস ডিকেন্স। তলস্তয়ের মতে, চার্লস ডিকেন্সের লেখায় সর্বোত্তম মানব অনুভূতি প্রতিফলিত হয়।

রাশিয়ান, তথা বিশ্বসাহিত্যের দুই মহিরুহ তলস্তয় ও দস্তয়ভস্কি। যদিও তাঁরা সমকালীন ছিলেন, কিন্তু নানা কারণে তাঁদের কখনো দেখা হয়নি। তবু তাঁরা একে অপরের লেখা পড়তেন। দুজনেই দুজনের লেখা নিয়ে চিঠি আদান-প্রদান করতেন। দস্তয়ভস্কি মানুষের জীবনের অন্ধকার দিক এবং তাদের বেদনাদায়ক মুহূর্তের দিকে তাঁর মনোযোগ আবদ্ধ করেছেন। অন্যদিকে তলস্তয় তাঁর বিপরীত। তিনি প্রেম, বন্ধুত্ব এবং পারিবারিক সম্পর্ককে তাঁর লেখায় তুলে এনেছেন। তা সত্ত্বেও, তাঁদের একে অপরের প্রতি মুগ্ধতা ছিল। যখন দস্তয়ভস্কি মারা যান, তখন তলস্তয় বলেছিলেন, ‘তিনি আমার সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে প্রিয় এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষ।’ দস্তয়ভস্কির লেখা ‘হিউমিলিয়েটেড অ্যান্ড ইনসাল্টেড’, ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, ‘দ্য ইডিয়ট’ ছিল তলস্তয়ের কাছে অসম্ভব প্রিয়। স্বভাবত, গুণমুগ্ধ হলেও দস্তয়ভস্কির কিছু ব্যাপারে তলস্তয়ের গুরুতর অভিযোগও ছিল। তলস্তয়ের মতে, দস্তয়ভস্কির উপন্যাসে কিছুটা টেকনিক্যাল দুর্বলতা আছে। তা বারবারই রাজনীতি, ধর্ম কিংবা গম্ভীর কোনো রহস্যের মিশ্রণে অসংগঠিত কিছু চিন্তাভাবনা নিয়ে গড়ে ওঠে। তলস্তয় আরও অভিযোগ করেছিলেন, দস্তয়ভস্কি সব সময় তাড়াহুড়ো করে লিখতেন। কারণ, তাঁর চিরকালই টাকার প্রয়োজন ছিল।

ভার্জিনিয়া উলফের মতো অনেকেই তলস্তয়কে বিশ্বসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক বলে অবিহিত করেন। ওরহান পামুকের মতো আরও অনেক বিশ্বজয়ীর কাছে ‘আন্না কারেনিনা’ এখন পর্যন্ত লেখা সেরা উপন্যাস। তলস্তয়কে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছে যে ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, তাতে মুগ্ধ হননি, এমন সাহিত্য সমালোচক পাওয়া দুষ্কর। তবু তলস্তয় জীবনের শেষ বেলায় এসে নিজের সেরা রচনাগুলোকেও অস্বীকার করতে চেয়েছেন। এই অস্বীকার সম্ভবত সেই অস্বীকার, যাতে নিজের লেখাকে আরও পরিশুদ্ধ করা যায়। অরও সর্বজনীন করে তোলা যায়।

তথ্যসূত্র: রাশিয়া বিয়োন্ড