কুরোসাওয়ার স্বপ্নের কোলাজ

 কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
বিজ্ঞাপন
স্বপ্নের বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি রয়েছে জাপানি চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়ার বিখ্যাত ‘ড্রিমস’ ছবিতে, যা একই সঙ্গে বাস্তব ও পরাবাস্তবের প্রান্ত ছুঁয়ে থাকে। বর্তমানেও আমরা হয়তো সেই স্বপ্ন–বাস্তবতার ভেতরেই ঘুরপাক খাচ্ছি। এ লেখায় প্রাণ পেয়েছে ‘ড্রিমস’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে এক লেখকের অন্তর্গত অনুভূতি।

‘মানুষ তখনই মেধাদীপ্ত, যখন সে স্বপ্নশীল’—এই কেন্দ্রমন্ত্র বাজাতে বাজাতে জাপানি মুভিমেকার আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর ‘ড্রিমস’ ছবি অথবা পেইন্টিংয়ের ড্রাফট করেন। সাল ১৯৯০। তিন দশক আগের এই ছবিটি মূলত কয়েকটি স্বপ্নের কোলাজ। স্বপ্নের ভূমিরেখা, জলাজঙ্গল আর তার দিগন্তবিস্তার—সব মিলেঝুলে ‘ড্রিমস’–এর অভিনব নির্মাণ, প্রথাসিদ্ধ কাহিনিকে চুরমার করে দিয়েছে।

রঙের ঢল, মনের মহল; স্বপ্নপ্রসূ কিন্তু অলীক কিছু না। কারণ, স্বপ্নই তো এক ভীষণ বাস্তবতা।
প্রকৃতি কুরোসাওয়ায় কেন্দ্র ও প্রান্ত। পাহাড়। পৃথিবীর খোলা মঞ্চ। ধীরলয়ে বাজছে লোকবাদ্য। নাচছে মুখোশমানবেরা। একটা বালক গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তা দেখছে। স্তব্ধতার বুক চিরে মুখোশ বাহিনী অগ্রসরমাণ। তাদের পদবিক্ষেপ কি মনে করিয়ে দিচ্ছে তারাই মানুষের ভেতরের সত্তাগুচ্ছের চলমান প্রদর্শনী? বালক একবার সভয়ে পিছিয়ে যায়, আরবার আগ্রহে সামনে তাকায়। বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রকোপকালে নিজে যখন হরদম মুখোশবাস্তবতার শিকার, তখন মনে পড়ে, কুরোসাওয়ার ‘ড্রিমস’–এর এই স্বপ্নখণ্ড।

আরে, আমিই তো চলেছি! আমরাই তো! পায়ের আওয়াজ নাকি মুখোশের বাহার মিলিয়ে যাচ্ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরে—পাহাড় পেরিয়ে দূরান্তরে!
বালক তুমি দৌড়াও এবার। দৌড়; প্রাণান্ত।
স্বপ্নের প্লাবন থেকে বাঁচতে হলে চলে যাও এই চক্রনৃত্যের চৌহদ্দি থেকে।
তবে কোথায়ই–বা যাবে!

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেখানেও তো স্বপ্নের হাতছানি, পায়চারি।
রংধনুর ঝিকিমিকি।
রোদ-বৃষ্টি-মেঘ; খ্যাঁকশিয়ালের বিবাহসভা। স্বপ্নের বর্ণিল আলপনা। আমার গায়ে তো বাহারি ধূলিকণা। এই সব ময়লা–মোহর নিয়ে আপাতত চলে যাই আর্ট গ্যালারিতে।
কী সুনসান-নিস্তব্ধ! একজন দর্শকও নেই দেখছি।

default-image

তাতে কী! ভ্যান গঘ তো আছেন।
একটা ছবি৷ গমখেতে কাক। দেখি। নিমগ্ন চক্ষুলুণ্ঠন। ঢুকে পড়ি। একি শস্যমঞ্জরি নাকি রঙের ভুবনবাটি! এতকালের নিরঞ্জন বেঁচেবর্তে থাকার নিকুচি করে রঙের রেখাপথে জরুরি স্নান সারতে সারতে সামনে চলি। পাহাড়, ফসলি মাঠ, জলাধার মাড়িয়ে শূন্য ক্যানভাস হাতে চলি।
একটা ঘর। খালি।
সামনে একটা লোক।
একি ভ্যান গঘ?
কী জানি!

আমার কৌতূহলের মুখেও সে কেমন নির্বিকার।
এটা কি কোনো গ্রাম?
হয়তোবা।
গ্রামবাসী কই?
আছে হয়তো, হয়তো নেই।
নাম কী গ্রামের?
গ্রামই কেবল। কী দরকার নামের!

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জলকলের গ্রাম বলা যেতে পারে। আগুনের আসবাব যেহেতু আজকাল মানুষের হৃদয়ঘরে।
বিদ্যুৎ নেই, বাতি নেই!
প্রয়োজন কি খুব! আর বাতি থাকলে নক্ষত্র দেখার অসুবিধা খুব।
মানুষ আজ সেই সত্য বিস্মৃত যে, সে প্রকৃতিরই অবিভাজ্য অংশ।
জল আর হাওয়ার দূষণ তার হৃদয়কেও দূষিত করে ফেলেছে।
তার বোধ হয়ে পড়েছে অন্তর্বাতিহীন।

default-image

আমি কোথায় পাব সেই ভেতরবাতির দেখা, আলোর রেখা!
যাও, দূরে সরো। আমি নই প্রশ্নোত্তরের কারবারি কিংবা করি না আলো–আঁধারের সওদাপাতি।
আমি স্বপ্নের প্যালেটটা খুঁজছি।
ওই, মনে হয় ওই সে নদীর ধারে।
যাই৷
সূর্য ডুবছে নাকি উঠছে!
ঠাহর না হয়। দরকারও নেই৷
ঢুকে পড়ি স্বপ্নের সীমান্তে।
কে গুলি তাক করছে?

তোমার বাস্তবের সীমান্তরক্ষী—চোখ নিশ্চয়ই।
সংখ্যাতীত কাকের কান্না নাকি উড়ন্ত হাসির কা কা ফোয়ারা!
আমি পা হড়কে পড়ে যাই শূন্যদর্শক গ্যালারিতে।
ও আমার স্বপ্ন,
তোমার চোট লাগেনি তো?

অন্য আলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন