গৌতম বসুর কবিতা: ‘কম্পমান আলোকতরঙ্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছি’

পশ্চিমবঙ্গের কবি গৌতম বসু মারা গেছেন গতকাল। গত শতকের আশির দশকে তাঁর উত্থান। তাঁর কবিতা বাংলাদেশের তরুণ কবি ও কাব্যমোদীদেরও আলোড়িত করেছিল। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রকাশিত হলো এই লেখা।

গৌতম বসুর ছবি অবলম্বনে

২০০৫ বা ০৬ সাল হবে তখন। আমরা চটি ধরনের এক-দেড় ফর্মার একটা কবিতার বই পাই কবি মজনু শাহর কাছ থেকে। ফটোকপি। এই কবির নাম কখনো শুনিনি। গৌতম বসু। বইটির নাম ছিল ‘রসাতল’। কবিতা পড়ার প্রত্যেকের একটা মানদণ্ড থাকে। আমার ক্ষেত্র এ রকম ছিল যে যদি আগের রাতের পড়া কবিতা পরে কখনো মনে পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে সেটি মনে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে। তো পিজি হাসপাতালের (অধুনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) সেই অন্ধকার আউটডোরে সন্ধ্যা থেকে আমরা কয়েকজন সিনিয়র-জুনিয়রসহ শুরু করি ‘রসাতল’ পড়া। বেশ একটা পাঠ হলো, রাতে বাসায় গিয়ে বন্ধুরা আবার একে অন্যকে ‘রসাতল’ থেকে নানা পঙ্‌ক্তি পাঠ করে শোনাত তখন। মনে আছে, আমাদের এক বন্ধু, সফেদ ফরাজী, রাতে অফিস থেকে ফিরে ফোন দিত, শোনাত গৌতম বসুর নানান কবিতা। আর সফেদের পাঠও অসাধারণ। ফলে, যদিও ফোনের দুই প্রান্তে দুজন, বেশ একটা আবহ তৈরি হতো। বেশ নীরবতা হতো। পরে বন্ধুদের মধ্যে তখন তাঁর পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে বেশ স্ট্যাটাস দেওয়ারও চল পড়ে ফেসবুকে। ফলে, বলা যায়, এত এত মিডিয়ার অলক্ষ্যে থেকেও বাংলাদেশের কিছু তরুণ কবির কাছে বেশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলেন গৌতম বসু।

গৌতম বসুর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘রসাতল’-এর সাদামাটা প্রচ্ছদ

কিন্তু এই কসমোপলিটন বাস্তবতায়, যেখানে বাংলাদেশের সমস্ত গ্রামও ধীরে ধীরে শহর হয়ে উঠছে, কীভাবে আমাদের মনে তিনি প্রাসঙ্গিক হয়েছিলেন? কীভাবে তাঁর ‘এই জল প্রকৃত শ্মশানবন্ধু, এই জল রামপ্রসাদ সেন’-এর মতো পঙ্‌ক্তি আমাদের মনে মনে বইতে বইতে মাঝেমধ্যে মুখেও এসে যেত? এর কারণ কী? এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ায় গৃহীত যে কবিরা, তাঁদের মতো নন উনি। দেখা যাবে, তাঁর কবিতার যে গঠন, একটা সহজতার মধ্যে যেন প্রবাহিত হতে চাইতেন তিনি। সহজতা কিন্তু সরলতা নয়। এই সহজতার প্রবণতা দেখতে পাওয়া যাবে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘অন্নপূর্ণা ও শুভকাল’ থেকেই। আর তাঁর এ সহজ ভাব আসলে আধুনিকতাকে অস্বীকার করে গড়ে ওঠা এক ঋজু ভাষাবিশ্ব, যেখানে তিনি মৃত্যু পর্যন্ত বলতে গেলে স্থিরই ছিলেন। এবং তাঁর আয়ুধ বলতে শুধু যে এই সহজভাব, তা কোনোভাবেই নয়। তাঁর স্মৃতি, যেন এই মানবজন্মের এক সাক্ষী। কবিতায় তাঁর গ্রথিত শব্দেরা এমন এক সুর তৈরি করে, যা বেশির ভাগ সময়ই মনে হয় যে শব্দের অর্থ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে পাঠককে। ‘যখন ফলকের সঙ্গে ফলকের সংঘাত/ধাতুর ক্রোধে বীর পড়েছে ভূতলে, রথ/টলতে-টলতে প্রবেশ করল যুদ্ধের আরও ভিতর;’ (অন্নপূর্ণা ও শুভকাল-৩), এই তাঁর ভাষার সংগঠন, বা বলা যায় চিন্তার সংগঠন। এখানে ফলক বলতে আমরা ভাষার স্থিতিস্থাপকতাকে ধরে ইগোকেও বুঝতে পারি। কিন্তু পুরোটা কি মেলে? মেলে না। আবার ধাতুর ক্রোধ যেখানে বলছেন উনি, সেখানে ধাতু কী? ধাত থেকেই তো ধাতু। কার ধাত? জীবনানন্দ থেকে ধার করে বলা যায়, ‘মানবের’ ধাত। কিন্তু তাতেও পুরোটা যে মেলে, তা বলা যায় না। এই ভাষাবিশ্ব কিন্তু আধুনিকদের মতো লুক্কায়িত বা কোনো চিন্তাতেই উত্তর-আধুনিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একটা বৈশিষ্ট্য থাকে। তাঁরা যেকোনো কিছুকে প্রশ্ন করে অসহায় করে তুলতে পারেন। এবং এ প্রশ্নের সামনে চুপ করে বসে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। স্থিতিস্থাপকতাকে, আমরা কবিতায় দেখেছি ভাষার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে। মূলত, শব্দের স্থিতিস্থাপকত্বেই বেশির ভাগ কবিকে ভরসা রাখতে দেখা যায়। গৌতম বসুর ক্ষেত্রে সেটা গিয়ে দাঁড়ায় পুরো কবিতার সংগঠনে, যেখানে সুরের আরোহণ অবরোহণের মতো বাক্য বা পঙ্‌ক্তি, যা-ই বলি না কেন, চেতনার নানান স্তর স্পর্শ করে, অর্থ যত না শব্দের স্থিতিস্থাপকতার জন্য তৈরি হয়, তার চেয়ে বেশি তৈরি হয় সামগ্রিকতার মধ্য দিয়ে। এখানে অনুপ্রাস, যমক বা কবিতার নানান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারতেন তিনি, করেননি। কেন? কারণ, আমি যা লিখি, তা-ই শুধু আমার লেখা নয়, যা লিখিনি, তা আমাকে আরও বেশি করে সংজ্ঞায়িত করে।

গতকাল তাঁর মৃত্যুর কথা শুনে বারবার শুধু একটি কথাই মনে পড়ছিল। এপ্রিলের ৩, ২০১৩। আমার প্রথম কন্যা পৃথিবীতে এল। যখন আমি তাঁকে দেখছিলাম প্রথমবার, ভাবছিলাম এই অনুভূতির প্রকাশ কীভাবে করি! মনে পড়ল একটি পঙ্‌ক্তি, ‘একটি স্থির, কম্পমান আলোকতরঙ্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছি’। সেদিন সারা দিন শুধু এই লাইনই মাথায় ঘুরছিল। অনেক পরে আবিষ্কার করেছি, এটি গৌতম বসুর লাইন।

‘ম্লান হেসে এগিয়ে এসেছে আমার বিনাশ’ (‘সুদর্শন’) বা ‘হলো না সত্যদর্শন, ভেঙে গেছে হোলিখেলা’ (‘আনন্দ গান’)—এই সর্বস্ব হারানো ভাব যেন দেখি সর্বতোভাবে তাঁর কবিতায়। একদিকে এ কিন্তু সত্যভাষণ, আরেক দিকে এ তাই, যা তিনি যাপন করে চলতেন। ফলে, ‘প্রলয়ের বোঝা পিঠে নিয়ে আমি যখন হেঁটে আসছিলাম/তখন রাত নেমেছে গভীর, আমার কপালে বিদ্যুৎলতা/বুকে কৃষ্ণমেঘের অশান্ত মালা।’ এ তো স্বাভাবিক। কোনো গোপনতা নেই—না কবিতায়, না শব্দে, না প্রকাশে। মানে কোনো দ্বিধা নেই—এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাঁরই বন্ধু কবি গৌতম চৌধুরী লিখছেন, ‘কবি-গৌতম যে অদ্যাবধি সেই রথতেই আসীন, সত্যভাষণের চালিকা শক্তিতে যার চলনপথ ভূমি থেকে কিছু ঊর্ধ্বেই স্থাপিত-এ-প্রতীতি আমাদের প্রশ্নাতীত।’
সাহস, এই একটিমাত্র গুণ আছে, যা আমার মনে হয় যেকোনো শিল্পীর মাপকাঠি হতে পারে। কিন্তু এর প্রয়োগ তাঁরা নানানভাবে করে থাকেন। গৌতম বসুর ক্ষেত্রে তাঁর যে অনুধাবনগুলো দেখি, তাঁরা এককথায় শান্ত, ধীর, স্থির এবং বৈনাশিক:
‘যা-কিছু হারাল সমাপ্তির আগেই, তা যেন জন্মায়, মরে, জন্মায়
যা-কিছু লাভ করেছি, তা যেন হারাতে পারি।’ (আখতারী বাঈ)

একটা নির্লিপ্তভাব যেন প্রচ্ছন্ন। কোনো কিছু গোপন নয়। যে ভাষাবিশ্ব তিনি গড়ে তুলেছেন, তা তাঁর সমসময়ের অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী কবিদের থেকে একদমই আলাদা, বলা যায় একক এবং অনন্য।
গতকাল তাঁর মৃত্যুর কথা শুনে বারবার শুধু একটি কথাই মনে পড়ছিল। এপ্রিলের ৩, ২০১৩। আমার প্রথম কন্যা পৃথিবীতে এল। যখন আমি তাঁকে দেখছিলাম প্রথমবার, ভাবছিলাম এই অনুভূতির প্রকাশ কীভাবে করি! মনে পড়ল একটি পঙ্‌ক্তি, ‘একটি স্থির, কম্পমান আলোকতরঙ্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছি’। সেদিন সারা দিন শুধু এই লাইনই মাথায় ঘুরছিল। অনেক পরে আবিষ্কার করেছি, এটি গৌতম বসুর লাইন। কোন কবিতার সেটা, এখন আর মনে করতে পারছি না। আমার সব সময় মনে হয়, কবিতার অনেক কাজের মধ্যে এটি একটি—অবাঙ্‌ময় অনুভূতিগুলোকে ভাষা দেওয়া। পরে যখন তাঁকে এটা বলেছিলাম, অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। একসময় বললেন, আমি তাহলে আপনার মনে আপনার কন্যার মধ্যে বেঁচে আছি।
হ্যাঁ, গৌতমদা এখনো বেঁচে আছেন। আমার কাছে। থাকবেন সব সময়। আমার কাছে তাঁর মৃত্যু নেই। আর বাংলা কবিতায়, সে প্রশ্ন সম্ভবত কোনো দিনই উঠবে না।
অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo. com