৫ নভেম্বর ছিল আনোয়ারা সৈয়দ হকের ৮০তম জন্মদিন
default-image

রাজিয়া বানু চেম্বারে বসে আছেন। আজ রোগী বেশি নেই। চারটে রোগী দেখার পরেই এল পাঁচ নম্বর ক্লায়েন্ট। রাজিয়া বানু তাঁর রোগীদের ক্লায়েন্ট বলেন। কারণ তাঁর অধিকাংশ রোগীর কোনো ওষুধ লাগে না, মুখে মুখে পরামর্শ দিলেই হয়।

পাঁচ নম্বর ক্লায়েন্ট হলো এক দম্পতি। বয়সে এখনো তরুণ। রাজিয়া তাদের বসতে অনুরোধ করলেন। বললেন, বসুন।

রোগী বয়সে যতই ছোট হোক না কেন, তাদের আপনি করে সম্বোধন করেন রাজিয়া। দীর্ঘদিন বিদেশে ট্রেনিং নিয়ে তিনি এটা শিখেছেন যে রোগীর সঙ্গে কোনোক্রমেই আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ব বা নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা যাবে না। তাহলে প্রথম থেকেই থেরাপিউটিক রিলেশনশিপ নষ্ট হয়ে যাবে। থেরাপিউটিক রিলেশনশিপ এমন একটি সম্পর্ক, যা রোগীর থেরাপিতে সহায়তা করে এবং তাকে জীবনের সংকট মুক্ত করতে সাহায্য করে। আর যিনি থেরাপিস্ট, তিনি থাকেন সম্পূর্ণভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তা না হলে রোগীর জীবনের জটিলতার সঙ্গে ডাক্তারও যদি জড়িয়ে যান, তাহলে আর চিকিৎসা হবে না, হবে কেওস। অর্থাৎ ভজঘট অবস্থা। তবে নিজের দেশ ও পরিবেশ বুঝে বিদেশের সব ট্রেনিংকেই মোডিফাই করতে হয়, নইলে চিকিৎসা করা যায় না—এ কথাও রাজিয়া জানেন।

দম্পতি ঘরে এসে বসলেন।

স্বামী বললেন, ‘ম্যাডাম, দোষ আমার। আমি আমার স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়ে ফেসবুকে একটি মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলাম। আমার এভাবে নষ্ট হওয়ার প্রবণতা শুরু হয় যখন থেকে আমি পাশের ঘরে একা ঘুমোতে শুরু করি। ছোট বাচ্চা রাতে মায়ের সঙ্গে থাকতে চায় এবং রাতে সে কান্নাকাটি করে বলে আমার স্ত্রী নিজেই আমাকে পাশের ঘরে ঘুমোতে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাতের বেলা ঘুম আসত না। তাই ফেসবুকে সময় কাটাতাম আমি। এভাবে সেই মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। মেয়েটি বিবাহিত, কিন্তু তার স্বামী থাকে বিদেশে। খুব লোনলি। তাই...’

স্বামী কথা শেষ না করতেই স্ত্রী বলে উঠলেন, ‘তাই তার লোনলিনেস কাটাবার দায়িত্ব নিলেন আমার স্বামী, বুঝলেন ম্যাডাম? অপরের স্ত্রীর লোনলিনেস দেখে আমার স্বামীর বুক ফেটে গেল! আর তার স্ত্রী যে তারই সন্তানের জন্য নিজের বেডরুম থেকে বাধ্য হয়ে স্বামীকে পাশের ঘরে পাঠিয়ে সারা রাত একাকিত্বে ভোগে, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই।’

বিজ্ঞাপন
default-image

রাজিয়া বানু একটু কাশলেন। এ ছাড়া আর কী করবেন?

স্বামী বললেন, ‘আমি অবশ্য এরপর আমার স্ত্রীর কাছে অনেকবার মাফ চেয়েছি, কিন্তু সে আমার কোনো অনুরোধ আর রাখতে চায় না। সে আমাদের এত বছরের গড়ে তোলা সংসার ভেঙে ফেলতে চায়!’

স্বামীর কথা শেষ না হতে স্ত্রী বলে উঠলেন, ‘সংসার ভেঙে ফেলতে চায়। আ হা হা হা, কতবার করে মাফ চেয়ে আবার কতবার করে সেই মহিলার সঙ্গে সে ভার্চ্যুয়াল সম্পর্ক স্থাপন করেছে, একবার শুনে দেখেন তো, ম্যাডাম? সেই মহিলাকে সে কতবার উপহার পাঠিয়েছে, একবার শুনে দেখেন। তার মোবাইল খুলে আমি দেখেছি, এমন কোনো শব্দ নেই, যা সেই মহিলাকে আদর করে সে বলেনি! এখন যখন অন্য একজনের সঙ্গে আমিও প্রেম করতে শুরু করেছি, তখন তার টনক নড়েছে!’

স্বামীটি এবার ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল, ‘ম্যাডাম, আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানকে ভালোবাসি। আমি পছন্দ করে তাকে বিয়ে করেছি। সে যদি আমার জীবন থেকে চলে যায়, তাহলে আমার জগৎ অন্ধকার হয়ে যাবে, ম্যাডাম! তাকে ছাড়া পৃথিবীর আর কাউকে আমি ভালোবাসিনি। ওই মহিলা আমার কিছু না! ওসব ছিল একটা ফান। সময় কাটানোর একটা ছল।’

স্ত্রীর মুখে আবারও খই ফুটল। স্বামীর দিকে ফিরে তিনি বললেন, ‘ছল? তো ছল নিয়েই থাকো। কিন্তু আমারটা ছল নয়, আমারটা রিয়েল!’ তারপর রাজিয়ার দিকে চোখ ঘোরালেন তিনি। বললেন, ‘এখন আর আমার ফেরার সময় নেই! কারণ সে–ও একজন ঘাই খাওয়া মানুষ। তার স্ত্রীও তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। আমার বাচ্চাটিকে ভদ্রলোক নিজের বাচ্চা বলে মানুষ করবেন বলে কথা দিয়েছেন। তিনি খুব লোনলি একজন মানুষ, ম্যাডাম!

‘মানুষের জীবন তো একটি দর্শন, ম্যাডাম। এই দর্শনকে কি মানুষের শ্রদ্ধা করতে হবে না? আমার স্বামী যখন বারবার আমাকে ধোঁকা দিতে লাগলেন, তখন বুঝলাম এটা তার স্বভাব। আর এই স্বভাব জীবনেও যাওয়ার নয়। এই সব স্বামীদের কাছে সংসার আলাদা আর প্রেম আলাদা। এরা সংসারের চার দেয়ালের ভেতরে প্রেম খুঁজে পায় না। প্রেম খুঁজে পায় বাইরের জগতে। আর ফেসবুকে প্রেম খুঁজে পেতে আজকাল কয় মিনিট লাগে? তাই টাটা বাইবাই।’

রাজিয়া বানুর চোখের সামনে স্বামীর দিকে হাত বাড়িয়ে টাটা দিয়ে উঠলেন তার স্ত্রী। এ মহিলার গন্তব্য এখন অন্য কোনোখানে।

ওদিকে সব দেখে চক্ষু চড়কগাছ—হতবাক চোখে তাকিয়ে আছেন রাজিয়া!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0