সত্যজিৎ রায়ের ছবি অবলম্বনে
সত্যজিৎ রায়ের ছবি অবলম্বনেছবি: সংগৃহীত

১৯৪০ থেকে ২০২০—দিনক্ষণের হিসাবে আশি বছরের পথপরিক্রমা। কলকাতার বিশপ লেফ্রয় রোডে রায় পরিবারের বাড়িতে এই এত বছর পর এসে হঠাৎ আলোর ঝলকানি হয়ে আভা ছড়াল কিছু অমূল্য স্মৃতিকণা। পুত্র সন্দীপ রায় খুঁজে পেলেন পিতা সত্যজিৎ রায়ের লেখা কতগুলো চিঠি, যা সত্যজিৎ শান্তিনিকেতন থেকে লিখেছিলেন তাঁর মাকে। লকডাউনের দিনে যখন বাইরে বেরোবার উপায় নেই, এ রকম একটা সময়ে বাড়ির চিলেকোঠা গোছাতে গিয়ে সন্দীপ রায় আবিষ্কার করলেন কিছু পুরোনো ঐশ্বর্য। এই লুকোনো কিংবা হারিয়ে যাওয়া ঐশ্বর্যের খোঁজ এত দিন বাড়ির কেউ পাননি। তিনি পুরোনো বাক্স ঘাঁটতে গিয়ে পেলেন ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সময়কালে শান্তিনিকেতন থেকে মা সুপ্রভা রায়কে লেখা সত্যজিতের চিঠি। এসব চিঠির সঙ্গে তিনি আরও খুঁজ পেলেন চলচ্চিত্র কিংবদন্তি ফ্রাঙ্ক ক্যাপরা, আর্থার সি ক্লার্ক, আকিরা কুরোসাওয়া আর রিচার্ড অ্যাটেনবরোর কিছু চিঠি, টেলিগ্রাফ, সত্যজিতের ক্যামেরায় তোলা প্রায় ১০০ আলোকচিত্র, ভারতে বেড়াতে আসা বিশ্বনন্দিত আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় তোলা সত্যজিতের ছবি এবং সিনেমার অসংখ্য স্টিল ছবির নেগেটিভ, যা ছিল ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপু ট্রিলজি’ আর ‘জলসাঘর’–এর সেট বা লোকেশনের।
সত্যজিৎ রায়ের মা সুপ্রভা রায়। তিনি যেদিন অমর্ত্যলোকে যাত্রা করেছিলেন, সেই রাত সত্যজিতের জন্য ছিল এক গাঢ় বিষণ্নতার রাত। তিনি যখন বাবা সুকুমার রায়কে হারিয়েছিলেন, সে সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র দুই বছর চার মাস। বাবার কোনো স্মৃতি তাঁর স্মৃতিপথে ভেসে আসার কথা নয়। একলা মা-ই তাঁকে বড় করে তুলেছিলেন। সত্যজিতের মননে, চেতনে শিল্প আর নন্দনতত্ত্বের ধারণা মা-ই গেঁথে দিয়েছিলেন। যে রাতে মা চলে গেলেন, লেক টেম্পল রোডের বাড়িটায় বিজয়া রায় মায়ের ঘরলাগোয়া বারান্দায় একটা চেয়ার পেতে বসিয়ে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়কে। কানের কাছে আলতো স্বরে বলেছিলেন, ‘কাঁদো। যত মন চায়। কেউ তোমাকে আজ বিরক্ত করতে আসবে না এখানে।’ দিনটা ছিল ২৭ নভেম্বর, ১৯৬০।

সত্যজিৎ সেদিন ৩৯ বছর বয়সী একজন যুবক। তত দিনে মুক্তি পেয়ে গেছে ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ‘পরশ পাথর’, ‘অপুর সংসার’, ‘জলসাঘর’ আর ‘দেবী’।
একটু আগেই যা বলা হলো, করোনার এই মহামারিকালে সন্দীপ রায় বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়ির চিলেকোঠায় একদিন আবিষ্কার করলেন প্রায় ৫০টি চিঠি, যেসব সত্যজিৎ লিখেছিলেন তাঁর মাকে শান্তিনিকেতন থেকে, তিনি তখন সম্ভবত ঝাড়গ্রামে থাকতেন। সন্দীপ চিঠিগুলোয় দেখতে পেলেন মা-ছেলের বন্ধনের এক অপূর্ব আলো, যা এত দিন অন্ধকারে পড়ে ছিল। তাঁর মনে হতে লাগল, এসব অমূল্য চিঠি এত দিন কেনই–বা চোখের আড়ালে রয়ে গেল, কেনই–বা এর সঠিক সংরক্ষণ হলো না? চিঠিগুলো পাঠ করে সন্দীপেরও জানাশোনার এক অজানা দিগন্ত খুলে গেল। বাবাকে, ঠাকুরমাকে অন্যভাবে জানা হলো। ঠাকুমাকে তেমন করে তো পাওয়াই হয়নি। কারণ, সুপ্রভা রায় যেদিন এ পৃথিবী ছেড়েছেন, সন্দীপের বয়স তখন মাত্র সাত বছর! এবার আর ভুল হবে না। তিনি চিঠিগুলো সযত্নে সাজিয়ে–গুছিয়ে রাখার কাজ শুরু করলেন সেদিনই। তাঁর ইচ্ছা চিঠিগুলো মলাটবন্দী করবেন।

মাকে লেখা সত্যজিতের চিঠিগুলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দুজনই পরস্পরের অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ে খেয়াল রাখতেন। সত্যজিতের প্রায় সব চিঠিতেই লেখা আছে, তাঁর মায়ের ব্লাড সুগারের মাত্রা ঠিকঠাক আছে কি না, নিয়মিত সময়ে দিনের খাবারটা খাচ্ছেন কি না, ইনসুলিনের ইঞ্জেকশন শেষ হলো কি না, এসব বিষয়। ধোপাবাড়ি থেকে কাপড় এসেছে, বিলও দেওয়া হচ্ছে সময়মতো, টাকা লাগলে তিনি জানাবেন, ঘরের এটা-ওটা, সব বিষয়ে তিনি মায়ের কাছে জানতে চাইছেন, ‌নিজেরটা জানাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন

সত্যজিৎ রায় বাবা সুকুমার রায়কে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন, অন্যান্য কাজও যতটা করেছেন, মাকে নিয়ে সেভাবে কিছু করেননি। রান্নাবান্না থেকে সূচিকর্মে তিনি নিপুণা হয়ে উঠেছিলেন, গানও গাইতেন সুপ্রভা। ‘আনসাং ট্যালেন্ট’ হয়েই থেকে গিয়েছিলেন। তাঁর কথা অন্যেরা মান্য করতেন, কিন্তু খুব যে তাঁকে ভয় পেয়ে চলতেন, সে রকম ছিল না। বিদ্যাসাগর বাণীভবন বিধবা সদনে তিনি সূচিকর্ম শেখাতেন। এসব তথ্য জানা যায় সত্যজিতের ‘পোর্ট্রেট অব আ ডিরেক্টর’ নামের আত্মজীবনী গ্রন্থে।

শান্তিনিকেতনের স্মৃতিপাঠে দেখা যায়, একবার যখন মায়ের সঙ্গে সত্যজিৎ শান্তিনিকেতন আশ্রমে গিয়েছেন, টানা প্রায় তিন মাস ছিলেন সেখানে। সুপ্রভা কিশোর সত্যজিৎকে নিয়ে পূর্ণিমা রাতে কোপাই নদীর ধারে গিয়েছেন। ছেলেকে ব্রাহ্মগীতি গেয়ে শুনিয়েছেন। এ সময় তাঁর জীবনের গভীর বেদনার কথাও সত্যজিৎকে বলতেন তিনি। আশ্রমে থাকাকালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিও সত্যজিতের মনন গঠনে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৪০ সালে যখন সত্যজিৎ রায় কলাভবনের শিক্ষার্থী হিসেবে শান্তিনিকেতনে গেলেন, মূলত তখন থেকেই মাকে চিঠি লেখা শুরু করেন।

default-image

এই আশি বছর পর পাওয়া চিঠিগুলোয় প্রাপকের ঠিকানা দেখলে ধারণা করা যায়, সুপ্রভা সে সময় ঝাড়গ্রামে কোনো স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করতেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে প্রথমদিকের লেখা চিঠিগুলোয় রবীন্দ্রনাথ, অবন ঠাকুরের কথা ঘুরেফিরে এসেছে। সত্যজিতের অন্যতম প্রিয় শিক্ষক নন্দলাল বসুর বিষয়ে তিনি মাকে চিঠিতে লিখেছেন তাঁর স্কেচ ও শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে। একটা চিঠিতে উল্লেখ আছে, একবার কোনো এক চিত্রকলা প্রদর্শনীতে সত্যজিৎ রায় একটা ছবি জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু নিজের আঁকা সেই ছবিকে তিনি লিখেছেন, ‘মন্দ ছবি’। লিখেছেন, আরও কয়েক দিন সময় পেলে এর বদলে অন্য ছবি এঁকে জমা দিতে পারতাম।

মাকে লেখা সত্যজিতের চিঠিগুলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দুজনই পরস্পরের অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ে খেয়াল রাখতেন। সত্যজিতের প্রায় সব চিঠিতে লেখা আছে তাঁর মায়ের ব্লাড সুগারের মাত্রা ঠিকঠাক আছে কি না, নিয়মিত সময়ে দিনের খাবারটা খাচ্ছেন কি না, ইনসুলিনের ইঞ্জেকশন শেষ হলো কি না, এসব বিষয়। ধোপাবাড়ি থেকে কাপড় এসেছে, বিলও দেওয়া হচ্ছে সময়মতো, টাকা লাগলে তিনি জানাবেন, ঘরের এটা–ওটা, সব বিষয়ে তিনি মায়ের কাছে জানতে চাইছেন, ‌নিজেরটা জানাচ্ছেন। সত্যজিতের হোস্টেল থেকে সবচেয়ে কাছের সিনেমা হলটাও ছিল প্রায় দুই মাইল দূরে। ওখানে দেখানো হতো পুরাণনির্ভর সব সিনেমা, যাতে তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি তাই অপেক্ষায় থাকতেন ছুটিতে কখন শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় আসবেন আর তাঁর পছন্দমতো সিনেমাগুলো হলে বসে দেখবেন। সন্দীপ রায় বলছেন, একটা চিঠিতে বাবা কোনো একটা সিনেমা দেখার বিষয়ে খুব আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, সিনেমার নাম বাবা সুনির্দিষ্ট করে লেখেননি। কিন্তু আন্দাজ করতে পারছি, সেটা ১৯৪১ সাল ছিল আর তখন কলকাতার সিনেমা হলে চলছিল ‘সিটিজেন কেইন’; মেট্রোতে তখন এই সিনেমা দেখার জন্য প্রচুর দর্শকের ভিড় ছিল। সেই চিঠিতে বাবা লেখেন, তাঁর মন পড়ে রয়েছে এখানে। বাবা তাঁর শিক্ষাক্রমের পাঁচ বছর শেষ না করেই কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল শিল্প আর চিত্রকর্ম নিয়ে যথেষ্টই শেখা হয়ে গেছে। পুরোটা শেষ না করে ফিরে গেলে এমন কিছু ক্ষতি হবে না।

ক্রিকেট এবং সংগীতের প্রতি ছিল সত্যজিৎ রায়ের দুর্বার আকর্ষণ। মাকে লেখা কিছু চিঠিতে সেসবের নিদর্শন আছে। একবার ইডেন গার্ডেনে একটা ক্রিকেট খেলা চলছিল, তিনি তখন শান্তিনিকেতনে। সেই ম্যাচ না দেখতে পাওয়ার হাহাকার লেখা আছে একটা চিঠিতে। আরেক চিঠিতে তিনি মাকে অনুরোধ করেছেন, তখন কলকাতায় আয়োজিত একটা কনসার্টের খবর আর ছবির ক্লিপিং যেন সংবাদপত্র থেকে কেটে তাঁকে পাঠানো হয়।

default-image

সন্দীপ রায়ের মতে, ‘এত সব বন্ধনের মধ্যেও মা-ছেলের সম্পর্কে কমিউনিকেশন গ্যাপ বলতে যা বোঝায়, তার একটা প্রচ্ছন্ন ছায়াও কোথাও ছিল। ব্যক্তি সুপ্রভা-সত্যজিৎকে খুঁজে পাওয়া যায় অপু ট্রিলজির “অপরাজিত” সিনেমার সর্বজয়া-অপুর মধ্যে। বাবাকে তাঁর মা এক হাতে লালন-পালন করেছিলেন, একলা মায়ের দ্বিগুণ শক্তি আর দায়িত্ব নিয়ে। ‘অপরাজিত’তে আমরা দেখি হরিহর মারা যাওয়ার পর সর্বজয়া ঠিক এভাবে একার লড়াইকে সঙ্গ করে অপুর জীবন-মনন গড়ে দিয়েছিলেন। বাবার ব্যক্তিগত যাপনের একটা ছায়া অবচেতনেই তিনি এঁকেছিলেন অপু আর সর্বজয়ার সম্পর্কের সেলুলয়েড ক্যানভাসে।’

সুপ্রভা রায় সত্যজিৎকে দেখতে চেয়েছিলেন একজন সুশিক্ষিত এবং পেশাগত জীবনে সফল মানুষ হিসেবে। সৃষ্টিশীল কাজে ছেলের এই আগ্রহ আর ঝুঁকে পড়ায় মায়ের খুব একটা সায় ছিল না। তিনি সত্যজিৎকে নিশ্চিত ও নিরাপদ একটা জীবনে দেখতে চেয়েছিলেন। তাই বাবা-ঠাকুরদার পথ অনুসরণ করে ছেলেকে পাঠালেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। কিন্তু কী করা! সত্যজিতের মন পড়ে রয়েছে এই সব সৃষ্টিশীল কাজে! এই চলচ্চিত্র নির্মাণের জগৎ ছিল সুপ্রভা রায়ের চোখে অনিশ্চিত জীবন এবং এই জীবন বেছে নেওয়ার ছেলের এই সিদ্ধান্তে তিনি মন খারাপ করেছিলেন। তবে ‘পথের পাঁচালী’র সাফল্য দেখার পর ছেলের এই সিদ্ধান্তের প্রতি ধীরে ধীরে নমনীয় হন এবং একই সঙ্গে হন গর্বিতও।

লেক অ্যাভিনিউ থেকে লেক টেম্পল রোড, সেখান থেকে আজকের বিশপ লেফ্রয় রোড। এত সব বাড়িবদলের কারণে অনেক অনেক পুরোনো জিনিসপত্র বাক্সবন্দী হয়ে পড়ে ছিল। এই লকডাউনের ঘরবন্দীকালে সন্দীপ রায় সেসবের ওপর জমা ধূলা পরিষ্কার করতে গিয়ে এসব অমূল্য রতন আবিষ্কার করেন। এত বছরের অদেখা যা কিছু পাওয়া গেল, সেসব সাজিয়ে সত্যজিৎ রায়কে নিবেদন করে অন্তত তিনটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা যাবে। সন্দীপ রায় বলছেন, ‘যা এখনো বাক্সে জমানো আছে, তার কেবল অর্ধেক অংশ আলো–বাতাসের মুখ দেখল। বাকিটা আস্তেধীরে বের করব। ইচ্ছা আছে বাবার জন্মশতবর্ষে, অর্থাৎ ২০২১ এর ২ মে এসবের কিছু কিছু গুছিয়ে তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের জন্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করব। তবে এই করোনাকালে সবই অনিশ্চিত।

কোনো পরিকল্পনাই কল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে না। তবু আমার মনে হয়, এই ঐশ্বর্যের খোঁজ পাওয়াটা এক অর্থে এই হতাশার কালে একটা আলোর রেখা হয়ে আমাদের আশা দেখাচ্ছে।’

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন