উপন্যাসটির পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী সময়। সময়কে সঙ্গী করে নারী ও পুরুষের জীবনসংকটের ব্যঞ্জনাময় এক অপূর্ব কাহিনির মধ্য দিয়ে এতে বর্ণিত হয়েছে বাস্তবতা, কুসংস্কার, হানাহানি, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অভাব-অনটন ও লোভ-লালসার লজ্জিত ছাপ।

লেখক এখানে তাঁর স্বকৃত পরিচিত বর্ণনায় বুনেছেন এর চরিত্র, পার্শ্বচিত্র, ভাববিন্যাস। গোটা উপন্যাসেই একটি জিজ্ঞাসার পানে ছুটেছেন ঔপন্যাসিক। শুধু তাই নয়, জিজ্ঞাসাটা ধরে রেখে তিনি ফজলু চরিত্রকে পুঁজি করে এগিয়েছেন শেষের দিকে। খুঁজেছেন কী পাপ, কী পুণ্য। কার পাপ, আর কেনই–বা পাপ; কেনই-বা পুণ্য!

উত্তম পুরুষে লেখা উপন্যাসটিতে শামসুল হক ‘আমি’র মধ্য দিয়ে বিচরণ করেছেন প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে, প্রতিনিধিত্ব করেছেন একজন বোদ্ধা হিসেবে; যিনি যাচাই-বাছাই করে বলেছেন প্রতিটি কথা। এই আখ্যানের বড় অংশজুড়ে রয়েছে নারী। নারীকে একবার পাপের উৎসঘর সন্দেহ করা হয়েছে, আরেকবার নারীকে পুণ্যাধিক উতরিয়ে দেখানো হয়েছে জন্মনাড়ের সঙ্গতায়। তাকেই আবার প্ররোচনাকারীরূপে চিত্রিত করা হয়েছে, ভালোবাসার বাঁশি হিসেবেও দেখানো হয়েছে। মোটকথা নারী এখানে নানা মাত্রা এবং যুক্তি পরম্পরায় হাজির।

‘আমি, হ্যাঁ আমিই তো বলেছিলাম, প্রতিবাদ করে উঠেছিলাম; নারী যদি পাপের শিকড়, তবে আমাদের জন্ম যে নারীর গর্ভে, সেই নারীকে, আহ্ সেই জননীকেই পাপের শিকার বলা হয়। জননী কি নারী নয়? জননী যদি পাপের ভূমি হয়, তবে জননীর হাত এত স্নিগ্ধ কেন মনে হয়? কেন এই দারুণ দুর্দান্ত গরমের কালেও তার হাতের পাখার বাতাস এত শীতল হয়?’

শেষতক কোনো পাড়ে ভেড়েনি হক সাহেবের জিজ্ঞাসার তরি। মাঝপথে কার পাপে স্বর্গ নষ্ট, পৃথিবী নরক—তা আগলে রেখে, পাঠককে একটি ঘোর কূপে ফেলে ফজলুর ওপর কাহিনির পা দিয়ে, আমরা কেউই যে পাপের বাইরে নই, সবাই–ই স্খলন আঁধারের শিকার; তার ইঙ্গিত রেখে লেখক পাড়ের কাছে তরি রেখেছেন অত্যন্ত মুনশিয়ানায়। এখানেই সৈয়দ শামসুল হকের পারদর্শিতা।

রহস্য, ঘোর, কাব্যময় ভাষা, জিজ্ঞাসার যৌক্তিক গাঁথুনির পরও কেন যেন মনে হয়েছে এর গায়ে লেগে আছে ব্যস্ততার ছায়া। এই মনে হওয়াটা হয়তো ভুল, হয়তো অন্যকিছু। কিন্তু বুননে এক কড়া ছিদ্র নেই পতন–এর মধ্যে। এই উপন্যাসে একটি ঘূর্ণিও আছে, এই ঘূণিটাই সৈয়দ হকের সুগন্ধ দেয় পাঠককে, চেনা পথে অচেনা মুদ্রা প্রাপ্তির তৃপ্তিতে তাঁকে বুঝতে শেখায়। পতন কেবল মানুষের জীবনজিজ্ঞাসাই নয়, এ এক আনন্দপাঠও।

পতন

সৈয়দ শামসুল হক

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২১, প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল, ৭০ পৃষ্ঠা, দাম: ২০০ টাকা।

বইটি পাওয়া যাচ্ছে

prothoma.com এবং মানসম্মত

বইয়ের দোকানে।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন