দীর্ঘশ্বাস পড়ছে মিলনমেলা ভঙ্গের

বিজ্ঞাপন
default-image
>বইমেলার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মেলা নিয়ে হিসাব–নিকাশের খতিয়ান বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের কলমে

নাকে লাগে ফাল্গুনের দৌড়ঝাঁপের হাওয়া। মুকুলের অভিযানে যেমন আমের পাতা খুঁজে পাওয়া ভার, তেমনি শিমুলের উল্লাসে কাণ্ডের দেখা মেলে ফাঁকফোকরে। এই ফাল্গুনে, এই ফেব্রুয়ারিতে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি...’—মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা। গ্রন্থমেলাই বলি কিংবা পুস্তকমেলা—শেষ অব্দি তো বইমেলাই। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে। মেলা চলার একদম প্রান্তে এসে পাওয়া, না–পাওয়ার বিষয়গুলো উঁকিঝুঁকি দেয়। মেলার পরিসর, প্রয়োজনীয় উপকরণের পাশাপাশি এত এত বই আর জনসমাগম নিঃসন্দেহে আনন্দের সপক্ষে যায়। তারপরও কিন্তু দীর্ঘশ্বাস পড়ছে মিলনমেলা ভঙ্গের!

বই প্রকাশের খতিয়ান করে খুব একটা জুতসই অবস্থায় যাওয়া গেলেও তার মান নিয়ে কিন্তু নিত্যবারের মতো এবারও কথা উঠেছে। চেতনার অংশের সঙ্গে মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রকাশ নিয়ে ভেতরে-ভেতরে কিন্তু চলছে তোলপাড়! বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে এই বৃহৎ বই–সমাহার থেকে নিশ্চিতভাবে কী ফল লাভ হলো—প্রশ্নটি সহজে করা গেলেও উত্তরটির জন্য পেছনের দরজাগুলো উন্মুক্ত করতে হবে। পঁচাত্তর–পরবর্তী বড় একটা সময় উল্টো হাঁটার পরিসংখ্যানে চলেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও দর্শনের সম্মিলনের সরল অঙ্কের যোগফল নির্ণয়ে সংকট পাশে দাঁড়ায়। হোঁচট সেখানে প্রতি স্তরে, আর সাকল্যে ছিন্নভিন্ন প্রভাতগুলো কেবল সংশয়েই নিপতিত হয়। তাই উজ্জ্বল আশা ও নতুন স্বপ্নের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মতো বিন্দু আবিষ্কারই এখন বইমেলার প্রাণসূত্র।

দুই
লেখকের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে নানা কথা মেলাজুড়ে ঘুরপাক খায়। আবার আছে মান-অভিমানের প্রশ্ন! প্রকাশক-লেখক সম্পর্কের ন্যায়-অন্যায় তো বইয়ের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। যদি বলি, মূল কথাটির কেন্দ্র যে লেখকের কলমে, প্রণেতার মস্তিষ্কে—তাকে বাদ দিয়ে তো কিছু হওয়ার নয়। আক্ষেপের পুষ্পরাজি খুঁজে বেড়ায় সমাধান। এখানে লেখকের দুর্ভাগ্যের রেখাগুলো মুছে ফেলার জন্য প্রকাশকের ভূমিকা মুখ্য হলে নৌকা ও জলের প্রকৃত মিলন ঘটবে। প্রকাশকের সংকটের সম্মুখে অবস্থান পাঠকের! প্রকাশক যদি প্রত্যাশামতো কোনো গ্রন্থে পাঠককে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হন, তবে তার দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নানা কথা আছে, নানা প্রশ্ন থাকবে। তবে শেষ ভরসার জমিটুকু কিন্তু পাঠকের পায়ে-পায়েই চিহ্ন এঁকে যায়। সংযোগের সুতা যত গিঁটহীন হবে, তত তার উপযোগিতা প্রকাশ পাবে। মিলনসূত্র হবে দীর্ঘস্থায়ী।

 তিন
বসে আছি উড়ো হাওয়ায়, আর মন ঘুরছে দূরে—প্রান্তরে। এবারের মেলায় কবিতার বই এসেছে অনেক। আর তা আসবেই। আবেগের কোনো শর্ত থাকে না, উচ্ছ্বাসের কোনো মর্ত্যলোক নেই। তাই যখন তারা যৌথভাবে কলাপাতায় বসে কিংবা দোয়েলের চঞ্চুতে ঠাঁই পায়, তখন কর্ণ ধ্বনিময় হয়, শব্দ বেজে ওঠে, আর বাক্য মনোজগতে প্রতিভাত হয় নব উপকরণে। কবি তাঁর বোধ ও বিস্তারের যৌথ বিহারে পাঠককে সম্পৃক্ত করেন অনন্তের যাত্রারথে। বিপত্তির অংশটুকু এই, যা ‘না’, তাকে ‘হ্যাঁ’ করার প্রক্রিয়ায় যথাযথ রসায়ন প্রায়শ ঘটে না। ফলে প্রাচুর্যের মধ্যেও থেকে যায় অনেক শূন্যতা, কবিতার আঙুলগুলোর মেলে না সঠিক তারের স্পর্শ। প্রকৃতি প্রকৃত বাজে না। কিন্তু এমনটি তো প্রত্যাশা ছিল না। কবিতা ভরিয়ে দিক ভুবনের জড় ও চৈতন্য, কবিতার আনন্দে উদ্ভাসিত হোক মঙ্গলসূত্র!

 চার
গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ মিলিয়ে চর্চার গদ্যাংশটুকু দর্শন-বিজ্ঞান-সমাজতত্ত্ব-ইতিহাস-ভূগোল নিয়ে চলাচল করে। যে চাওয়া সৃষ্টিতে, তার রূপ প্রকাশে সহায়তা করবে, তাই-ই তো কাম্য। কিন্তু কোথায় যেন হিসাব মেলে না! পরিধি বিস্তৃত করে শিকড় থেকে ফল পর্যন্ত পৌঁছাতে কোথায় যেন বেলা কিংবা অবহেলা, বোধ কিংবা বিধান, জাগরণ কিংবা স্বপ্ন পরতে পরতে বাধাগ্রস্ত হয়। এ যেন ‘খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না’র মতো অবস্থা। বইমেলার উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে, আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিত্যবছরের কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে কর্মফলে পরিণত করতে কোথায় যেন কাঁটা ফুটছে। এ দায় কার? দায় আমাদের। নিষ্ঠা ও ভাষাপ্রেম, কর্তব্য ও দেশপ্রেম এবং শুদ্ধাচার ভবিষ্যতের ধর্মসূত্র হোক।

 পাঁচ
অনুবাদ নিয়ে নানা কথা। সাহিত্যের অনুবাদ থেকে বিজ্ঞান-দর্শনের অনুবাদের প্রসঙ্গটি বারবার উঠে আসছে। বিদেশি ভাষা থেকে বাংলায় রূপান্তরের বিষয়টি কাঁচাভাবে হলেও চলছে, কিন্তু বাংলা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তরের কাজটি প্রায় শূন্যের কোঠায়। ব্যক্তি-উদ্যোগে দু–চারখানা কবিতা-গল্প ইংরেজিতে রূপান্তরিত হলেও অন্য শাখায় কোনো কাজ হচ্ছে না বলা চলে। তবে পরিকল্পনামাফিক কিছু অনুবাদে বাংলা একাডেমি সহসাই হাত দেবে। আর সর্বপরিকল্পনায় যোগ্য মেধা চাই, চাই প্রকৃত সারটির উন্মোচন। তারুণ্যই পারে উদ্যোগের ভাগীদার হয়ে বিষয়টি ত্বরান্বিত করতে। বিজয়সূত্রের প্রারম্ভেই তাদের সাদর আহ্বান জানাই।

default-image

ছয়
বেশ কিছু শিশুতোষ গ্রন্থের মৌলিকত্বের প্রশ্নটি দীর্ঘদিন যাবৎ দোলা দিচ্ছে। এবারও বইমেলায় শিশুমানসের প্রকৃত প্রতিফলন নিয়ে বই প্রকাশে ঊনতা দেখা গেছে। অনুরাগে নয়, দায় থেকে আমাদের কর্তব্যটি সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সর্বভুল পরিহার করে আগামী প্রজন্মের জন্য চাই ভালো বই। প্রকৃত শিক্ষার জন্য উপযুক্ত বিদ্যা চাই। বিদ্যাসূত্রের ওপর ভর করেই দাঁড়াবে আগামী বাংলাদেশ।

সাত
চেতনার প্রতিফলন হোক, মানসম্মত বই হোক একুশে গ্রন্থমেলার মূল আদর্শ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গ করা মেলায় তাঁর ওপর বিস্তর বই প্রকাশিত হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। এই ‘হওয়া’কে যথার্থভাবে আমরা তুলে ধরতে চাই। বাংলা একাডেমি এ পর্যন্ত ২৬টি বই প্রকাশ করেছে এবং আগামী দিনে আরও ৭৪টি বই প্রকাশ করে মোট ১০০টি বই প্রকাশের কর্মপরিকল্পনা সম্পন্ন করবে। এ আমাদের শেষ কথা নয়। বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই হোক আমাদের যজ্ঞসূত্র।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন