বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১.

ডিসেম্বর ৩, ১৯৭১

পূর্ব পাকিস্তান

লীলা, ময়না পাখি আমার,

অনেক দিন তোমার খোঁজখবর পাই না। আমিও যে সময় করে তোমাকে লিখব, তার সুযোগ হচ্ছে না। আশা করি, ভালোই আছ। একটা পরীক্ষার কথা বলেছিলে। কী একটা প্রোগ্রামের কথাও শুনেছিলাম। কেমন কী হলো না হলো লেখো।

ঠিকই বলেছিলে তুমি, রাজনৈতিক বা মানবিক দিক তো আছেই, কোটির ওপরে শরণার্থী সামলানো, ওদের মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র দেওয়াও কঠিন কাজ। আমাদের অর্থনীতির কথাও তো ভাবতে হবে। যত দীর্ঘায়িত হতো এ যুদ্ধ, তত আমাদের ক্ষতি।

কৌশলগত যুদ্ধ বা চোরাগোপ্তা হামলা বেশ আগে থেকেই শুরু করেছি আমরা। তবে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলো এই কয়েক দিন। ইপিআর আর সাধারণ যোদ্ধা মিলেই মূলত মুক্তিবাহিনী। ওদের অধিকাংশই অপেশাদার, স্বল্প প্রশিক্ষিত। তবে প্রশিক্ষণ আর দক্ষতার ঘাটতি ওরা পুষিয়ে দিচ্ছে মনোবল আর সাহস দিয়ে। এমনকি এদের মেয়েরাও যুদ্ধ করছে বিভিন্ন ফ্রন্টে।

কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীন থাকলেও আমরা চলছি আমাদের ভারতীয় কমান্ডে, আর মুক্তিবাহিনীর চেইন অব কমান্ড আলাদা। এমন হলে সমস্যা তো একটু হয়ই, কখনো কখনো ওভারল্যাপিং হচ্ছে। তা ছাড়া অন্য ফ্রন্টগুলোর কথা জানি না, আমাকে যেন ঠিক প্রাণ খুলে গ্রহণ করছে না ওরা। ওদের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট হাবিবের আচরণে অন্তত তা-ই মনে হয়। যেন ওদের হয়ে আসা রান্নায় আমরা বাগার দিতে এসেছি। ওদের এত দিনের সংগ্রাম–রক্ত-জীবন-সম্ভ্রমের ফলটাকে যেন আমাদের কৃতিত্ব বলে চালাব!

তবু আমরা ভালো করছি। এরই মধ্যে ছোট দুটি শহর দখলে এসেছে। কালকের সাফল্যটা অবশ্য ছাড়িয়ে গেছে আগের দুটিকে। সীমান্ত থেকে শ দুয়েক মাইল ভেতরে ক্যাম্প। আরও ৫০-৬০ মাইল ভেতরের এই পাকিস্তানি ঘাঁটি। ভেবেছিলাম কষ্ট করতে হবে খুব। আদতে তা হলো না। ভোরের দিকে অতর্কিত আক্রমণ করেছি। ঘণ্টাখানেকের গোলাগুলি সামলাতে পারেনি পাকিস্তানিরা। অথচ শুরু থেকেই বলে বেড়াচ্ছে আমরাই নাকি বাঙালিদের নামে লড়ছি!

যা হোক, শত্রুমুক্ত শহরে ঢুকে সে কী উল্লাস মুক্তিবাহিনীর!

যুদ্ধের ময়দানে প্রায়ই লুটপাট–ভাঙচুর চালায় বিজয়ীরা। তাই খেয়াল রাখতে হলো, বিজয়োল্লাস যেন মাত্রা না ছাড়ায়।

নাশতা রেডি হতে সময় লাগছিল। ততক্ষণ বিশ্রাম।

একটু শুয়ে-বসে থাকলাম। গল্প-আড্ডা হলো। আবার গুছিয়ে নিতে হবে নিজেদের। পরবর্তী ঘাঁটির দখল নিতে হবে। দিশে না পেয়ে তারা আশ্রয় নেবে ঢাকায়। অন্যান্য রণাঙ্গন থেকেও এভাবে তাদের তাড়িয়ে আনবে যৌথবাহিনী। চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা হবে। সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, সরবরাহ বন্ধ, হার মানা ছাড়া তখন আর উপায় থাকবে না তাদের। সে দিন যত দ্রুত আসবে, তত দ্রুতই আমি ফিরতে পারব দেশে। আহা, সোনামণিটার মুখ দেখব! ঠিক নাকি মায়ের মতো হয়েছে।

তোমার বউদির শরীরটা নাকি খারাপ। দুশ্চিন্তা হয়।

যা হোক, নাশতার পর এগিয়ে গেলাম শহরের দিকে। যে স্কুলে ক্যাম্প করেছিল পাকিস্তানিরা, তার কাছের একটা দোচালা লম্বা টিনের ঘর থেকে মনে হলো কান্নার আওয়াজ আসছে। গেলাম ছুটে। দরজা খোলা হলো। কিন্তু কেউ বেরও হয় না, কান্নাও থামায় না। ঢুকতে তো পারি না, দরজায় দাঁড়িয়ে অভয় দিচ্ছি, কাজ হচ্ছে না। শেষে বয়সী কণ্ঠের একজন জানালেন, তার গায়ে কাপড় নেই। শুনে তো আমরা থ! তাড়াতাড়ি যার গায়ে যা ছিল, তা খুলে দিলাম। জড়িয়ে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে টলতে টলতে বেরিয়ে এল ওরা। পায়ের পাতায়, গোড়ালিতে, হাঁটুতে আঘাতের চিহ্ন, দড়ি বাঁধার দাগ। অনাহারে-অর্ধাহারে থেকেছে, অকথ্য অত্যাচার সয়েছে, দাঁড়াতেই পারছে না, এরা সব যাবে কোথায়? এদিকে বেশ শীত, সকালে তখন রোদ ছিল না, বাতাস ঠান্ডা। কম্বল-কাঁথা যা যা ছিল, তা জড়িয়ে দিলাম ওদের গায়ে। শুকনা খাবার ছিল, দিলাম। তারপর পাঠিয়ে দিলাম বেজ হাসপাতালে। যাওয়ার আগে এক নারী ছুটে এল আমার দিকে। ‘আল্লাহ তুমার ভালো করবে বাপধন’ বলে কাঁদতে লাগল। আমি সামলাতে পারলাম না। কত ভয়ংকর সময় পার করেছি এই সৈনিকজীবনে, কত যন্ত্রণার শিকার হয়েছি, কোনো দিন এমন লাগেনি। কান্না লুকাতে লুকাতে দেখি এমনভাবে তাকিয়ে আছে লেফটেন্যান্ট হাবিব, যেন ভেঙে পড়বে এখনই।

অন্যরাও আবেগাপ্লুত।

সকালের উল্লাস–উচ্ছ্বাস হারিয়ে গেছে নিমেষেই। প্রতিটা চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখে ঘৃণা। এ মুহূর্তে কোনো পাকিস্তানিকে পেলে ওরা নিশ্চিত ছিঁড়ে ফেলবে হাতে হাতে।

সামনে খুব বড় অভিযান, প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। তার আগে হল্ট করে আছি, সারা দিন নড়িনি আমরা। একটা জঙ্গলমতো জায়গায় ট্রেঞ্চ-বাংকার খোঁড়া হয়েছে, অপেক্ষা এখন পরবর্তী নির্দেশের।

বিকেলে কথা হলো হাবিবের সাথে। কান্নার ধকল সামলাতে পারেনি তখনো। চোখ ফোলা। এখানকারই ছেলে সে, শহরের পাশেই বাড়ি, স্বর্ণগ্রামে। বাবা প্রায়ই বলতেন গ্রামটার কথা, ওখানেই নাকি তার নাড়ি পোঁতা। বলতেন, সময় সুযোগ করে একবার ঘুরে আসবেন। দেখে আসবেন তার শৈশবের সময়টা সেখানে বেঁচেবর্তে আছে কি না। তার তো আর সে সুযোগ হলো না। হাবিবের বাবার নাম শুনে চমকে উঠলাম আবার। আজিজ মিয়া বাবার বাল্যবন্ধু। বাবার ঠোঁটেই যেন লেগে থাকত তার নামটা। পরিচয় পাওয়ার পর থেকেই অদ্ভুত একটা উপলব্ধি হচ্ছে, মনে হচ্ছে, হাবিব আমার ভাই। যুদ্ধ শেষ হোক, ওর সাথে স্বর্ণগ্রামে আসব, বাবা তখন নিশ্চয়ই আমার চোখ দিয়ে দেখবেন তার প্রিয় মাটি-জল।

আচ্ছা, রাত অনেক হলো, এবার রাখি।

মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে তাই ভাবলাম তোমাকে লিখি।

মোলায়েম একটা জোছনা ছড়িয়ে আছে। তাতে ভাসতে ভাসতে দূর্বাঘাসে নেমে আসছে শীতের শিশির। পাশে কোথাও হাসনাহেনার গাছ। সুগন্ধে আমার পাগল পাগল লাগছে। জানি তোমারও লাগবে। ড্যাফোডিলের দেশে এ গন্ধ নিশ্চয়ই তোমার নাকে জোটে না, পাঠিয়ে দিলাম।

ইতি

দাদাভাই

২.

বড়পা,

কোথায় আছিস, কেমন আছিস, জানি না। তবে খুব মনে পড়ছে তোর কথা, তোদের কথা। আমার ভাগনি সোনাটা কেমন আছে? ওর হওয়ার খবর শুনেও আসতে পারিনি, রাগ করে আছিস হয়তো। কিন্তু কী করব বল, পরীক্ষা চলছিল, ভেবেছিলাম শেষ করেই ছুটব। ছুটতে আমাকে হলো, কিন্তু রণাঙ্গনে। তারপর থেকে এই বারুদ আর বুলেট, ছোটা আর ছোটানো। একটু যে স্থির হয়ে দুটি কথা লিখব তোকে, তারও ফুরসত পাইনে। তাই বলে ভাবিস না তোকে ভুলে গেছি। মনে পড়বে না কেন? আলো ভুলে গেলে তো মানুষ দেখতেও ভুলে যায়। সত্যি, তোকে ছাড়া বাড়ির প্রায় সবাইকে আমার কাছে অন্ধকার লাগত। তোর বিয়ের পরও কিছু একটা করলেই মা বলত, ‘লাই দিয়ে তুই মাথা খাইছিস আমার।’ তুই-ই আমারে শিখাইছিলি, যা বলার তা যেন বলে দিই মুখে মুখে। ভেতরে হলুদ রেখে মুখে লাল-নীল আমি দেখাই না। লোকের চোখে তাই আমি আনকালচারড। শব্দটা যেন লেপ্টে আছে ভাগ্যে আমার, এখানেও শুনতে হয় প্রায়ই। গেরিলা যুদ্ধের সময় অন্তত তিনবার আমার লেগে গেছে কমান্ডারের সঙ্গে। মত ভিন্ন হলেও নিজেরাই তো, সামলে নেওয়া গেছে। তবে এখন ব্যাপারটা ভিন্ন।

ভারতীয় সৈন্যরাও লড়ছে আমাদের জন্য, ওদের শ্রদ্ধা করি। কালরাত্রির পর থেকেই সহযোগিতা আর সহমর্মিতার যে অনন্য নজির ওরা রাখছে, তার জন্য কৃতজ্ঞতারও শেষ নেই। কিন্তু কিছু ব্যাপার আমি নিতে পারি না। ওরা পেশাদার, গায়ে ভারী যুদ্ধসাজ। অথচ শুরু থেকেই খেয়াল করেছি, কোনো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় ওরা আগে যেতে চায় না। ইতস্তত করে বলে, ‘পেহলে তুম!’ তা যুদ্ধ যেহেতু আমাদের, আমাদেরই লড়তে হবে। লড়ি। তারপরও মাস তিনেকের ট্রেনিংয়ে যোদ্ধা হয়েছি, ভুলভ্রান্তি তো মানুষের হয়ই। হলে এমন নিচু চোখে তাকায়, সহ্য হয় না। এর মধ্যে এক কমান্ডারের কাজ-কারবার তো মানতেই পারতাম না। কাজে-অকাজে মাতব্বরি ফলাত। প্রতিটা কথা–কাজেই মনে করিয়ে দিত, ওরা আমাদের জন্যই লড়ছে। এ ছাড়া অভিযানের খুঁটিনাটি নিয়েও মতানৈক্য হতো প্রায়ই। যা হোক, ভালোই হয়েছে তার সঙ্গে এখন আর কাজ করতে হচ্ছে না। সঙ্গে থাকা মিত্রবাহিনীর এখন যিনি কমান্ডার...

বড়পা, মুভমেন্ট অর্ডার এসে গেছে। থাক, বেঁচে থাকলে পরে লিখব আবার।

***

একেই কি ভাগ্য বলে, আপা? চিঠিটা শেষ করতে পারলাম না, তোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কিন্তু এমন দেখা দেখব, তা তো আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। ছাপরা মসজিদ থেকে তোরা বের হলি যখন, মেয়েদের ওই দশা, ওই যন্ত্রণা, আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। হু হু করে কাঁদছি, হঠাৎ দেখি তুই। দেখতেই আমার কান্না শুকিয়ে গেল। মনে হচ্ছিল দম আটকে মারা যাব। গেলেই কি ভালো হতো না?

সত্যিই কি তুই চিনতে পারিসনি আমাকে? নাকি চিনেছিস, কিন্তু ধরা দিসনি আমার মতো?

তোর কি মনে আছে, বড়পা, মেজ ভাইয়া তোকে বাবলাগাছ আর আমাকে স্বর্ণলতা বলত? মা আর তুই—দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বললে সব সময় আমি তোকেই নিয়েছি। আজই প্রথম উল্টোটা করলাম। দেশ তো মা-ই, তা–ই না? তা ছাড়া যুদ্ধ শেষ না করে থামলে তোরই কি ভালো লাগত?

এখন অবশ্য মনে হচ্ছে, তোকে ওই অবস্থায় ফেলে এসে ভুল করেছি।

না, ভুল না, আমি অন্যায়ই করেছি। আমাকে ক্ষমা করিস না।

ইতি

তোর হাবু

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন