ধীরেন্দ্রনাথের মাটি

‘রক্তে আঁকা ভোর’—আনিসুল হকের ‘যারা ভোর এনেছিল’ উপন্যাসধারার শেষ খণ্ড। প্রথমা প্রকাশন থেকে সেপ্টেম্বরের পয়লা সপ্তাহে প্রকাশিত হচ্ছে বইটি। মোট ছয় খণ্ডে প্রকাশিত মহাকাব্যিক এই আখ্যানধারায় ধরা আছে বাঙালির জাগরণের ইতিহাস। প্রকাশিতব্য ‘রক্তে আঁকা ভোর’ উপন্যাসের কালপর্ব ১৯৭১–এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় থেকে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরা। এই অনুপম উপাখ্যানের একটি মর্মস্পর্শী অংশে রয়েছে দেশের জন্য শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মবলিদান। প্রকাশিত হলো সেই অধ্যায়টি।

এই মাটি ছাইড়া আমি কোথাও যামু না। কারে বলে দ্যাশ? এই মাটিই আমার দ্যাশ। কুমিল্লার বাড়িতে লাগানো সুপুরিগাছের গোড়ার মাটিতে খুরপি চালাতে চালাতে তিনি আপনমনে বিড়বিড় করছিলেন। নিজ হাতে কতগুলো নারকেল আর সুপুরির চারা লাগিয়েছেন কিছুদিন আগে। এগুলো এখনো মাটিতে শিকড় ছড়িয়ে শক্তপোক্ত হয়নি।

এই গাছগুলোকে বাঁচাতে পরিচর্যা দরকার। কিন্তু সেই যে চারপাশে এত আম, জাম, কাঁঠাল, কদম, হিজলগাছ আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে, মাটির গভীরে শিকড় ছড়িয়েছে, এদেরকে যদি জিজ্ঞেস করি, তোমাদের দেশ কী, ও গাছ ভাইয়েরা, ওরা কী বলবে? যাবে তোমরা নিজের দেশে? একটাই দেশ ছিল, এখন ভাগ হয়ে গেছে। এইটা আর তোমাদের দেশ না? ও বকুলগাছ দিদি, ও অশ্বত্থ দাদা, যাইবা আমগো সাথে, ওই পারে?

১৯৪৭ সালে একষট্টি বছরের বৃদ্ধ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হাসেন। তাঁর সাদা চুল। যেন বকুলগাছ নয়, তাঁর হাসি বকুল ঝরায়। এই মাটি ছাইড়া আমি কোথাও যামু না। এই মাটিই আমার দ্যাশ। এই আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি, এই আমার কুমিল্লার মাটি। এই আমার পূর্ব বাংলার মাটি। রমেশ পানির ঝাঁঝরি এনে তাঁর পাশে দাঁড়ালে তিনি গাছের গোড়ায় পানি ঢালেন, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গাছের পাতাতেও পানি ঢালেন।

গাছের পাতারা জলের সোহাগ পেয়ে ঝকমকিয়ে ওঠে, ধীরেন্দ্রনাথ সেই হাসিটুকু যেন দেখতে পান।

শিল্পী : কাইয়ুম চৌধুরী

রমেশ লোকটা তাঁর পুরোনো ভৃত্য, ঘাড়ে গামছা, পরনে ধুতি, কুচকুচে কালো গায়ের রং, চামড়া ফাটা, তার বয়স পঁয়তাল্লিশও হতে পারে, পঁয়ত্রিশও হতে পারে, সে তার বাবুর এই স্বভাব জানে, গাছের সঙ্গে, মাটির সঙ্গে কথা কন তিনি। ধীরেন্দ্রনাথ বলেন, ‘রমেশ, এই যে ছোট সুপারিগাছের চারা, নারকেলগাছের চারা, এইগুলান তুইলা লইয়া গিয়া কলকাতায় মাটিতে লাগাইলে বাঁচব না?’

‘বাঁচতেও পারে বাবু।’
‘কিন্তু বড়গুলানরে লইয়া যাওন যাইব? ওই বটগাছটারে যদি তুইলা লইয়া যাই?’
রমেশ হাসে। তাঁর দাঁত কালো, পান-তামাক নানা কিছু খেয়ে দাঁতের বারোটা বাজিয়েছে সে।
‘বড়গাছ কি আর তোলন যাইব বাবু! কাইটা-চিইরা তক্তা লইয়া যান।’
‘তাইলে আমরা বড় মানুষগুলান, কই যামু? এইহানে থাকুম নাহি কলকাতা যামু?’
রমেশ আবার দাঁত বের করে। বড় কালো ওর দাঁতগুলো।

‘শোনো, করাচি গেছিলাম না? মুহম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণটা শুইনা, কইলজাটা ঠান্ডা হইছে। আসলে তো হেও কংগ্রেসই করত। শিক্ষিত লোক। সেক্যুলার আছে।’

‘জিন্নাহ কী কইছে?’ রমেশ নারকেলগাছের চারার ওপরে পানি ঢালতে ঢালতে শুধায়।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মনে পড়ে জিন্নাহর প্রথম বক্তৃতাটা। করাচিতে গণপরিষদ সম্মেলনে তিনি প্রথম দিয়েছিলেন এই ভাষণটা। ‘যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তান কখনোই এমন ধর্মরাষ্ট্রের পরিণত হবে না, যা কিনা ধর্মযাজকেরা পারলৌকিক মিশন নিয়ে শাসন করে থাকে। আমাদের আছে অনেক অমুসলিম—হিন্দু, খ্রিষ্টান, পারসি, কিন্তু তারা সবাই পাকিস্তানি। তারা অন্যদের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে এবং পাকিস্তান বিষয়ে তারা পূর্ণ অধিকার নিয়ে ভূমিকা পালন করবে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা শুরু করছি এমন একটা কালে, যখন কোনো বৈষম্য নেই, কোনো সম্প্রদায়ের তুলনায় আরেকটা সম্প্রদায়কে আলাদা করা হয় না, বর্ণের কারণে, গোত্রের কারণে কারও প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা হয় না। আমরা শুরু করতে যাচ্ছি এই মৌলনীতি অবলম্বন করে যে আমরা সবাই একটা রাষ্ট্রের নাগরিক এবং সম-অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।’

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

এই কথা শুনে আসার পরে ধীরেন্দ্রনাথ কি এই কুমিল্লা ছেড়ে, এই পূর্ব বাংলা ছেড়ে কলকাতা যেতে পারেন?

‘আমি এই মাটির পোলা, আমি এই আমগাছের মতো, এই বটগাছের মতো, আমারে তোমরা আর কোথাও লইতে পারবা না। আমি এই মাটির সাথে হামাগুড়ি দিয়া মাটি ধইরা আঁকড়াইয়া থাকুম।’

‘রক্তে আঁকা ভোর’–এর প্রচ্ছদ

রমেশ আবার তার কালো দাঁত বের করে।
মাটির কথাই ধীরেন্দ্রনাথকে বলতে হয়। কংগ্রেসি ছিলেন তিনি। গান্ধীবাদী ছিলেন। জেল খেটেছেন স্বদেশি করতে গিয়ে। স্বদেশ হিসেবে পেয়েছেন পাকিস্তানকে। মাটির গন্ধ তাঁর গা থেকে যায় না। পাস করা উকিল। ওকালতিই তাঁর ব্যবসা। কিন্তু কথা বলতেন মাটির টানমাখা বুলিতে।

মাটি অথবা মা-টি। দুটোই তো মা। ভাষা, সে-ও তো মা-ই। মায়ের ভাষা—আমরা বলি না?
তো, ১৯৪৮ সালের বসন্তকালে, ফাল্গুন মাসে, কুমিল্লায় কি ঢাকায় যখন পলাশ ফুটেছে, কোকিল ডাকছে, দক্ষিণা সমীরণ বইছে, তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য, তাঁর মাটির কথা, কিংবা
মা-টির কথা পেড়ে বসলেন পার্লামেন্টে। জিন্নাহ তখন সভাপতিত্ব করছিলেন গণপরিষদে। পার্লামেন্টে একটা বিধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিধিটা কী? ‘গণপরিষদে সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজির সঙ্গে উদু‌র্ও বিবেচিত হবে।’ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নোটিশ দিলেন। একটা ছোট্ট, খুবই ছোট্ট সংশোধনী আছে তাঁর। ফ্লোর পেলেন দুদিন পর।

রক্তে আঁকা ভোর
আনিসুল হক
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
৫৮৪ পৃষ্ঠা
দাম: ১০৫০ টাকা।prothoma.com–থেকে এখন হ্রাসকৃত মূল্যে বইটি প্রি-অর্ডার করতে পারেন আপনিও। প্রি-অর্ডারে দাম: ৭৫০ টাকা।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। পায়ের নিচে তাঁর করাচির গণপরিষদ ভবনের পাথুরে মেঝে, কিন্তু কেত্থেকে যেন তিনি পাচ্ছেন তাঁর কুমিল্লার মাটির গন্ধ, তাঁর মনে হলো, তিনি বৃক্ষ হয়ে উঠছেন, এবার তাঁর শিকড় তাঁর পায়ের নিচে চাড়া দিচ্ছে, জানান দিচ্ছে তাঁর পায়ের নিচে মাটি আছে, তাঁর রক্তের মধ্যে মা আছে, ভাষা আছে—তিনি বললেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, স্যার, আমার সংশোধনী: ২৯ নম্বর বিধির ১ নম্বর উপবিধির ২ নম্বর লাইনে “ইংরেজি” শব্দের পর “অথবা বাংলা” শব্দ দুটি যুক্ত করা হোক।’

বাংলার বসন্তকালের সমস্ত শিমুল আর পলাশ আর আম আর জামগাছের মুকুলগন্ধমাখা ডালপালা-পাতার ফাঁক থেকে এক কোটি কোকিল কুহু কুহু বলে ডেকে উঠল।

ধীরেন্দ্রনাথ বললেন, ‘আমি এই সংশোধনীটা ক্ষুদ্র প্রাদেশিকতার মানসিকতা থেকে উত্থাপন করিনি। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ছ কোটি নব্বই লাখ। এর মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লাখ কথা বলে বাংলায়। তাহলে স্যার দেশের রাষ্ট্রভাষা কোনটি হওয়া বাঞ্ছনীয়।...স্যার, এই জন্য আমি সারা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মনোভাবের পক্ষে সোচ্চার হয়েছি। বাংলাকে একটা প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এই বাংলা ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।’

পূর্ববঙ্গের সাধারণ সদস্য প্রেমহরি বর্মণ তাঁকে সমর্থন করলেন।
প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর বক্তব্য হলো, ‘এটা আসলে কোনো নিরীহ সংশোধনী নয়, এটা হলো পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা বিনষ্ট করা। পাকিস্তান একটা মুসলিম রাষ্ট্র। এ জন্য মুসলিম জাতির ভাষা উদু‌র্কেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।’

উঠে দাঁড়ালেন ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত। তিনিও পূর্ববঙ্গের সদস্য। বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এমন কিছু মন্তব্য বেছে বেছে করেছেন, যা তিনি না করলেও পারতেন।’

পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বললেন, ‘আমি নিশ্চিত, পাকিস্তানের বিপুল জনগোষ্ঠী উদু‌র্কেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে।’
পূর্ববঙ্গের শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বললেন, ‘পাকিস্তান একটা মুসলিম রাষ্ট্র, এই কথাটা পরিষদের নেতার মুখে শুনে দুঃখ পেয়েছি খুব। এত দিন পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল, পাকিস্তান গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্রে মুসলিম আর অমুসলিমদের সমান অধিকার।’
ভোটে উঠল সংশোধনীটা। পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি কণ্ঠভোটে দিলেন প্রস্তাবটা। মোট সদস্য ৭৯ জন। ৪৪ জন পূর্ব বাংলার।
কিন্তু কণ্ঠভোটে ধীরেন্দ্রনাথের প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেল।

এক কোটি কোকিল তীব্রস্বরে ডেকে উঠল পূর্ব বাংলায়। এক লাখ শিমুল মাথা ঝাঁকাল। এক লাখ পলাশ পাপড়িতে আগুন জ্বালাল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল আর পুরান ঢাকার নানা স্কুল থেকে ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়তে লাগল স্লোগান দিতে দিতে—পাখির ঠোঁটে ঠোঁটে বার্তা রটে গেল, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। সেই ১৯৪৮-এর ফাল্গুনেই। ১১ মার্চ হরতাল। পিকেটিং করতে হবে। ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবের জলদগম্ভীর কণ্ঠ বেজে উঠলে অলি আহাদ সমর্থন দিলেন। তোয়াহা, শওকত, শামসুল হক, অধ্যাপক আবুল কাশেম, নাইমুদ্দিন, আবদুর রহমান চৌধুরী, কামরুদ্দীন, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল—হরতালের দিনে কে কোন জায়গায় পিকেটিং করবেন, দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়ে গেল।

মাটির টানটা ধীরেন্দ্রনাথের কথাবার্তায় ছিল সর্বক্ষণই।’৪৮ সালেই ময়মনসিংহ শহরে এক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে আগের বক্তা মালেক সাহেবের ‘দেশে আরেকটা তুলাধুনার ব্যবস্থা হওয়া উচিত’—এই বক্তব্যের পরে তিনি বললেন, ‘এই তো মাত্র দেশে বহুত তুলাধুনা হইয়া গেল, কিন্তু তাঁর রেশ তো এখনো শেষ হইল না। কাজেই এমন ব্যবস্থা করতে হইবে, যাতে হিন্দু-মুসলমান, আমরা বরাবর যে রকম মিইলা-মিইশা কাজ কইরা যাইতাছি, ইংরেজের বিরুদ্ধে মিইলা-মিইশা সংগ্রাম কইরা তারারে তাড়াইছি, এইভাবে মিইলা-মিইশাই আমরা আগাইয়া যাইব, এই সম্প্রীতি কিছুতেই নষ্ট হইতে দেওন যাইব না।’

ধীরেন্দ্রনাথকে আজ বড় শান্ত দেখায়। তিনি সন্ধ্যার সময় মাথা ধুলেন। নাতনিকে ডেকে এনে বললেন, ‘ওই কালো চামড়ায় মোড়া বইটা দাও তো দিদি।’ বইটা এনে দিল নাতনি। তিনি পাতা ওলটালেন। লাল পেনসিল দিয়ে দাগ দিলেন কয়েকটা বাক্যে। বললেন, ‘শোনো, কী লেখা এখানে, দেশের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিলে সে মরে না, সে শহীদ হয়। সে অবিনশ্বর, তাঁর আত্মা অমর।’

কথায় মাটি গন্ধ। মগজে মাটির নেশা। কতজন উকিল কুমিল্লা ছেড়ে চলে গেল কলকাতায়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গেলেন না। মন্ত্রী হয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমানের মন্ত্রিসভায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। তো মন্ত্রী তো তিনি কলকাতাতেও হতে পারতেন। হয়তো মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন, ডেপুটি লিডার ছিলেন কংগ্রেসের। মুখ্যমন্ত্রী না হলেও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী তো হতে পারতেনই।

কিন্তু কুমিল্লার মাটি, মেঘনা কি তিতাসের জল তাঁকে আবিষ্ট করে রাখল। এই মাটিই যে তাঁর দেশ।

১৯৭০-এ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা বলল, কলকাতায় চলে যাও। মেয়ে পুতুল বলল, ‘বাবা, দেশে যদি একটা কিছু ঘটে যায়, তোমাকেই তো বাবা সবার আগে মারবে।’

‘রক্তে আঁকা ভোর’–এর লেখক আনিসুল হক

তিনি বললেন, ‘তোরা শুনবি তোগো বাবারে গুলি কইরা রাস্তায় ফেইলা রাখা হইছে। শকুনি আমার দেহটা খাইতাছে। তবু তো ভালো প্রাণীর খাদ্য হমু। জীবন এইভাবে শেষ হইলে তবু একটা মূল্য থাকে।’

সেই কথা শুনে রমেশ কেঁদে উঠেছিল। পুতুল বলেছিল, ‘কাকু, কেঁদো না তো। বাবাকে তো চেনোই। সেই স্বদেশি আমল থেকে জেলখাটা মানুষ।’
রমেশ বলল, ‘কোথাও সইরা থাকলেই তো হয়।’
‘এই মাটি ছাইড়া আমি কই যামু রমেশ? ’ ৮৫ বছরের বৃদ্ধ অকম্পিত স্বরে বললেন।

নির্যাতন শুরু হলো ৮৫ বছরের ওই বৃদ্ধের ওপরে। এই বৃদ্ধই সব নষ্টের গোড়া। আজ থেকে ২৪ বছর আগে করাচির পার্লামেন্টে এই মালাউনই প্রথম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলে। এ বছর, ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতেও শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে বেইমান শেখ মুজিব এই ধীরেন্দ্রনাথের নাম নিয়েছে। ওকে পেটাও।

২৯ মার্চ ১৯৭১। কুমিল্লা শহরে কারফিউ। চারদিকে নিস্তব্ধতা। শিমুল ফুল ফেটে গিয়ে তুলো বীজ উড়ছে, তার শব্দও যেন পাওয়া যাবে, এমনই নিস্তব্ধতা। থেকে থেকে ফৌজি গাড়ি ছুটছে আর তার পেছনে ধেয়ে যাচ্ছে নেড়িকুকুরের দল।

ধীরেন্দ্রনাথকে আজ বড় শান্ত দেখায়। তিনি সন্ধ্যার সময় মাথা ধুলেন। নাতনিকে ডেকে এনে বললেন, ‘ওই কালো চামড়ায় মোড়া বইটা দাও তো দিদি।’ বইটা এনে দিল নাতনি। তিনি পাতা ওলটালেন। লাল পেনসিল দিয়ে দাগ দিলেন কয়েকটা বাক্যে। বললেন, ‘শোনো, কী লেখা এখানে, দেশের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিলে সে মরে না, সে শহীদ হয়। সে অবিনশ্বর, তাঁর আত্মা অমর।’

পুত্র আর পুত্রবধূদের ডাকলেন তিনি। বললেন, ‘আজ রাতেই ওরা আমাকে নিয়ে যাবে।’ রমেশের চোখ দিয়ে দরদরিয়ে জল গড়াতে লাগল। সুপুরিগাছগুলো বড় হয়েছে। নারকেলগাছে নারকেল ধরেছে।

রাত বাড়ছে। কুকুরের আর্তনাদ আসছে কানে। রাত দেড়টায় বাড়ির সামনে এসে থামল পাকিস্তানি সৈন্যদের ট্রাক। ধরে নিয়ে গেল ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আর তাঁর ছোট ছেলে দিলীপ দত্তকে।

ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হলো তাঁদের। ওটা ততক্ষণে কসাইখানায় পরিণত হয়েছে। বাঙালি সৈন্য ও অফিসারদের মারা হয়েছে নৃশংসভাবে।

নির্যাতন শুরু হলো ৮৫ বছরের ওই বৃদ্ধের ওপরে। এই বৃদ্ধই সব নষ্টের গোড়া। আজ থেকে ২৪ বছর আগে করাচির পার্লামেন্টে এই মালাউনই প্রথম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলে। এ বছর, ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতেও শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে বেইমান শেখ মুজিব এই ধীরেন্দ্রনাথের নাম নিয়েছে। ওকে পেটাও।

বেশি প্রহার দরকার ছিল না। হাঁটুর হাড় মড়মড় করে ভেঙে গেল। তবু থামে না নির্যাতন। চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো কলম। যেন এই চোখে সে আর কোনো দিনও বাংলা বর্ণমালা দেখতে না পায়। দুহাতের নখ উপড়ে ফেলা হলো। চোখের পাতা টেনে ছিঁড়ে ফেলা হলো।

ক্যান্টনমেন্টের একজন নাপিত দেখতে পেল, বুড়ো মানুষটি হামাগুড়ি দিচ্ছেন, একটু আড়ালে সরে যাচ্ছেন মলত্যাগ করবেন বলে। একাত্তরের বসন্তে, চৈত্রের শেষ দিনে নাকি পয়লা বৈশাখে তিনি হামাগুড়ি দিয়ে পাকা শান ছেড়ে চলে এলেন মাটিতে। মাটি আঁচড়ালেন। মাটি মাখলেন চোখে-মুখে-মাথায়।

শিল্পী : কাইয়ুম চৌধুরী

নাপিতটা ভাবল, মলত্যাগ করতেই এসেছেন। কিন্তু এবার তিনি মলত্যাগ করতে আসেননি। তিনি বিড়বিড় করলেন। বললেন, ‘এই মাটিই আমার মা। এই মাটিই আমার দেশ। এই মাটি আমার মা-টি। তাঁর ভাষাই আমার মায়ের ভাষা। মাটি, আমি তোমারে নিলাম। মা-টি, তুমি আমারে লও।’
তিনি মাটিতে দেহ রাখলেন।
পাকিস্তানি সৈন্যরা আরও আরও বাঙালি সৈন্য আর বেসামরিক মানুষের সঙ্গে তাকে পুঁতে ফেলল মাটিতেই।

রমেশ আর্তনাদ করে। কোনোরকমে কুমিল্লা ছেড়ে আগরতলা পাড়ি দিয়ে রমেশ নিজের প্রাণটা বাঁচায়। তারও বয়স হয়েছে। চোখে ঠিকমতো দেখতে পায় না। দাঁত পড়ে গেছে। কিন্তু সে তো বেঁচে আছে। তার মনিব ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়েছিল, সেই কথাটা আকাশে-বাতাসে ১৯৭১-এ খুব শোনা গেল। রমেশও শুনল। কতজনের মুখ থেকে! তারা বলল, উনি হামাগুড়ি দিতেন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য, আড়াল খোঁজার জন্য।

রমেশ বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি জানি ক্যান বাবু হামাগুড়ি দিচ্ছিল। মাটি ধরার জন্য। ভগবান তাঁর ইচ্ছা পূরণ কইরাছে, তিনি মাটিতেই মিইশা গেছেন।’