default-image

আমি যখন চারুকলায় ভর্তি হই, তখন থেকেই সেখানে সরকারবিরোধী আন্দোলন হতো। এগুলো ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু হয়েছিল। তখনকার ছাত্র ও শিক্ষকেরা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতেন। এগুলো দেখে ধীরে ধীরে আমি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে শুরু করলাম। আমি ১৯৬৩ সালে চারুকলায় ভর্তি হই। তখন আমি আজিমপুরে থাকতাম। আমরা প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করতাম, কীভাবে কী করা যায়। তখন আন্দোলন দিন দিন বাড়ছে। পাকিস্তানিদের কার্যকলাপও সন্দেহজনকভাবে দেখছি। একদিন সরকারবিরোধী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়লাম।

২৬ মার্চ যুদ্ধ শুরু হলো। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলো। তখন আমি প্রায়ই বন্ধু হারানের বাসায় যেতাম। তারপর ভেবে দেখলাম, দিন দিন অবস্থা তো খারাপ হচ্ছে। আমার একটা আলাদা রুম ছিল। সেখানেও বিভিন্ন লোক আসত। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা কী করতে পারি, এ ব্যাপারে আলোচনা হতো। একসময় আগরতলায় একটি ক্যাম্প তৈরির কথা ভাবলাম। একদিন এক সহকর্মীসহ তিনজন আমরা রওনা হলাম আগরতলার দিকে। সীমান্ত পেরিয়ে মেলাঘর ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছালাম।

আমরা যখন পৌঁছালাম, তখনো আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্প শুরু হয়নি। কয়েকজন কেবল নাম লিখিয়েছে। তখন আমরা স্কুল–কলেজে শরণার্থীদের মতো থাকা শুরু করলাম। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমরা অনেক অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় ঢুকেছিলাম। মোট চারজন। এসএলআর চারটা, স্টেনগান চারটা, অ্যামো(গুলি) কয়েক কেজি, গ্রেনেড ইত্যাদি নিয়ে ঢুকেছিলাম। অস্ত্রগুলো আমরা বাকের আলীর বাসায় রেখেছিলাম। পরিকল্পনা ছিল, সেগুলো বাকেরের এক আত্মীয়ের সাহায্যে বাড্ডায় ঢোকানো হবে। হয়তো সেখান থেকে কিছু অস্ত্র পরে আলতাফ ভাইয়ের বাসায় নেওয়া হয়েছিল। আলতাফ ভাইয়ের বাসায় অবশ্য কিছু অস্ত্র আগেই ছিল। আমরা যখন চলে যাব বলে ভাবছি, তখন আলতাফ ভাই আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তাঁর বাসায় গেলাম। তিনি বললেন, আমার এক বন্ধু বিপদে পড়েছে। তুমি তো ক্যাম্পেই ফিরে যাচ্ছ, তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যাও। আমি বললাম, ঠিক আছে।

বিজ্ঞাপন

সেদিন রাত হয়ে গিয়েছিল। আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ঠিক উল্টো দিকে থাকতাম। যেহেতু সন্ধ্যার পরপরই কারফিউ জারি হতো, তাই সেদিন তাঁর বাসায় থেকে গেলাম। আমার সেই রাতে ফতেহ আলীর বাসায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমি যেতে পারিনি। আর কোনো খবরও ফতেহ আলীকে পাঠাতে পারিনি। তাই চিন্তায় রাতে আমার ঘুম হয়নি। সকালবেলা শুনলাম চারদিকে বুটের আওয়াজ। দরজায় দমাদম বুটের শব্দ। আমি উঠে পড়লাম। তখনো ভাবছি দরজা খুলব কি না। তখন দেখি আলতাফ ভাই ভেতর থেকে চলে এসেছেন। বললেন, তোমার খোলার দরকার নাই। আমি খুলছি। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আর্মিরা ঢুকল। রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করল আলতাফ ভাইকে। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। সব আর্মি ঘরে ঢুকে পড়ল। রাইফেলের বাঁট দিয়ে আমাদের মারল, লাথি দিল। এরপর সবাইকে বারান্দায় নিয়ে এল।

আমাদের ওখানে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। শুধু আলতাফ ভাইকে জিজ্ঞেস করল, আলতাফ মাহমুদ কোন হ্যায়? তিনি বললেন, আমিই আলতাফ। পাকিস্তানিরা জিজ্ঞেস করল, কোথায় অস্ত্র রেখেছ? তাতে বোঝা গেল, তারা সবকিছু জেনেই এসেছে। এরপর আলতাফ ভাইকে বাড়ির পেছনে নিয়ে গেল। বলল, অস্ত্র কোথায় রেখেছ? তারপর দেখলাম, পেছন থেকে একটা কালো বড় ট্রাংক নিয়ে আসা হলো। মাটির নিচে রাখা ছিল ওটা। অস্ত্র ভর্তি। আমার কাছে অবাক লাগল, আলতাফ ভাই কোন সাহসে নিজের বাসায় এই অস্ত্র রেখেছিলেন।

আমাদের সবাইকে একত্র করা হলো। নিয়ে আসা হলো অস্ত্রগুলো। এরপর আমাদের নিয়ে মার্শাল ল কোটে গেল। এখন যেটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ওটাই তখন অ্যাসেম্বলি ছিল। অ্যাসেম্বলির পাশেই সদস্য ভবন ছিল। ওখানে ছিল মার্শাল ল কোর্ট। ছিল টর্চার শেলও। শুরু হলো টর্চার। আলতাফ মাহমুদকে আগে নিয়েছে। এরপর আরও দু–তিনজনকে নিয়েছে। তারপর আমার ডাক পড়ে। ওরা তো কারও নাম জানে না। দরজার কাছে যে থাকে, তাকেই আগে ডাকে। হঠাৎ করে দেখি, একজন এসে জিজ্ঞেস করছে, আলভী কে? তখন আমি একটু ঘাবড়ে গেছি। কারণ, কাউকেই নাম ধরে ডাকেনি। সেখানে অনেকেই ছিল। কেউ কেউ পরিচিতও ছিল। কারণ, সেদিন রাতে আট–নয়জন মুক্তিযোদ্ধার বাসায় রেড দেওয়া হয়েছিল। ধরা পড়েছিল অনেকেই। আমাদের আগে রুমি, রুয়েল, বদিরা ধরা পড়েছে।

আলতাফ ভাইকে নেওয়া হলো সেলে, তাঁর ওপর অত্যাচার, নির্যাতন করা হলো। আমরা সে অত্যাচারের আওয়াজ শুনতে পেলাম। তারপর আমাকে ডেকে নেওয়া হলো। আমাদের অস্ত্রগুলোর বিবরণ দিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কত তারিখে ঢুকেছ? বললাম, আমি কখনো বর্ডারে যাইনি। আমি এখানেই চাকরি করি। তারা বলল, তোমার বন্ধু কিন্তু ধরা পড়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে ধরা পড়েছে? তখন ফতেহ আলীর নাম বলছে, বাকেরের নাম বলছে। মানে আমরা যে চারজন ঢুকেছিলাম, তাদের সবার নামই জানে। তখন নিশ্চিত হলাম, আমাদের কেউ ধরা পড়েছে। কিন্তু কে ধরা পড়েছে, তা বুঝতে পারছি না। এটুকু বুঝতে পারছি যে ধরা পড়েছে, তার থেকে এই তথ্য পেয়েছে। তা না হলে আমরা কতগুলো অস্ত্র নিয়ে ঢুকেছি, তা সঠিকভাবে জানার কথা নয়। আমাকে ভীষণভাবে মারল বেত দিয়ে, রক্তাক্ত করল, তারপর নখগুলো উপড়ে ফেলল। আলতাফ ভাইয়ের ওপর তো তখনো চরম নির্যাতন চলছে।

আমি ঠিক করলাম, আমাকে সবকিছু অস্বীকার করতে হবে। কিছুক্ষণ পরে দেখি, বাকেরকে নিয়ে আসছে। তার শরীর রক্তাক্ত। তাকাতে পারছে না। শুধু দেখলাম করুণভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছে এবং মাথা ঝুলিয়ে হ্যাঁ-সূচক ভঙ্গি করল। তখন আমি নিশ্চিত হলাম, কে ধরা পড়েছে। এরপর আমার ওপর অত্যাচার বেড়ে গেল। কিন্তু তখনো আমি অস্বীকার করছি, আমি ওকে চিনি না। ও ভুল করছে। অন্য কারোর সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ওরা কি বিশ্বাস করে! অত্যাচার চলতেই থাকল। তখন আমি ঠিক করেছি, যেহেতু ওরা আমাকে চিনেই ফেলেছে, যতক্ষণ পারি অস্বীকার করেই যাব। এভাবে ওই দিনটা গেল। রাতে আমাদের নিয়ে গেল রমনা থানায়। গিয়ে দেখি, ওখানে আগে থেকে অনেকেই আছে। বেশির ভাগই চাকরিজীবী। আবার চোর বা পকেটমাররাও আছে। খুব অবাক লাগল, যখন আমাদের রেখে আর্মি চলে গেল, কোথা থেকে যেন পেইনকিলার, ব্যান্ডেজ, আয়োডেক্স ইত্যাদি বের হলো। এগুলো সবাই পেল। আরও অবাক করা ব্যাপার, যাদের আমরা মূল্যায়ন করি না মানে চোর, পকেটমার—তারা গামছা খুলে মেঝে পরিষ্কার করে দিল। যাতে আমরা ওখানে বসতে পারি। তখনো আমাদের সারা শরীর রক্তাক্ত।

পরদিন সকালে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। এবার আরও বড় পদের চারজন এসেছে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। আলতাফ ভাইসহ সবাইকে ডাকল। আলতাফ ভাইয়ের বাসা থেকে যাদের ধরে নিয়ে এসেছে, তাদেরকেও কাগজ ধরে ধরে ডাকছে। কিন্তু আমাকে আর ডাকে না। আমি অবাক হলাম। আমার মনে হলো, কাগজে লেখা রিপোর্ট ধরে ডাকছে। কোনো কারণে রিপোর্টে আমার নাম ছিল না। আমার এটাও খেয়াল আছে, যখন আমাকে অত্যাচার করার জন্য পাশের রুমে পাঠানো হচ্ছিল, তখনো আমি অস্বীকার করছি। আমি সব সময় বলেছি, আমি ওদের চিনি না। আমি কখনো বর্ডারের কাছে যাইনি। সে সময় কিছু একটা আমার নামে লিখেছিল আর্মিরা। কিন্তু আমি বারবার অস্বীকার করার কারণে কাগজটি ছুড়ে ফেলে দিল। তখন আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার নাম কী। আমি বললাম, আমার নাম সৈয়দ আবুল বারক। আলভী বললাম না। কারণ, ওখানকার সবাই আমাকে আলভী নামেই চেনে। আমি অনেকটা ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেলাম।


অনুলিখন: কাজী আকাশ

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন