default-image

আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পকলা ভুবনের এক ব্যতিক্রমী বিশিষ্টজন আবুল হাসনাত বড় আকস্মিকভাবে চলে গেলেন এই মর্ত্যলোক ছেড়ে। তাঁকে ব্যতিক্রমী বলছি, কারণ, বাহ্যিকভাবে দেখলে সাহিত্য–অন্তঃপ্রাণ এই ব্যক্তিটিকে কিছু ভেতরগোঁজা মনে হবে, কিন্তু তাঁর অন্তর্জগতের জ্যোতি ও বিস্তার ছিল বহুমুখিতায় পূর্ণ। এই লাজুক মানুষটি ছিলেন কবি—যেন কবি পরিচয়ে লজ্জা, তাই কি কবি হিসেবে নাম নিলেন মাহমুদ আল জামান! তাঁর গদ্যের হাতটিও ছিল বেশ কুশলী। বহু আগে ওঁর লেখা কিশোর উপন্যাস স্টিমার সিটি দিয়ে যায় পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম। শিশু–কিশোর সাহিত্যে তাঁর অর্জন সামান্য ছিল না। হাসনাতের লাবণ্যময় ও স্মৃতিমেদুর গদ্য আমরা পেয়েছি তাঁর আত্মজৈবনিক স্মৃতিকথা হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে নামের অনিন্দ্যসুন্দর গ্রন্থে।

শহর ঢাকার গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক–ইতিহাস-ঐতিহ্য বোঝার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বই হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে। মুক্তিযুদ্ধ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন ও শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণসহ নানা প্রগতিশীল কার্যক্রমের অনুপুঙ্খ বিবরণ আছে এখানে। সেই সঙ্গে ১৯৬১ সালে ঢাকায় রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্​যাপন, ছায়ানটের জন্ম ও রবীন্দ্রসংগীত–চর্চার এক নবজাগরণ পর্বের উদ্ভবের পরিচয়ও পাওয়া যায় বইটিতে। জার্নিম্যানের প্রকাশক কবি তারিক সুজাত নন্দিত শিল্পী রফিকুন নবীর প্রচ্ছদে প্রকাশ করেছেন এই শিল্পশোভন গ্রন্থ। প্রচ্ছদেই যেন ফুটে উঠেছে সেকালের ঢাকার নিখুঁত ছাপচিত্র। এই তো দিন কয়েক আগেও হৃদয়গ্রাহী বইটি হাতে নিলে আনন্দে ভরে যেত মন। আর এই লেখার জন্য বইটি যখন হাতে নিলাম, বেরিয়ে এল একরাশ দীর্ঘশ্বাস—হায়! এই বইয়ের নিপুণ স্রষ্টা ও সর্বজনপ্রিয় আবুল হাসনাত আর আমাদের মাঝে নেই।

বিজ্ঞাপন

দুই

default-image

ওই হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজেতে দেখি, পুরান ঢাকা শহরের আগা নবাব দেউড়িতে আবুল হাসনাতের জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, ক্রিকেট খেলার নেশাসহ অনেক কিছু। নিজেদের পরিবারের যাপিত জীবনের সুখ-দারিদ্র্যের কথা তিনি এ বইয়ে অকপটে বলেছেন। এতে করে আমরা হাসনাতের সততা এবং চরিত্রের মানবিক শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় যেমন পাই, তেমনি মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত সংসারের বাস্তব অবস্থা বর্ণনায় তাঁর সক্ষমতারও পরিচয় মেলে। এই অংশে লেখকের বিশিষ্ট কীর্তি নিজের মায়ের চরিত্রের অনন্যসাধারণ উপস্থাপনা। হাসনাতেন মা এক অলোকসামান্য নারী। এই মায়ের প্রভাবেই নিজেকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হন হাসনাত। শান্ত, বিবেচক, প্রজ্ঞাময়ী ও ধৈর্যশীলা এই নারীই তাঁকে হাসনাত হয়ে উঠতে সাহায্য করেছেন। হাসনাতের মা ও তাঁদের পরিবারের বস্তুনিষ্ঠ বিবরণে এখানে সত্যিই এক ভিন্ন আবহ ফুটে উঠেছে।

হাসনাতের মায়ের রক্তে ছিল উত্তর ভারতের মুসলিম সংস্কৃতির প্রবাহ। পূর্বপুরুষের সুফিবাদী আদর্শিক প্রেরণায় ওঁর পরিবার একদা আলোড়িত হয়েছিল। বিগত শতকের কুড়ির দশকে ভারতের বিহার অঞ্চলের ফৈজাবাদ থেকে ভাগ্যান্বেষণে তাঁরা এ দেশে এসে পুরান ঢাকার আগা নবাব দেউড়িতে থিতু হয়েছিলেন।

চকবাজার ও বকশীবাজার ছিল তাঁর মাতৃকুলের ব্যবসাকেন্দ্র। মাতামহদের সবাই ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। বিত্তবৈভবে সচ্ছল ছিল তাঁদের মাতৃকুল। ওঁদের মাতৃভাষা ছিল উর্দু। গৃহে চলত ওই ভাষাই। ভাষা ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে তাঁর মাতৃকুল পুরান ঢাকার সমাজজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। তবে ওই পরিবারে সুফিবাদী চর্চা এবং ফৈজাবাদে থাকাকালে তাঁর নানাদের কাব্যচর্চারও অভ্যাস ছিল। ফলে মাতৃকুলে উদারতা ও মুক্তচিন্তা তাঁদের জীবনচেতনার অংশ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই পরিবারেরই অনড় পশ্চাৎপদতা ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে। আবুল হাসনাতের মায়ের দুঃখ ছিল এ কারণে। বাল্যকালে তিনি লেখাপড়ার জন্য জেদ ধরেছিলেন। এই জেদে ও কান্নাকাটির জন্য তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। হাসনাত লিখেছেন: ‘প্রাইমারি স্কুল থেকে সামান্য অক্ষরজ্ঞান লাভ করার পর তাকে আগা নবাব দেউড়ির মসজিদের একাংশে মেয়েদের জন্য ঘের দেওয়া স্থানে আরবি পাঠের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।...তিনি কোরান শরিফ মুখস্থ করেছিলেন।’

default-image

হাসনাতের পরিবার পুরান ঢাকার আদিবাসী। তাঁর বাবাও ছিলেন ব্যবসায়ী। ছেলে লেখাপড়া করুক, এটা তিনি চাননি। ব্যবসাপাতি করুক, গদিতে বসুক—এই ছিল তাঁর কামনা। উপরন্তু পুত্র তাঁর পড়াশোনায় ভালো না, আত্মবিশ্বাস নেই; খেলাপাগল, সারা দিন ক্রিকেট খেলে—এ ছেলের কিছু হবে না। তাই কড়া শাসন ও মারধরও করতেন। এতে কিশোর হাসনাতের ব্যক্তিত্ব গঠনে খানিকটা সমস্যা হয়। সব সময় কিছুটা ভয় ও অস্বস্তিতে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকতেন। তাঁর পরবর্তীকালের চাপা স্বভাব ও কিছু সপ্রতিভতার অভাবের মনস্তাত্ত্বিকতার কারণ সম্ভবত এটাই।

কিন্তু ছেলের মানসিক বিকাশ, জীবনদৃষ্টি গঠনের এই পর্যায়ে হাসনাতের মায়ের ভূমিকাই ছিল প্রধান। মা তাঁকে শুধু প্রশ্রয়ই দিতেন না, সুস্থ সুন্দর, সমাজ ও সংস্কৃতিসচেতন মানুষ হয়ে উঠুক পুত্র—এ কামনা এবং এ জন্য তাঁর নিরন্তর লড়াই–ই হাসনাতকে তৈরি হতে সাহায্য করে।

মায়ের পর এক মেন্টরপ্রতিম শিক্ষক এবং দুজন বন্ধু—এক পুরুষ ও এক নারী—যাঁরা সেকালে বামপন্থী আদর্শে দীক্ষিত এবং হৃদয়গত দিক থেকেও অনুরাগসিক্ত, তাঁরা হাসনাতকে প্রগতিশীল নবজীবনধারায় শামিল হতে সাহায্য করেন নিজেদের আদর্শিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে। এই দুজনই একালে নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বনামধন্য—মতিউর রহমান ও মালেকা বেগম দম্পতি। এই তিনজনই ছিলেন বিখ্যাত মার্ক্সবাদী গণিতজ্ঞ দীক্ষাগুরু অধ্যাপক আবদুল হালিমের ছাত্রপ্রতিম। মতিউর রহমান-মালেকা বেগম শিক্ষালাভের সুযোগসহ সব ক্ষেত্রেই ছিলেন হাসনাতের পরম সহায়ক, প্রকৃত সুহৃদ ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, সংস্কৃতি সংসদে ছিলেন তাঁরা ‘কমরেড অ্যাট আর্মস’।

পেয়ারু সর্দারের জীবনও হাসনাতকে সমৃদ্ধ করে। বিচিত্র জীবনাভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তিন

default-image

আমার বিবেচনায়, আবুল হাসনাতকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল করে তুলেছে দৈনিক সংবাদ। এ পত্রিকায় তিনি সাংবাদিকতা করেছেন ৩৫ বছর। এটি ছিল প্রগতিশীল কাগজ। এর নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক-সম্পাদক জহুর চৌধুরী, রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সার, কে জি মুস্তফা প্রমুখের সান্নিধ্যে সাংবাদিকতা করা তো এক বিরল অভিজ্ঞতা। রাজনীতি, সমাজ ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী ইতিহাসের সঙ্গে মূলত এখানেই সম্যক পরিচয় ঘটে আবুল হাসনাতের। এই পত্রিকায় তাঁর সেরা সময় ২১ বছরব্যাপী সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা। লেখা সংগ্রহে তাঁর এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। এই পত্রিকায় আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক যেসব লেখা ছাপা হতো, তাতে আমাদের সাহিত্য যেমন নতুন চিন্তা ও প্রগতিশীল ধারায় স্থিত হয়েছে, তেমনি বহু লেখককে আধুনিক সাহিত্যচিন্তায় করেছে অনুপ্রাণিত। বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের সাহিত্যের কাঙ্ক্ষিত সুরটি ধরিয়ে দিয়েছে আবুল হাসনাত সম্পাদিত সংবাদ–এর সাহিত্য সাময়িকী।

স্বাধীনতার পর গণসাহিত্য এবং কালি ও কলম সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনায়ও তাঁর অভিনিবেশ, নিষ্ঠা, উদ্ভাবনক্ষমতা ছিল অনন্য। চিত্রকলার প্রতি তীব্র অনুরাগ এবং অনুরক্ত ও ওই বিষয়ে অনায়াস অধিকার তাঁর নিজের লেখাপত্র ও সাহিত্য সম্পাদনায় ভিন্নমাত্রিকরূপে সহায়তা দিয়েছিল। কালি ও কলমকে কলকাতার পাঠক-লেখকদের কাছে পরিচিত করাও তাঁর উল্লেখযোগ্য সাফল্য। আবুল হাসনাত ছিলেন প্রকৃত গুণী। আমরা তাঁকে স্মরণ করি ভালোবাসায় ও সম্মানে।


আবুল হাসনাতকে িনয়ে পিয়াস মজিদের লেখা পড়ুন www.prothomalo.com/onnoalo–এ।

মন্তব্য পড়ুন 0