রোকেয়া বলেন, ‘এমনই হয়, আপা।’

আহত আলিমা প্রতিবাদ করেন, ‘এ কথা কেমন করে বলো? তোমার তো ছেলেমেয়ে নেই। এমনই হয় মানে?’ রোকেয়া চুপ করে থাকেন। তিনি জানেন, নিরুপায়জন মিথ্যা দিয়ে সত্য ঢেকে কষ্ট ঠেকায়, ঠেকাতে গিয়ে কখন যেন মিথ্যাটা বিশ্বাস করে বসে।

তাদের দেখাশোনায় আছেন তিনজন, যাদের মধ্যে কাজে ভালো, যত্নে ভালো শিপ্রা, যদিও কথায় ভালো না। প্রথম দিনেই দুজনের ইতিহাস জেনে একটা বেমওকা প্রশ্ন করে বসেছে, ‘খালাম্মা, মাইয়া তো আফনারে এইহানে থুইয়া যাওনের লাইগ্যা পাগল হইল। ক্যান?’

‘আরে, ও তো মহা ব্যস্ত, শিপ্রা, তার বিরাট চাকরি। ওর বাড়িতে খুব আনন্দে ছিলাম, কিন্তু ব্যস্ততার জন্য বেচারা সময় দিতে পারে না। একদিন হলো কি, বাথরুমে পড়ে গিয়ে...।’

‘বুঝলাম খালাম্মা। এইহানে থাহেন। আরাম পাইবেন।’

‘বাথরুমে পড়ে যাওয়ায় মেয়ে ভয় পেয়ে গেল। বলল, ছোট্ট কাজের মেয়েটার সঙ্গে একটা নার্সও রেখে দেবে। কিন্তু আমিই বললাম, একটা বৃদ্ধাশ্রমে বরং তুলে দাও। নার্স রাখাটা...।’

‘সেই কওয়াডা তারে কুন দিন কইলেন?’

‘এই তো, দশ-বারো দিন হবে। তারপরও দুদিন গেল মেয়েকে রাজি করাতে। মেয়ে তো কেঁদেকেটে একসার। কিছুতেই...’

‘এইহানে সিট পাওনের লাইগ্যা অ্যাপ্লিকেশন তো করন লাগছে এক বছর আগে,’ শিপ্রা বলল এবং রোকেয়ার দিকে তাকিয়ে তার সমর্থন চাইল। রোকেয়া তাকে ইঙ্গিতে কেটে পড়তে বলল। শিপ্রা বেরিয়ে গেলে তিনি আলিমাকে বললেন, ‘এখানে যখন এসেই পড়েছেন, আপা, সুতাগুলি সব কেটে দিন। এই বয়সে সুতা থাকলেই বিপদ। খালি জট লেগে যায়।’

আলিমা হাসলেন। ‘সুতা কি চাইলেই কাটা যায়? এই দেখো না, কানাডায় থাকা আমার ছেলেটা মা বলতে কতটা পাগল। এই কদিনে কবার ফোন করল। খালি বলে, মা, তোমার গুড্ডু কতবার বলল তুমি কানাডায় চলে আসো, আর তুমি কিনা বেছে নিলে বৃদ্ধাশ্রম। বলে, আর কাঁদে।’

রোকেয়া চুপ করে থাকেন। দুই দিন ছেলের সঙ্গে তাকে কথা বলতে শুনেছেন। দু-আড়াই মিনিটে এত কথা বলে ফেলল ছেলেটা?

দুই

এক বছরও গেল না, মেয়ে এসে বলল, তারাও কানাডা চলে যাচ্ছে। কাগজপত্র হয়ে গেছে। তারপর সে ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদল।

রোকেয়া দেখলেন, মেয়েটার কান্নার আড়ালে যেন হাসি। সে কি মাঝেমধ্যে প্রবীণ নিবাসে আসা-যাওয়ার ধকল থেকে পরিত্রাণের স্বস্তিতে, নাকি কানাডা যাওয়ার আনন্দে? তিনি জানেন, মেয়েটা বেরিয়ে গেলে তার পক্ষে নানান সাফাই গাইবেন আলিমা আক্তার। তাকে সেই কষ্ট থেকে রেহাই দিতে তিনি ঘর ছেড়ে পালালেন।

তিন

আলিমা দেখলেন, জানালার পাশের কদমগাছটাতে কবে থেকে যেন কিছু ফটিকজল কিচিরমিচির শুরু করেছে। এগুলো যে ফটিকজল, দোয়েল নয়, শিপ্রাকে জিজ্ঞেস করে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন। তার মনে হলো, পাখিগুলো তাকেই গান শোনায়। একদিন জানালার গ্রিলে বসে এক জোড়া ফটিকজল তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছেন? ভালো তো?’

তিনি ভড়কে গেলেন। পাখি কথা বলে? জাদু, না মতিভ্রম?

তাকে চুপ থাকতে দেখে পাখিগুলো উড়াল দিল। আলিমার মন খারাপ হলো, দুটি কিউট পাখি। টিয়া-ময়না মানুষের মতো কথা বলতে পারলে তারা কেন পারবে না?

শিপ্রা জিজ্ঞেস করল, ‘আফনার চউখখের অপ্রেশন না করাইয়া মাইয়া চইলা গেল?’

‘না শিপ্রা, ওকে চোখের কথা বলিনি। কী দরকার ওর পেরেশানি বাড়িয়ে?’

শিপ্রা বুঝল এবং নিবাসের ডাক্তারকে জানাল। একদিন ধরেবেঁধে তাকে গাড়িতে তুলেও দিল।

চোখের জ্যোতি ফেরার পর আলিমা দেখলেন, পাখিগুলো ছবির মতো সুন্দর। পালকগুলো যেন পালিশ করা। কিন্তু তাকে দেখেই তারা হাওয়া হয়ে গেল। তিনি রোকেয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন পাখিগুলি চলে গেল? এ জন্য কি, তারা জানে আমার দিন শেষ?’

‘তা কেন হবে,’ রোকেয়া বললেন, ‘পাখিদের যাওয়া-আসা থাকে, মানুষের যেমন থাকে।’

আলিমা হাসলেন। ‘তারা ফিরলে খুশি হই। যাওয়ার দিনক্ষণটা জেনে নিতে পারি।’

‘পাখিগুলি তাহলে না ফেরার জন্যই গেছে,’ রোকেয়া বললেন।

চার

দেশে মারির বেশে কোডিভ হানা দিল। মিয়া মাকসুদের প্রাণপণ চেষ্টার ফাঁক দিয়ে তা নিবাসে ঢুকে পড়ল, তার বাড়িতেও, কয়েকজনকে হাসপাতালেও টেনে নিল, অক্সিজেন না পেয়ে যাদের আর ফেরা হলো না, মিয়া মাকসুদ ফিরলেও। শুরুতে ভালোই ছিলেন আলিমা। কিন্তু একদিন করোনাজীবাণু তার ঘরেও উড়ে এল, রোকেয়াকে পাশ কাটিয়ে তার ফুসফুসে ঢুকে পড়ে তাকে দখলে নিয়ে নিল। আলিমার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। হাসপাতালের অক্সিজেনযুদ্ধে রোগীদের না পাঠিয়ে নিবাসে রেখেই তাদের চিকিত্সা চলল। কিন্তু একদিন শিপ্রা এসে জানাল, অক্সিজেন বাড়ন্ত। জোগাড়ের চেষ্টা চলছে। রোকেয়া বানুকে সে বলল, ‘খালাম্মার লাইগা আমরা কিচ্ছুই করতারি না?’

রোকেয়া বললেন, ‘দোয়া করো।’

শ্বাসকষ্ট বাড়লে আলিমা টের পেলেন, একটা যুদ্ধ যেন শুরু হয়েছে তার ভেতরে, যে রকম একটা যুদ্ধে লড়তে লড়তে একসময় তিনি জয়ের পতাকা উড়িয়েছিলেন। যুদ্ধটা কী, তা আরেক আষাঢ়ে বলা যাবে। সেই যুদ্ধে প্রতিপক্ষে ছিলেন স্বামী আর স্বামীর বাড়ির লোকজন। আপন এক ভাই। যুদ্ধটা আণবিক হলো যখন অস্ত্রগুলো ছেলেমেয়ের দিকে তাক করা হলো।

ফুসফুসে দামামা বাজিয়ে আরেকটা যুদ্ধ শুরু হলে যেন ওই যুদ্ধজয়ের হারিয়ে যাওয়া গর্বটা তিনি ফিরে পেলেন।

স্বস্তি নিয়ে জানালা দিয়ে চোখ মেললেন আলিমা। বাইরে তুমুল আষাঢ়। কদমগাছটা থোকা থোকা ফুলের ভারে যেন নুয়ে পড়েছে। হঠাৎ দুই ফটিকজল উড়ে এসে জানালার গ্রিলে বসল। তাদের দেখে আনন্দে কেঁদে ফেললেন আলিমা। চোখ বন্ধ করে তিনি একটা প্রার্থনা করলেন, পাখিগুলি যেন আর একটা দিন থাকে। কথা বলে। তাদের সঙ্গ তার প্রয়োজন। তিনি শুনলেন, কারা যেন বলছে, ‘মা, তুমি শুধু শুধু আমাদের ওপর মন খারাপ করছ। আমরা তো তোমার যুদ্ধটা দেখেছি। তোমার গর্বটাও ভাগ করি।’

কে কথা বলে? তিনি চমকে চোখ মেলে তাকালেন। বিছানায় তার দুপাশে দুই ছেলেমেয়ে বসেছে তাকে আগলে রেখে, যেমন তারা বসত অনেক কাল আগে, ভুলে যাওয়া অসম্ভব কোনো কষ্টের রাতে।

আলিমার চোখে আষাঢ়ের ধারা নামল। তিনি ছেলেমেয়েকে বললেন, ‘একটা ছোট স্যুটকেস হাতে আমি এই নিবাসে এসে উঠেছি। এক জীবনের সংসারটা, চাওয়া-পাওয়াটা এই একটুখানি স্যুটকেসে দিব্যি জায়গা করে নিল! অবাক।’ মেয়ে বলল, ‘তোমার জন্য কানাডায় দুটি সংসার অপেক্ষায় আছে, মা।’ আলিমা বললেন, ‘ছোটবেলায় গুড্ডুটাকে অন্য কোনো নামে ডাকলে রেগে যেত, অথচ ও বড় চাকরিবান হলে বাইরের মানুষের সামনে গুড্ডু বলে ডাকায় বিশ্রী একটা বকা দিল আমাকে।’

গুড্ডু বলল, ‘কোভিড তোমার এত ক্ষতি করল, মা! তোমাকে বকা দেব আমি, এটি ভাবতে পারলে?’

মেয়ে বলল, ‘মা আমরা তো ফিরে এসেছি। তোমার এই যুদ্ধযাত্রায় সামিল হতে।’

আলিমার মনে হলো, এমনটাই তো হওয়ার কথা। কেন তিনি এত দিন একটা ভুলের মধ্যে ছিলেন? ভুলটা ভাঙিয়ে দেওয়ার জন্য আষাঢ়ের ঘনঘোরকে তিনি ধন্যবাদ জানালেন।

জানালার বাইরে আকাশটা যেন হঠাৎ খুব উজ্জ্বল হয়ে গেল। তার গর্বের শিরস্ত্রাণটাকে সেই আলো আরও উজ্জ্বল করে তুলল।

পাঁচ

শিপ্রা বলল রোকেয়াকে, ‘খালাম্মার কেইসডা কী, কন তো, কেমুন বেতাইল্যা? এত্ত কষ্ট, কিন্তু দেহেন, হাসিডা যায় নাই!’

রোকেয়া বললেন, ‘দোয়া করো, কোভিড আমাকে ধরলে যেন এই আষাঢ়েই ধরে। আর পাখিগুলা যেন থাকে, কদম ফুলে ভরা গাছটাতে। আর আমার বিছানার এদিকটাতে কেউ একজন বসবার মতো যেন যথেষ্ট যায়গা থাকে।’