বিজ্ঞাপন

তাহমিমা বলেন, ‘বইগুলো আমার শিকড় খুঁজে পাওয়ার একটি উপায় বলতে পারেন। আমি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে লেখার টেবিলে বসতাম। তারপর সারা দিন কাঁদতাম। একটা সময় কম্পিউটার বন্ধ করে ঘুমাতে যেতাম। কোনো এক জায়গার সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা যদি জটিল ধরনের হয়, তবে সে জায়গাটিকে খুব সহজভাবে বোঝার একটি দুর্দান্ত উপায় হচ্ছে বই লেখা। আমি এমনটাই উপলব্ধি করেছি। সে জায়গাটি আমার দেশ, আমার ইতিহাস।’

কিন্তু তিনি তাঁর সদ্য প্রকাশিত নতুন বইয়ে বর্তমান সময়ের সঙ্গে মোলাকাত করেছেন। দ্য স্টার্টআপ ওয়াইফ কোনো ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়। এটি আশা রায় নামের এক তরুণ বাঙালি-মার্কিন বিজ্ঞানীর রহস্যাত্মক গল্প। জমজমাট কাহিনিতে ভরপুর হলেও এর পরতে পরতে রয়েছে দার্শনিকতা। আশা রায়ের স্বামী সাইরাস জোন্স এতটাই মেধাবী যে তার বুদ্ধিমত্তাকে এনসাইক্লোপিডিয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়। আশা তার এই অসম্ভব বুদ্ধিমান স্বামীকে নিয়ে একটি স্টার্টআপ শুরু করেন।

তাহমিমা আনাম বলেন, ‘এই উপন্যাসটি লেখার ব্যাপারে আমি সীমাহীন স্বাধীনতা নিয়েছি। প্রযুক্তির কল্যাণে বদলে যাওয়া এই বিশ্বে সীমিত প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়ে একজন অভিবাসী নারীর নিজস্ব পথ তৈরি করা কতটা কঠিন, সেই উপলব্ধি থেকে এই গল্পটা আমার মাথায় এসেছে।’ কারণ, উপন্যাসের নায়িকার মতো তাহমিমা নিজেও একজন স্টার্টআপ স্ত্রী।

তাহমিমার স্বামী রোল্যান্ড ল্যাম্ব ‘রলি’ নামের একটি সংগীত প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। প্রায় ১০ বছরেরও বেশ সময় ধরে তাঁরা পূর্ব লন্ডনের হ্যাকনয়ে এটি পরিচালনা করেছেন। তাহমিমা বলেন, ‘আমাদের বিয়ের বয়স আর আমাদের স্টার্টআপের বয়স প্রায় একই। বিয়ের পর আমরা যে বাড়িতে সংসার শুরু করেছিলাম, সেখানেই শুরু হয়েছিল ব্যবসাটা। ফলে স্টার্টআপটি আমাদের একটি সন্তানের মতো।’

তবে উপন্যাসের আশার সঙ্গে তাহমিমার পার্থক্য হচ্ছে, তাহমিমা তাঁর স্বামীর স্টার্টআপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নন। তাঁরা এখন সত্যিকারের দুটি ফুটফুটে সন্তান নিয়ে উত্তর লন্ডনে ব্যবসাটি পরিচালনা করছেন।

উপন্যাসের স্ত্রী আশা প্রবলভাবে বিজ্ঞানাসক্ত। তিনি তার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বিজ্ঞানে বুঁদ হয়ে থাকেন। তিনি যখন এমআইটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন, তখন মানুষের অনুভূতিসম্পন্ন একটি যন্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করছিলেন।

আগের উপন্যাসগুলোর মতোই এই নতুন উপন্যাস লেখার সময়েও প্রভূত আনন্দলাভ করেছেন বলে জানান তাহমিমা। তবে মজার বিষয়, এই উপন্যাসে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন তাহমিমা, কিন্তু প্রকাশক রাজি হননি। তাহমিমা বলেন, ‘আমার আগের বইগুলো থেকে এই বই সম্পূর্ণ আলাদা। আগের বইগুলোর সঙ্গে একই কাতারে এই বইটিকে রাখা আমার পক্ষে কঠিন।’

বক্তব্যের দিক থেকে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও চারটি বইয়ের মধ্যে বেশ কিছু জোরালো মিলও রয়েছে। যেমন একটি হচ্ছে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান। এ ছাড়া ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি যেগুলো সম্প্রদায়ের মধ্যে শক্তি বাড়ায়। দ্য গোল্ডেন এজ-এ দেখা যায়, সম্প্রদায়গুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে ওঠে, ধর্ম ও পরিবারগুলো একতাবদ্ধ হয়ে থাকে। এই গল্পে রেহানা হক নামে অল্পবয়সী এক তরুণী বিধবা রয়েছেন।

কিন্তু স্টার্টআপ ওয়াইফ-এ দেখা যাচ্ছে, আচার অনুষ্ঠানগুলো কৃত্রিম। শোপিসের মতো সাজানো। যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী আচার–অনুষ্ঠানগুলো ধসে পড়ছে। তারপরও বিয়ের বর সাইরাস স্বপ্ন দেখে, তার বিয়ের অনুষ্ঠান হবে দুই ধরনের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে তাহমিমা বলেন, তাঁর মা–বাবা বাস করেন ঢাকায়। তাঁরা দুজনেই ১৯৭১ সালে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। বাবা এখন একটি প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক এবং মা একজন মানবাধিকারকর্মী। তিনি বেড়ে উঠেছেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক একটি পরিবেশে। আজও প্রতিবছর এপ্রিল মাসে বাংলা নববর্ষের সময় তাহমিমার বাবা–মা লন্ডনে আসেন মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে। তাহমিমা বলেন, ‘যাঁরা এখনো অসাম্প্রদায়িক থাকতে চান, তাঁদের উচিত এ ধরনের অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ আচার-অনুষ্ঠানের চর্চা চালিয়ে যাওয়া।’

সদ্য প্রকাশিত বইটি সম্পর্কে তাহমিমা বলেন, ‘দ্য গুড মুসলিম বইতে যেমন ধর্মের সর্বাত্মক শক্তিশালী হয়ে ওঠা দেখানো হয়েছে, তেমনি দ্য স্টার্টআপ ওয়াইফ–এও প্রযুক্তির সর্বাত্মক শক্তিশালী হয়ে ওঠা দেখানো হয়েছে। আমি মনে করি, দুটি বইয়ের বার্তা একই। আর সেটি হচ্ছে অন্ধবিশ্বাসের ভয়ংকর রূপ।’

অনুবাদ: মারুফ ইসলাম

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন