default-image

প্রথম আলোর দুই যুগ হবে দুবছর পর। স্কুলে থাকতে যখন শুনলাম একটি নতুন পত্রিকা বেরোচ্ছে, নাম প্রথম আলো; মনে আছে, বন্ধুরা উৎসাহের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলাম প্রথম দিনের পত্রিকাটার জন্য, নতুন কী কী আছে সে-ই কৌতূহলে মূলত। নতুন কী কী ছিল না সেই প্রথম প্রভাতে? প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতায় চোখ-চক্করে প্রথম আলো আমাদের প্রজন্মকে আকৃষ্ট করেছিল অনায়াসে।

সেই কিশোর বয়সে প্রথম আলো এমন একটা পত্রিকা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল, যা কয়েক পাঠেও পুরোনো হয় না, রেখে দিতে হয় তাকে তুলে। প্রথম আলোর সমৃদ্ধ সাহিত্য পাতা, ছুটির দিনেসহ কত কত সংখ্যা যে আমার কৈশোরক সংগ্রহকে উজ্জ্বল আলোর আভায় ভরে তুলেছিল তার শুমার নেই কোনো! জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সেই সংগ্রহ ব্যাগ ভরে নিয়ে এসেছি কুমিল্লার বাসা থেকে। এখনো জরুরি কাজে বা প্রিয় পাঠে হাতের কাছে রাখি পুরোনো প্রথম আলোর বহু কপি, যা নতুনতার স্বাদে অমলিন আজও। প্রথম আলো একবার স্লোগান দিয়েছিল ‘সংবাদপত্রের চেয়ে একটু বেশি’। এ ধরনের কথাকে সবাই আত্ম-বিজ্ঞাপন ভেবে থাকে কিন্তু আমি তো মনে করি এতে বিন্দু পরিমাণ অসত্য নেই। ভেবে দেখুন, আজ বাংলাদেশে অ্যাসিড–সন্ত্রাসের প্রকোপ কতটা কমে এসেছে। এর পেছনে প্রথম আলোর সচেতনতামূলক ভূমিকার কথা কে না জানি আমরা!

একটু সাহিত্যের কথায় আসি। একসময় বাংলাদেশের অনেক ঈদসংখ্যার পাতা দখল করে রাখত কলকাতার জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকদের পুরোনো উপন্যাসগুচ্ছ। প্রথম আলো ঈদসংখ্যা শুরু থেকেই সেই পথ বর্জন করে লুপ্ত  ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সমকালের পাঠকের সামনে উপস্থাপনের প্রয়াস চালিয়েছে। এ কথা তো আজ বলতেই হয়, ‘সন্ধানী’, ‘বিচিত্রা’র পর প্রথম আলোর সেই সব অনন্য ঈদসংখ্যা আমাদের ঋদ্ধ করেছে; যেসব সংখ্যায় ছিল মীর মশাররফ হোসেনের দুষ্প্রাপ্য উপন্যাস থেকে শামসুদদীন আবুল কালামের আত্মকথা, শওকত ওসমানের দিনলিপি, তিরিশের কবিদের অপ্রকাশিত পত্রাবলি কিংবা পুরোনো ঢাকার প্রাচীন চিত্রমালা। পশ্চিমবঙ্গের  পুরোনো উপন্যাসের বদলে এখন তো অধিকাংশ পত্রিকাই ইতিহাস-ঐতিহ্যের উৎসমূলে গিয়ে নতুন ধরনের লেখা ছাপতে চায় সিংহভাগ পত্রিকা; দেখে ভালো লাগে, এই জায়গাতেও তো প্রথম আলো পথিকৃতের ধন্যবাদ-প্রাপ্য।

বিজ্ঞাপন
একসময় বাংলাদেশের অনেক ঈদসংখ্যার পাতা দখল করে রাখত কলকাতার জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকদের পুরোনো উপন্যাসগুচ্ছ। প্রথম আলো ঈদসংখ্যা শুরু থেকেই সেই পথ বর্জন করে লুপ্ত ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সমকালের পাঠকের সামনে উপস্থাপনের প্রয়াস চালিয়েছে। এ কথা তো আজ বলতেই হয়, ‘সন্ধানী’, ‘বিচিত্রা’র পর প্রথম আলোর সেই সব অনন্য ঈদসংখ্যা আমাদের ঋদ্ধ করেছে; যেসব সংখ্যায় ছিল মীর মশাররফ হোসেনের দুষ্প্রাপ্য উপন্যাস থেকে শামসুদদীন আবুল কালামের আত্মকথা, শওকত ওসমানের দিনলিপি, তিরিশের কবিদের অপ্রকাশিত পত্রাবলি কিংবা পুরোনো ঢাকার প্রাচীন চিত্রমালা।

প্রথম আলোর পাতা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘কদর্য এশীয়’, আনিসুজ্জামানের ‘কাল নিরবধি’, ‘বিপুলা পৃথিবী’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘তিন পয়সার জোছনা’, ‘প্রণীত জীবন’, ‘বিম্বিত কবিতাগুলো’, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ‘এক ভারতীয় বাঙালির আত্মসমালোচনা’, গোলাম মুরশিদের ‘আদর্শবাদ ও মানুষের সংকট’-এর মতো অসাধারণ রচনাগুচ্ছ প্রকাশসূত্রে।
প্রথম আলোতে সংবাদ পড়ি, সম্পাদকীয় পাতাও পড়ি শুরু থেকেই। কারণ সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা যেমন পাই এই পত্রিকার সংবাদে, তেমনি সমকালের বিশ্বস্ত চিত্র পাই এখানকার সম্পাদকীয়-কলাম আর বিশ্লেষণে। সৈয়দ আবুল মকসুদের ‘সহজিয়া কড়চা’, সোহরাব হাসানের ‘কালের পুরাণ’ বা আনিসুল হকের ‘গদ্যকার্টুন’-এর উৎসুক পাঠকের দেখা পেয়েছি প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়েও।

অনেক কথা পরিস্থিতিগত কারণে মানুষ নিজে বলতে পারে না, কিন্তু প্রথম আলোর কোনো কোনো কলামে তার সাহসী উপস্থাপন দেখে বুক বেঁধে দাঁড়াতে উৎসাহ বোধ করেছে—এমন উদাহরণ গত ২২ বছরে নিশ্চয়ই অনেক আছে। একটা সংবাদপত্রের পক্ষে সবার চাহিদা মেটানো তো কোনোমতেই সম্ভব না, তবু শত প্রতিকূলতা উজিয়ে প্রথম আলো সেই পত্রিকা, যা বাংলাদেশের কোনো নদী দখল হলে দখলদারের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সেই সংবাদ ছাপে, কোনো ঐতিহ্যবাহী ভবন ভাঙার কু-উদ্যোগ দেখলে সেটা আমাদের জানাতে দেরি করে না, আবার বাংলাদেশের একটা ছেলে বা মেয়ে বহির্বিশ্বে গিয়ে কোনো ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখলে অথবা গহিন গ্রামে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রান্তীয় প্রচেষ্টার খোঁজ সবার আগে দেওয়ার চেষ্টা চালায়।

করোনা মহামারির আগ্রাসনে পুরো পৃথিবীটা যখন বদলে গেল, মুদ্রিত সংবাদপত্রের জগতেও এসে পড়ল সেই গ্রহণের দাগ। সেই সময় বাংলাদেশে অঘোষিত লকডাউনকালে ঘরবন্দী আমাদের এক বড় আশ্রয় হয়ে দেখা দিল প্রথম আলোর শক্তিশালী অনলাইন সংস্করণ। হালনাগাদ তথ্য পরিবেশনের পাশাপাশি অন্যআলো ডটকমের মতো বিশেষ বিভাগে প্রকাশিত বিচিত্র লেখাপত্র আমাদের গুমোট জীবনের মানচিত্রে যেন বইয়ে দিয়েছিল এক ঝলক টাটকা বাতাস। সেই বাতাস এখনো প্রবাহিত। কারণ অন্যআলো ডটকম প্রতিদিনই সাহিত্যের নতুন কিছু না কিছু পাঠকদের উপহার দিয়ে চলেছে।

প্রথম আলো পড়ি—ছাপা পত্রিকা ও অনলাইন উভয়ই। করোনা মহামারির আগ্রাসনে পুরো পৃথিবীটাই যখন বদলে গেল, মুদ্রিত সংবাদপত্রের জগতেও এসে পড়ল সেই গ্রহণের দাগ। সেই সময় বাংলাদেশে অঘোষিত লকডাউনকালে ঘরবন্দী আমাদের এক বড় আশ্রয় হয়ে দেখা দিল প্রথম আলোর শক্তিশালী অনলাইন সংস্করণ। হালনাগাদ তথ্য পরিবেশনের পাশাপাশি অন্যআলো ডটকমের মতো বিশেষ বিভাগে প্রকাশিত বিচিত্র লেখাপত্র আমাদের গুমোট জীবনের মানচিত্রে যেন বইয়ে দিয়েছিল এক ঝলক টাটকা বাতাস। সেই বাতাস এখনো প্রবাহিত। কারণ অন্যআলো ডটকম প্রতিদিনই সাহিত্যের নতুন কিছু না কিছু পাঠকদের উপহার দিয়ে চলেছে।

তবে প্রথম আলোরও ভুল হয়। কখনো এই পত্রিকায় অসাবধানতাজনিত একটা বানান ভুল দেখেও ক্ষিপ্ত হয়ে যাই, কারণ পত্রিকাটা তো প্রথম আলো। পাঠকের অনায়াস-অধিকারবোধ থেকে তো আমরা সব সময় শতভাগ নির্ভুল প্রথম আলোর প্রত্যাশা করতেই পারি। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার জন্য রাজপথে রক্ত দিয়ে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি প্রাণের বর্ণমালার অধিকার। আসছে ২০২২ সালে ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পূর্তির বছরই প্রথম আলো পূর্ণ করবে প্রকাশের দুই যুগ। প্রিয় বাংলা ভাষার একটি দৈনিকের জন্য এর চেয়ে উদ্‌যাপনীয় বিষয় আর কী হতে পারে? শুভ জন্মদিন প্রিয় প্রথম আলো।

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0