বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

সেই যে রিকশায় চেপে শহর ঘুরতাম মা–বাবার আঙুল আঁকড়ে, আমি দেখতাম বটগাছকে। জানতাম ‘এনিভার্সিটি’ কিংবা ইউনিভার্সিটি মানে ওই বটগাছ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার হলো যেদিন, সেদিন আমি প্রথম ওই বটগাছের সামনে গিয়েই দাঁড়িয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, সময় কেমন রঙিন অতীত ছিল সেদিন। সেদিন আমি দেখিনি। ২ মার্চ, ১৯৭১। তবু সেই দিনটিকে আমি যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, আমি থেকে কেমন করে ‘আমরা’ হয়ে উঠছে লক্ষ মানুষ, ঠিক এই কলাভবনের বটতলায়! কলাভবনের পশ্চিম প্রান্তের গাড়িবারান্দায় বাংলাদেশের প্রথম পতাকা কী দারুণ অহংকারে উড়ছে! আমি প্রায় ৩০ বছর পর সেই কলাভবনের সামনে দাঁড়িয়েও সেই দিনটি দেখতে পেয়েছিলাম। দেখতে পেয়েছিলাম মনশ্চক্ষে।

আমি সেদিন যে বটগাছের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, সে তো ৩০ বছর আগের সেই একই গাছ নয়। আমি তো জেনেছিলাম, একাত্তরের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সৈন্যরা উৎসব-আয়োজন করে সমূল উপড়ে দিয়েছিল ওই বট গাছ। কী ক্রোধ, কী আক্রোশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাবলে আজ কেন শুধুই মনে হয় এক বটগাছ। একটা সময়, এক দেশজুড়ে দাঁড়িয়ে যেন শত বছরের বুড়ো মহারাজা। পুরোনো হয়েছ? কমেছে জৌলুশ। তেজ? বাকলে জমেছে ঘুণ। তবু জেগে ওঠো বটগাছ, আগের মতন। হাঁপিয়ে উঠছ কেন? ফিরে এসো আবারও, রাজার মতন। আমাদের বেঁচে থাকার অহংকারটুকু জাগিয়ে রেখো টুকটুকে মুক্তোর মালার মতন।

এই বটগাছকে ঘিরেই বাংলাদেশ যেন জেগে উঠছিল। সেখানে যেহেতু নেচে উঠত পাকিস্তানবিরোধী স্লোগান, তাই যেন বটগাছটি উপড়ে ফেললেই মরে যাবে দেশ!
বটগাছ মরেছিল, দেশ জেগে উঠেছিল। আহারে! বটগাছ মরেছিল এই যুদ্ধের দেশে।

বাবা বলেছিলেন সেদিনের গল্প, ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। বাংলাদেশে যুদ্ধপরবর্তী অবস্থা দেখতে ঢাকায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী জোয়ান বেনেট কেনেডি ও ভাই রবার্ট কেনেডির ছেলে জোসেফ প্যাট্রিক কেনেডি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীদের বিজয়ের অভিনন্দন জানাতে ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছান তিনি। সিনেটর কেনেডি নিজ হাতে উপড়ে ফেলা পুরোনো বটগাছটির শূন্য জায়গায় নতুন একটি বটগাছের চারা লাগান, তারপর ছাত্র সমাবেশে ভাষণ দেন।

এই তবে সেই বটগাছ?

হয়তো, হয়তো নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তখন মার্কিনবিরোধী হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষার্থীদের মন। তাই কেনেডির সেই চারাগাছ উপড়ে সেখানে নাকি নতুন গাছ লাগিয়েছিলেন ছাত্ররা। আবার শোনা যায়, উপড়ে ফেলেনি হয়তো, বরং তার পাশে নতুন আরেকটি চারা গাছ লাগিয়েছিলেন। তবে এখন বেঁচে আছে একটিই বটগাছ। কোন বটগাছ?

default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেদিন থেকে আমার হয়েছিল, আমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি বটগাছটিকে...আহারে বটগাছ! আমার প্রেমের কথা মনে পড়ে যায়। কতবার মরে যেতে হয়েছিল, একবার বাঁচবে বলে। সেই প্রেমের ঘ্রাণ—বুড়ো বটগাছের পুরোনো পাতার গন্ধের মতন। বাতাসে দুলে দুলে মন কেমন করা সুর তোলে, প্রেমের মতন। তার মূলে, আকলে বাকলে—‘খুলে যায় রজনীর নীল’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাবলে আজ কেন শুধুই মনে হয় এক বটগাছ। একটা সময়, এক দেশজুড়ে দাঁড়িয়ে যেন শত বছরের বুড়ো মহারাজা। পুরোনো হয়েছ? কমেছে জৌলুশ। তেজ? বাকলে জমেছে ঘুণ। তবু জেগে ওঠো বটগাছ, আগের মতন। হাঁপিয়ে উঠছ কেন? ফিরে এসো আবারও, রাজার মতন। আমাদের বেঁচে থাকার অহংকারটুকু জাগিয়ে রেখো টুকটুকে মুক্তোর মালার মতন।

আমি এবং আমরা তোমার কাছে ফিরে আসি। ভাবতে চাই, ভেবে যেতে চাই—
‘দুধারে ছড়ানো এই প্রণতি ও উত্থান, মনে হয়েছিল
তুমি আছ, আছ তুমি।’

প্রেমের মতন পুরোনো বটগাছ আমাদের—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জন্মদিন হোক শুভ, এক শতে এক শ।

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন