বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

আমি বিশেষভাবে কৌতূহলী হয়ে উঠি ফরহাদ খানের গদ্য সম্পর্কে—যখন ‘চিত্র বিচিত্র’ বইটি আমার হাতে আসে। গদ্যই তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় সম্পদ। সাধু গদ্য এখনো দেখতে পাবেন; কিন্তু ‘স্বাদু গদ্য’ কোনোকালেই সহজলভ্য ছিল না। ফরহাদ খানের গদ্য তৃপ্তি নিয়ে আস্বাদ করা যায়। সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্য তিনি দায়িত্ব নিয়ে একেকটি বিষয় লিখে গেছেন। ঘুম, বিশ্বসুন্দরী, স্বপ্ন, হাঁচি—বিচিত্র বিষয়ে লিখেছেন। তথ্যকে কীভাবে সরস করে লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হয়, তা তিনি জানতেন। সেই সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতাকেও মিলিয়ে দিতে পারতেন লেখায়। অন্য আলোতে যখন তাঁর ‘কালি, কলম, মন’ কিংবা ‘আউট বই’ ছাপা হয়েছে, তখন একনিশ্বাসে পড়ে ফেলেছি। পত্রিকায় দীর্ঘ লেখা সচরাচর ছাপা হয় না; তবে ফরহাদ খানের লেখা একটু দীর্ঘ না হলেই বুঝি পাঠকের তৃপ্তির জায়গায় ঘাটতি থেকে যায়। দীর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত, অথচ তৃপ্তিদায়ক লেখা তিনি পত্রিকার তাগিদে অনেক লিখেছেন। লিখেছেন, লিখছেন, লিখবেন—এমন কথাই বেশির ভাগ সময় বলতেন। যদিও শেষ কয়েক বছরে লিখতে তাঁর কষ্ট হতো। সে কষ্ট শরীরের, মনের নয়।

ফরহাদ খানের বই থেকে পেয়েছি ‘খেই হারানো’র সঙ্গে সুতার কী সম্পর্ক, কিংবা ‘পটল তোলা’র সঙ্গে চোখের পাতার কী সম্পর্ক। মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে, এই লোকটা শব্দের অর্থগত উৎস নিয়ে এত বেশি ভেবেছেন এবং পড়েছেন, কোনো শব্দের অর্থই বুঝি তাঁর অজানা নেই।

ফরহাদ খান বেশ বুঝতে পারতেন একটা লেখা কোথা থেকে শুরু করতে হয় আর কোথায় থামতে হয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপকরণ আর চিন্তার বদলও ঘটে; এটি লেখক ফরহাদ খানের সব সময় নজরে থাকত। অতীত স্মৃতি ও বর্তমান অবস্থার সঙ্গে লেখার বিষয়কে মেলাতে পারতেন তিনি।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাতৃভাষা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফরহাদ খানের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। বানানের কোনো সূত্র নেই; কিন্তু ওই অনুষ্ঠানে বানানকে আমি সূত্র দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছি সব সময়। এটি ফরহাদ খানকে মুগ্ধ করেছে। তিনি সুযোগ পেলেই ফোন করে আমার কাছে বানান বিষয়ে কথা বলতেন। ‘প্রমিত’র নামে বানানের যথেচ্ছাচার পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারতেন না। আমিও তাঁকে ফোন করতাম শব্দের অর্থ জানতে চেয়ে। টেলিভিশনের অনুষ্ঠান রেকর্ড শেষে ফেরার পথে তিনি আমার সঙ্গে একটু একটু করে অনেক কথা বলতেন। তাঁর আলাপে ঘুরেফিরে আসত জার্মানির কথা। মাত্র তিন বছর কাজ করেছেন জার্মানির ডয়চে ভেলেতে, বেতার সাংবাদিক হিসেবে। কিন্তু যখন ওসব নিয়ে গল্প করতেন, মনে হতো তিন বছর নয়, তিরিশ বছর তিনি জার্মানিতে ছিলেন। জার্মানদের আদবকেতা আর নিয়মনীতির উদাহরণ তুলে ধরতেন সুযোগ পেলেই।

কথ্য বাংলায় এবং প্রচারমাধ্যমে তিনি ভাষার প্রমিত উচ্চারণকে অবিকল্প বলে মনে করতেন। তরল, খেলো লেখাকে বাংলা সাহিত্য বলে মেনে নিতে পারতেন না। লেখকের জনপ্রিয়তা তাঁর কাছে কখনোই লেখার মাপকাঠি হয়নি। সময়ের ফেরে রুচি ও আচরণের বদল ঘটেছে—তিনি দেখতে পেতেন। এসব বদলের বেশির ভাগই তাঁর কাছে ছিল পীড়াদায়ক। মানুষের মধ্যে তিনি সততা ও মহানুভবতা খুঁজে বেড়াতেন। নিজেও ছিলেন আমৃত্যু নির্লোভ, মহানুভব এবং এগুলোর অতিরিক্ত সহনশীলও। টেলিভিশনে সেট নির্মাণে দেরি হয়েছে, ক্যামেরা চালু হওয়ার আগে উজ্জ্বল আলোর নিচে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে, তবু কখনো তাঁকে বিরক্ত হতে দেখিনি।

যেদিন সর্বশেষ ফরহাদ খানকে গাড়িতে করে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিতে গেছি, সেদিন কথায় কথায় জেনেছি, তাঁর হৃৎপিণ্ডের অবস্থান শরীরের ডান দিকে। ফলে শরীরের অন্যান্য কলকবজাও এদিক-ওদিক সরে গেছে। এগুলো নিয়েও তিনি দিব্যি চলতেন। চলতেন দিব্যি; তবে শেষ জীবনে বেশ একা হয়ে পড়েছিলেন। খুব সচেতন থাকতেন, যেন তাঁর কারণে অন্য মানুষ কষ্ট না পায়, তাঁর কারণে অন্য কেউ যাতে অস্বস্তিবোধ না করে। ফরহাদ খানের চলে যাওয়ার পর স্বরোচিষ সরকার বললেন, ‘মানুষ হিসেবে তিনি অনেক উঁচু দরের ছিলেন।’ সবার হৃৎপিণ্ড থাকে বাঁ দিকে; তাই বুকে বুক মেলালেই আরেকজনের হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয় মেলানো যায় না। কিন্তু ফরহাদ খান যে কারও সঙ্গে নিজের হৃদয়কে মেলাতে পারতেন। তাঁকে শ্রদ্ধা।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন