default-image

একটি ফ্যানের বিজ্ঞাপনে কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬—১২ ভাদ্র ১৩৮৩) স্কেচ ও তাঁর স্নিগ্ধ সৌজন্যে লেখা একটি প্রশংসাবাচক চিঠির পাণ্ডুলিপিচিত্র পাওয়া গেছে। পাঠকদের হয়তো মনে পড়বে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও প্রশস্তি ব্যবহার করে রেল কোম্পানির ও নানা পণ্যের বিজ্ঞাপন পত্রিকায় মুদ্রিত হতো।

এখানে সংকলিত বিজ্ঞাপনটি অনিল কুমার সিংহ সম্পাদিত গত শতকের পঞ্চাশ–ষাটের দশকের মর্যাদাবান প্রগতিশীল সাহিত্য–সংস্কৃতি পত্রিকা নতুন সাহিত্য–এ (শ্রাবণ–আশ্বিন ১৩৬৮) পুরো পাতায় (ডাবল ক্রাউন ১/৮ আকারে) ছাপা হয়। ক্যালকাটা ফ্যান ওয়ার্কস প্রাইভেট লিমিটেড কর্তৃক বিজ্ঞাপনটি প্রচারিত হয়েছিল। বলা ভালো, বিজ্ঞাপনটি বেরিয়েছিল কবির জন্মদিন উপলক্ষে। বিজ্ঞাপনটি ছিল এমন:

এই শুভদিনে

জানাই নমস্কার

আজ হতে ২৫ বছর আগে অগ্নিযুগের কবি আমাদের এই স্বদেশী প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছিলেন প্রেরণা ও উৎসাহ:

ক্যালকাটা ফ্যান ওয়ার্কস প্রা. লি. কর্ত্তৃক প্রচারিত।

বিজ্ঞাপন

১৯৩৬ সালে নজরুল ওই প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক পাখা উপহার পেয়ে যে ছোট চিঠি লিখেছিলেন, সেটি ‘২৫ বৎসর আগে অগ্নিযুগের কবি আমাদের এই স্বদেশী প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছিলেন প্রেরণা ও উৎসাহ’ উল্লেখ করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বিজ্ঞাপনে অর্ধপৃষ্ঠাব্যাপী কবি–প্রতিকৃতি মুদ্রিত হয়েছিল।

তবে বিদ্রোহী কবিকে নিয়ে বিজ্ঞাপন বা তাঁর বইপত্র নিয়ে বিজ্ঞাপন এই প্রথম নয়। ১৯৩৬ সালের ওই বিজ্ঞাপনের চার দশক আগে অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকায় নজরুলের প্রথম বই ব্যথার দান গল্পগ্রন্থের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। নজরুলের বন্ধু আফজাল–উল হক তাঁর মোসলেম পাবলিশিং হাউস, কলকাতা থেকে ১ মার্চ ১৯২২–এ বইটি বের করেছিলেন।

ধূমকেতুতে (২৯ আগস্ট ১৯২২) বিজ্ঞাপনের ভণিতায় লেখা হয়েছিল:

কবিসম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঔপন্যাসিক শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ সাহিত্যরথিগণ যাঁহার লেখার মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা কীত্ত৴ন করিয়াছেন, যাঁহার নাম অতি অল্পদিনের মধ্যেই বাঙ্গলার আবাল–বৃদ্ধ–বনিতার মুখে মুখে বিরাজিত, তাঁহার পুস্তক সম্বন্ধে বিজ্ঞাপনের বাহ্যাড়ম্বর নিষ্প্রয়োজন

বিজ্ঞাপনে সেকালের বিখ্যাত পত্রিকা ভারতী আত্মশক্তি প্রশস্তি উদ্ধৃত হয়; বিজ্ঞাপনটির বয়ান:

“ধূমকেতু”–সারথি

সৈনিক–কবি কাজী নজরুল ইসলাম–প্রণীত

—ব্যথার দান—

সুদৃশ্য সুন্দর মনোজ্ঞ বাঁধাই বই।

বিজ্ঞাপন
default-image

বাঙ্গলার বিদ্রোহী কবির উদ্দাম প্রাণের উচ্ছল রসাবেশে ভরপুর বুক–ভরা বেদনার মূত্ত৴ বিকাশ এই ‘ব্যথার দান’। কবির প্রেম–বিরহ, অনুরাগ–অভিমানের প্রাণস্পর্শী করুণ কাহিনীপূর্ণ বৈচিত্র্যময় জীবনের প্রথম পর্ব এই ‘ব্যথার দান’। ‘ভারতী’ বলেন—এখানি ছোটগল্পের বহি। গল্পগুলিতে বৈচিত্র্য আছে, সবগুলিই রোমান্স; তাহাতে ব্যথার সুরই আগাগোড়া বাজিয়াছে। কাবুল, বেলুচিস্তান, সাহারার ক্যাম্প, এমনি নানা বিচিত্র দৃশ্য–মাধুরীতে ও সেখানকার আবহাওয়ায় গল্পগুলি ভারী মিঠা মশগুল হইয়া উঠিয়াছে। ‘আত্মশক্তি’ বলেন, কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা প্রতিভাবান নবীন কবি বলিয়াই জানিতাম। তাঁহার এই বইখানি পড়িয়া বুঝিলাম যে গদ্য সাহিত্যেও তিনি সমান কৃতী। ভাষা ও ভাব কবিত্ব–মাখা।

আজই সংগ্রহ করুন। বিলম্বে পস্তাতে হবে।

প্রকাশক—মোসলেম পাবলিশিং হাউস

কলেজ স্কয়ার (ইস্ট) কলিকাতা।

‘তিনখানি উপাদেয় পুস্তকে’র এই বিজ্ঞাপন বেরোয় ধূমকেতু জানুয়ারি ১৯২৩ তারিখের এবং পূর্বাপর প্রায় সব সংখ্যার প্রথম পাতায়:

“ধূমকেতু”–সারথি সৈনিক–কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রণীত

—তিনখানি উপাদেয় পুস্তক—

(কবির বিভিন্ন সময়ের তিনখানি প্রতিকৃতি সম্বলিত)

ব্যথার দান

বিজ্ঞাপন

‘ব্যথার দানে’ প্রকাশিত [sic!] এক বৎসর আগে লেখা ‘রাজবন্দীর চিঠি’ কবির বর্ত্তমান জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন।

ভাবে, ভাষায়, নূতনত্বে ইহা উপন্যাস সাহিত্যে অতুলনীয়!! সুন্দর সুদৃশ্য মনোজ্ঞ বাঁধান বই। মূল্য দেড় টাকা মাত্র।

অগ্নি–বীণা

সুদৃশ্য বাঁধাই; মূল্য এক টাকা

আজই সংগ্রহ করুন! বিলম্বে পস্তাতে হবে!!

প্রাপ্তিস্থান—মোসলেম পাবলিশিং হাউস

৩ নং কলেজ স্কয়ার (ইস্ট); কলিকাতা

বিজ্ঞাপনটিতে একটি ভুল আছে। রাজবন্দীর চিঠি নামে কবির কোনো উপন্যাস নেই। রাজবন্দীর জবানবন্দী প্রবন্ধের বই। (প্রকাশ ১৯২৩, প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি)।


স্বীকৃতি: ধূমকেতুর দুষ্প্রাপ্য ফাইল সৈয়দ আবদুর রহমান ফেরদৌসীর ব্যক্তিগত সংগ্রহে (খোশবাসপুর, মুর্শিদাবাদ) দেখেছি।

মন্তব্য পড়ুন 0