বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০ ডিসেম্বর ১৯৭১, দৈনিক ইত্তেফাক–এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে থেকে জানা যায়, শেষ দুই দিন বেগম মুজিব ও তাঁর পরিবারকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি। এমনকি বাড়িতে নড়াচড়া পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি। ১৭ ডিসেম্বর সকালে বাড়ির সামনে কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই খবর পেয়ে ভারতীয় বাহিনীর মেজর অশোক তারার (পরে কর্নেল) নেতৃত্বে মিত্রবাহিনীর একটি দল ১৮ নম্বর সড়কের ওই বাড়িতে পৌঁছান। এ সময় হানাদার বাহিনীর দলটি গুলি করতে উদ্ধত হয় এবং হুমকি দেয় যে তাদের আক্রমণ করা হলে তারা বেগম মুজিবসহ অন্যান্যদেরকে হত্যা করবে। তখনকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে মেজর তারা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মনোতাত্ত্বিক যুদ্ধের পথ বেছে নেন। নিরস্ত্র হয়ে ১৮ নম্বর সড়কের বাড়ি ভেতরে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর মেজর তারা অত্যন্ত কুশলী ভাষায় দখলদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। তাদের বুঝান যে, নিজেদের মঙ্গলের জন্যই তাদের আত্মসমর্পণ করা উচিত।

২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত শুভজ্যোতি ঘোষের প্রতিবেদনে মেজর তারার স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, সেদিন বাড়িটিতে থাকা হানাদার সেনারা মারাত্মক খুনের মেজাজে ছিল। বাড়িটির কিছু দূরেই গুলিবিদ্ধ একটি গাড়ি, তার ভেতরে একজন সাংবাদিকের লাশ দেখতে পান মেজর তারা। লাশটি থেকে তখনো রক্ত ঝরছিল। ওই সাংবাদিক বাড়িটির দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে হানাদার বাহিনী তাকে গুলি করে। আর আশপাশের লোকজন মেজর তারাকে জানিয়েছিলেন, আরও সকালের দিকে স্থানীয় একটি পরিবারকেও গুলি করে জখম করে হানাদারেরা সৈন্যরা। স্মৃতিচারণে মেজর তারা বলেন, ‘আমি তখন দেখলাম, সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার চালানোই একমাত্র রাস্তা। শেখ মুজিবের পরিবারকে বাঁচাতে হলে সেই মুহূর্তে আমার সামনে আর কোনো পথও ছিল না।...আমি হুমকির জবাবে জানালাম, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা গতকালই আত্মসমর্পণ করেছে, কাজেই তারাও অস্ত্র ফেলে দিলেই ভালো করবে। মনে হলো ওই সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পণের কোনো খবর পৌঁছায়নি।...একেবারে সামনে আসতেই গেটে যে সেন্ট্রি ছিল, সে তার বন্দুকের সামনে লাগানো ধারালো বেয়নেটটা আমার শরীতে ঠেঁকিয়ে ধরল।... বললাম, আমি ইন্ডিয়ার আর্মির একজন অফিসার।...একেবারে নিরস্ত্র অবস্থায় আমি একলা তোমাদের এখানে এসেছি। তারপরও কি তোমরা বুঝতে পারছ না সব খেলা চুকে গেছে? তখনই আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটা হেলিকপ্টার। আমি সঙ্গে সঙ্গে আঙুল তুলে বললাম, “তোমরা কি ওই হেলিকপ্টার দেখতে পাচ্ছ? বুঝতে পাচ্ছ কি ঢাকার নিয়ন্ত্রণ এখন কাদের হাতে?”’

এরপরও পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করতে গড়িমসি করে এবং সময় নেয়। মেজর তারা বুঝতে পারেন যে মনোস্তাত্ত্বক সমরে শত্রুপক্ষকে তিনি ধীরে ধীরে ঘায়েল করতে সক্ষম হচ্ছেন। তিনি সতর্কতার সঙ্গে একের পর কথার অস্ত্র চালিয়ে যেতে থাকেন। সবশেষে চূড়ান্ত শব্দাস্ত্রটি প্রয়োগ করে বলেন, ‘এখনই সেরেন্ডার করলে আমি ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তোমাদের কথা দিচ্ছি, অক্ষত শরীরে তোমরা নিজেদের হেডকোয়াটারে ফিরে যেতে পারবে। আর না করলে তোমাদের লাশের যে কী হবে, তার কিন্তু কোনো গ্যারান্টি নেই।’ পরে পাকিস্তানি সৈন্যরা অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। প্রাণে রক্ষা পান বেগম মুজিব ও তাঁর স্বজনরা। মেজর অশোক তারার স্মৃতিচারণে আরও উল্লেখ আছে, ওই বাড়িতে শিশুপুত্র কোলে শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোটবোন শেখ রেহানাও ছিলেন। তাঁরা সবাই মেজর তারার অত্যন্ত কুশলী এই কথোপকথন শুনতে পান। উদ্ধারের পর মেজর তারাকে তাঁরা কৃতজ্ঞতা জানান।

১৮ নম্বর সড়কের সেই বাড়িতে তখনো পাকিস্তানের পতাকা উড়ছিল। এ সময় বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই মমিনুল হক হক খোকা মেজর তারাকে বাংলাদেশের একটি পতাকা এনে দেন। মেজর তারা বাড়ির ছাদ থেকে পাকিস্তানের পতাকা ছুঁড়ে ফেলে বাংলাদেশের পতাকা উড়ান। পাকিস্তানের পতাকাটি মাটিতে পড়তেই বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব সেটিকে পায়ের নিচে পিষে চিৎকার করে বলেন, ‘জয় বাংলা’।

পরবর্তীকালে বেগম মুজিবও মেজর তারার প্রত্যুৎপন্নমতিত্বেও কথা উল্লেখ করে প্রশংসা করেন। পরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেজর অশোক তারাকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে কৃতজ্ঞতা জানান। একাত্তরে অনবদ্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে মেজর অশোক তারাকে বন্ধু সম্মাননা প্রদান করে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার কাছে সংঘটিত ‘ব্যাটল অব গঙ্গাসাগর’ এ বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি ভারতের ‘বীর চক্র’ খেতাব পান।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন