বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অতি সুরক্ষিত সেই বাড়িটার দিকে তাকালেই মনে পড়ে যেত বাংলার অতি আদরের দুলাল—বঙ্গবন্ধুকে। কোথায় কোন অজ্ঞাত কারাগারে তাঁকে বন্দী করে রেখেও নরপিশাচরা স্বস্তি পায়নি—কড়া পাহারায় বন্দী করে রেখেছে তাঁর প্রিয়তমা পত্নী এবং আদরেরর সন্তানদের।

আজ মুক্ত বাংলা। মুক্ত হয়েছেন বেগম মুজিবও। তবু বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি সেই কয়েদখানায়ই রয়েছেন। নববর্ষের দিন সূর্যের আলোয় পথ চিনে এগিয়ে গেলাম ১৮ নম্বর রোডের দুর্গসদৃশ সেই বাড়িটার দিকে। বাইরের ঘরেই বসে ছিলেন বেগম শেখ মুজিব। হাসিমুখে আহ্বান জানালেন আমাকে। বাড়িটার উল্লেখ করতেই হেসে বললেন, ‘এটা তো তবু একটা মাথা গুঁজবার ঠাঁই, কিন্তু ২৫ মার্চের পর পুরো দেড় মাস, তা–ও কোথাও পাইনি। আজ এখানে কাল সেখানে, এমনি করে সেই দেড় মাসে কম করেও ১৪–১৫টা বাসা বদল করেছি কিন্তু কোথাও মাথা গুঁজবার ঠাঁই পাইনি।’

হাসছিলেন বেগম মুজিব, কিন্তু দেখলাম হাসির মাঝে কেমন জানি অস্পষ্ট এক বিষণ্নতার ছোঁয়ায় করুণ হয়ে উঠেছে তাঁর চোখের দৃষ্টি।

২৫ মার্চের সেই ভয়াবহ রাত। অন্ধকার শোবার ঘরটাতে বিছানায় শুয়ে শেখ সাহেব শুনছিলেন বাইরের বোমাবিধ্বস্ত ঢাকার আর্তনাদ। উত্তেজনায় একেক সময় উঠে বসছিলেন তিনি। ঠিক এমনি এক মুহূর্তে গুলির একটি টুকোরা জানালা ভেদ করে খাটের পায়ের কাছের পায়া ভেদ করে ছোট ছেলে রাসেলের পায়ে আস্তে করে লাগে। অন্ধকারে হাতড়ে গুলিটা কুড়িয়ে নিয়েছিলেন শেখ সাহেব। আর সেই দুঃসহ রাতেই নরপিশাচরা তাঁকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে তখন ছিলেন বেগম মুজিব আর তাঁর দুই পুত্র।

‘২৬ মার্চ—সারাটা দিন ছিল কারফিউ। গোলাগুলির শব্দ তখনো থামেনি। নিস্তব্ধ বাড়িজুড়ে যেন এক ভৌতিক বিভীষিকা মাথা খাড়া করে উঠেছে। সামনে ধানমন্ডি বালিকা বিদ্যালয়ে ফিট করে রাখা বড় বড় কামানের মুখগুলো একেবারে আমার বাসার দিকে। ভয়ে জানালাগুলো পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে পারিনি। দুপুরে কারফিউর মধ্যেই এবাসা–ওবাসা করে বড় ছেলে কামাল এসে পৌঁছাল। নিচের ঘরে তখনো কয়েকটি ভলেন্টিয়ার ছেলে ছিল। সকলের জন্য কোনোরকম ভাত–ডাল রান্না করার জন্য বাবুর্চিকে বললাম, কিন্তু মন আমার রাতের কথা ভেবে অবশ হয়ে আসছিল। এর আগে বহুবার শেখ সাহেব বন্দী হয়েছেন, কিন্তু এবারের মতো অত বীভৎস লাগেনি তাঁর অবর্তমানে নিজেদের অবস্থা।’

default-image

রাত এল। সেই আঁধার কালো রাত। ইয়াহিয়া খানর সেই হিংস্রভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে বলা বিবৃতি শুনে এককথাতেই নিজেদের অবস্থা বুঝতে পারলেন বেগম মুজিব। তাই কালবিলম্ব না করে ছোট ছেলে আর মেজ ছেলেকে নিয়ে পাঁচিল টপকে প্রতিবেশী ডাক্তার সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। অন্যদিকে বড় ছেলে কামাল এবং মহিউদ্দিন সাহেব পালালেন অন্যদিকের পাঁচিল ডিঙিয়ে। রাত ১১টা থেকেই তোপদাগার শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। কতকটা চেতন, কতকটা অচেতন অবস্থায় বেগম মুজিব ২৬ মার্চের সেই ভয়াবহ রাতে শুনলেন তাঁর আদরের বাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার শব্দ। রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত একইভাবে তারা বিধ্বস্ত করে বাড়িটাকে। সে রাতে ওভাবে না পালালে তাঁর এবং তাঁর সন্তানদের ভাগ্যে কী যে ঘটত, আজও তিনি তা ভাবতে পারেন না।

২৭ তারিখ সকালে বাচ্চা দুটো সঙ্গে নিয়ে তিনি আবার পালালেন। পুরো দেড় মাস এবাসা–ওবাসা করেন। শেষে মগবাজারের এক বাসা থেকে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ১৮ নম্বর রোডে এই বাসাটাতে নিয়ে আসে।

১৮ নম্বর রোডে আসার আগের মুহূর্তটাকে স্মরণ করে গম্ভীর হয়ে গেলেন বেগম মুজিব। বললেন, ‘আমি তখন মগবাজারে একটা বাসায় থাকি। আমার বড় মেয়ে হাসিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা। সে, জামাই, আমার দেবর, জা, মেয়ে রেহানা, পুত্র রাসেলসহ বেশ কয়েকজন একসঙ্গে ছিলাম মগবাজারের বাসাটাতে। হঠাৎ একদিন পাকিস্তানি বাহিনী ঘেরাও করে ফেলল বাসাটা। একজন অফিসার আমাকে জানাল যে আমাকে তাদের তত্ত্বাবধানে অন্যত্র যেতে হবে। জানি না, কীভাবে ঠিক সেই মুহূর্তটাতে ভীষণ সাহসী হয়েছিলাম আমি। কড়াভাবেই সেই অফিসারকে বললাম, লিখিত কোনো আদেশপত্র না দেখালে আমি এক পা–ও বাড়ব না। উত্তরে সে ঔদ্ধতভাবে জানাল যে ভালোভাবে তাদের সঙ্গে না গেলে তারা অন্য পন্থা গ্রহণ করবে। তখন বাধ্য হয়ে আমি তাদের বললাম যে আমার মগবাজারের বাসায় যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রত্যেককে আমার সঙ্গে থাকতে দিতে হবে। আমার কথায় তারা নিজেরা কী যেন আলোচনা করল, পরে তারা রাজি হয়ে নিয়ে এল আমাদেরকে ১৮ নম্বর রোডের এই বাসাটাতে।’

১৮ নম্বর রোডে আসার প্রথম দিনের কথা বলতে গিয়ে আবার হেসে ফেললেন বেগম মুজিব। ময়লা–আবর্জনাপূর্ণ এই বাড়িটাতে তখন বসবার মতো কোনো আসবাব দূরে থাক, একটা মাদুর পর্যন্ত ছিল না। জানালার পাশঘেঁষা তিন–চার ইঞ্চি প্রশস্ত একফালি জায়গায় ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে ছিলেন তিনি এবং পরিবারের সব সদস্য।

অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে এভাবে কষ্ট করে বসে থাকতে দেখে সেদিন বুক ফেটে যাচ্ছিল তাঁর। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেননি, শুধু অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলেন চারদিক। হয়তো অসহায়ের করুণ ডাক আল্লাহ তাআলা সেদিন শুনেছিলেন। প্রহরী পাকিস্তানি বাহিনীর একজন পাঠান অফিসার অনুভব করেছিল তাঁর অসহায় অবস্থাকে। সেই অফিসার একজন ঝাড়ুদার সংগ্রহ করে পরিষ্কার করে দেয় ঘরদুয়ার—সংগ্রহ করে দিয়েছিল কয়েকটি চেয়ার এবং একটি কম্বল। বন্দিজীবনের নৃশংস পাকিস্তানি পাহারাদার বাহিনীর মধ্যে এই অফিসারটিই ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রম।

ধানমন্ডির এই বাড়িটার মধ্যে অনেক দুঃখ–দৈন্যের স্মৃতি চিরদিনের মতো বেগম মুজিবের বুকে আঁকা হয়ে গেছে—তবু এই বাসাতেই তিনি তাঁর প্রথম আদরের নাতিকে বুকে নিতে পেরেছিলেন—এ স্মৃতি তাঁর কাছে কম উজ্জ্বল নয়।

বন্দিজীবেনর শত দুঃখের স্মৃতি বুকে নিয়ে বেগম মুজিব আজও সেই ১৮ নম্বর রোডের দুর্গবাড়িতে অবস্থান করছেন। তবে আজ সেই অবরুদ্ধ বাড়ির আঁধার–কালো পরিবেশকে খান খান করে দিয়েছে মুক্ত বাংলার স্বচ্ছ আলোকবহ্নি। দেখলাম নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা একদল আলোক সৈনিক এসেছে বেগম মুজিবকে শ্রদ্ধা জানাতে। ওদের দীপ্ত চাহনি উচ্ছল হাসিতরঙ্গ নতুন করে যেন ঘোষণা করছে—নতুন আলোর বারতা।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন