বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অবশ্য আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক গ্রামের ডাক পত্রিকায়। ডাকযোগে পাঠানো কবিতা ছাপা হলো জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী সম্পাদিত দ্বিমাসিক দীপঙ্কর–এ, আবিদ আজাদ সম্পাদিত মাসিক শিল্পতরুতে। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, সাগরময় ঘোষ, আহসান হাবীবের নাম পড়েছি বইপত্রে। ঝিনাইদহ বা খুলনা ছেড়ে ঢাকায় আসার পর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীনও আমি খামের ভেতরে কবিতা পুরে তা সাহিত্য সম্পাদক বরাবর পাঠাতাম। ততদিনে আমার লেখা প্রচুর ছাপাছাপি শুরু হয়ে গেছে। কায়সুল হক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবুল হাসনাত, হায়াৎ মামুদ, রশীদ হায়দার, শামসুজ্জামান খান, নির্মলেন্দু গুণ, মারুফ রায়হান, সাজ্জাদ শরিফ, ব্রাত্য রাইসু, আলীম আজিজ, শহীদুল ইসলাম রিপন, জাফর আহমদ রাশেদ, মাহবুব আজীজ, আলতাফ শাহনেওয়াজ—এঁরা আমার লেখা প্রচুর ছেপেছেন। তাগাদা দিয়ে লিখিয়ে নিয়ে ছেপেছেন। এখনো তাগাদার চাপ নিয়েই আছি, লিখে যাচ্ছি। এককথায় বলব, গত দশ-পনেরো বছরে আমার যত লেখা, সব এই সাহিত্য সম্পাদকদের চাপেই লিখতে হয়েছে বা এখনো হচ্ছে। বারবার লেখা থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দিলেও আমার লেখা এখনো চলছে সাহিত্য সম্পাদকদের চাপাচাপিতেই।

একেকটি সাহিত্য পাতার চরিত্র একেক রকম। চরিত্র না বলে বলা যায় মেজাজ একেক রকম। মাঝখানে আমিও কাজ করেছি এক দৈনিকের সাহিত্য বিভাগে। কাজেই সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব কিছুকাল আমিও পালন করেছি। আর প্রথম আলো সাময়িকীতে লিখে যাচ্ছি পত্রিকার প্রথম থেকেই। দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রথম আলোর সাহিত্যপাতায় লিখছি। এই পাতার বিভাগীয় সম্পাদক বদল হয়েছেন বারবার। এতে করে সাহিত্যপাতার মেজাজও পূর্বাপর একই রকম থাকেনি পুরোপুরি। সেটিই স্বাভাবিক। এ সময়ে তো একটি প্রশ্ন মনে আসতেই পারে, প্রথম আলোর সাহিত্যপাতা বাংলা সাহিত্যে কতখানি অবদান রাখতে পারল বা পারেনি? কতজন নতুন ও প্রতিভাবান লেখকের আগমন ঘটেছে এই সময়ে? এ কথা অবশ্য আমাদের মনে রাখা দরকার যে এদেশে সাহিত্য জার্নাল ঠিক গড়ে ওঠেনি, যেমনটি গড়ে উঠেছে দৈনিকের সাহিত্যপাতা। দৈনিক পত্রিকার আনুকূল্যেই সাহিত্য অনেকটা বিকশিত হচ্ছে। দৈনিক পত্রিকা মূলত বাণিজ্যিকভাবেই সংবাদমাধ্যম। সে কারণে যে দৈনিকের সম্পাদকের সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা যতটা, সেই দৈনিকের সাহিত্যপাতার সম্পাদক যিনিই থাকুন না কেন, সাহিত্যপাতায় তাঁর একটা প্রভাব থাকে। বাজার–বিকানো লেখকের প্রয়োজন অবশ্যই বেশি। বিজ্ঞাপন একটি বিষয় সেখানে। প্রথম আলোও তাঁর ব্যতিক্রম নয়।

একসময় এই পত্রিকার সাহিত্যপাতা চার পৃষ্ঠা প্রকাশিত হতো। করোনার কারণে এখন সেই কলেবর কিছুটা কমেছে। এদেশে যেহেতু সাহিত্যের জার্নাল তেমনভাবে প্রকাশিত হয় না এবং দৈনিকের সাহিত্যপাতার ওপর নির্ভর করেই সাহিত্য পাঠকের কাছে পৌঁছায়। তাই সাহিত্যপাতার কলেবর কমে যাওয়া কোনোভাবেই সাহিত্যের জন্য মঙ্গলজনক নয়। প্রথম আলোর মতোই এর সাহিত্যপাতাও দারুণ একটা প্রভাব তৈরি করেছে বাংলাভাষী পাঠকের কাছে, তা যেমন সত্য, আবার সেই সাহিত্যপাতার জমিন কমে গেলে তা একপ্রকার আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে বৈকি! পরিস্থিতির প্রয়োজনে শিল্পসাহিত্য সৃজনের প্রয়াস কমে গেলে তা–ও কি আমাদের জন্য শুভকর কিছু? আশা করি সাহিত্যপাতার কলেবর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।

এ কথা সত্য, প্রথম আলোর সাহিত্যপাতায় লেখা ছাপা হোক—এই আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন দেশের প্রায় অধিকাংশ লেখক। বিশেষত তরুণেরা তো বটেই। পাঠকও সম্ভবত সেই আকাঙ্ক্ষার অংশ হয়ে গেছেন। এ ব্যাপারটা প্রথম আলোর সাহিত্যপাতার অবশ্যই বড় অর্জন। যে প্রভাব অন্য কোনো দৈনিক এই সময়ে অর্জন করতে পারেনি। এই পাতার নিয়মিত একজন লেখক হিসেবে আমার মধ্যে তাই এক ধরনের ভালো লাগাও কাজ করে। কিন্তু এই পাতার ব্যর্থতাও কি নেই?

যাঁদের লেখা গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়ে থাকে এখানে, সবাই কি সত্যি সত্যি সেই গুরুত্বের লেখক? এর মধ্যে কোনো বিশেষ বলয় কি নেই? আর বলয় হলে থাকলে সেই বলয় কি ভাঙা যায় না? কোনো লেখক যেন এই সাহিত্যপাতার অংশ না হতে পেরে ক্ষোভ পুষে না রাখেন, প্রতিভাবাবন লেখক বা কবিরা যেন অবহেলার শিকার না হন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

গ্রামলগ্ন নদীপাড়ে বসে আজকের কোনো তরুণ যেন তাঁর ভালো লেখাটা প্রথম আলোর সাহিত্যপাতায় পাঠিয়ে দিতে পারেন, সেই সুযোগ যেন তিনি পান। আজ আর হয়তো সেই ডাক বিভাগের দিন নেই, লেখা পাঠানো কাজটি এখন ই–মেইলেই হয়ে থাকে। তা হোক। লেখা এলেই হলো, লেখা পড়ে তা ভালো হলে ছাপানোর কাজটি হলেই হলো। মানুষ তো ভালোর সঙ্গেই থাকতে চায়। আমার আশা, এই সাহিত্যপাতা ঘিরে আরও ভালোদের সম্মিলন হোক। ভালো কবিতা–গল্প হোক, নিবন্ধ হোক—সেই ভালো, সেই ভালো।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন