বিজ্ঞাপন

গড়খাইয়ের পাড়ে পাড়ে ঝিরিঝিরি হাওয়ায় হেঁটে হেঁটে আরও খানিক সামনে এগোই আমরা। মোড়ে এসে বাঁক নিতেই, আমার পিঠের ব্যাকপ্যাকে ঝুলন্ত কাজরি এক্সাইটেড হয়ে বলে ওঠে, ‘লুক বাপি, নৌকা, আ রিয়েল বিগ নৌকা।’ সম্পূর্ণ সোনালি ল্যাকারে রঞ্জিত সুদৃশ্য জোড়া-পঙ্খী বজরাখানা এবার আমাদেরও চোখে পড়ে। সারা জলতল আলো করে ভাসছে রাজকীয় কিশতিটি।

এক জমানায় মান্দালয়ের রাজার এ দুর্গের অভ্যন্তরে ছিল, দেয়ালে হাজার-বিজার আয়না বসানো এক প্রাসাদ। তার কাহিনি আমরা বইতে পড়েছি। ইংরেজের সঙ্গে লড়াইয়ে হার হলে রাজা নির্বাসিত হন ভারতবর্ষে। ঔপনিবেশিক আমলের ইংরেজ আমলারা অতঃপর এই রয়েল প্যালেসে গড়ে তোলে তাদের সামাজিক ক্লাব। প্রাসাদের দরবার হলে বিলাতের রাজার জন্মদিনে ‘গড সেইভ দ্য কিং’ গাওয়ার শোরগোলের মাঝে বসত তাদের বল ড্যান্সের আসর। পরবর্তী জমানায় বার্মায় রেললাইন এলে তা বসানো হয় দুর্গের ভেতর দিয়ে সাতমহলা অন্দরের চকমিলান দালানকোঠা ভেঙেচুরে কেটেকুটে।

default-image

একটি কাঠের বৃহৎ ব্রিজ গড়খাইকে সংযুক্ত করে রেখেছে অন্য পাড়ের শানবাঁধানো চত্বরের সঙ্গে। আমরা তা অতিক্রম করে চলে আসি রাজকীয় দেউড়ির সামনে। একসঙ্গে জোড়া হাতি অতিক্রম করতে পারে এ ধরনের তোরণের ভেতর দিয়ে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে ঢুকতে গেলে, গার্ডরুম থেকে বেরিয়ে এসে, আমদের ঘিরে ধরে জনা ছয়েক বার্মিজ সৈনিক। তাদের আচরণ বেজায় অ্যাগ্রেসিভ। ইংরেজিতে কথাবার্তা বলে তাদের কিছু বোঝাতে পারি না। একজন আমার ক্যামেরা কেড়ে নেয়, তারপর টিফিন বক্স থেকে কাজরির ফ্রুটজুসের বক্স খুলে অন্যজন পানও করে। প্রতিক্রিয়ায় আমাদের মেয়েটি তারস্বরে কেঁদে ওঠে। ঠিক তখনই ব্রিজ পাড়ি দিয়ে এগিয়ে আসেন মাঝবয়সী এক লোক। তাঁর চেককাটা লুঙ্গিতে শার্টটি ভেতরে গুঁজে নাভির ওপর গিঁট্টি দেওয়া। আমাদের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বার্মিজ সেপাইদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে শুরু করেন তিনি। সৈনিকেরা তাঁর মধ্যস্থতায়—আমরা আর প্রাসাদে ঢুকবার চেষ্টা করব না—এ কড়ারে ক্যামেরা ফেরত দেয়। ব্রিজ ধরে ওপারে ফিরে এসে তিনি নিজের নাম মি. কোকু তুইতাং বলে পরিচয় দিয়ে সোলজারদের আচরণের জন্য মাফ চান। তারপর কথাবার্তা বলতে বলতে, হাঁটতে হাঁটতে আমাদের সঙ্গে চলেন। একটি গলিতে এসে কাঠের তৈরি নেহাত সাদামাটা তাঁর বাড়িটি দেখিয়ে ভেতরে এসে চা খেতেও বলেন। আমরা সে প্রস্তাবে রাজি না হলে তিনি বিদায় নিতে গিয়ে বলেন, মান্দালয়ে কোনো ঝামেলা হলে আমরা যেন এ বাড়িতে এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলি।

দিন দুয়েক মান্দালয়ে কাটিয়ে খুব ভোরবেলা সুবেহ সাদিকের ঠিক পরপর আমরা চলে আসি স্টিমারঘাটে। ইচ্ছা জার্নি বাই বোটে বার্মার কয়েক শতাব্দী আগের রাজধানী পেগানে যাওয়া। স্টিমারখানা আকারে পেল্লায়। এ ধরনের বয়লার থেকে চিমনি দিয়ে বাষ্প ওঠা স্টিমার একসময় চাঁদপুর ও গোয়ালন্দের ঘাটে দেখা যেত। বাষ্পীয় পোত পছন্দ হলেও তার টিকিট কাটা নিয়ে খুব ঝামেলা হয়। টিকিটের টংঘরটির সামনে শতাধিক যাত্রীর ভিড়। সেদ্ধ আন্ডা, চা-গরম, ভাপা পিঠা বিক্রেতা ও স্যুটকেস ধরে ক্রমাগত টানাহেঁচড়া করনেওয়ালা মুটেদের মুলামুলিতে নাস্তানাবুদ হওয়ার উপক্রম হয়। হঠাৎ দেখি, হাসি মুখে পানের বোঁটা থেকে মুখে চুন গুঁজতে গুঁজতে এগিয়ে আসছেন মি. কোকু তুইতাং। আমাদের মুশকিল আহসান হয় তৎক্ষণাৎ। তিনি ভিড়ভাট্টায় ধস্তাধস্তি করে আমাদের জন্য টিকিট কেটে, খুব সাবধানে আগলে আগলে হিলহিলে কাঠের সাঁকো বেয়ে তুলে দেন স্টিমারে।

না, গোলযোগে আমরা ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কাটতে পারিনি। সুতরাং সারা দিনের জার্নির জন্য কেবিন পাওয়া যায় না। খানিক খাজুল হয়ে তৃতীয় শ্রেণির ডেকে এসে স্যুটকেসে হেলান দিয়ে বসতেই ভেঁপু বাজিয়ে স্টিমারটি ছাড়ে। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে বোটের পাশে লাগানো বিশাল ঘূর্ণমান চাকার তোড়ে উত্থিত সফেদ ফেনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ইরাবতী নদীর চলমান জল থেকে আস্তে–ধীরে মাথা তুলছে সূর্যের অরুণিম গোলক। তার আভায় ক্রমশ রঙিন হয়ে উঠছে জেলেনৌকার গলুই ও পাল। স্টিমারটি বাঁক নেয়, আর দেখতে দেখতে পাড়ের জনপদ আলোকিত হয়ে ওঠে। এদিককার প্রসারিত নদীজলে অসংখ্য লঞ্চজাতীয় জলযান। আমরা দারুণ আগ্রহ নিয়ে দেখি, তীরসংলগ্ন পাহাড়ের একাধিক স্তূপ ও মন্দির। ভাবি, হাতের কাছে বাইনোকুলারটি থাকলে বেশ হতো।

‘হ্যালো মিস্টার, হাউ ইজ দ্য বোটরাইড? এভরিথিং গোয়িং ওকে?’ বলে কাছে এসে দাঁড়ান মি. কোকু তুইতাং। তাঁর হাতে দুকাপ চা ও কাজরির জন্য একটি কাঠিলজেন্স। তৃতীয় শ্রেণির ডেকে আমাদের দুরবস্থা আঁচ করতে তাঁর বিন্দুমাত্র সময় লাগে না। কবজিতে ঢলঢলে সোনালি চেইনের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘কষ্ট করে একটু অপেক্ষা করুন। সাড়ে সাতটার দিকে ক্যাপ্টেন ইঞ্জিনঘরের বাইরে আসবেন, তখন দেখব আপনাদের জন্য কেবিনের বন্দোবস্ত করতে পারি কি না?’ না, আমাদের সাড়ে-সাতটা অব্দি ইন্তেজারি করতে হয় না। পৌনে সাতটার দিকে তিনি আমাদের কেবিন জোগাড় করে দেন। তাঁকে ভালো করে ধন্যবাদ জানানোর কোনো ফুরসত হয় না। আমাদের মালসামান কেবিনে ঢুকিয়ে দিয়ে, ভারী ব্যস্তসমস্ত হয়ে দুই খালাসির সঙ্গে বার্মিজ ভাষায় কথা বলতে বলতে তিনি চলে যান বয়লারের দিকে।

তিনতলার এ ডেকটিতে খেলছে আলাবোলা হাওয়া। আমরা ক্যানভাসের ইজিচেয়ারে বসে পড়ি। ইরাবতীর পাড়ে নারকেল কুঞ্জের আড়ালে মন্দিরের চূড়ায় পিতলের ত্রিশূলে সূর্যের সোনালি আঁচড় দেখতে দেখতে ভাবি, মি. কোকু তুইতাংয়ের আসল পরিচয়টা কী? এটা স্পষ্ট, জাহাজ কোম্পানির কোনো কর্মকর্তা তিনি নন। তাঁকে ট্যুর গাইডও মনে হয় না। কী কাজে তিনি স্টিমারে চড়ে আজ মান্দালয় থেকে পেগান যাচ্ছেন?

দুপুরের দিকে কাজরির খাবার নিয়ে আরেক দফা সংকট দেখা দেয়। খুব ভোরবেলা আমরা মালপত্র গুছিয়ে স্টিমারঘাটের দিকে মেলা দিয়েছিলাম। তাড়াহুড়ায় হোটেলরুমে ফেলে এসেছি, ফ্রিজে রাখতে হয় না এ ধরনের কয়েকটি দুধের বক্স। মেয়ে এখন কেবলই দুধ খেতে চাচ্ছে, অন্যান্য শিশুতোষ খাবার সে মুখে তুলছে না। হলেন তাকে কাঁধে করে ছন্ন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ডেক থেকে অন্য ডেকে। চায়ের স্টলে সাক্ষাৎ পাওয়া যায় মি. কোকু তুইতাংকে। তিনি চুরুট ফুঁকে, থু থু করে তামাকপাতার ছিটেফোঁটা টুকরা দূরে ফেলতে ফেলতে ভুরু কুঁচকে হলেনের বাচনিকে সমস্যাটি শোনেন। তারপর কাজরিকে আমার কোলে দিয়ে হলেনকে নিয়ে সরাসরি ঢোকেন কিচেনে। রাঁধুনি গরম পানি দিয়ে হান্ডি ধুয়ে তাতে একটু দুধ ভালো করে ফুটিয়ে দেয়। তা হলেন ফিডারে ভরে ঠান্ডা করতে করতে নিয়ে আসে ডেকে।

কথা ছিল, সন্ধ্যার দিকে স্টিমার পেগানে পৌঁছাবে। কিন্তু দেখতে দেখতে রাত আটটা-নয়টা বাজল। সার্চলাইট জ্বেলে ইরাবতীর জল কেটে কেটে ধীরেসুস্থে বোট চলছে। আবার মাঝেমধ্যে হ্যাজাক কিংবা কুপি-লন্ঠন জ্বলা হিলহিলে সব জেটিতে থেমে থেমে প্যাসেঞ্জার ও মালসামান নামাচ্ছে। কেবিনের আধো অন্ধকারে ঝিমাতে ঝিমাতে আমরা বোধ করি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জেগে উঠতেই মনে হলো, বোট এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। উর্দি পরা এক খালাসি এসে আমাদের তাড়াতাড়ি পেগানের ঘাটে নেমে যাওয়ার জন্য তাড়া লাগায়। রাত বাজে সাড়ে বারোটার মতো। ঘুমিয়ে পড়াতে আমাদের ঘাটে নামার প্রিপারেশন নেওয়া হয়নি। খালাসিরা হিলহিলে সাঁকো গোটানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। খুব তাড়াহুড়া করে স্যুটকেস গুছিয়ে, ডাফোল ব্যাগে কেবিনের ফ্লোরে ছড়ানো কাজরির খেলনাগুলো ঢুকিয়ে প্রায় দৌড়ে আমরা বেরিয়ে আসি।

জেটি ধরে নেমে আসতেই দেখি, লাল টেইললাইট জ্বেলে শেষ ট্যাক্সিটি প্যাসেঞ্জার নিয়ে চলে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে ক্যাচম্যাচ করে খানচারেক রিকশাও যাত্রীর সঙ্গে মালসামান বোঝাই দিয়ে চলে যায়। না, এখানে আর কোনো রিকশা–ফিকশা নেই। একটু দূরে টংঘরের টিমটিমে লন্ঠনের আলোয় দাঁড়িয়ে, আমাদের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে দুটি খেঁকি কুত্তা মৃদু মৃদু ভুকে। মুশকিলেই পড়া গেল। রাতবিরাতে গেস্টহাউস অব্দি যাই কীভাবে?

একটি ছায়াশরীর আমাদের দিকে এগিয়ে আসে। কষে দম দেওয়া চুরুটের আগুনে এবার মি. কোকু তুইতাংয়ের মুখের আদল আমরা দেখতে পাই। তিনি আমাদের অপেক্ষা করতে বলেন। একটু পর তাঁর পেছন থেকে ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং করে এসে থামে একটি ছ্যাকড়া ঘোড়ার গাড়ি। স্টিমারের লেট করে পৌঁছানোর জন্য তিনি হলেনের কাছে মাফ চান। কথাবার্তায় বুঝতে পারি, অন্যান্য প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে দেখতে না পেয়ে তিনিই খালাসি পাঠিয়ে আমাদের ঘুম ভাঙান। সব ট্যাক্সি ও রিকশা অন্যান্য প্যাসেঞ্জার নিয়ে নিলে, তিনি এ ছ্যাকড়া গাড়িটি আমাদের জন্য রিজার্ভ করে রেখেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে আমরা ঘোড়ার গাড়িতে ওঠি। তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘ডোন্ট ওরি মিস্টার, কোচওয়ান আমার পরিচিত, খুবই বিশ্বস্ত...গুডবাই।’

ছ্যাকড়া গাড়ি ছেড়ে দিতে আমি পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি, মি. কোকু তুইতাং ম্যাচলাইট জ্বেলে জ্বেলে সাবধানে পথ দেখে নদীর ঢাল বেঁয়ে নেমে যাচ্ছেন। ঠিক বুঝতে পারি না কোথায় যাচ্ছেন তিনি? জেটির নিচে ভাসা ছোট্ট নৌকাটি ভাড়া করে তবে কি তিনি এদিকের কোনো গ্রাম বা গঞ্জে যাবেন? তাঁর সঙ্গে পেগান শহরে আগামীকাল আবার আমাদের দেখা কি হবে?

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন