default-image

‘পরবেন’ নাকি ‘পড়বেন’—এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এখন তোলপাড় চলছে। আলোচনায় আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কর্তৃপক্ষের টাঙানো এক বিজ্ঞপ্তি। সেখানে মাস্ক ‘পড়তে’ বলা হয়েছে। এখন মাস্ক কীভাবে পড়া যাবে, তা নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা যাক। প্রয়োজনে এটি গবেষণার বিষয়ও হতে পারে। দয়া করে, ভুরু সোজা রাখুন।

বিজ্ঞপ্তির ভাষা বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তিটি টাঙিয়েছে। অন্তত বিজ্ঞপ্তিটি আক্ষরিক অর্থে ‘পড়ে’ তা-ই মনে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও বিজ্ঞপ্তিটি দৃষ্টিগোচর হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রাক্কালেই। সেখানে এই ‘পড়া’ নিয়েই মূল বিতর্ক উঠেছে। আছে ‘সুস্থ্য’ সংক্রান্ত বিড়ম্বনাও।

বিজ্ঞাপন

এবার একটু ব্যাকরণের জগতে ঘুরে আসা যাক। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী, ‘পরা’ শব্দের অর্থ হলো পরিধান করা। ‘র’-এর বদলে ‘ড়’ হলে তার অর্থ দাঁড়ায় অধ্যয়ন বা পাঠ করা। আবার পতিত অর্থও হতে পারে, তবে তা বাক্যে প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল।

মাস্ক ‘পড়তে’ বলায় এখন ‘হায় হায়’ রব উঠেছে। কিন্তু এত অবাক হওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে? একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের তো উচিত, সবার আগে পড়াশোনায় ও গবেষণায় মনোযোগ দেওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও সেটিই করেছে। সবকিছু পড়ার মধ্যে নিয়ে আসার এই চেষ্টার কি কোনো মূল্য নেই? আমাদের বরং উচিত ছিল এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে মূল্যায়ন করা। সেদিক থেকে মাস্ক ‘পড়ার’ একটা উপায় আমরা খুঁজে দেখতেই পারি। ছাই উড়িয়ে দেখতে গিয়েই পাওয়া যেতে পারে অমূল্য রতন।

দেখা যাবে, ‘পরার’ বদলে ‘পড়তে’ পারলেই সুবিধা বেশি! মনে রাখতে হবে, এভাবেই কিন্তু একদিন জানা গিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) দশ টাকায় এক কাপ চা, একটা শিঙাড়া, একটা চপ ও একটি সমুচা পাওয়ার যুগান্তকারী খবর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তখন চোখ কপালে তোলার দশা হয়েছিল। গিনেস বুক অব রেকর্ডে স্থান করে নেওয়ার কথাও তখন দৃপ্ত স্বরে শোনা গিয়েছিল কর্তাব্যক্তিদের কণ্ঠে। মাস্ক ‘পড়ার’ কৌশল আবিষ্কারে মাধ্যমে আবার কিন্তু সেই পথে দৌড়ানোর সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলা যায়।

করোনা মহামারির শুরু থেকেই এ দেশে মাস্ক নিয়ে তুঘলকি কাজ-কারবার চলছে। নাক-মুখের বদলে অনেকেরই থুতনিতে জায়গা করে নেয় মাস্ক। এখনো এ দেশের মানুষের মুখমণ্ডলের অন্যান্য স্থানের তুলনায় থুতনিতে থাকার বিষয়ে মাস্ক এগিয়ে আছে। আবার দেখা যায়, কারও কারও ক্ষেত্রে মাস্ক মুখে আছে, কিন্তু নাক অনাবৃত।

আবার কখনো কখনো নাক আবৃত করার দায়িত্ব পেলেও, ঠোঁটের নাগাল মাস্ক পায় না। এমন অবস্থায় এটি পরিধানের বিষয়টি নিয়েই একটি বিতর্ক উঠে আসা ছিল সময়ের দাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল টিম অনুরোধের রূপে সেই বিষয়টিই উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে হয়তো। কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতেই হতো, তাই না?

এ বিষয়টি নিয়ে হাসি-তামাশা করা আসলে অনুচিত। তার চেয়ে বরং এ নিয়ে একটি গবেষণামূলক কাজ শুরু করা যেতে পারে। মুখে পরিধানের বদলে মাস্ক কীভাবে ‘পড়া’ যেতে পারে এবং তা জ্ঞানপিপাসা নিবারণে কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত বিবেচ্য বিষয়। এ থেকে নতুন তথ্য জানতে পারারও সম্ভাবনা আছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে মাস্ক অধ্যয়নের মাধ্যমে কীভাবে ‘সুস্থ্য’ থাকা যায়, সেটি নির্ধারণ করতে পারলে তো কথাই নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। চা-চপ-শিঙাড়া দিয়ে আর গিনেস বুকে স্থান পাওয়ার চেষ্টা তখন করতে হবে না। উল্টো পুরো আন্তর্জাতিক তথা বিশ্ব সম্প্রদায় আমাদের বুকে টেনে নিতে পারে।

বাংলা একাডেমির অভিধান বলছে, ‘সুস্থ’ শব্দটির অর্থ নীরোগ বা স্বাস্থ্যসম্পন্ন। শান্ত বা সুস্থির শব্দ দুটিও এর অর্থ হিসেবে লেখা আছে। সেদিক থেকে ‘সুস্থ্য’ আদতে ‘সুস্থ’কে প্রতিনিধিত্ব করে কি না, তা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট করা জরুরি। এ ব্যাপারে আরেকটি নতুন বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া যেতে পারে। তা থেকে জ্ঞানের নতুন দিশাও মিলতে পারে।

আমাদের আসলে এমন একটা অবস্থা হয়েছে, সুযোগ পেলেই ছিদ্রান্বেষণের চেষ্টা করি। এই ধারা থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন। তবেই নিজেদের মৌলিক ভাবনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হবে।

সবশেষ কথা, করোনা মহামারির এই সময়ে টেস্টে নেগেটিভ প্রমাণিত হওয়ার তাড়নায় দয়া করে মনের গহিনে নেতিবাচক ভাবনার বিষবৃক্ষ গজিয়ে তুলবেন না। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে সম্প্রতি আমরা জানতে পেরেছি, আমেরিকা থেকেও এ দেশে মানুষ আসছে করোনার টিকা নিতে। এমন এক অভূতপূর্ব করোনা পরিস্থিতিতে মাস্ক ‘পড়া’ নিয়েও ইতিবাচক হওয়ার চেষ্টা করা জরুরি। তবেই ‘সুস্থ্য’ থাকা যাবে, ‘সুস্থ্য’ রাখা যাবে!

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন