মেয়েদের কথা, মেয়েদের কথায়

ষাটের দশকের মাঝামাঝি মরিস টোব্যাকো কোম্পানি ভার্জিনিয়া স্লিমস নামের এক নতুন সিগারেট বাজারজাত করা শুরু করে। সেই প্রথম শুধু মেয়েদের জন্য সিগারেট বাজারজাত করা হলো। মরিস কোম্পানি সে সময় কয়েক কোটি টাকার এক বিশাল বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইনও শুরু করে। সে প্রচারণার স্লোগান ছিল—‘ইউ হ্যাভ কাম এ লং ওয়ে, বেবি’। এই স্লোগানের মোদ্দা অর্থ, একসময় মেয়েরা ছিল সবচেয়ে অবহেলিত, সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার। এখন আর সে অবস্থা নেই। মেয়েরা ইতিমধ্যে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। প্রমাণ, সে এখন চাইলেই সিগারেট ধরাতে পারে, চাইলেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে তা ছুড়ে দিতে পারে যেকোনো পুরুষের মুখের ওপর।এও তো প্রায় ৪০ বছর আগের কথা। এই সময়ে মেয়েরা অনেকটা পথ পেরিয়েছে বটে, কিন্তু এখন তারা আর বৈষম্যের শিকার নয়, এ কথা সর্বৈব মিথ্যা। শুধু দারিদ্র্যক্লিষ্ট, পিছিয়ে থাকা দক্ষিণে নয়, চোখ ধাঁধানো নিয়ন বাতির শিল্পোন্নত পশ্চিমেও মেয়েদের সমস্যার চেহারা অভিন্ন। বাইরে থেকে যেমনই মনে হোক না কেন, মেয়েমাত্রই বৈষম্যের শিকার। সমাজে, কর্মক্ষেত্রে, সংসারে, প্রতিটি ক্ষেত্রে। শহরে বা গ্রামে, ধনী বা গরিব দেশে, দক্ষিণ গোলার্ধে বা উত্তরে, এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে তারা পুরুষ নামের হায়েনার শিকার নয়। অথবা শিকার নয় দৈনন্দিন সহিংসতার। যুদ্ধের সময় ধর্ষণ এখনো খুব পরিচিত একটি অস্ত্র। যেখানে যুদ্ধ নেই, সেখানেও শান্তি নেই মেয়েদের। শুধু মেয়ে বলে তাদের এখনো যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়, প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায়। কখনো কখনো খুব নিকটাত্মীয়দের হাতে, যেমন স্বামী বা প্রেমিক। কাগজের পাতায় কখনো কখনো তাদের কারও খবর বেরোয়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের বোবা কান্নার স্বর ঘরের চার দেয়াল পেরোয় না।সাধারণত মেয়েরা সমাজের সামনে এসে দাঁড়ায় না নিজেদের কাহিনী নিয়ে। সমাজ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় সে কাহিনী শুনতে। কিন্তু একটা মেয়েকে নিজেকে তো অহর্নিশ সে কাহিনী শুনতে হয়। নিজের শরীরে সে কাহিনীর চিহ্ন সে বয়েও বেড়ায়। কাউকে না পেয়ে এই গল্প তাই সে শোনায় সহযাত্রী কোনো মেয়েকে। সহানুভূতির আশায় নয়, বুকের বোঝা হালকা হবে, এই আশায়। একবার যখন সংকোচের বাঁধ ভেঙে যায়, প্লাবনের মতো কূল চাপিয়ে নামে বেদনার বর্ষা।এ রকম একটি নাটক সম্প্রতি আমার দেখার অভিজ্ঞতা হলো। আটটি মেয়ে, নানা বয়সের, সামাজিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন পর্যায় থেকে উঠে এসেছে তারা। তাদের কেউ সফল কর্মজীবী, কেউ লেখক, কেউ অভিনেতা, কেউ বা দেহপসারিণী। শুধু মেয়ে, এই লিঙ্গ-সদৃশ ছাড়া খুব বেশি কিছু মিল তাদের বাহ্যত নেই। অথচ সামনে ঝুলিয়ে রাখা মুখোশটা টান মেরে খুলে ফেলুন। কী আশ্চর্য, সবার বেদনার অভিজ্ঞতাই যে অভিন্ন!নাটকটির নাম ইন দ্য রেড রুম: এভরি ওম্যান ড্যানসেস ফর সামওয়ান। নাট্যকার ও পরিচালক গর্ডন ফ্যারেল নাটকটিকে উপস্থিত করেছেন একটি বার লাউঞ্জে। এই রেড রুম আসলে একটি শুঁড়িখানা। এখানে সবাই পাশাপাশি বসে, কিন্তু কেউ কাউকে চেনে না। এখানে মদ হাতে অপরিচিতের কাছেও নিজের কথা বলা যায়। আটজন মেয়ে এই শুঁড়িখানায় বসে নিজেদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত, সবচেয়ে নিভৃত, কখনো কখনো সবচেয়ে লজ্জার গল্পগুলো একে অপরের কাছে তুলে ধরে। বোঝাই যায়, নাট্যকার মেয়েদের অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য সন্ধান করেননি, বরং তাদের সাদৃশ্য নির্দেশেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। সব গল্পই নারীর দেহকে ঘিরে। তার নিজের শরীর, অথচ এই শরীরের ওপর মেয়েদের পূর্ণ অধিকার নেই, নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা দেখি, তরুণী ছাত্রীর দেহ দাবি করছে সম্মানিত শিক্ষক, কর্মজীবী নারীর দিকে হাত বাড়াচ্ছে অফিসের বস, বন্ধুত্বের নামে সহপাঠীর দেহ ভোগের আবদার করছে কলেজপড়ুয়া ছাত্র। এমন গল্প আমরা আগেও শুনেছি অথবা দেখেছি। বস্তুত এসব গল্প প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও অভিনীত হচ্ছে। ফ্যারেল নিজেও বলেছেন, গত ২০ বছর এসব গল্প তিনি মেয়েদের কাছ থেকেই শুনেছেন। তাতে কোনো রং চড়াননি, বাড়তি নাটকীয়তাও আনেননি।একটি সত্যিকারের বার লাউঞ্জে নাটকটির মঞ্চায়ন হয়। স্টেজের পেছনে রয়েছে বার, দর্শক চাইলে এক বোতল বিয়ার বা এক গ্লাস সুরা হাতে নিয়ে নাটক দেখতে বসতে পারে। ঝকঝকে আলোর নিচে হাই চেয়ারে বসে আটটি মেয়ে। গল্পগুলো পর্যায়ক্রমে তারাই বলে যায়। দুটি পুরুষ চরিত্র আছে গল্পে নাটকীয়তা সরবরাহের জন্য। কিন্তু তাদের খুব যে প্রয়োজন ছিল, তা নয়। লাল টেপ দিয়ে মেঝের চারধার চিহ্নিত, কথক বা অভিনেতা মেয়েরা সেই ‘লক্ষণরেখার’ ভেতর কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো বসে, কখনো উপুড় হয়ে নিজেদের গল্প বলে। আমরা যারা দর্শক, সে লক্ষণরেখার ঠিক বাইরে বসে এই নাটক দেখছি, কেউ চেয়ারে, কেউ সোফায়। অভিনেতারা আমাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলে যায়। কোথাও কোনো চালাকি নেই, নাটকীয় আড়ালের কোনো চেষ্টাও নেই।শুধু একটি গল্প ছাড়া প্রতিটি গল্পই আলাদা ও সম্পূর্ণ, কিন্তু তাদের এভাবে গাঁথা হয়েছে যে মনে হয় আসলে আমরা একটা গল্পই দেখছি। আটটি মেয়ে মঞ্চে হেঁটে বেড়ায়, কথা বলে, অথচ তারা আলাদা আলাদা কেউ নয়। বিষণ্ন, কান্নাভেজা গল্পগুলো নির্মম অভিজ্ঞতাকে তারা মেনে নিয়েছে, কিন্তু সে অভিজ্ঞতাকে একমাত্র নিয়তি বলে স্বীকার করেনি। জীবন তাদের জন্য থেমে থাকে না, হতাশায় বন্দীজীবনও নয় তাদের। এই নাটকের আসল শক্তি এখানেই। গল্পগুলো মেয়েরা বলে মেয়েদের কাছেই। সম্ভবত এ কারণে যে তারা একে অপরের কাছ থেকে সংহতির শক্তি আহরণ করে। বুকভাঙা কান্নার গল্প, কিন্তু সে কান্না শেষ হলে মেয়েরা একে অপরের হাত ধরে হেসেও ওঠে। জীবন অনিঃশেষ, নারী কেন সে জীবনের সম্ভাবনা অর্জিত হওয়ার আগেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবে? যদি পুরুষকে সে সাথি হিসেবে না পায়, নারীই হবে তার সহযাত্রী।এটি একটি অফ-অফ ব্রডওয়ে নাটক। ব্রডওয়ে নাটক বলতে যে নাচা-গানা বোঝায়, এ নাটক ঠিক তার উল্টো। অফ ব্রডওয়েতে অধিকাংশ কলা-কুশলী মূলধারার বাইরে থেকে কাজ করেন। এই নাটকের বেলায়ও দেখলাম এক নাট্যকার-পরিচালক ছাড়া যাঁরা অভিনয়ে অংশ নিলেন, তাঁরা সবাই নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রী। কেউ এখনো নাটকের স্কুলের ছাত্র, কেউ সদ্য পাস করে বেরিয়েছেন। আমরা যেদিন নাটকটি দেখি, সর্বসাকল্যে নয়জন দর্শক সেখানে উপস্থিত। বড় মঞ্চে ওঠার আগে এটি ছিল সেই নাটকের প্রিভিউ। অভিনয় শেষে কলা-কুশলীরা আমাদের সঙ্গে কথা বললেন, জানতে চাইলেন কী ভালো লেগেছে, কী ভালো লাগেনি। এই নাটক, সম্ভবত সব নাটকই আসলে এক ধরনের কনভারসেশন। এক স্তরে এই আলাপচারিতা নাটকের চরিত্রগুলোর নিজেদের মধ্যে। কিন্তু অন্য স্তরে, গভীরতর স্তরে, এই আলাপচারিতা অভিনেতা ও দর্শকদের ভেতর। কোনো নীতিকথা শোনানো তার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু এই গল্পগুলো শুনে যদি দর্শকের ব্যক্তিগত চৈতন্যে একটি ছোট ঢিলও এসে পড়ে, তাহলেই তার উদ্দেশ্য সফল হয়।সে ঢিল তো পড়েছেই, না হলে এই লেখার তো কোনো প্রয়োজনই থাকত না।২ নভেম্বর ২০০৯, নিউইয়র্ক