বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

এলএমজির ট্রিগারে হাত রেখে গুলি চালাতে চালাতে মোস্তফার মনে পড়ছে তাঁর স্ত্রী পেয়ারা বেগমের কথা। বউটা পোয়াতি। তাঁকে বাড়ি রেখে তিনি বাড়ি ছেড়েছেন ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর। তারপর তো দেশেই ঘূর্ণিঝড় লেগে গেল। নির্বাচন হলো। আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। মার্চ মাস ধরে অসহযোগ।

৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে চাকরি তাঁর। মেজর শাফায়াত জামিলের সঙ্গে তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিলেন মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে। খবর আসছে, পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি সৈন্যদের ওপরে আক্রমণ করবে। মেজর খালেদ মোশাররফকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে পাঠানো হয়, সেখান থেকে আলফা কোম্পানিসহ তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় শমসেরনগরের দিকে। শমসেরনগরে মেজর শাফায়াত জামিল আর মেজর খালেদ মোশাররফ বৈঠক করলেন। যুদ্ধ আসন্ন। তাঁরা বিদ্রোহ করবেন।

২৫ মার্চের পর কুমিল্লায় পাকিস্তানি সৈন্যরা আক্রমণ করে ঘুমন্ত বাঙালি সৈন্যদের হত্যা করে। আর শমসেরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন খালেদ মোশাররফ আর শাফায়াত জামিল। এপ্রিলের শুরুতে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সব কোম্পানি একত্র হয়। মেঘনার পশ্চিমে তারা শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে তোলে।

default-image

কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী বিপুল শক্তি সংগ্রহ করে হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান, গানশিপসহ এমন আক্রমণ করে যে পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া মুক্তিবাহিনীর কোনো উপায় থাকে না। এরপর তারা আখাউড়াতে তাদের ডিফেন্স লাইন গড়ে তোলে।

১৬ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী আখাউড়া আক্রমণ করতে এলে যুদ্ধ শুরু হয়। একটা পুকুরপাড়ে সর্বডানে ট্রেঞ্চ খুঁড়ে মোস্তফা কামাল এলএমজি নিয়ে প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত। ১৭ এপ্রিল ব্যাপক গোলাগুলি হয়।
১৮ এপ্রিল প্রচণ্ড বৃষ্টি। পাকিস্তানি সৈন্যদের গোলাগুলিও থেমে গেছে। তবে কি তারা ফিরে গেছে ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়ে।

রক্তে আঁকা ভোর
আনিসুল হক
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
৫৮৪ পৃষ্ঠা
দাম: ১০৫০ টাকা। prothoma.com–থেকে এখন হ্রাসকৃত মূল্যে বইটি প্রি-অর্ডার করতে পারেন আপনিও। প্রি-অর্ডারে দাম: ৭৫০ টাকা।

কিন্তু না। একটু পরে শুরু হয় প্রচণ্ড আক্রমণ। দুই দিক থেকে আক্রমণ আসছে। মোগড়াপাড়া, গঙ্গাসাগরের দিক থেকে। দরুইন গ্রামের এই ডিফেন্স পোস্টে ১০ জনের প্লাটুনের কমান্ডার মোস্তফা। মেজর শাফায়াত জামিল তাঁকে ল্যান্স নায়েকের ব্যাজ পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটা পরেই তিনি এখন যুদ্ধরত।
দুই দিক থেকে আসা একযোগে আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা চাপে পড়ে গেছে। তাদের পিছিয়ে যেতে হবে। পেছানোর জন্যও কভার দিতে হবে।

default-image

মোস্তফা বললেন, ‘আমি এলএমজি চালাচ্ছি। তোমরা সরে যাও।’
এলএমজির নল প্রচণ্ড গরম। গুলি বের হওয়ার সময় মাটি পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। পাকিস্তানি বাহিনী এগোচ্ছে সার বেঁধে। তাদের অনেকের হাতেই এলএমজি। এমনকি মর্টার থেকে গোলাবর্ষণ করছে তারা।

মোস্তফা তাঁর কাজ জানেন। কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে হবে শত্রুদের। তারপর তিনিও পিছিয়ে যাবেন।

ঠিক এ সময়ে তাঁর মনে পড়তে লাগল তাঁর বাবার মুখ। বাবা ছিলেন বীর। তিনটা মেডেল পেয়েছেন বিশ্বযুদ্ধের সময়। মনে পড়ে মায়ের মুখ। মা বলছিলেন, ‘বাবা, আবার কবে আসবা? সাইক্লোনে সব ভাসায়া নিয়া গেছে, তবু আমরা তো বাঁচিয়া আছি।’
ভোলা থেকে আসার পর চিঠি এসেছে বাবার। ‘বাবা মোহাম্মদ মোস্তফা। তোমার স্ত্রী গর্ভবতী। একবার আসিয়া দেখিয়া যাইয়ো।’

একটু পরে শুরু হয় প্রচণ্ড আক্রমণ। দুই দিক থেকে আক্রমণ আসছে। মোগড়াপাড়া, গঙ্গাসাগরের দিক থেকে। দরুইন গ্রামের এই ডিফেন্স পোস্টে ১০ জনের প্লাটুনের কমান্ডার মোস্তফা। মেজর শাফায়াত জামিল তাঁকে ল্যান্স নায়েকের ব্যাজ পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটা পরেই তিনি এখন যুদ্ধরত।
দুই দিক থেকে আসা একযোগে আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা চাপে পড়ে গেছে। তাদের পিছিয়ে যেতে হবে। পেছানোর জন্যও কভার দিতে হবে।

মোস্তফা ভাবলেন, আমার বাবা ছিলেন সৈনিক। আমিও হয়েছি সৈনিক। আমার ছেলেও সৈনিক হবে। তবে সে হবে স্বাধীন দেশের সৈনিক।

default-image

ছেলের নাম কী রাখা হবে?
আমি ছেলেকে দেখতে যাব। তবে যখন যাব, তখন এই দেশ শত্রুমুক্ত। স্বাধীন বাংলাদেশ।
মোস্তফা গুলি চালাচ্ছেন তিন দিকে। একবার দক্ষিণে, একবার পশ্চিমে, একবার উত্তরে।

একজন সহযোদ্ধা বললেন, ‘মোস্তফা চইলা আহো।’
মোস্তফা বললেন, ‘তোমরা তাড়াতাড়ি যাও। আমি আসতেছি।’

গুলি শেষ হয়ে এসেছে। আর থাকার মানে হয় না। বাংকার থেকে বেরোতে যাবেন, অমনি একটা গুলি এসে লাগল তার কাঁধে। উড়ে গেল কাঁধ। পড়ে গেলেন তিনি। বাংলার মাটিতে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাটি। বৃষ্টিতে রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে। এই পানি কি মিশে যাবে মেঘনার স্রোতে?
পাকিস্তানি মিলিটারি চলে এসেছে এই এলএমজি পোস্টে। দেখল, একটা বাঙালি সৈন্য তখনো নড়ছে। এ তো বেঁচে আছে। বেয়নেট চালাল তারা।
মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে গেছে তাদের ক্যাম্পে।

পড়ে রইল মোস্তফার নিস্পন্দ শরীর। গুলিবিদ্ধ, বেয়নেট-চেরা।
পরে সৈন্যরা চলে গেলে দরুইন গ্রামের চাষা আর শ্রমিকেরা আসে সেখানে। মোস্তফা কামালকে সমাহিত করে সেই জায়গাতেই।

বড় ছেলে মোস্তফার মৃত্যুসংবাদ ভোলার সেই টিনে ছাওয়া বেড়ার ঘরের বাড়িতে কবে এসে পৌঁছায়, তাঁর মা মালেকা বেগম কবে ডুকরে কেঁদে ওঠেন, আর কবে পেটের ভেতরে সন্তান নিয়ে পেয়ারা নির্বাক হয়ে ঘরের খুঁটি ধরে দাঁড়ান, কে তার খোঁজ রাখে!
জুলাই মাসে পেয়ারা বেগমের সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো। ছেলে। ছেলের নাম রাখা হলো মোশাররফ হোসেন। দাদা হাবিলদার হাবিব তাঁকে ডাকেন বাচ্চু বলে। তা থেকেই ছেলের নাম হয়ে গেল মোশাররফ হোসেন বাচ্চু।

ব্যাঙ্গমা বলবে, ‘মো. মোস্তফাকে স্বাধীনতার পর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়া হইল। নামের লগে যুক্ত কইরা দেওয়া হইল কামাল। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল।’

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন