কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম

সঞ্জীবদার সঙ্গে আমার পরিচয় ‘আহ’ অ্যালবাম দিয়ে, আসলে সঞ্জীবদার গীতিকবিতার সঙ্গে, গানের সঙ্গে আর বাপ্পা ভাইয়ের সঙ্গেও। প্রথমেই গীতিকবিতার কথা বললাম, কারণ, ‘আহ’-এর গানগুলো শুনে সুর-সংগীতের চেয়েও আমার কানে গানের কথাগুলো এসে লেগেছে। তারপর থেকে গেছে মনে, মননে।

আমি এখন স্বীকার করি, গান সুরপ্রধান মাধ্যম। তবু কিছু গান আছে, যেখানে সুরের চেয়েও গানের কথা প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে। সামনে এসে দাঁড়ায়। সুরকে কোমল ভঙ্গিতে শাসন করে এগিয়ে নিয়ে যায়। ‘আহ’ ক্যাসেটের গান শুনে আমি সঞ্জীব চৌধুরী নামে একজন বিস্ময়কর গীতিকবির সন্ধান পেলাম। সময়কাল বোধ করি ১৯৯৬-৯৭। তত দিনে বিষয়ভিত্তিক গানের প্রতি আমি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়েছি। শুরুটা এলআরবির গান শুনে। বাপ্পী খান, শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, লতিফুল ইসলাম শিবলী আর ওপারে সুমন, অঞ্জন, নচিকেতা। সে সময়েই শুনি প্রতুল আর মহীনের ঘোড়াগুলির গান।

এ রকম গান শোনা শুরু করে মাঝখানে একটা সাময়িক বিরতি। মনে হলো যেন বিষয়ভিত্তিক গান একটু কমে গেছে বা আমার কানে আসছে না। তখনো ক্যাসেটের স্বর্ণযুগ। আর আমিও খুব সংকোচের সঙ্গে কবিতা লিখছি। কিন্তু মনকে আড়াল করে মনকেই বলছি যে আমি আসলে গীতিকবি হতে চাই। ঠিক সেই সময়ে আমার হাতে ‘আহ’ অ্যালবাম এল। ‘বেতার জগৎ’-এর প্রডাকশন। প্রচ্ছদে তিন ফোঁটা—এক ফোঁটা দ্রোহ, এক ফোঁটা প্রেম আর এক ফোঁটা নির্লিপ্ততা। দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে ধর্ষণের শিকার হওয়া ইয়াসমীন আক্তারকে নিয়ে লেখা গান ‘আহ! ইয়াসমিন’, ‘কথা ছিল’, ‘গিটার’, স্যাটায়ারধর্মী গান ‘কাগা’, দারুণ নির্লিপ্ততার ‘আমার ভাল্লাগে না’ অথবা দেহতত্ত্বের বিমূর্ত ‘সাদা ময়লা’।

বিজ্ঞাপন
default-image

এই সব ছাপিয়ে আমি বুঁদ হলাম ‘সানগ্লাস’ গানটাতে। মনে হলো সুদূর থেকে সর্বগ্রাসী কথা আর সুর আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল এক অচিনপুরে। সঞ্জীব চৌধুরীর ভক্ত হয়ে গেলাম আমি, সঞ্জীব চৌধুরীর গানের কথা আর সহজিয়া কিন্তু গভীর উঠে আসা এক কণ্ঠস্বরের। ভক্ত হলাম বাপ্পা মজুমদারের সাইকেডেলিক সংগীতের। আমার মাথায় কেউ জলটোকা দিয়ে বলে গেল, আমাকে অবশ্যই ‘দলছুট’-এর সঙ্গেই কাজ করতে হবে।

দেয়ালে তোমার ছবি অন্ধকার, তুমি ছায়া ঘেরা সুদূরের মুখ

সঞ্জীবদার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই বাপ্পা ভাই মারফত আমি দাদার পরামর্শ পেয়েছি। পরামর্শকে শিরোধার্য মেনে জয় গোস্বামীর কবিতা পড়া শুরু করেছি। পড়তে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি তাতে লেখা:

যদি মেঘ থেকে নামে
মৃত্যু—সকল গাছ
ঘুমন্ত এই গ্রামে
জাগ্রত সব গাছ
প্রতি মৃত্যুর নামে
জন্ম পাঠায় আজ

তার দুই দিন আগেই সঞ্জীবদা আমার লিরিকে একটা গান করেছেন। সেই গানের শিরোনাম ‘গাছ’: ‘খোলা আকাশ, একটি গাছ/ সবুজ পাতা, একটি গাছ/ স্মৃতির বৃক্ষ, পাতারা জানে/ মেঘের চাষবাস।’ গান শোনা শেষ হলে কোনো এক বিকেলে বাপ্পা ভাইয়ের সেই নীলা মেটার্নিটি গলির বাসায় সঞ্জীবদার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় আমার। খুব ধীরে সখ্য বাড়ে। বাড়তেই আমার নতুন নামকরণ হয়—বৃক্ষ রানা।

আমি সানন্দে সঞ্জীবদার দেওয়া নাম মেনে নিই। আরও বোহিমিয়ান হয়ে যাই। সঞ্জীবদার সবকিছু অনুসরণ করতে চাই। সেই হাফহাতা শার্ট, গ্যাভার্ডিন প্যান্ট আর স্যান্ডেল পায়ে ঝাঁকড়া চুলের সঞ্জীব চৌধুরী। পত্রিকার অফিসে কাজ আর রাজ্যের শুভানুধ্যায়ী। রিকশায় করে বাড়ি ফেরা রাতে নিয়ন আলো বিমূর্ত সন্তাপ। সেই সন্তাপে অনেক উচ্ছ্বাস ছিল, কিন্তু এখন আমার মনে পড়ে, তার আড়ালে বিষাদও ছিল নিবিড়।
‘হৃদয়পুর’ ক্যাসেটের বি সাইডে সিরিয়াল ধরে আমার তিনটা লিরিক জায়গা করে নেয়—‘সবুজ যখন’, ‘গাছ’, ‘বৃষ্টি’। সব কটিই বাপ্পা ভাইয়ের সুর করা। তত দিনে ‘দলছুট’-এর সুর-সংগীতের মূল ভার বাপ্পা মজুমদারের আর গানের কথার পুরোধা পুরুষ সঞ্জীব চৌধুরী। ‘গাছ’ তো ছিলই, সঞ্জীবদা আর বাপ্পা ভাইয়ের যুগলবন্দী হলো ‘সবুজ যখন’ গানটি। ‘হৃদয়পুর’-এর সর্বশেষ রেকর্ডকৃত গান। ‘বৃক্ষ রানা, তোর লিরিকে গান করে এলাম’—মিউজিকম্যান স্টুডিও থেকে বেরিয়ে সঞ্জীবদার চিরাচরিত কৌতুকমেশানো সেই কণ্ঠস্বর, কান পাতলেই শুনতে পাই।

দুদিন আগেই সঞ্জীবদা আমার লিরিকে একটা গান করেছেন। সেই গানের শিরোনাম ‘গাছ’: ‘খোলা আকাশ, একটি গাছ/ সবুজ পাতা, একটি গাছ/ স্মৃতির বৃক্ষ, পাতারা জানে/ মেঘের চাষবাস।’ গান শোনা শেষ হলে কোনো এক বিকেলে বাপ্পা ভাইয়ের সেই নীলা মেটার্নিটি গলির বাসায় সঞ্জীবদার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় আমার। খুব ধীরে সখ্য বাড়ে। বাড়তেই আমার নতুন নামকরণ হয়—বৃক্ষ রানা।
আমি সানন্দে সঞ্জীবদার দেওয়া নাম মেনে নিই। আরও বোহিমিয়ান হয়ে যাই। সঞ্জীবদার সবকিছু অনুসরণ করতে চাই। সেই হাফহাতা শার্ট, গ্যাভার্ডিন প্যান্ট আর স্যান্ডেল পায়ে ঝাঁকড়া চুলের সঞ্জীব চৌধুরী।

‘হৃদয়পুর’-এর গানগুলো ‘আহ’-এর খুব বিপরীত প্রান্তের। ‘আহ’ যদি হয় দ্রোহ, ‘হৃদয়পুর’ তবে ময়ূরাক্ষী নদীর বুকে ভেসে যাওয়া ডিঙিনৌকার গান। নদীটা শান্ত, নৌকারও কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। ‘জলের দামে’, ‘বাজি’, ‘অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’, ‘দোলো ভাটিয়ালি’…একেকটা মাস্টারপিস! ঠিক সে সময় ‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত হলো বাউল শাহ আবদুল করিমের লেখা ও সুর করা ‘দলছুট’-এর পরিবেশনা ‘গাড়ি চলে না’। তারপর রচিত হলো ইতিহাস। কিন্তু এই সব ছাপিয়ে আবার সঞ্জীবদার একটা লিরিক আমার মনের ভেতর ডুব দিল অতলে:

‘আমি তোমাকেই বলে দেব
কী যে একা দীর্ঘ রাত
আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে…’
এত বিষাদসুন্দর গানের কথা আমি কি শুনেছি আগে, পরে? এই গান শুনে আমার মনে হলো, সঞ্জীবদার গানের কথা ছোঁয়াও যায় না, ধরাও যায় না। খুব কাছের কিন্তু সেই নৈকট্যই বুঝি অনতিক্রম দূরত্বের আরেক নাম!

কালাপাখি শোন তোর, চোখকান কিছু নাই

সঞ্জীবদা আপাদমস্তক উদাসী এক কবি ছিলেন। কিন্তু দ্রোহের মুখোমুখি হয়ে পিছুটান দেওয়ার ইতিহাস তাঁর নেই। প্রতিকূল ডায়াসে দাঁড়িয়ে টান টান উত্তেজনার সামনে সত্যবচনে একবিন্দুও পিছপা হননি, গাইতে গিয়ে গলাও কাঁপতে দেখিনি আমি।
কিন্তু সঞ্জীবদা আদতে গান নিয়ে সিরিয়াস ছিলেন না। এমনকি ‘আহ’ সময়কালেও গান রেকর্ডের কথা শুনে সঞ্জীবদা স্বভাবসিদ্ধ হাসিমুখে বলেছিলেন, ‘আমি কেন গাইব! আমি তো গায়ক নই, গান তো গাইবি তুই!’

এই কথাগুলো আমি পরে বাপ্পা ভাইয়ের মুখে শুনেছিলাম। দুজনই প্রবলভাবে মজেছিলেন পিঙ্ক ফ্লয়েডে। তার প্রভাব ‘আহ’তে খুব ভালোভাবে বোঝা যায়। সেই সাইকেডেলিক আবহটা সহজেই কানে আসে। চোখে নানা রকম দৃশ্য দেখায়। তিন ফোঁটার সুররিয়ালিজম।

default-image

সঞ্জীবদার আরেকটা গান আমার খুব প্রিয়। একটা নয়, দুটো। জুলফিকার রাসেলের লেখা ‘কথা বলব না’ ও প্রজ্ঞা নাসরীনের লেখা ‘বাড়ি ফেরা’।
‘সমুদ্র সন্তান’ অ্যালবামের কাজ চলছে, রাতে একসঙ্গে বাড়ি ফিরছি। আমার আর সঞ্জীবদার বাসা তখন কাছাকাছি, মিরপুরেই। সিএনজি বাহনে ফিরতে ফিরতে অ্যালবাম নিয়ে অনেক কথা বললেন। এই গানগুলো নিয়ে বেশ উত্তেজিত ছিলেন সঞ্জীবদা। আমার একটু অভিমান হয়েছিল। আমার লিরিক ছিল না। সঞ্জীবদাকে বলেছিলামও। দাদার সেই পরিচিত ভঙ্গি, ‘আরে, নেব তো তোর লিরিক!’

আমি ফিরে পেতে চাই, সেই বৃষ্টিভেজা সুর

প্রথম যেদিন আজিজ মার্কেটে বসে সঞ্জীবদা বাপ্পা ভাইকে বলেছিলেন, ‘তুমি অনেক ভালো গান করো, আমি তোমাকে কিছু লিরিক দেব। তুমি গাইবে।’—বাপ্পা ভাইয়ের সেই অব্যক্ত অনুভূতির এক স্বজন আমার হাত ধরতেই আমি হাঁটাপথে দেখতে পাই সঞ্জীবদা আর বাপ্পা ভাই কনসার্টে একসঙ্গে হাসিমুখে গাইছেন, ‘আমি ফিরে পেতে চাই, সেই বৃষ্টিভেজা সুর/ আমি ফিরে পেতে চাই সাত সুখের সমুদ্দুর।’ সামনে হাজারো দর্শক। সবাই গলা মিলিয়ে সমস্বরে ফিরে পেতে চাইছে নিজস্ব জানালা।

ফিরে পেতে চাওয়ার আকুলতা সঙ্গে নিয়েই সঞ্জীবদার কথা মনে পড়ে আমার। আমি ভাবি আর বুঝতেও পারি, সঞ্জীবদার গীতিকবিতা আসলে সমস্তই তাঁর নিজস্ব পঙক্তিমালা, এমনকি তাঁর কণ্ঠের সব গানও তা-ই। নিজের দুঃখ, বিষাদ, ভালোবাসা, প্রণয়, দ্রোহ, ক্ষোভ আর আকুলতার শব্দচয়ন।
এখানেই এক প্রস্থ কথা শেষ হয় কারও।

ঢেউ বলে চল দূরে চল, নদী বলে থাম

১৯ নভেম্বর ২০১৭। ঢাকা থেকে আমি যোজন যোজন দূরে। নিজেকে হারিয়ে খুঁজে ফিরছি ভুলতে চাওয়া বিলেতের পথে।

অদ্ভুত এক দোলাচলে ভুগছিলাম। নিদারুণ শূন্যতা গ্রাস করেছিল আমাকে। জীবন থেকে, গান লেখা থেকে, সমস্ত সুন্দর থেকে গুটিয়ে নিয়ে নির্বাসনদণ্ড যাপন করছিলাম। সবার অলক্ষ্যে। অনেক মানুষের ভিড়ে আমি আসলে কোথাও ছিলাম না।
হঠাৎ হঠাৎ সঞ্জীবদার কথা মনে পড়ত। বাপ্পা ভাইয়ের স্টুডিওতে সময় কাটানো। ঈদের আগের এক রাতে তিনজন এক রিকশায় চেপে পাটুয়াটুলী যাওয়ার কথা। মোহাম্মদপুরের আদর্শ কলেজের গলিতে সঞ্জীবদার বাসায় গান নিয়ে হুলুস্থুল হওয়ার কথা, মদির নিদমহলের কথা।

বিজ্ঞাপন

আর মনে পড়ত সঞ্জীবদার একান্ত কিছু কথা, সে কথাগুলো বিষাদের। বিরান পথের মতো একাকী।

সঞ্জীবদা কি মানুষের এত ভালোবাসার মধ্যেও একা ছিলেন? যিনি আসলে নিজের ভেতর ডুব দিয়ে মেঘের চাষবাস করতেন, তারপর একাকিত্ব আলিঙ্গন করে ঘুরে বেড়াতেন? আমি জানি না! সঞ্জীবদাকে আমার চেনা হলো না কোনো দিন।
শুধু সঞ্জীবদার কথা মনে পড়লে আমার ‘খোলা আকাশ, একটি গাছ’-এর বিষাদতম সেই কণ্ঠস্বরের কথা মনে পড়ে। ফিরে পেতে চাওয়ার আকুলতার কথা মনে পড়ে। অন্ধের চোখে সানগ্লাসের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কেউ একজন গান গাইছেন আর ভাবছেন, আমি ভালো নেই, ভালো থাকার মানে নেই।

সঞ্জীবদার কথা মনে পড়লে আমার ১৯ নভেম্বরের সেই রূঢ় কিন্তু জ্বলজ্বলে শূন্যতার কথা মনে পড়ে। সেই শূন্যতা সর্বগ্রাসী হয়ে আমাকে আরও স্বার্থপর করে দিয়েছিল।
সঞ্জীবদা, আপনার কথা আমি দৈনন্দিন স্বার্থপর জীবনযাপনে ভুলে থাকি।কিন্তু ১৯ নভেম্বর আমাকে বিরান পথের কথা মনে করিয়ে দেয়।
কী যে একা দীর্ঘ পথ আমি হেঁটে গেছি। আর বলে গেছি এই সব কথা:

‘হাহাকার মাখা শহুরে সন্ধ্যা
সেই পথে একা ঘুরি
যেই পথ ধরে বাড়ি ফিরে গেছে
সঞ্জীব চৌধুরী।’

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0