উপভোগ করছিলাম ছবির এসব অন্তর্গত মজা। এ সময় শূন্য প্রদর্শনীকক্ষে কারও পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। চোখ ফিরিয়ে দেখি গৌতম চক্রবর্তী। তিনি গ্যালারি কায়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিজে শিল্পী, আবার এ প্রদর্শনীর ছবিগুলোও বাছাই করেছেন তিনি। এখানে খানিক আগেই আমরা চারকোলে আঁকা তাঁর ছবির মুখোমুখি হয়েছি।

কালো ক্যানভাসের ভেতরে আলতো সাদা রঙের শেড ব্যবহার করে ‘এলিফ্যান্ট’ শিরোনামের ছবিতে হাতির পা ও শুঁড়ের মধ্যে তিনি এমন এক অস্থিরতা নির্মাণ করেছেন, যা হয়তো অমাদের সমসাময়িক দিকশূন্যতাকেই নির্দেশ করছে।

ছবির দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে এবার খানিক স্থির হয়ে বসা গেল। গৌতম চক্রবর্তীর সঙ্গেও চলল টুকটাক বাতচিত, এই প্রদর্শনীর অনন্যতা কোথায়? প্রশ্ন করলাম তাঁকে।

: আমরা নানাভাবে মাস্টার শিল্পীসহ বিভিন্ন শিল্পীর কাজ সংগ্রহ করি এবং এই প্রদর্শনীর জন্য জমিয়ে রাখি। এখানে এবার কিংবদন্তি শিল্পীদের এমন কয়েকটি ছবি আছে, যা আগে কখনো প্রদর্শিত হয়নি। যেমন, মুর্তজা বশীরের ‘দ্য উইং’ সিরিজের ছবিটি।

কথা বলতে বলতে গৌতম চক্রবর্তী আমাদের নিয়ে গেলেন ছবিটির সামনে। তেলরঙে ২০০৫ সালে আঁকা ছবিতে পাখা মেলেছে উড়ন্ত নীলচে একটি ডানা। বিমূর্ত এই ছবির পর আমরা এবার মূর্ত দুটি স্কেচের সামনে। গৌতম বললেন, ‘এ ছবি দুটি আমার বাবা দেবদাস চক্রবর্তীর। ১৯৯২ সালে এঁকেছিলেন। এগুলোও আগে প্রদর্শিত হয়নি।’

‘ওম্যান’ ও ‘সিস্টারস’ শিরোনামে স্কেচ দুটিতে তাকালাম আমরা। ছবিগুলোয় নারীমুখ—একটিতে একজন, অন্যটিতে রয়েছে দুই বোনের মুখাবয়ব।

default-image

বিভিন্ন শিল্পীর অপ্রদর্শিত এমন আরও কয়েকটি ছবি প্রদর্শনীটির জেল্লা বাড়িয়েছে বৈকি! আর এ তালিকায় যদি ওপারের ‘রাগী শিল্পী’ যোগেন চৌধুরীও থাকেন, তবে এপার–ওপার মিলে তা সোনায়–সোহাগাই তো হয়।

দিন কয়েক আগে বিকেলের প্রথমার্থে কায়ার চারটি প্রদর্শনীকক্ষে আমরা যখন শিল্পীদের চিত্রমালার মুখোমুখি, তখন প্রথম দিকে এখানে কেউই ছিলেন না, গৌতমও এসে পৌঁছাননি। ফলে একধরনের সুমসাম পরিস্থিতির মধ্যেই আমরা দেখছিলাম গেল শতকের চল্লিশ দশকের চিত্রকর থেকে একেবারে সাম্প্রতিককালের শিল্পীদের ছবিগুলো। আর তাঁদের আঁকা–রেখার কারসাজিতে একে একে মূর্ত হয়ে উঠছিল বাংলাদেশের চারুকলার বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসও। কেননা, এখানে পঞ্চাশ দশকের পথিকৃৎ চিত্রকর আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তীর ছবি আছে, রয়েছেন এর পরের কালের সমরজিৎ রায়চৌধুরী, হাশেম খান, হামিদুজ্জামান খান, রফিকুন নবী। আবদুস শাকুর শাহ, চন্দ্রশেখর দে, মুহম্মদ ইউনুস, ফরিদা জামান, রণজিৎ দাস, শিশির ভট্টাচার্য্য, জামাল আহমেদ থেকে শুরু করে তরুণ সোহাগ পারভেজ, শাহনূর মামুন, কামালুদ্দিন, বিশ্বজিৎ গোস্বামী, নগরবাসী বর্মনসহ অনেকের কাজই এখানে ফ্রেমবন্দী। তবে শুধু বাংলাদেশের শিল্পী নন, ভারতের বিখ্যাত মকবুল ফিদা হুসেন, কে জি সুব্রামানিয়ান, সোমনাথ হোড়, যোগেন চৌধুরী—তাঁরাও সমৃদ্ধ করেছেন এই আয়োজন। প্রদর্শনীটি চলবে ২ জুলাই অব্দি।

১৭ জুন শুরু হওয়া প্রদর্শনীর ৩৫ জন শিল্পীর মোট ৬৮টি কাজের মধ্যে মাধ্যমগত বৈচিত্র্য যেমন আছে, তেমনি একেকজন শিল্পীর অঙ্কনশৈলী অনুধাবনের পথটিও এতে উন্মুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন শিল্পীর ছবি আঁকার শৈলী কীভাবে মনে বিচিত্র অনুভব তৈরি করে, তা–ও কি সম্যক বোঝা যায় না এখানে এসে? যেমন, তেলরং ও অকটেনে আঁকা আমিনুল ইসলামের ‘আনটাইটেল–৩’ ছবিতে তাকালে দেখা যায়, লাল, নীল, কালো এবং হলুদাভ কমলা—এসব রং হালকা ও গাঢ়ভাবে বিন্যস্ত, ক্যানভাসজুড়ে নানান রঙে অস্থিরভাবে খেলা করেছেন শিল্পী। আর নির্বস্তুক ছবির এই রংগুলো আমাদের চোখে ও মনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, মজার ব্যাপার হলো, তার রূপটি একেবারেই স্থির—সে যেন আমাদের ধ্যানস্থ ও স্থিত হতে বলে। আবার লিথোগ্রাফে আঁকা ‘আনটাইটেল–৩’ নামে শাহাবুদ্দিন আহমেদের দুইরঙা ছবিতে অবয়বের আবহ থাকলেও শিল্পীর ট্রেডমার্ক ‘গতিশীলতা’র কারণে এটি আমাদের মনকে ধাবমান গতির কোনো ‘অস্থির’ প্রান্তে দাঁড় করিয়ে দেয়।

default-image

ছবির পর ছবিতে, ক্যানভাসের অক্ষরহীন ভাষায়, রং ও রেখার নীরবতার মধ্যে, কত কিছু যে ব্যক্ত হয়ে আছে! দর্শক হিসেবে আমরা সেসব খুঁজে চলি—প্রথমে অন্ধের মতো একা একা, পরে বিভিন্ন সূত্র ধরিয়ে দিয়ে ‘অন্ধের যষ্টি’ হলেন গৌতম চক্রবর্তী। গৌতম যখন প্রদর্শনকক্ষে এলেন, তার কিছুক্ষণ বাদে এখানে পাওয়া গেল বেশ কয়েকজন শিল্পরসিক দর্শককে। ফরিদপুর থেকে এসেছেন এক শখের আঁকিয়ে। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে নিশ্চিতই তিনি এর স্বাদ গ্রহণ করছিলেন, বোধ হয় ভাষা ও ভাবটিও বুঝে নিতে চাইছিলেন।

এদিকে গৌতম চক্রবর্তী আমাদের বলছিলেন কৌতূহলোদ্দীপক সব কথা, ‘পঞ্চাশে আমাদের মাস্টার আর্টিস্টদের বেশির ভাগই যে নন–ফিগারেটিভ ছবি আঁকলেন, এর কারণ কী? আবার দেখেন, এখনকার তরুণ শিল্পীদের অনেকেই ফিগারে মনোনিবেশ করছেন, এর পেছনেও নিশ্চয় কারণ আছে। এ প্রদর্শনীতে আমরা ফিগারেটিভ ও নন–ফিগারেটিভ—দুই ধরনের ছবিই রেখেছি।’

এর মধ্যে প্রদর্শনকক্ষে ঢুকলেন প্রবীণ শিল্পী হামিদুজ্জামান খান ও তাঁর স্ত্রী আইভি জামান। গৌতমের মনোযোগ এখন তাঁদের দিকে। তাই আমাদেরও আবার ছবি দেখার অবকাশ মিলল। আমরা ছবি দেখছি, সস্ত্রীক হামিদুজ্জামান খানও ছবি দেখছেন। তাঁকে পাশে পেয়ে একসময় বললাম, ‘এখানে আপনার পছন্দের ছবি কোনগুলো?’

হামিদুজ্জামান বললেন, ‘তরুণদের বেশ কয়েকটি কাজ দেখলাম। ভালো লেগেছে।’

: খুব পছন্দের ছবির নাম যদি বলতে বলি?

এক্ষণে একটু ভাবলেন হামিদুজ্জামান খান। পরে আমাদের নিয়ে গেলেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া চল্লিশ দশকের শিল্পী সোমনাথ হোড়ের একটি লিথোগ্রাফের সামনে।

‘আনটাইটেল–৪’ নামে ছবিটি ১৯৬৪–তে আঁকা। গাঢ় লাল রঙের জমিনে বিমূর্তভাবে তিনজন মানুষের অবয়ব।

‘ওঁর সঙ্গে আমাদের ভালো যোগাযোগ ছিল।’—সোমনাথ হোড়ের ছবির দিকে তাকিয়ে হামিদুজ্জামানের প্রথম কথা। পরে বললেন, ‘পেপারের মধ্যে লাল রং দিয়ে তারপরে লিথোগ্রাফে ছাপ দেওয়া হয়েছে। দেখেন, ফিগারের ভেতরে কেমন নন–ফিগারেটিভ একটা ইশারা। এ জন্যই ছবিটি আমার বিশেষ পছন্দ।’

এরপর সোমনাথ হোড়ের ছবিটির দিকে দৃষ্টি রেখে আমাদের মনে হয়, বামপন্থী এ শিল্পী ছাপাই মাধ্যমে ছবিটি যখন আঁকছেন, কলকাতায় তখন তো জেগে উঠেছে নকশালবাড়ি আন্দোলন। ছবিটি কি সেই আশাবাদী জাগরণের শিল্পরূপ?

প্রদর্শনীর ছবিগুলো এভাবেই দর্শকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ, এগুলো আমাদের কেবল চোখ আর মনকে প্রশান্তিই দেয় না, ভাবনার খোরাকও জাগায়।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন