মিটিংয়ে দেখলাম সভাপতি সবাইকে ডেকেছে, বুঝলাম আটঘাট বেঁধে এসেছে। আমাদের ধরবে। রাস্তার কাজ খারাপ হয়েছে, দুই পত্রিকা রিপোর্ট করেছে। একটা ব্রিজে ফাটল ধরেছে, দুই কালভার্ট ভেঙে গেছে, সাড়ে তিন মাইল রাস্তায় সামান্য বৃষ্টিতে বিটুমিন উঠে গেছে। প্রজেক্ট এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, তারপর ওয়ারেন্টি পিরিয়ড দুই বছর, মিটিংয়ের সবার হাতে পত্রিকার কাটিং। আমাদের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার আমার পাশে বসা, তার চোখমুখ ফ্যাকাশে, আমি ওর হাতে চাপ দিলাম। ইঙ্গিত করলাম, আপনি কিছু বলবেন না।

টেবিলের বিপরীত পাশের লোকজনের ওপর চোখ বোলাচ্ছি। মনের ভাব বুঝছি। সভাপতির প্রশিক্ষিত নির্বিকার মুখ। বাকিরা উৎসাহে টগবগ করছে। পুকুর চোর ধরা পড়েছে। আমার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল, প্রজেক্টের চিফ ইঞ্জিনিয়ার আল্লাহর কাছে। ১০ দিন আগে মারা গেছে। ম্যাসিভ স্ট্রোক। কিছু বলে যাওয়ার সুযোগ পায়নি।

আমি বললাম, ‘চিফ ইঞ্জিনিয়ার আমাদের সাথে মিটিংয়ে স্বীকার করেছিলেন সয়েল ইনভেস্টিগেশন, স্পেসিফিকশনে ভুল ছিল।’

সভাপতির কারিগরি পরামর্শদাতা, বেচারার এখানে পানিশমেন্ট পোস্টিং, বললেন, ‘টার্ন–কি কাজ, সব আপনাদের দায়িত্ব।’

‘এটা বিদেশি ঠিকাদারের ফেলে যাওয়া কাজ ছিল আমাদের গছিয়ে দিয়েছেন। চিফ ইঞ্জিনিয়ার বলেছিলেন, তদন্ত কমিটি করাবেন নতুন করে স্পেসিফিকেশন করাবেন।’

‘কথাগুলো সত্যি না, চিফ ইঞ্জিনিয়ার আকাশ থেকে নেমে সাক্ষী দিতে আসবেন না।’

চোখে চোখে সভাপতির সাথে বাক্‌বিনিময় হলো, তিনি রাজি।

পাশার দান উল্টে গেল। ডিপার্টমেন্টের লোক ধরা হবে কাজে এত বড় ভুল কীভাবে হলো? সরকার খারাপ মানের কাজ গ্রহণ করবে না। কোয়ালিটি রাস্তা চাই। জনপ্রতিনিধিরা হেলিকপ্টারে না এই সিল্কের মতো মসৃণ রাস্তায় যাতায়াত করবেন। খরচ বাড়ুক।

লামেরিডিয়ানের রুমে সায়কা বলে, ‘আমাকে কেমন লাগছে?’ বলি, ‘সানি লিওনি।’

মিটিং থেকে উঠে এমডিকে ফোন করলাম, ‘ব্যবস্থা হয়েছে, কাজের রিভাইজড এস্টিমেট করে নতুন স্পেসিফিকেশনে আবার সব কাজ হবে, কন্ট্রাক্ট প্রাইস তুলব ডাবলের কাছাকাছি।’

পরের ফোনটা করলাম সায়কাকে।

‘বিজি?’

‘না, অলি ভাই।’

‘বিরাট দাও মারলাম। দুই বছরে আমার ২০০ কোটি টাকা থাকবে।’

‘টাকা আমাকে টানে না, রুমেলেরও অনেক টাকা।’

‘এই কথাটা ঠিক না। অনেক টাকা ঠিকই তাবে সব রুমেলের ভাইবোনের। বাপের রেখে যাওয়া সম্পত্তি ওরা বাড়িয়েছে। রুমেল গুড ফর নাথিং। সম্বন্ধ ভাঙিয়ে টাকা। মায়ের পেটের ভাইকে ফেলে তো দেওয়া যায় না। আমার নিজের রোজগারের টাকা। হার্ড ওয়ার্ক করে পাই, যুদ্ধ করে জিতি।’

‘আপনি আপাকে যুদ্ধ করে জিতেছিলেন?’

‘বাসিরা তো চলে গিয়েছিল প্রায় হার্ভার্ড। তোমার বাবা এসব হার্ভার্ড–অক্সফোর্ড–কেমব্রিজ শুনলে কাৎ হয়ে যান। টাকপড়া গবেষকের বিরাট বাড়িতে সারা জীবন তোমার আপা কাঠের সিঁড়ি ভেঙে ওপর-নিচ করত আর জানালার ঠান্ডা কাচে মুখ চেপে একা স্নো ফল দেখত।’

‘আপাকে বাঁচালেন, আমাকে ঢুকিয়ে দিলেন।’

‘তোমাকে তো বাঁচাতে বলোনি প্রিন্সেস।’

‘এখন বাঁচান।’

‘সেজন্যই ফোন করেছিলাম সায়কা। লেটস সেলিব্রেট। হঠাৎ পাওয়া ৫০০ কোটি টাকা, এটা হবে কোম্পানির নিট লাভ। আমি বের করে নেব পুরো অর্ধেক না হলেও তার কাছাকাছি।’

মনে হচ্ছে যে আমি ভিক্টরি স্ট্যান্ডে। ওয়ান টু থ্রি লেখা তিনটা বক্স। আমি জাম্প দিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছি ওয়ান পজিশনটায়। দর্শকদের গ্যালারি লক্ষ করে স্যালুট দিচ্ছি। নামছি। আবার প্রথম বিজয়ী। আবার এসে দাঁড়াচ্ছি। করতালির পর করতালি।

নর্থ গুলশানের টপ ডেভলপারের বারো তলা অ্যাপার্টমেন্টের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটটা কিনে ফেলেছি। ইউএসএর বার্কলিতে ছেলের অ্যাডমিশন শেষ। মেয়ে স্কুলে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ওর নাম ছড়িয়ে গেছে সাহিত্যকর্ম আর ভলেন্টিয়ার অ্যাক্টিভিটিজে। এটা ঠিক যে ছেলেমেয়ের কৃতিত্বের পেছনে বাসিরার অবদান বেশি। তবে বড় যেটা, ফিন্যান্সিয়াল স্পন্সর তো আমি। এমডি আমার ওপর ড্যামড প্লিজড। আমার ওপর কোম্পানির কাজের দায়িত্ব দিয়ে দেশের বাইরে থাকতে পারছে বেশি সময়। এমডির সঙ্গে ঝুলাঝুলি করছি, আমাকে কোম্পানির ডিরেক্টর বানিয়ে নেওয়া নিয়ে। জানি যে দুরন্ত ধুরন্ধর লোক ফ্যামিলির বাইরের কাউকে কোম্পানিতে ঢোকাবে না। তবে আমি এটা ছাড়ছি না। বার্গেনিং পয়েন্ট বানাচ্ছি। আরেক কম্পিটিটার কোম্পানি আমাকে এটা দিলে বিশ বছরের এমডিকেকে ছেড়ে যেতে আমার অসুবিধা হবে না।

কয়েকটা প্লট কিনে রেখেছি, চড়চড় করে দাম বাড়ছে। আরেকটা অ্যাপার্টমেন্ট কেনা আছে। ওটা খালিই থাকুক, ভাড়াটে বসিয়ে ফ্ল্যাটের দামি ফিটিংসগুলো নষ্ট করাব না। ছেলেটি ফিরবে না। মেয়ে যদি থাকতে চায়। অবশ্য জানি যে বাসিরা মেয়েকেও দেশে রাখবে না।

আমাকেও বলে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নাও। মাইগ্রেট করো কানাডায়। বিদেশ আমার কম দেখা হয়নি। তবে আমাকে টানে না। ওসব বড় জায়গায় আমি নোবডি। আমার দেশে ফান বেশি।

কয়েক মাস ধরে টের পাচ্ছি আমার ভেতরে একটা পরিবর্তন আসছে। আগে তো কেবল দৌড়েছি, হিসাব করিনি কী চাই? কতটুকু পেয়েছি? এখন হিসাব করতে ভালো লাগে। ক্যালকুলেট করে দেখি আই আর্নড আ লট, শুধু টাকায় না—সব দিক দিয়ে আমরা একটা শক্ত পজিশন টপ এক্সিকিউটিভ হিসেবে। অনেক কোম্পানির মালিক আমাকে ডেকে পাশে বসায়, দু–একটা অ্যাডভাইজ চায়, আমাকে টোপ দেয়, আমার সঙ্গে চলে আসুন।

আমি জিয়া ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করে দাঁড়িয়েছি, তার মানে এই নয় যে আমার গাঁটছড়া বাঁধা। বাসিরার জন্যও এটা সত্যি। ওকে আমি সব দিয়েছি আমার টোটাল ভালোবাসা, কমিটমেন্টও। এখন একটু রং ডুইংয়ের ইচ্ছে হচ্ছে। অন্য কিছু, নতুন ফান, এক্সাইটমেন্ট।

সায়কা কেন, কোনো মেয়েই আলাদাভাবে আমাকে টানেনি। ওটা আমার ঠিক কাপ অব টি মনে হয়নি। কিন্তু কয়েক দিন অন্যরকম একটা কিছু মনে হচ্ছে। ছেলেটা আমার চলে যাবে, ওর সঙ্গে আমার ভালো সময় কাটত এদিক–ওদিক ঘুরে, ভিডিও গেম, অপিনিয়ন এক্সচেঞ্জ। ও না থাকলে আমার কিছুটা ফাঁকা লাগবে। আমার কোনো জায়গা শূন্য রাখব না।

সায়কা ঘন ঘন কয়দিন বড় বোনের বাসায় আসছিল, কানে গেছে রুমেলের মিসবিহেভের মাত্রা বেড়েছে। সাইকোলজিক্যাল পেসেন্ট, শাউট করে, খুব বাজে বাজে কথা বলে। সায়কা বলে, রুমেলের সঙ্গে সে কন্টিনিউ করতে পারবে না।

সায়কাকে কোনোদিন গুরুত্ব দিইনি। জানিও না সে কেমন! আমার সময় ছিল কই? এখন কেন জানি মনে হয় সে যে বাসিরার কাছে আসে, এটা আসলে আমার কাছেই আসে, চোখে পড়তে চায়। সায়কার সঙ্গে বাইরে কোথাও মিট করিনি। বাড়িতে বাসিরার সামনেই দুজনে কফি খাই, টুকটাক গল্প করি। রুমেলের কথা শুনি। সমস্যাটা বুঝতে চাই।

পুরুষ মানুষের চোখে মেয়েদের অনেক কিছু ধরা পড়ে না। এক মেয়ে আরেক মেয়েকে বোঝে।

আমার এখন রং ডুয়িং করতে ইচ্ছে হচ্ছে। বাংলায় বললে দুষ্টুমি, সফট না হার্ড কিছু।

মেয়েদের সাথে ঘুরঘুর কথাটা আমি বুঝি, বাসিরা আসলে সায়কাকে মিন করছে। লেটস ইটস হ্যাপেন্ড।

আমি বাসিরাকে বলি, ‘কুয়াকাটা যেতে হবে প্রজেক্টের কাজে।’

আমি মাঝেমধ্যে যাই প্রজেক্ট সাইটে। আমার ব্যাগেজ গুছিয়ে দেয়, আমার সব প্রয়োজন সে বোঝে, আমি কখনো কোথাও গিয়ে বিপদে পড়িনি।

সায়কাকে ফোনে বলি, ‘লামেরিডিয়ানে চলে এসো।’

আমি অফিসে গিয়ে ড্রাইভার মকবুলকে ছেড়ে দিই। বাসিরার আলাদা গাড়ি আলাদা ড্রাইভার। মকবুলকে তার লাগবে না, তা–ও মকবুলকে বললাম, ‘ম্যাডামের কাছে গিয়ে রিপোর্ট কোরো তুমি ফিরেছ।’

আমি অন্য গাড়ি নিয়ে লামেরিডিয়ানে যাই।

লামেরিডিয়ানের রুমে সায়কা বলে, ‘আমাকে কেমন লাগছে?’

বলি, ‘সানি লিওনি।’

ওকে জড়িয়ে ধরি। নিজেকে বলি, একটু দুষ্টুমি করি।

রাতেও সায়কাকে ছাড়ি না। ওকে বাসায় ফিরতে হবে না আজ রাতে।

সায়কা বলে, ‘রুমেল চিন্তা করবে, ওকে কিছু বলে আসিনি।’

‘তুমি তো চাও সে তোমাকে নিয়ে চিন্তা করুক। সায়কার ভাবনা রুমেলের কাছে থাকুক। তোমার রক্তমাংসটা আমার।’

রাত চারটায় সায়কা বলে, ‘ঘুম আসছে না, ক্লান্তি লাগছে আর তো কিছু করার নেই অলি।’

আমি লাফিয়ে উঠে বললাম, ‘চলো লংড্রাইভে যাই।’

হোটেলের পুল থেকে গাড়ি নিলাম। ফিল্মস্টারদের মতো জড়াজড়ি করে লিফট দিয়ে নামলাম, হোটেলও ফাঁকা, শব্দ নেই।

শোফার গাড়ি রেখে চাবি দিল।

কোথায় যাব জানি না।

আগে জয়দেবপুর মোড় পর্যন্ত যাই, তারপর ঠিক করব রাইট অর লেফট।

টঙ্গি ব্রিজ পার হয়েছে গাড়ি। পাঁচটা বাজে, গাড়ির ড্যাশবোর্ডে দেখি। দিনের আলো ফুটছে, সেটা আবার রাস্তার বাতির আলোকে ম্লান করে দিচ্ছে। কুয়াশা বা ঢাকার বিখ্যাত ধুলা, সামনেটা ঝাপসা লাগে। হেডলাইট ডিপারে দিই। একটা ভ্যান গাড়ি, দূর থেকে যা মনে হয়, বস্তির সংসারের হাঁড়িকুড়ি, দুই–তিনটে মানুষও পা ঝুলিয়ে বসা। একটা কমপ্লিট ফ্যামিলি এঁটে গেছে একটা ভ্যানগাড়িতে। মজা লাগে। কত অল্প জায়গা লাগছে ওদের। বাতির তীব্রতা বাড়িয়ে হর্ন বাজিয়ে জানাচ্ছি, আমি আসছি। কিন্তু ভ্যানগাড়িটা নড়ল, এগোচ্ছে, আমার সামনে দিয়েই রাস্তা পেরোবে।

আমাকে আবার কম্পিটিশনের নামিয়ে দিল। ভ্যানগাড়ি মাঝ রাস্তায় পৌঁছার আগে আমি তাকে পেরিয়ে যেতে পারব? না আমার সব শক্তি দিয়ে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব?

আমি গাড়ির অ্যাক্সেলেটরে পা চাপতে চাপতে আরেকটা রং ডুয়িংয়ের কথা ভাবি।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন